অস্বস্তিতে ঘাসফুল শিবির। একের পর এক তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতাদের কাণ্ড কারখানা সামনে আসছে। আরজিকরের দগদগে ঘা এখনও রয়েছে। কসবা গণধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতা মনোজিৎ মিশ্র। মনোজিতের একের পর এক একাধিক কাণ্ড সামনে এসেছে। এবার প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থার অভিযোগ টিএমসিপি রাজ্য সহ সভাপতি সৌভিক রায়ের বিরুদ্ধে। নরসিংহ কলেজের র্যাগিংয়ের ভিডিয়ো দেখিয়ে এসএফআই অভিযোগ করছে, জোর করে প্যান্ট খুলে পড়ুয়াদের যৌনাঙ্গ দেখে বিকৃত সুখ পেতেন সৌভিক রায়। টিএমসিপির নেতৃত্বকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত সৌভিক এখনও নিজের পদেই বহাল। তৃণাঙ্কুর দাবি করেন, তিনি কোনও অভিযোগ পাননি। সৌভিক রায়কে নিয়ে ২০২৩ সালে হাওড়া জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদে সভাপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠির একটি কপি পাঠানো হয়েছিল টিএমসিপি-র রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকেও। এর পাশাপাশি অভিযোগপত্রের কপি পাঠানো হয় ব্যাঁটরা থানা, অ্যান্টি র্যাগিং কমিশনেও। তারপরও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে। এখনও নিজের পদেই বহাল সৌভিক। সৌভিকের যৌন হেনস্থার উদাহরণ তুলে ধরে এক পড়ুয়া সম্প্রতি টিভি৯ বাংলাকে বলেন, ‘রাত ৮টার পর সবাই যখন বেরিয়ে যেত, তখন ইউনিয়ন রুমে থাকতে বলা হত। আমি আর আমার কয়েকজন বন্ধুকে বলছিল, প্যান্ট খুলতে। আমাদের যৌনাঙ্গ দেখত, ভিডিয়ো করাত, ছ্যাঁকা দেওয়া হত, প্যান্টে জল ফেলে দেওয়া হত। প্রতিবছর কোনও না কোনও ছেলেকে ধরে এই সব করত। আমরা এটা নিয়ে তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে জানিয়ে ছিলাম। কয়েকজন দাদার সাহায্যে জানাই।’

কসবাকাণ্ডের পর তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দাদা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন সংগঠনের বহিষ্কৃত নেত্রী রাজন্যা হালদার। আর তার পরই তাঁর সরব হওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছিলেন তৃণমূলের ২ যুবা নেত্রী। আর সেই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রবিবার সংবাদমাধ্যমের স্টুডিয়োয় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর পর রাজন্যার বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বাড়াল তৃণমূল। সরাসরি রাজন্যাকে আক্রমণ করলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভ্রাতৃবধূ জুঁই বিশ্বাস। রাজন্যাকে নখ – দাঁত বার করে আক্রমণ শানিয়ে তিনি বললেন, ‘না নেত্রী হওয়ার যোগ্যতা আছে, না অভিনেত্রী।’ ফের রাজন্যাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানায় তৃণমূল। গত বছর আরজি কর কাণ্ডের পর নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন রাজন্যা। এর পর তাঁকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। যদিও বহিষ্কারের পরেও তৃণমূলের প্রতি তাঁর আনুগত্য অবিচল রয়েছে বলে দাবি রাজন্যার। কসবাকাণ্ডের পর তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নানা কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এমনকী এআই এর মাধ্যমে বানানো তাঁর নগ্ন ছবি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতারা ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলেন। এর পরই প্রশ্ন ওঠে, এই অভিযোগ এতদিন কেন করেননি রাজন্যা? কেন পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেননি তিনি? রবিবার এই প্রশ্ন তোলেন ফিরহাদ হাকিমের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম ও অতীন ঘোষের কন্যা প্রিয়দর্শিনী ঘোষ। রবিবার একটি সংবাদমাধ্যমের স্টুডিয়োয় সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজন্যা। ফের রাজন্যাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানায় তৃণমূল। জুঁই বিশ্বাস বলেন, ‘ঘটনাটি আমি তিন চারদিন ধরে টিভির পর্দায় দেখছি। দলের একজন কর্মী, জনপ্রতিনিধি হিসাবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। যদি কোনও মহিলার সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তাহলে এতদিন চুপ করে ছিলেন কেন? তিনি তো একজন পড়াশোনা করা মহিলা, নেত্রী বলছেন নিজেকে, তিনি নিজেকেই যদি রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে নেত্রী হিসাবে বাকিদের জন্য কী করবেন? প্রশ্ন দুই, তিনি কেন এতদিন চুপ ছিলেন? যৌন হেনস্থা হলে মহিলাদের জন্য দেশে আইন রয়েছে। তিনি আইনের দ্বারস্থ হতে পারতেন। ’ জুঁইদেবীর বক্তব্য, ‘যোগ্যতা বিচারের জন্যও যোগ্যতা লাগে। যাঁরা একে মাথায় তুলেছিলেন, তাঁদের যোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। না নেত্রী হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে, না অভিনেত্রীর। দু’দিনে এসেই নেত্রী? কোভিড কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এদের মুখ কেন দেখতে পাওয়া যায় না। শুধু ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করতে আসে।’ জুঁই বিশ্বাসের মন্তব্যে স্পষ্ট, রাজন্যাকে জায়গা ছাড়তে নারাজ তৃণমূল। রাজন্যা নিজের অবস্থানে অনড় থাকলে তৃণমূলের আক্রমণ আরও তীব্র হবে।
কসবায় গত ২৫ জুন গণধর্ষণ কাণ্ডের সময় কলেজেই ছিলেন ভাইস প্রিন্সিপাল? কসবার ওই কলেজের উপস্থিতি রেজিস্ট্রার দেখা যায়, ২৫ জুন সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে কলেজে ঢুকেছিলেন নয়না চট্টোপাধ্যায়। এরপর আউট টাইমেও ৯টা ৫০ মিনিট লেখা। জুন মাসের ১ তারিখ থেকে ২৫ জুন রেজিস্টারে এম-পিএমের উল্লেখ করা নেই। ২৬ জুন নাকি রেজিস্টারে এম-পিএমের উল্লেখ করেন নয়না চট্টোপাধ্যায়। ২৬ জুন তিনি রেজিস্টারে প্রথমে ইন টাইম উল্লেখ করেছিলেন সকাল সাড়ে ন’টা। পরে তা কেটে ১০টা ১৫ মিনিট করা হয়। আউট টাইমে লেখা ছিল রাত ৮ টা ৩০। পরে তা কেটে হাফ ডে ছুটি নেওয়ার কথা লেখা হয়। নয়না চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন তিনি এই ঘটনার বিষয়ে জানতেনা না। তিনি নাকি ঘটনার দু’দিন পরে ২৭ জুন কলেজের এক নিরাপত্তারক্ষীর থেকে এই গণধর্ষণের বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন। এদিকে কলেজের সিসিটিভি ফুটেজের অ্যাক্সেস ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে থাকে। এই আবহে ক্রমেই তাঁর দাবি ঘিরে প্রশ্নচিহ্ন উঠছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, কসবা গণধর্ষণকাণ্ডের পরের দিনই সকালে আইন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ডঃ নয়না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনোজিতের কথোপকথনের প্রমাণ পায় কলকাতা পুলিশের নয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল সিট। দাবি সাম্প্রতিক রিপোর্টে। তদন্তকারীরা তিন অভিযুক্তেরই মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস রেকর্ড ক্রস চেক করছে। তদন্তকারী বলেন, ‘আমরা দেখতে পাই ঘটনার পরদিন সকালে মনোজিতের নম্বর থেকে কলেজের ভিপিকে ফোন করা হয়। তাঁদের কথোপকথনের খুঁটিনাটি জানতে দু’বার ভিপিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।’ এদিকে এই ঘটনার পরে মনোজিৎ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর শরণাপন্ন হন বলে দাবি করছে পুলিশ সূত্র। দক্ষিণ কলকাতার একাধিক জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রভাবশালীদের সঙ্গে দেখা করেছিল মনোজিৎ।
অবশেষে প্রবীণ বাম নেতাকে নিগ্রহে অভিযুক্ত মেদিনীপুরের দলীয় কাউন্সিলর বেবি কোলেকে বহিষ্কার করল তৃণমূল। সোমবার শহরে দলীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে একথা জানিয়েছেন দলের রাজ্য সহ সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। বেবি কোলেকে আগেই শো কজ করেছিল তৃণমূল। সেই শো কজের জবাব গ্রহণযোগ্য মনে না হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মেদিনীপুরের খড়িদা এলাকায় বাম নেতা অনিল দাসকে রাস্তায় ফেলে মারধর করেন বেবি কোলে। প্রাণ বাঁচাতে বৃদ্ধ অনিলবাবু একটি রংয়ের দোকানে আশ্রয় নিলে সেখানে ঢুকে তাঁকে লক্ষ্য করে রংয়ের কৌটো ছুড়ে মারেন বেবি কোলে। ফের তাঁকে মারধর করেন মেদিনীপুর শহরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর। ঘটনার ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এলে রাজ্যজুড়ে শোরগোল শুরু হয়। আক্রান্ত অনিল দাস বলেন, বেবি কোলে জমি দখল করছিলেন। তার বিরুদ্ধে থানার দ্বারস্থ হওয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। চারিদিকে সমালোচনার মুখে বেবি কোলেকে শো কজ করে তৃণমূল। শো কজের জবাবে তৃণমূলের ওই কাউন্সিলর জানান, তাঁকে আগে আক্রমণ করেছিলেন অনিলবাবু। আত্মরক্ষার স্বার্থে পালটা হামলা করেছেন। মেদিনীপুরে গিয়ে জয়প্রকাশ মজুমদার জানান, রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি বেবি কোলেকে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন।




