পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাডার অ্যান্টেনা কক্ষপথে স্থাপন করল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ইসরো এবং আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা। মূলত হিমবাহ, জঙ্গল, ভূকম্পন জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর দেবে এই রাডার অ্যান্টেনা। ইসরো এবং নাসা যৌথ ভাবে সিন্থেটিক অ্যাপারচার মিশন (নিসার) শুরু করে। সেই অভিযানের অধীনে এই অ্যান্টেনা স্থাপন করা হল। যেটি ৩৩ ফুট দীর্ঘ। পৃথিবী থেকে ৪৬০ মাইল দূরে মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে এই বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন এই রাডার অ্যান্টেনা। নাসা এবং ইসরোর সূত্রে জানা গিয়েছে, নিসার উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণ করবে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল) এবং ইসরো। দিন-রাত ২৪x৭ কাজ করবে। ফলে যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যযের আশঙ্কা তৈরি হলে আগাম খবর দেবে শক্তিশালী রাডার। সেই মতো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ক’দিন আগেই ইসরো জানিয়েছিল, ভারতের মাটি থেকে ৬,৫০০ কেজি ওজনের মার্কিন স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাবে তারা। এই তথ্য প্রকাশ্যে জানান, ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভারত-মার্কিন শুল্কযুদ্ধের মাঝেই ইন্দো-মার্কিন মহাকাশ মিশন দুই দেশের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন আলো দেখাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঘরে ফিরছেন ‘শুক্স’। এই নামেই মার্কিন মুলুকে, বিশেষত নাসার অভিযানে সহকর্মীদের কাছে পরিচিত হয়ে পড়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার সদস্য, ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী হিসাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন-এর ১৮ দিনের মিশন শেষ করে পৃথিবীতে ফিরেছেন আগেই। রবিবার সকালে ফিরলেন ভারতে। তার আগে ইনস্টাগ্রামে আবেগঘন বার্তা লিখলেন মহাকাশচারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি ভারতে ফিরে আসছি।’ বিমানে বসেই ইনস্টাগ্রামে লেখা সেই নোটে শুভাংশু তাঁর মনের নানা অনুভূতির কথা ভাগ করে নেন। শুভাংশু লিখেছেন, ‘ভারতে ফেরার – বিমানে বসে আমার মনে একসঙ্গে অনেকগুলো অনুভূতি কাজ করছে। দুঃখ হচ্ছে সেই অসাধারণ মানুষদের ছেড়ে আসতে, যারা গত এক বছরে এই মিশনে আমার পরিবার ও বন্ধু ছিল। আবার একইসঙ্গে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে, কারণ এবার আমি প্রথমবার মিশনের পর দেশে ফিরে আমার পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করতে পারব। মনে হচ্ছে, এটাই আসলে জীবন, সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া।’ এই অভিযানে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তাতেও তিনি আপ্লুত। দেশে ফিরে তিনি আগামিকাল, সোমবারই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করবেন। গগনযানের জন্যও প্রস্তুতি নেবেন দ্রুত সেই বিষয়ে মোদির সঙ্গে কথা হবে তাঁর। দিল্লি বিমাবন্দরে পৌছান শুভাংশু। সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রিয় মন্ত্রি জিতেন্দ্র সিং, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং ইসরোর কর্মকর্তারা। এক বছরে লখনউয়ের ছেলে শুভাংশু নাসা, অ্যাক্সিওম এবং স্পেসএক্স-এর বিভিন্ন কেন্দ্রে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অ্যাক্সিওম-৪ মিশনের অংশ হিসেবে তাঁর এই মহাকাশযাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বড় সাফল্য নয়, ভারতের সাফল্য এমনই মনে করছেন তিনি। মহাকাশ মিশনে সঙ্গে সামিল ছিলেন কমান্ডার পেগি হুইটসন। তাঁর প্রসঙ্গে শুভাংশু বলেন, ‘বিদায় জানানো কখনওই সহজ নয়। কিন্তু জীবন মানেই এগিয়ে চলা। যেমন আমার কমান্ডার পেগি হুইটসন বলেন, স্পেসফ্লাইটে পরিবর্তন একমাত্র অবিচল জিনিস। আমি মনে করি, এটা জীবনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।’ পোস্টের শেষে অ শুভাংশু শাহরুখ খানের ‘স্বদেশ’ ছবির জনপ্রিয় গান থেকে একটি লাইন উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘শেষমেশ বলতে হয়, ইউ হি চলা চল রহি, জীবন গাড়ি হ্যায় সময় পাহিয়া।’

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে ‘আত্মনির্ভর ভারত’। বড় বড় ক্ষেত্রে গবেষণা কাজে আর পাঁচটা উন্নত দেশকে টেক্কা দিচ্ছে। তারই মধ্যে একটি মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্র। সেই কাজে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো কার্যত যুগান্তকারী কাজ করে চলেছে। আগামী ২, ৩ বছরের মধ্যে ভারতের সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে হবে ‘গগনযান মিশন’। তার প্রস্তুতি জোরকদমে। এবার শোনা গেল, নভশ্চরদের প্রশিক্ষণের জন্য বাইরের দেশে নয়, এ দেশেই তেমন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে লাদাখের মরু অঞ্চল সো কার ভ্যালিকে। এখান থেকেই নাকি মহাকাশকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। তাই সেখানে তৈরি হচ্ছে হিমালয়ান আউটপোস্ট ফর প্ল্যানেটারি এক্সপ্লোরেশন