আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় রাজন্যা হালদার শর্ট ফিল্ম বানিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। পরে দল তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করেছিল। রাজন্যা এবার কসবা গণধর্ষণের সময় মুখ খুললেন। ফেসবুকে দীর্ঘ প্রায় ২৫মিনিটের লাইভ রাজন্যা এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সহ-সভাপতি প্রান্তিক চক্রবর্তী বললেন, ‘ধর্ষককে নিয়ে তর্জা নয় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ফায়ার করুন। অন্য রাজ্যের রেফারেন্স নয়, অপরাজিতা বিলকে কার্যকরী করুন।’ রাজন্যা লাইভে বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে তা রাজনীতি, ধর্ম, বর্ণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের যেন সর্বোচ্চ সাজা হয়। এমন সাজা হোক যাতে বাকিদের বুঝিয়ে দেওয়া যায় ভবিষ্যতে কেউ যদি এমন ঘটনা ঘটায় তাঁদেরও এমনই হাল হবে।’ এদিকে ‘সামাজিক ও মানুষ রাজন্যা’ লাইভে আরও বলেন, ‘তৃণমূলের অনেকের অন্য রাজ্যের প্রসঙ্গ টেনে এনে আনছেন, আমি এটাকে সমর্থন করতে পারছি না। একইসঙ্গে বিরোধী দলও এখানে রাজনীতি করে সেটাকে আমরা সমর্থন করি না। এটা একটা ক্রাইম। অভিযুক্ত তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি ছিল না সেটা এখানে বিচার্য নয়। একটাই কথা, সাজা চাই।’ এরপর কসবা কাণ্ডের জের টেনে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিরাপত্তা নিয়ে রাজন্যা বলেন, ‘এখন যা অবস্থা তা দেখে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তো মনে করবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা নিরাপদ নই। যখন একটা বীজ থেকে একটা গাছ জন্মাচ্ছে, তখনই যদি মনে হয় তার মধ্যে কোনও সমস্যা আছে, খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তখনই যদি তাঁকে সাবধান করে দিতাম তাহলে হয়তো আজকে এই দিন দেখতে হত না।’ এদিকে রাজন্যা আরও বলেন, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলেছেন, তেমন পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা উচিত এই সব দোষীদের।’ ২৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ২৪ বছর বয়সি আইনের ছাত্রীকে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের কসবা ক্যাম্পাসে গণধর্ষণ করা হয়। তাঁকে মারধর করা হয়েছিল। অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, জাইব আহমেদ, প্রতিম মুখোপাধ্যায়কে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়েছে। ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর মেডিক্যাল রিপোর্ট ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ছাত্রীর গলায় কামড়ের দাগ রয়েছে। এদিকে যৌনাঙ্গ ক্ষত রয়েছে। এছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় মারধরের দাগও দেখা গিয়েছে। মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট যে যৌন নিগ্রহের শিকার অভিযোগকারী তরুণী।
কসবা গণধর্ষণকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রের বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক অভিযোগ। আর তাতেই টের পাওয়া যাচ্ছে তার দাপট। শ্লীলতাহানি, মারধরসহ মনোজিতের বিরুদ্ধে থানায় প্রায় এক ডজন অভিযোগ থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কখনও তেমন কোনও কড়া পদক্ষেপই করেনি। এমনকী পুলিশ পিটিয়েও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামিন পেয়ে যায় মনোজিত। বেশি পুরনো নয়, গত এপ্রিলে ঘটেছে এই ঘটনা। এপ্রিলে কসবা থানা এলাকার একটি এটিএমে টাকা তুলতে যান টিএমসিপি নেতা মনোজিত মিশ্র। সেখানে তাঁর সঙ্গে এটিএমএর নিরাপত্তারক্ষীর বিবাদ বাঁধে। অভিযোগ, রক্ষীর ওপর চড়াও হন মনোজিত। হামলার মুখে পড়ে নিরাপত্তা চেয়ে ১০০ ডায়ালে ফোন করেন নিরাপত্তারক্ষী। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে এসে পৌঁছয় কসবা থানার টহলদারি ভ্যান। অভিযোগ, এর পর কসবা থানার এক এএসআইকে মারধর করেন মনোজিত। এই ঘটনার পর মনোজিতকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ, এর পর থানার ভিতরে দাপট দেখাতে শুরু করেন মনোজিত। পুলিশকর্মীদের গালিগালাজ করেন তিনি। মনোজিতকে পরের দিন আলিপুর আদালতে পেশ করে পুলিশ। পুলিশ পিটিয়েও সেদিনই আদালতে জামিন পেয়ে যান মনোজিত। প্রশ্ন উঠছে, কার হাত মাথায় থাকায় পুলিশ পিটিয়ে গ্রেফতার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামিন পেয়ে যেতে পারেন একজন যুবক? বিরোধীদের দাবি, শুধু তৃণমূল নেতৃত্ব নয়, মনোজিতের বাড়বাড়ন্তের পিছনে পুলিশেরও প্রশ্রয় রয়েছে।
