Wednesday, July 22, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ভাঙা পায়ে ব্যাট করতে নেমে নজির পন্থের!‌ স্টেডিয়ামের ‘‌স্ট্যান্ডিং ওভেশন’‌!‌ ‘জান’ একরকম কবুল করে ৫৫ মিনিট ক্রিজে থেকে ২৭ বলে ১৭ রান ঋষভের!‌

মুখে কষ্টের ছাপ। সিঁড়ি ভেঙে নামতে কষ্ট হচ্ছিল। রেলিং ধরে সাবধানে নামলেন সময় নিয়ে। অপেক্ষা করলেন শার্দূল ঠাকুর। ক্রিজে থেকে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একের পর এক সিঙ্গলস। মৃত্যুকে জয় করে স্বমহিমায় ফিরেছেন ক্রিকেট মাঠে। অসমসাহসী ঋষভ পন্থ আর চোট আঘাতে ভয় পান না? ক্রিজ কামড়ে পড়ে থাকে বিপক্ষের আগ্রাসী বোলিংয়ের পালটা চোখে চোখ রেখে জবাব ভারতীয় সহ অধিনায়কের। ভাঙা পায়ে ৫৫ মিনিট! ২৭ বলে ১৭ রান। গড়লেন নজিরও। হার না মানা লড়াইয়ে ছড়ালেন মুগ্ধতা। অনিল কুম্বলে ভাঙা চোয়াল নিয়ে খেলেছিলেন। ঋষভ পন্থ খেললেন ভাঙা পা নিয়ে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠে নামলেন পন্থ। ভাঙা পা নিয়েই নেমে পড়লেন ব্যাট করতে! বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। জল্পনা, আশঙ্কায় সাময়িক জল ঢেলে দিলেন ভারতীয় দলের সহ-অধিনায়ক। ডান পায়ের পাতায় আঘাত পেয়ে মাঠকর্মীদের গাড়িতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল বুধবার। ১৯ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই পায়েই হেঁটে মাঠে নামলেন পন্থ! মাঠে নামলেন গোটা স্টেডিয়ামকে দাঁড় করিয়ে। তাঁর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য আউট হওয়া শার্দূল ঠাকুরও। অকুতোভয় পন্থ। ম্যাঞ্চেস্টারে পন্থ আবার ব্যাট করতে পারবেন, এতটা ভাবা যায়নি। যিনি দাঁড়াতেই পারছেন না, তিনি খেলবেন কী করে! ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও জানিয়ে দিয়েছিল, পন্থের পক্ষে ম্যাঞ্চেস্টারে উইকেট রক্ষা করা সম্ভব নয়। শুভমন গিলদের কি তবে ১০ জনে খেলতে হবে? সিরিজে পিছিয়ে থাকা দল অসম লড়াইয়ের মুখে? দলের জন্য। দেশের জন্য। প্রায় অসম হয়ে যাওয়া লড়াইয়ে জান ফেরালেন। চোট পাওয়ার আগে পর্যন্ত ৪৮ বল খেলে ৩৭ রান করেছিলেন পন্থ। এ দিন মধ্যাহ্নভোজের আগে ১৫ মিনিটে খেলেন ৭ বল। করেন ২ রান। বিরতির পর আরও ৪০ মিনিটে ২০ বল খেলে ১৫ রান করলেন। ভাঙা পা নিয়ে সব মিলিয়ে ৫৫ মিনিট ব্যাট করলেন। ২৭ বলে ১৭ রান করলেন। চার মারলেন। ছয়ও মারলেন। ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ছয় মারার রেকর্ড গড়লেন। অর্ধশতরান করলেন! আর্চারের বলে বোল্ড হলেন বলের লাইন ‘মিস’ করে। ঠিক যে ভাবে আউট হয়েছিলেন লর্ডসে। সাজঘরে ফেরার সময় কোচ-সতীর্থেরা তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন উঠে দাঁড়িয়ে। কেনই বা জানাবেন না? প্রায় এক ঘণ্টা ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অবিশ্বাস্য মুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছিলেন যে।

