অভয়াকে আধঘন্টা ধরে ধর্ষন। তারপর খুন। সঞ্জয়ের সে রাতের ১ ঘণ্টা ১২ মিনিটের সফর। ভোর ৪টে ৩ মিনিট থেকে সাড়ে ৪টে। সিবিআইয়ের চার্জশিট অনুযায়ী, ৯ আগস্ট ভোর ৩টে ২০ নাগাদ আরজি কর হাসপাতালে ঢুকেছিলেন সঞ্জয়। ৩টে ৩৪ মিনিটে ট্রমা কেয়ার সেন্টারে যান এবং এক তলায় ওঠেন। সেখান বেরিয়ে আসেন ৩টে ৩৬ মিনিটে। তার পর ভোর ৪টে ৩ মিনিটে তাঁকে জরুরি বিভাগের চার তলায় একটি ওয়ার্ডে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল। সেখান থেকে সাড়ে ৪টের পর প্রস্থান। এই আধঘণ্টা ধর্ষণ এবং খুনের সম্ভাব্য সময়। ট্রমা সেন্টার ছেড়ে বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে এলে প্রসূতি বিভাগ এবং আইসিসিইউ বিল্ডিং। সঞ্জয়ের লোলুপ চোখ। চেতলার যৌনপল্লী ঘুরে এসে আরজি করে ঢুকেছিলেন সঞ্জয়। মদ্যপ, নেশাগ্রস্ত সঞ্জয়। জরুরি বিভাগে ঢোকার আগে আর কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ানো? কী কী চোখে পড়েছিল?

আর সেই তরুণী? রাতের ডিউটিতে বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া সেরে হয়তো তিনি এখন চার তলার সেমিনারে। হয়তো সবেমাত্র একটু বিশ্রামের তোড়জোড় করছেন। তাঁর ঘাতক যে নীচে ঘোরাফেরা করছেন, একটু পরেই জরুরি বিভাগের নিরাপত্তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে তিনি যে উপরে উঠে আসবেন, তা তরুণীর কল্পনার বাইরে। গলায় ব্লুটুথ নেকব্যান্ড, হাতে হেলমেট দোলাতে দোলাতে সঞ্জয় ঠিক এই সময়েই চার তলার করিডর দিয়ে সেমিনার হলে ঢোকে। সঞ্জয়ের নীল-কালো বাইকের সামনে সাদা হরফে বড় বড় করে ‘পুলিশ’ লেখা থাকত। সেই রাতে কোথায় বাইক দাঁড় করিয়েছিলেন সঞ্জয়? নিশ্চয়ই কেউ বাধা দেয়নি? বাইক রেখে এই রাস্তা দিয়েই কি হাঁটা? এখন অবশ্য লিফ্টের কাছে নীলচে পোশাক পরা এক নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে। আর এক জন সন্দেহের চোখে দূর থেকে কড়া নজর। রোগীর সঙ্গে দেখা করার জন্য যে কার্ডের বন্দোবস্ত রয়েছে আরজি করে, সেটা ছাড়া এই কাকভোরেও জরুরি বিভাগে ঢুকতে দেবেন না নিরাপত্তারক্ষীরা। সঞ্জয়কে কি আটকেছিলেন এ ভাবেই? এক বছর আগের রাতে এই নিরাপত্তার বেষ্টনী ছিল? ছিল এই তৎপরতা? হয়তো ছিল। কিংবা থাকলেও বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো? নিরাপত্তারক্ষীদের ভরসাতেই তো রাতের ডিউটিতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গিয়েছিলেন নির্যাতিতা! তাহলে এভাবে নৃশংশ ধর্ষনের পর খুন হতে হল কেন নিরপরাধ চিকিৎসককে? অভয়া শুধু প্রতিবাদ করেছিলেন। বলেছিলেন হাসপাতালে জাল ভেজাল ওষুধ ইনজেকশন চলবে না। তাহলে কেন সন্দীপ ঘোষেদের রক্তচক্ষু গ্রাস করল সেদিনের রাতে? প্রশ্ন আজও!