বা ‘হোপ’। এখানে মহাশূন্যের মতো পরিবেশ বানিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইসরোর। এই উপত্যকা আসলে নোনা এলাকা। দেশের সর্বোচ্চ স্থানে এমন পরিবেশ পাওয়া বিরল। সেই কারণে এখানেই গম্বুজাকৃতি তাঁবু তৈরির সিদ্ধান্ত। নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার একটি তাঁবু বানানো হয়েছে হিমালয়ান আউটপোস্ট ফর প্ল্যানেটারি এক্সপ্লোরেশন বা ‘হোপ’-এর তরফে। এর মধ্যে অন্তত ১০ দিন কাটালে মহাকাশের পরিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এই গোটা প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. সিদ্ধার্থ পাণ্ডে। তিনি নাসা-সহ একাধিক দেশের মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, ”শুধু নভশ্চররা এখানে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন, তা নয়। সাধারণ মানুষ, ভবিষ্যতে যাঁরা মহাকাশে যেতে ইচ্ছুক, তাঁদের কথা ভেবে এটা তৈরি করা।” লাদাখে তৈরি হিমালয়ান আউটপোস্ট ফর প্ল্যানেটারি এক্সপ্লোরেশন। দিন কয়েক আগেই মার্কিন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে জোট বেঁধে ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ মিশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন, লখনউয়ের শুভাংশু শুক্লা। তিনি ভারতের গগনযান মিশনে নভশ্চর হিসেবেও নির্বাচিত। তার আগে ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ একটা বাড়তি অভিজ্ঞতা, যা পরবর্তী মিশনে সামগ্রিকভাবে কিছুটা সুবিধা দেবে। শুভাংশুকে রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল। এ ব্যাপারে আর পরনির্ভরশীল থাকতে চায় না ভারত। মোদির ‘আত্মনির্ভরতা’র মন্ত্রে বলীয়ান হয়ে ইসরোও সব বিষয়ে নিজেদের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে তৎপর। আর সেই কারণেই বেসরকারি সংস্থা ‘প্রোটোপ্ল্যানেট’-এর হাত ধরে লাদাখে ওই ‘হোপ’ তৈরির পরিকল্পনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ এক অভিনব উদ্যোগ। মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্য নিয়ে ভারতের যা পরিকল্পনা, তা যথাযথভাবে করতে গেলে নিজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দরকার।

শেষের সেদিন গুনছে পৃথিবী! সর্বদিক থেকে ধ্বংসের নাগপাশ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। উষ্ণায়নের সর্বগ্রাসী দাপট পাহাড় থেকে সমুদ্র, মেরু থেকে ভূগর্ভ – ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে এগোচ্ছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। পৃথিবীর যেদিকে যত সৌন্দর্য, সবই যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশ আলো করে রাখা যে প্রবাল দ্বীপের আকর্ষণে স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে পা বাড়াতে মানুষ ভয় পায় না, সেই সৌন্দর্য ফিকে হচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলের প্রবাল প্রাচীরের বিপন্নতার কথা উঠে এল। বলা হচ্ছে, দীর্ঘতম ও বৃহত্তম ধ্বংসযজ্ঞ চলছে সেখানে! ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত যেভাবে সমুদ্রে উষ্ণায়ন হয়েছে, তা নজিরবিহীন। তবে কি প্রবালের অস্তিত্ব প্রবল সংকটে? অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মেরিন সায়েন্স সূত্রে খবর, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় নিনগালু ও কিম্বারলির রোলি শোলসের প্রবাল প্রাচীর ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত। এখন তাতেও অভিশাপ লেগেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে প্রায় ১৫০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ছিল অক্ষত। কিন্তু এবার সেখানে ধ্বংস শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ২০২৪-২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সাফ হয়েছে প্রবাল দ্বীপ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ব্লিচিং’। প্রবাল প্রাচীরের কারণে নিনগালু দ্বীপ ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে পরিচিত, ঠিক যেমনটা অস্ট্রেলিয়া পূর্বের গ্রেট বেরিয়ার রিফ। পরিবেশ মন্ত্রী মারে ওয়াট বলছেন, ”প্রবাল দ্বীপ বাঁচাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। অবিলম্বে কার্বন নিঃসরণ শূন্য হওয়া দরকার। কারণ, বিশ্বজুড়ে ওই কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি হওয়াই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।” আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছিল রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত বিভাগ। বলা হয়েছিল, সমুদ্রের জলতলের গড় উষ্ণতা দেড় ডিগ্রি বেড়েছে। এমনটা চলতে থাকলে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রবালই মৃত্যুমুখে পড়বে। তাই অবিলম্বে হু হু উষ্ণতা বৃদ্ধির দৌড় থামাতে হবে। বিজ্ঞানী জেমস গিলমার বলছেন, “উষ্ণতাবৃদ্ধির জেরে বিভিন্ন অংশের সমুদ্রের তলদেশে যে পরিমাণ প্রভাব পড়ছে, তা আমরা আগে দেখিনি। যা ক্ষতি হল, তা পূরণ করতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে।” এসব দেখেশুনে সমুদ্রপ্রেমীদের মনখারাপ। তবে কি সমুদ্রে ডুব দিলে আর জড়িয়ে ধরবে না রঙিন প্রবালের মায়াজাল?




