নাছোড়বান্দা তরুণীর কান্না! কাতর আর্জি! মোদিজি, আপনি আসুন! দুর্গাপুরের কোনও উন্নয়ন হয়নি। “মোদিজিকে ডেকেছি। বলেছি আসুন, দুর্গাপুর-সহ বাংলার উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলায় কারখানা বন্ধ। আমার ভাই-বোনেরা কাঁদছে। আপনি আসুন।” ছন্দা প্রামাণিক নামে এক তরুণীর সভাস্থলের বাইরে রাস্তার উপর বসে কান্নাকাটি। সকলে হতবাক। নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে যান। উন্নত দুর্গাপুর পেতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে চান। তরুণীর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নাকি তাঁকে চেনেন! সরকারি প্রকল্পরের উদ্বোধন। নেহেরু স্টেডিয়ামে সভা। নিরাপত্তার চাদরে মোড়া স্টেডিয়াম চত্বর।
“পুলিশকে বলব নিরপেক্ষ হয়ে যান। তারপরে দেখুন বিজেপি কী করতে পারে। এই আওয়াজ আমার সাথে থাকা প্রয়োজন। এজন্য বলছি ক্ষমতা আমাদেরও আছে। কিন্তু জোর করি না। কাউকে মারধরের কথা বলি না। কিন্তু ভাববেন না আমরা ভীতু। শুধু পুলিশকে বলুন নিরপেক্ষ হতে। ছাতি ফুলিয়ে বেরব। গুলি চালানোর হয় তো চালান। কিন্তু পিছন থেকে নয়। হিম্মত থাকলে সামনে থেকে লড়ুন।” ‘মহাগুরু’ বলেন প্রধানমন্ত্রীর সভামঞ্চ থেকে। বাংলায় বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে ময়দানে নামছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাস্থল থেকে জানালেন অভিনেতা-নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। দুর্গাপুর নেহরু স্টেডিয়ামে বিজেপির পরিবর্তন সংকল্প সভা থেকে মিঠুনের সংকল্প, ‘‘এ বার আমাদের জীবন-মরণের লড়াই। আমাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আশীর্বাদ রয়েছে। আমি থাকব। আপনারা থাকবেন। সকলে মিলে লড়ব। যে ভাবেই হোক এই ইলেকশন বিধানসভা নির্বাচন জিততেই হবে। এ ছাড়া আর কী নিয়ে কথা বলব? আমাদের এ বারের লড়াই শেষ লড়াই। এটা মাথায় রেখে মাঠে নামতে হবে। কী নিয়ে কথা বলব? দুর্নীতি? দুর্নীতি তো ভরে ভরে রয়েছে। একটা ফাঁকও নেই। মা-বোনেদের ইজ্জত নিয়ে কথা বলব? সেখানেও কথা বলার উপায় নেই। আমি পশ্চিমবঙ্গের ছেলে। পশ্চিমবঙ্গের মা-বোন আমার মা-বোন। আমি রাজনীতি করি না। মানুষ-নীতি করি। সে জন্য বার বার পশ্চিমবঙ্গে ছুটে আসি। এ বার মাঠে নেমেছি একেবারে তৈরি হয়ে। ২৩-২৪ তারিখ থেকে পুরো মাঠে নামব। আপনাদের সঙ্গে থাকব। আপনাদের প্রবলেম জানব। মাঠে নেমে একসঙ্গে লড়াই করব। এই লড়াই বহু দিন মনে রাখবে পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। শুধু পুলিশকে একটু নিরপেক্ষ হওয়ার কথা বলুন। তার পর দেখুন বিজেপি কী করতে পারে।’’ আজ সমস্বরে যে আওয়াজ সকলে তুলেছেন, তা যেন সর্বদা আমার সঙ্গে থাকে। আমি ‘কম্প্রোমাইজ় পলিটিক্স’ করি না। জীবনে কখনও কম্প্রোমাইজ়ের রাজনীতি করিনি। গায়ের জোর আমারও আছে। তবে কখনও কারও উপর খাটাইনি। কাউকে বলি না যে, ‘আপনাকে মারব, ধরব।’ কিন্তু এটা ভাববেন না যে, আমি করতে পারি না। আমরা ভিতু নই। শুধু পুলিশকে বলুন, ‘তোমরা নিরপেক্ষ হয়ে যাও। তৈরি থাকুন। আমি ময়দানে নামছি। বুক ফুলিয়ে নামব। গুলি চালালে চালাও। পিছন থেকে আক্রমণ কোরো না। হিম্মত থাকলে সামনে থেকে গুলি করো।’’
পাখির চোখ ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন। তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির ঠিক আগে বঙ্গ সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুর্গাপুরে মোদীর জনসভা। জনসভার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ৫০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলার জন্য ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডের সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সিডিজি প্রকল্পের ১৯৫০ কোটি টাকার শিলান্যাস ছাড়াও দুর্গাপুর হলদিয়া প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন-এর দুর্গাপুর থেকে কলকাতা ১৩২ কিলোমিটার অংশটি দেশের জন্য উৎসর্গ করলেন। প্রধানমন্ত্রী উরজা গঙ্গা প্রকল্পের অংশ। দুর্গাপুর ইস্পাত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের রঘুনাথপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শিলান্যাস। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রোজগারের সুযোগ বাড়বে বলে দাবি করছে কেন্দ্র। রেল পরিকাঠামোর উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস করবেন মোদী। তার মধ্যে রয়েছে পুরুলিয়া-কলকাতা রেললাইন ডাবলিং ৩৬ কিলোমিটার। জামশেদপুর, বোকারো, ধানবাদের কারখানাগুলির মধ্যে রেল সংযোগের সুবিধা বাড়বে বলে জানাচ্ছে কেন্দ্র। প্রকল্পটি ৩৯০ কোটি টাকার।
দুর্গাপুরের সরকারি সভা থেকে ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতটি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী উরজা গঙ্গা প্রকল্পের আওতায় দুর্গাপুর-কলকাতা ১৩২ কিলোমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার জন্য ১৯৫০ কোটি ব্যয়ে ভারত পেট্রোলিয়ামের সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন প্রকল্প। এছাড়াও ১৫৪৭ কোটি ব্যয়ে রঘুনাথপুর-মেজিয়া ডিভিসি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ নিয়ন্ত্রন প্রকল্পের শিলান্যাস। রেল ও সড়কপথের বেশ কিছু প্রকল্পের উন্নয়ন ও শিলান্যাস করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন করে মোদি বলেন, “ভারতের উন্নয়নে দুর্গাপুরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। দুর্গাপুর দেশের শ্রমশক্তির বড় উৎস। বিশ্বজুড়ে বিকশিত ভারত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ৪ কোটি মানুষ পাকা ঘর পেয়েছেন। অন্ডাল বিমানবন্দরকে উড়ান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এক দেশ এক গ্যাস প্রকল্পের সূফল পাচ্ছে বাংলা। বাংলায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ ঘরে সস্তায় রান্নার গ্যাস পৌঁছেছে। বাংলায় দ্রুত রেল প্রকল্পের উন্নয়ন হচ্ছে। আরও দু’টি রেল ওভারব্রিজ পাবে বাংলা। দ্রুত বিস্তার হচ্ছে কলকাতা মেট্রোর।” বিহারের সভা সেরে দুর্গাপুরের অন্ডাল বিমানবন্দরে নামেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে পৌঁছান সরকারি সভা মঞ্চে। এদিকে এই সভামঞ্চের পাশেই রাজনৈতিক সভামঞ্চ। দুর্গাপুরের সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘খাঁটি বাঙালি’র মতো বাংলায় ভাষণ শুরু করে মা দুর্গা এবং মা কালীর নাম নিলেন প্রধানমন্ত্রী।