এক বছর অতিক্রান্ত। মানুষ ভোলেনি সেই অত্যাচারের কথা। আবারও পথে নেমেছে হাজারও মানুষ। কলেজ স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত মশাল মিছিল করেন জুনিয়র ডাক্তাররা। সামিল সাধারণ মানুষদের অনেকেও। কেউ স্লোগান দিতে থাকেন ‘জাস্টিস ফর আরজি কর’। কারও হাতে থাকা ব্যানারে আবার লেখা আছে, ‘ঘুম নেই সেই অভিশপ্ত রাতে, প্রতিবাদে জাগি এসো পথে একসাথে’। জুনিয়র ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ‘অভয়ার রাত’-এ জেগে বিচার চাইবেন তাঁরা। শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তেই ‘অভয়া রাত’-এ প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। মালদা মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। মেদিনীপুরে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের তরফে মিছিল করা হয়। বিচার চেয়ে বহরমপুরে মিছিল করেন ‘দখলের মেয়েরা’, ‘আর জি কর আন্দোলনের সহযাত্রী’ এবং ‘আমরা যারা রাজপথ ছাড়িনি’ সংগঠন। আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের বিচারের দাবিতে শনিবার নবান্ন অভিযান রয়েছে। তাতে থাকবেন নির্যাতিতার বাবা-মা। যদিও কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, নবান্ন অভিযানের জন্য কোনওরকম আবেদন জমা পড়েনি। আবেদন জমা না পড়লেও নবান্ন অভিযান করা যাবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবাদ ও জমায়েতের জন্য দুটি বিকল্প জায়গাও দেওয়া হয়েছে। তরুণী চিকিৎসকের বাবা-মা জানিয়েছেন, তাঁরা নবান্ন অভিযান করবেন। যারা তাঁদের মেয়ের স্বপ্নপূরণ করতে দেয়নি, তাদেরও ফল ভুগতে হবে। যারা তাঁদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তাদেরও যাতে ঘুম কেড়ে নেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা করেছেন বাবা-মা। সেইসঙ্গে সিবিআই তদন্তে উষ্মাপ্রকাশ করে তাঁরা জানিয়েছেন, নবান্নে পৌঁছাবেনই। ভয় পেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছর ৮ অগস্ট রাতে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুন করা হয় তরুণী চিকিৎসককে। যদিও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ ওঠে পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তারইমধ্যে গ্রেফতার করা হয় সঞ্জয় রায়কে। গ্রেফতারির কয়েকদিনের মধ্যেই তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। যদিও নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, ওই ঘটনায় আরও অনেকে যুক্ত আছে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে জুনিয়র ডাক্তারদের ‘রাতদখল’। নির্যাতিতার জন্য বিচার চেয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত মশালমিছিল। মাঝপথে পথনাটিকা। জরুরি বিভাগের দিক থেকে প্রধান ফটকের দিকে সামনে এখনও বড় করে মঞ্চ বাঁধা। নিহত তরুণীর অবয়বের ছবিতে মালা পরিয়ে দিয়েছেন কেউ বা কারা। উপরে বড় হরফে লেখা ‘বিচার চাই’। আরজি করের একাধিক দেওয়ালে বিচার চেয়ে লেখা স্লোগান চোখে পড়েছে। কিন্তু মঞ্চ আজ একেবারে ফাঁকা। জনশূন্য। ছবিতে মালা দিয়ে হয়তো সকলে শ্যামবাজারের কর্মসূচিতে গিয়েছেন। মনে পড়ে যাচ্ছিল এক বছর আগের ‘রাতদখল’-এর রাত। সে দিনও ভোর ৩টের পরে আরজি করে একই দৃশ্য। আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে এক দল দুষ্কৃতী বেরিয়ে আরজি করের এই প্রধান ফটকে ভাঙচুর করেছিল। ঘটনাস্থল তখনও টাটকা। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘটনাস্থলেও কি পৌঁছে গিয়েছে কেউ কেউ।

দিল্লিতে সিবিআইয়ের সঙ্গে দেখা করে কলকাতায় ফেরার পরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের বাবা বলেন, ‘সিবিআইয়ের ডিরেক্টর একটা খুব ইন্টারেস্টিং কথা বলেছেন। আমরা একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছি। ওদের কথা থেকেই আমরা প্রশ্ন করছি। ওরা যে ৯৩টি রিপোর্ট তৈরি করেছে, সেখান থেকেই ওদের প্রশ্ন করছি। বিরক্ত হয়ে গিয়ে সিবিআই বলে যে আমরা মামলা ছেড়ে দেব। কোনও প্রশ্নের উত্তর ওদের কাছে নেই। আমি বলি, আমায় বলে কী লাভ। কোর্টে গিয়ে বলুন। চিন্তা করুন কী অবস্থা। যারা ১৪০ কোটি ভারতীয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে, তারা এই ধরনের কথাবার্তা বলছে এক বছর ধরে। এক বছর ধরে তাহলে সিবিআই কী করছিল? ঘাস কাটছিল? ঘাস তো যে কোনও লোক কাটতে পারেন। ওদের কী দরকার কোটি-কোটি টাকা মাইনে দিয়ে? ওই ডিপার্টমেন্ট রাখার কী দরকার। এত বড়-বড় বিল্ডিং রাখার দরকার কী? সব তুলে দেওয়া উচিত।’ তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও একই আর্জি জানাবেন। সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের বাবা বলেন, ‘সেটিং নয়, সেটিং নয়, সেটিংয়ের থেকেও বড় কথা হচ্ছে যে আর্থিক লেনদনের ব্যাপার রয়েছে এখানে। আমাদের কাছে প্রমাণ নেই, তাই সামনে এখনও কিছু বলতে পারছি না। টাকা খেয়ে এরকম করে এরা। সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারি। সিবিআই তো এরকম কাজ করে না।’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কবে দেখা হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের বাবা-মা। তাঁরা জানিয়েছেন, এবার দিল্লিতে গিয়ে শাহের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। তবে দেখা করার জন্য তাঁদের সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানিয়েছেন আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের বাবা-মা।