নিজের ‘জান’ একরকম কবুল করেই নামলেন পন্থ। দোতলার সাজঘর থেকে সিঁড়ি ভেঙে নামতে কষ্ট হচ্ছিল। রেলিং ধরে সাবধানে নামলেন সময় নিয়ে। অপেক্ষারত শার্দূল বাউন্ডারি লাইনে পন্থের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। সতীর্থের হাত এড়িয়ে যান পন্থ! মাঠ ছুঁয়ে প্রণাম করে বাউন্ডারি লাইনের ভিতরে পা রাখলেন। আবার সাজঘরের দিকে ঘুরে আকাশের দিকে তাকালেন। মেঘলা আকাশের মধ্যে সূর্যকে খুঁজলেন। নমস্কার সেরে এগিয়ে গেলেন পিচের দিকে। এই পুরো সময়টা উঠে দাঁড়িয়ে পন্থকে স্বাগত জানিয়েছেন দর্শকেরা। ক্রিকেটীয় ভদ্রতা দেখিয়ে অপেক্ষা করেছেন বেন স্টোকসেরাও। শার্দূল আউট হওয়ার পর থেকে পন্থের গার্ড নেওয়া পর্যন্ত ২ মিনিটের বেশি অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। চাইলে ‘টাইমড আউট’র আবেদন করতে পারতেন স্টোকস। করেননি। প্রতিপক্ষ পন্থের সাহসিকতাকে সম্মান জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা। সিঁড়ি ভাঙতে বেশ কষ্ট হচ্ছে পন্থের। ডান পায়ের উপর ভর দিতে পারছেন না। মধ্যাহ্নভোজের সময় সাজঘরে পন্থকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বেরিয়ে আসেন আকাশদীপ-সহ কয়েক জন ক্রিকেটার। এই অবস্থাতেও যে ব্যাট করা সম্ভব, তা সম্ভবত তিনিই ভেবেছিলেন। ভারতীয় দলের মেডিক্যাল স্টাফেরা তাঁকে তৈরি করে দিয়েছেন কাজ চালানোর মতো। কিছুটা কৃতিত্ব তাঁদেরও প্রাপ্য। সিঁড়ি ভাঙতে পন্থের যতটা সমস্যা হচ্ছে, সমান মাঠে হাঁটতে ততটা নয়। দৌড়োনোর মতো পরিস্থিতি নেই। ‘জগিং’ করে খুচরো রান নিয়েছেন। আলগা বলের জন্য অপেক্ষা করেছেন। ব্যাট করার সময় পায়ের নড়াচড়াতেও আড়ষ্টতা স্পষ্ট। ইংল্যান্ডকে বাড়তি সুবিধা দিলেন না পন্থ। আহত পন্থকে ২২ গজের লড়াইয়ে কোনও রকম দয়ামায়া করেননি স্টোকস। নাগাড়ে পন্থের ডান পায়ের জুতো লক্ষ্য করে ইয়র্কার দিয়েছেন। ইংল্যান্ড অধিনায়ক জানতেন, পন্থ দ্রুত পা সরাতে পারবেন না। ইংল্যান্ডের অন্য বোলারেরাও শরীর লক্ষ্য করে বল করেছেন। তবু লড়ে গিয়েছেন পন্থ। ২২ গজের এক প্রান্তে আউট হয়েছেন ওয়াশিংটন সুন্দর, অংশুল কম্বোজেরা। পন্থ অন্য প্রান্ত আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। পেশাদারিত্বের নিষ্ঠুরতাকে ঠেকিয়ে লড়াই করেছেন। পন্থের লড়াইয়ে শারীরিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকলেও আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। সাবলীল থাকার চেষ্টা করেছেন প্রতিটি বলে। বলের লাইনে গিয়ে খেলার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সাজঘরে তাঁর এই লড়াই হয়তো অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ভারতীয় ক্রিকেটেও লোকগাথা হয়ে থাকতে পারে ভাঙা পা নিয়ে তাঁর লড়াই। এমন নজির আগে নেই, তা নয়। কুম্বলে ছাড়াও অনেকে আছেন। নরি কনট্রাক্টর ভাঙা পাঁজর নিয়ে খেলেছেন। দিলীপ দোশী পায়ের ভাঙা পাতা নিয়ে খেলেছেন। গুরুতর চোট নিয়ে খেলার নজির রয়েছে কপিল দেব, বিজয় মঞ্জরেকরেরও। প্রতিটি ঘটনা সতীর্থদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রণিত করেছে। সেই তালিকায় উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকল পন্থেরও।