বাঙালি সংস্কৃতি এবং ধর্মাচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা। দলীয় মঞ্চে মোদিকে স্বাগত জানালেন শুভেন্দু অধিকারী-শমীক ভট্টাচার্য। হাতে তুলে দেওয়া হল দুর্গা, কালী, গণেশ মূর্তি। দেওয়া হল বিষ্ণুপুরের ঘোড়াও। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, “বড়রা আমার প্রণাম নেবেন। ছোটরা ভালোবাসা। জয় মা কালী। জয় মা দুর্গা।” তিনি বলেন, ‘বিকশিত বাংলা মোদির গ্যারান্টি। টিএমসি যাবে, তবেই আসল পরিবর্তন আসবে। টিএমসিকে হঠাও, বাংলা বাঁচাও। বিজেপির জন্য বাংলার অস্মিতাই সর্বোপরি। বাংলাকে আমরা প্রেরণার উৎস মনে করি।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘তৃণমূলের অপশাসনেই বিজেপির ভরসা। বাংলার এই মাটি সম্ভাবনার মাটি। বাংলার মাটি প্রেরণার মাটি। একসময়ে বাংলা বাণিজ্যে দিশা দেখিয়েছিল। এখন বাংলার যুবকদের ছোটছোট কাজের জন্যও বাইরে যেতে হচ্ছে। বাংলা পরিবর্তন চায়, বাংলা উন্নয়ন চায়’, সুর চড়ালেন মোদি। জানালেন, দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের আধুনিকীকরণ-সহ একাধিক প্রকল্প যুব সমাজকে কমসংস্থান দেবে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে শিল্পে সেরা হবে বাংলা, দুর্গাপুর থেকে আশ্বাস মোদির। তৃণমূল হুমকির রাজনীতি করে। তৃণমূলের আমলে সংস্থাগুলো বাংলা ছেড়েছে। সেই কারণেই এখন বেকার সমস্যা। টিএমসিকে সরালেই বাংলাকে বাঁচানো যাবে। টিএমসি যাবেই, বাংলায় আসল পরিবর্তন আসবেই। তৃণমূল বাংলার মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তৃণমূলের দুর্নীতির কারণেই এত মানুষ বেকার, শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কীভাবে তৃণমূল অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে? এক কলেজে এক তরুণীর উপর ভয়ংকর অত্যাচার হয়েছে। অভিযুক্তের তৃণমূলের যোগ মিলেছে। এগুলোই তৃণমূলের নির্মমতার সাক্ষী। অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা নেই।”
দুর্গাপুরে মোদির সভায় ছিলেন না বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। শুক্রবার সকালে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বেফাঁস মন্তব্য, “কর্মীরা ডেকেছিলেন। কিন্তু দল চায় না আমি সভায় থাকি।” প্রধানমন্ত্রীর সভামঞ্চে থাকবেন দিলীপ ঘোষ? গত কয়েকদিন ধরে চর্চায় এই একটাই বিষয়। কখনও শোনা গিয়েছে, দলের তরফে আমন্ত্রণ পত্র পৌঁছেছে দাপুটে এই নেতার কাছে। যদিও পরে তিনি নিজে দাবি করেছেন বঙ্গ বিজেপি আমন্ত্রণ করেনি। তবে দিলীপ বলেছিলেন কর্মী হিসেবে তিনি যাবেন সভায়। সোশাল মিডিয়ায় ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করে দিলীপ লেখেন, “আমরা থাকব, আপনি আসুন।” তাতেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ দমদম বিমানবন্দরে দিলীপ ঘোষ জানান, দলের কাজে তিনি দিল্লি যাচ্ছেন। মোদির সভার দিনেই কেন দিল্লি সফর? দিলীপের কথায়, “আমাকে কর্মীরা ডেকেছিলেন। তাই হ্যাঁ বলেছিলাম। পার্টি ডাকেনি। হয়তো পার্টি চায় না আমি যাই। আমি গেলে হয়তো অস্বস্তি হবে। তাই আমি দুর্গাপুর যাচ্ছি না। দিল্লিতে বিশেষ কাজে যাচ্ছি। পার্টিরই কাজ।” দিল্লিতে জে পি নাড্ডার বাড়িতে গিয়েও তাঁর দেখা পেলেন না বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। মুখে কুলুপ এঁটে দিলীপ মুখ ফস্কান, “যা বলার সময় মতো বলবেন।” বিকেলে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নাড্ডার সঙ্গে দেখা দিলীপের। নাড্ডা-দিলীপের সাক্ষাৎ। ঘণ্টাখানেক দিলীপের সঙ্গে কথা হয় বিজেপি সভাপতির। বৈঠকে দিলীপকে সমঝে দেওয়া হয়েছে। যেভাবে বারবার সংবাদমাধ্যমে বেফাঁস মন্তব্য করে দলকে অস্বস্তিতে ফেলছেন, সেটা বরদাস্ত করা হবে না। রীতিমতো আপত্তি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দিলীপের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘ঘণ্টাখানেক কথা হল, অনেক গল্প হয়েছে।’