নবান্ন অভিযানের জন্য কোনও আবেদনপত্র জমা পড়েনি বলে দাবি করল কলকাতা পুলিশ। তবে তারপরও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনার এক বছরের মাথায় যে নবান্ন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে, সেজন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে রাখছে বলে পুলিশের তরফে জানানো হল। শুক্রবার ভবানী ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতীম সরকার, এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) জাভেদ শামিম, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা এবং হাওড়ার পুলিশ কমিশনার প্রবীণ ত্রিপাঠী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, নবান্ন অভিযান করা যাবে না। পরিবর্তে দুটি বিকল্প জায়গা চিহ্নিত করে দিয়েছে পুলিশ। সেইসঙ্গে কড়া ভাষায় পুলিশ জানিয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘন করলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে। একইভাবে কালীঘাট অভিযানেরও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশের যুক্তি, নবান্ন রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর। সেখানে সর্বদা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা থাকে। তাই সেখানে মিছিল করা যাবে না। দেখানো যাবে না বিক্ষোভ। বিক্ষোভ বা মিছিলের জন্য দুটি বিকল্প জায়গা দিয়েছে – সাঁতরাগাছি বাসস্ট্যান্ড এবং রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ চত্বর। কলকাতা পুলিশ তরফে জানানো হয়েছে, বিকেলে কালীঘাট অভিযান করার কথা আছে অভয়া মঞ্চের। যদিও তার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের জন্য চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে বিকল্প জায়গা। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, যে কয়েকটি বিকল্প জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে, সেখানেই জমায়েত করা যাবে। অন্যত্র জমায়েত হলে পদক্ষেপ করা হবে। এখন সিসিটিভি, ড্রোনের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে। ফলে আইন ভঙ্গ করলে সহজেই ধরা যাবে। নবান্ন অভিযানের জন্য আপাতত যান চলাচলের উপরে সেরকম কোনও বিধিনিষেধ জারি করেনি কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশ। শুক্রবার পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, শনিবার (৯ অগস্ট) ভোর ৪ টে থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত কলকাতার কয়েকটি রাস্তায় পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া হবে না। তবে সেই তালিকা থেকে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, দুধ, ওষুধ, ফল, শাকসবজির মতো জরুরি এবং পচনশীল পণ্যবহনকারী গাড়িকে বাদ রাখা হয়েছে। বিদ্যাসাগর সেতু ও বিদ্যাসাগর সেতুর র্যাম্প, খিদিরপুর রোড, তারাতলা রোড, ডায়মন্ড হারবার রোড, সার্কুলার গার্ডেনরিচ রোড, গার্ডেনরিচ রোড হাইড রোড, কোল বার্থ রোড, রিমাউন্ট রোড এবং ওই রাস্তাগুলির সংযোগকারী ফিডার রোডে পণ্যবাহী যান চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে। জওহরলাল নেহরু রোড, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ, রেড রোড, নিউ রোড, ডাফরিন রোড, মেয়ো রোড, আউটরাম রোড, খিদিরপুর রোড, হসপিটাল রোড, লাভার্স লেন, কুইন্সওয়ে, ক্যাসুয়ারিনা অ্যাভিনিউ, ক্যাথিড্রাল রোড, এজেসি বোস রোড, এসএন ব্যানার্জি রোড, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট, কিংসওয়ে, সেন্ট জর্জেস গেট রোড, স্ট্র্যান্ড রোড, এম জি রোড, স্ট্র্যান্ড ব্যাঙ্ক রোড, কেকে টেগোর স্ট্রিট, কালাকার স্ট্রিট, ব্র্যাবোর্ন রোড এবং হাওড়া ব্রিজেও সেই বিধিনিষেধ থাকবে। কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি বুঝে কোনও রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আর শনিবার যেহেতু রাখি পূর্ণিমা পড়েছে, তাই এমনিতেই রাস্তায় গাড়ির চাপ কিছুটা কম থাকবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।