ইংল্যান্ড সিরিজ থেকে ছিটকে গিয়েছেন ঋষভ পন্থ। ৬ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হবে। বিকল্প ক্রিকেটার হিসেবে টিম ইন্ডিয়ার স্কোয়াডে ‘অবাধ্য’ ঈশান কিষাণের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের দরজা খুলে যেতে পারে। খুব শীঘ্রই ভারতীয় শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন ঈশান।৩১ জুলাই থেকে ওভালে শুরু হতে যাওয়া পঞ্চম টেস্টের জন্য নির্বাচক কমিটি ঈশানকে টেস্ট দলে যুক্ত করবে। ধ্রুব জুরেলের তবে কী হবে? পন্থের অনুপস্থিতিতে জুরেলই হয়তো কিপিংয়ের দায়িত্ব সামলাবেন। ঈশানকে দলের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে ব্যাকআপ উইকেটকিপার হিসেবে। ঈশানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন অজিত আগরকর। টিম ইন্ডিয়ার হেডকোচ গৌতম গম্ভীরেরও এই বিষয়ে সায় আছে। বর্তমানে নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে কাউন্টি খেলছেন ২৭ বছরের এই ক্রিকেটার। দু’টি ম্যাচে করেছেন ৮৭ এবং ৭৭। সামান্য চোট থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি তাঁকে স্কোয়াডে রাখা হতে পারে। প্রায় দু’বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে রয়েছেন ঈশান। ২০২৩ সালে ক্যারিবিয়ান সফরে টেস্টে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। একটি হাফসেঞ্চুরিও করেছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজে দু’টি টেস্টেই খেলেছিলেন তিনি। ২০২৩ সালেই মানসিক ক্লান্তির কারণে তিনি ক্রিকেট থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন। এরপর ঝাড়খণ্ডের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট না খেলার কারণে বিসিসিআই তাঁকে কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বহিষ্কার করেছিল। যদিও পরবর্তীতে ‘অবাধ্য’ ঈশানকে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ফিরিয়েছিল বোর্ড। পন্থ চোট পাওয়ায় এবার তাঁকে ভারতীয় স্কোয়াডেও দেখা যেতে পারে।

ভারতীয় টেস্ট সহ-অধিনায়ক তথা এলএসজি অধিনায়কের এমন সাহসী মনোভাবের তারিফ করেছেন গোয়েঙ্কা। আইপিএল চলাকালীন গোয়েঙ্কা এবং পন্থের ছবি এবং ভিডিও মাঝেমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। এমনকী নেটিজেনরা মালিক এবং অধিনায়কের অম্লমধুর সম্পর্কের নিয়ে মাঝেমাঝেই জল্পনা উসকে দিয়েছিলেন। অথচ দিল্লির বিরুদ্ধে একপ্রকার জেতা ম্যাচ যখন হেরে গিয়েছিল লখনউ, তখন পন্থ-সহ সকলকে ইতিবাচক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন গোয়েঙ্কা। আর এবার সাহসী পন্থকে নিয়ে গর্বিত এলএসজি মালিক। পন্থের দৃঢ়তার প্রশংসা করে এক্স হ্যান্ডেলে গোয়েঙ্কা লেখেন, ‘এটা শুধু প্রতিভা নয়। এটা চরিত্র। স্যালুট।’ আইপিএলের ‘তিক্ত অতীত’ ভুলে পন্থের লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন লখনউ সুপার জায়ান্টস মালিক সঞ্জীব গোয়েঙ্কা।আইসিসির নিয়মের গেরো বলছে চোট পেয়ে কোনও ব্যাটার যদি ব্যাট করতে না পারেন তাহলে অন্য কাউকে পরিবর্ত ব্যাটার হিসাবে নামানো যাবে না, ব্যতিক্রম কনকাশন সাব। ম্যাঞ্চেস্টার টেস্টের প্রথম দিন রিভার সুইপ মারতে গিয়ে পায়ে চোট পেলেন ঋষভ পন্থ। দ্বিতীয় দিন শুরুর আগে জানা গেল, ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই ছিটকে গিয়েছেন। ছ’সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। কিন্তু দেশের দরকারে তিনি সবটুকু উজাড় করে দিলেন। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রশ্ন, কেন এমন অমানুষিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ক্রিকেটারকে মাঠে নামতে বাধ্য করা হবে? যদিও আইসিসি নিয়ম অনুযায়ী পন্থকে মাঠে নামার জন্য বাধ্য করা হয়নি। কিন্তু নিয়মের ফাঁড়ায় ১০ জন ব্যাটারকে নিয়ে গোটা টেস্টে খেলতে হত ভারতকে। এই ‘অসাম্য’ দূর করতেই বাধ্য হয়ে নেমেছেন পন্থ। ক্রিকেটভক্তদের একাংশের মতে, যদি উইকেটকিপার হিসাবে পরিবর্ত নামানো যায় তাহলে পরিবর্ত হিসাবে নামা উইকেটরক্ষককে ব্যাট করার অনুমতিও দেওয়া উচিত।প্রাক্তন ভারতীয় উইকেটকিপার পার্থিব প্যাটেল আবার মনে করেন, বর্তমানে যা নিয়ম রয়েছে সেটাই বজায় রাখা উচিত। তাঁর মতে, কনকাশন সাবের অপব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ ইতিমধ্যেই রয়েছে। খেলা চলাকালীন যদি কেউ চোট পায় তাহলে কিছু তো করার নেই। নিয়ম যেরকম রয়েছে সেরকমই থাকা উচিত। ২০১৭ থেকে উইকেটকিপারের পরিবর্ত নামানোর আইন এনেছে এমসিসি। ‘লগান’ সিনেমায় সাহেবদের বিরুদ্ধে পায়ের আঘাত পেয়েও ব্যাট হাতে লড়ে গিয়েছিল ‘ইসমাইল’। সেই ইংরেজদের বিরুদ্ধেই মরিয়া লড়াই করলেন আহত পন্থ। ওয়াশিংটন আউট হওয়ার পর ধরে খেলার সুযোগ ছিল না। চালিয়ে খেলে যতটা সম্ভব রান তুললেন। টেলএন্ডারদের আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। পন্থ হয়তো ব্যাট হাতে দলকে অনেকটা এগিয়ে দিতে পারলেন না। তবে শুভমনদের সাজঘর আত্মবিশ্বাসে ভরে দিলেন। সিরিজ়ে সমতা ফেরানোর জেদ বাড়িয়ে দিলেন। যে আত্মবিশ্বাস, জেদের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে দশম উইকেটে জসপ্রীত বুমরাহ-মহম্মদ সিরাজের জুটিতে। পন্থের ১৭ রান ভারতকে খুব বেশি স্বস্তি হয়তো দেবে না। তবে সাহস দেবে। পন্থ দেখিয়ে দিলেন এ ভাবেও লড়া যায়। এ ভাবেও পারা যায়। ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসা পন্থ আরও একবার প্রমাণ করলেন নিজেকে। প্রমাণ করলেন তিনি আসলে সাহসী। হার না মানা এক যোদ্ধা। চাপা লড়াইয়ের নাম পন্থ। সাড়ে তিনশো পেরিয়ে থামল ভারত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles