দৈনন্দিন জীবনে কিছু সাধারণ অভ্যাসই সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি। এমনটাই বলছে ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদশাস্ত্র। আয়ুর্বেদে বর্ণিত নয়টি অভ্যাস আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামান্য দিবানিদ্রাই আপনার মস্তিষ্কের বয়সকে কমিয়ে দিতে পারে প্রায় সাড়ে ছয় বছর! বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ৬০ বছর বয়সের পর প্রতি বছর মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ০.৫ শতাংশ হারে সঙ্কুচিত হতে থাকে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানপত্রিকা ‘স্লিপ হেলথ’ জার্নালে প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় জানা গিয়েছে, সহজেই ঘিলু সংকুচিত হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দেওয়া যায়। গবেষকরা প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের জেনেটিক ডেটা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালান। এই বিশেষ সমীক্ষার সাহায্যে তাঁরা দিবানিদ্রা এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। শুধুমাত্র জেনেটিক মার্কার বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন, যাঁদের জিনে দিবানিদ্রার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের মস্তিষ্কের গঠনে কোনও বিশেষত্ব আছে কি না। ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গিয়েছে, যে ব্যক্তিদের মধ্যে জিনগতভাবেই দিবানিদ্রার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের মস্তিষ্কের গড় আয়তন অন্যদের তুলনায় ১৫.৮ ঘন সেন্টিমিটার বেশি। সহজ ভাষায় বললে একটি সদ্যোজাত শিশুর সঙ্গে একটি সাড়ে ছয় বছর বয়সি শিশুর মস্তিষ্কের ফারাক যতটা এটা ঠিক ততটাই। এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মস্তিষ্কের আয়তন কমে যাওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার অবক্ষয় এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের আয়তন কমে যাওয়া বার্ধক্য এবং স্নায়বিক অবক্ষয়ের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ। ঘুম, মাথাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করে। ঠিক যেমন কম্পিউটার রিসেট করলে আগের জমে থাকা বাতিল ফাইল মুছে যায় এবং কম্পিউটারের কার্যকারিতা বাড়ে, ঘুমও কিছুটা তেমন ভাবেই কাজ করে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের থেকে ক্ষতিকারক বর্জ্য পরিষ্কার করে, প্রদাহ কমায় এবং কোষের সংযোগকারী অঞ্চলকে রক্ষা করে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই কারণেই যাঁরা নিয়মিত দিবানিদ্রায় অভ্যস্ত, তাঁদের মস্তিষ্কের গঠন দীর্ঘদিন পর্যন্ত সুগঠিত থাকে।
উচ্চ রক্তচাপ-এর সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হাইপারটেনশন। অনেকেই মনে করেন এই রোগ কেবল বয়সকালে হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু একেবারে অন্য কথা বলছে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন শুধু বয়স্করাই নন, এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণ-তরুণীরাও। উচ্চ রক্তচাপ বংশগতির মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। অর্থাৎ আপনার পরিবারে বয়স্ক সদস্যদের মধ্যে যদি উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকে, আপনারও এই সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিছু জিন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদি আপনার বাবা-মা বা দাদু-ঠাকুরদার উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে আপনারও এই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায় একটি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের জীবনধারা একই রকমের হয়। সেই কারণেও অনেক সময় একই পরিবারে একাধিক সদস্যর এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরিবারের সদস্যদের খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়ামের অভ্যাস এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার কারণগুলিও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তাই পরামর্শ দিচ্ছেন বংশে এই রোগের ইতিহাস থাকলে ৩০ পেরলেই বাড়তি সতর্কতা অয়বলম্বন করা জরুরি।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: সুস্থ থাকতে হলে সবার আগে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। বাড়াতে হবে ফল, শাকসবজি, শস্য এবং কম চর্বিযুক্ত খাবারের পরিমাণ। লবণ এবং চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। একই সঙ্গে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার কম খেতে হবে। এতে দেহের বিপাক ক্রিয়া ভাল থাকবে। অতিরিক্ত নুন খেলে স্বাভাবিক ভাবেই রক্তে সোডিয়ামের পরিমাণ বাড়ে। ফলস্বরূপ বাড়ে রক্তচাপ।
নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করতে হবে। জিমে যেতে হবে না নিছক দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো দৈনন্দিন কাজেও উপকার মিলতে পারে। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন একটু কঠোর শরীরচর্চা করতে পারলে ভাল।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: বডি পজিটিভিটি যেমন দরকার। তেমনই দরকার নিজের ওজন নিয়ে সতর্ক থাকা। অতিরিক্ত ওজন একাধিক রোগ ডেকে আনে। উচ্চ রক্তচাপ তার মধ্যে অন্যতম তাই বাড়তি ওজন কমাতেই হবে।
ধূমপান এবং মদ্যপান ত্যাগ: ধূমপান এবং মদ্যপান বহু লাইফস্টাইল রোগের শিকড়। একই ভাবে এগুলি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই, এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: মানসিক চাপ কমানোর জন্য যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা অন্যান্য শিথিলকরণ কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। অনিদ্রা রক্তচাপের সমস্যা ডেকে আনতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: পরিবারের সদস্যদের উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস সম্পর্কে চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন। সম্ভব হলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাতে হবে। যাতে কোনও রকম সমস্যা দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ সতর্ক হওয়া যায়।
খাবারের আগে উষ্ণ জল পান: প্রতিটি মুখ্য ভোজ, অর্থাৎ সকালের খাবার, মধ্যাহ্নভোজ এবং রাতের খাবারের আগে উষ্ণ জল পান হজমশক্তি বাড়াতে এবং পরিপাকতন্ত্রকে মজবুত করতে সহায়ক।
রাত ১১টার আগে নিদ্রা: রাত ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে।
প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা: দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক এবং হাড়ের শক্তি বৃদ্ধি করে।
সকালের রোদ গ্রহণ: প্রতিদিন ১৫ মিনিট সকালের হালকা রোদে বসা শরীরে ভিটামিন ডি-এর প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে কাজ করে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।
ধীরে ও ভালভাবে চিবিয়ে খাওয়া: খাবার ধীরে ধীরে এবং সঠিকভাবে চিবিয়ে খেলে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। ফলে শরীর নির্মেদ হয়।
ঘুমতে যাওয়ার আগে ধ্যান: যাঁরা অনিদ্রায় ভোগেন তাঁদের জন্য এই অভ্যাস খুবই জরুরি। আধুনিক কালের সঙ্গে তুলনা করলে ঘুমতে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে থেকে ফোন, টিভি প্রভৃতি থেকে বিরত থাকলে মন শান্ত হয়, ঘুম ভাল হয়।
খালি পেটে ফল খাওয়া: দিনের শুরুতে খালি পেটে একটি ফল গ্রহণ শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে এবং শক্তি জোগায়।
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন: দৈনিক অন্তত ১০ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চা মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার রাখা: পরিপাকতন্ত্র বা অন্ত্র পরিষ্কার রাখা অপরিহার্য, কারণ এটি আমাদের মানসিক অবস্থা, ত্বকের স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিদিন মলত্যাগ করা উচিত।
কাজেই যদি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে ভরদুপুরে খাবার খাওয়ার পর ছোট্ট একটি ভাতঘুম। এই ঘুম যেন রাতের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়। ঘরে আলো কমিয়ে, মোবাইল ফোন দূরে সরিয়ে, ১৫-২০ মিনিটের জন্য একটি ছোট্ট ঘুম উপকার করবে, অপকার নয়। দিবানিদ্রা অলসতা নয়। বরং এটি মস্তিষ্ককে আরও তরুণ, সতেজ করে তোলার এক চাবিকাঠি।