কসবায় সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রের বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক অভিযোগ। মনোজিতের বিরুদ্ধে যে পুলিশে আগেও অভিযোগ হয়েছে তা জানা গিয়েছিল ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসতেই। আর তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আসছে চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ। জানা গিয়েছে, মনোজিত মিশ্রের বিরুদ্ধে এর আগেও ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছিল। পুলিশে অভিযোগ দায়ের হলেও সেই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। ২০১৮ সালে কসবা থানায় মনোজিত মিশ্রের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেন সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজের ২ ছাত্রী। তখন মনোজিত ওই কলেজের ছাত্র ছিল। ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ অভিযোগ দায়েরের পর এনআরএস হাসপাতালে অভিযোগকারীদের শারীরিক পরীক্ষা করায় পুলিশ। কিন্তু তার পর কোনও অজ্ঞাত কারণে মনোজিতের বিরুদ্ধে কড়া কোনও পদক্ষেপ করেনি কসবা থানা। এখানেই শেষ নয় ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ ফের মনোজিতের বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্যক্ত করার অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল রাজ্যের ক্ষমতায় আসার ঠিক পরের বছর ২০১২ সালে কসবা ল’ কলেজে ভর্তি হন মনোজিত। ২০১৩ সালে এক কেটারিং কর্মীকে রক্তাক্ত করার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ দায়ের হয় কালীঘাট থানায়। এর জেরে কলেজ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ২০১৭ সালে ফের সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে রি অ্যাডমিশন নেয় সে। তার পর তার বিরুদ্ধে ওঠে ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির অভইযোগ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পরীক্ষা দেওয়া ছাড়া মনোজিতের কলেজে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। কিন্তু তার পরেও কোন যাদুবলে সে কলেজের তৃণমূল ইউনিটের সর্বেসর্বা হয়ে উঠল সেই প্রশ্নই তুলছেন বিরোধীরা।
শুধু নির্যাতিতাই নন। এর আগে আইন কলেজের বহু আইনের ছাত্রীর সঙ্গেই অশালীন আচরণ করে কসবা গণধর্ষণের ঘটনার মূল অভিযুক্ত। আর সেই অশালীন আচরণের অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তুলে রাখত মনোজিতেরই সঙ্গীরা। ওই ভিডিওগুলি দেখিয়ে তাঁদের ব্ল্যাকমেল করা হত, এমন অভিযোগও উঠেছে। এবার সেই ছবি ও ভিডিওগুলির সন্ধানে তল্লাশি শুরু করল ‘সিট’। কসবায় সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে এক আইনের ছাত্রীকে আটকে রেখে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। রবিবার অভিযুক্ত প্রমিত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে হাওড়ার চ্যাটার্জিহাটের বাড়িতে ‘সিট’ তল্লাশি চালায়। এছাড়াও অন্য দুই অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ও জায়েব আহমেদের বাড়িতে এক দফা তল্লাশি হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর। লালবাজারের সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’-এর পাঁচজন সদস্য কাজ শুরু করেন। এদিন ‘সিট’-এর সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়। এখন ন’জন ‘সিট’ সদস্য তদন্ত করছেন। নির্যাতিতা ছাত্রী ও তিন অভিযুক্তর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গত বুধবার কসবায় সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে এক আইনের ছাত্রীকে আটকে রেখে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, তার দুই সঙ্গী জায়েব আহমেদ ও প্রমিত মুখোপাধ্যায়কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ছাত্রীকে ধর্ষণ চলাকালীন মিনিট দু’য়েকের দু’টি ভিডিও তোলা হয় বলে প্রথমে ধৃতরা দাবি করে। ধর্ষণের সময় ছাড়াও তার আগে ছাত্রীকে বিবস্ত্র করা ও তার যৌন নিগ্রহের আরও কয়েকটি ভিডিও ও ছবি তোলা হয় বলে সন্দেহ পুলিশের। তদন্তে ‘সিট’-এর সদস্যরা জানতে পারেন, যাবতীয় অশ্লীল ভিডিও ও ছবি অভিযুক্তরা নিজেদের মোবাইল ছাড়াও অন্য ল্যাপটপ ও পেন ড্রাইভে কপি করে রেখেছে। সেগুলির সন্ধানেই এদিন অভিযুক্তদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশের সূত্র। বুধবার রাতে কলেজে ছাত্রীর গণধর্ষণের যে ভিডিওগুলি তোলা হয়, সেগুলি একটি সোশাল মিডিয়ার বিশেষ গ্রুপে শেয়ার করা হয়েছিল বলে খবর আসে পুলিশের কাছে। পুলিশ সেই তথ্য যাচাই করছে। ওই গ্রুপে রয়েছে মনোজিৎ, জায়েব, প্রমিত ও মনোজিতের খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন। ওই গ্রুপের কেউ বাইরে ভিডিওগুলি ছড়িয়েছে কি না, সেই তথ্য পুলিশ জানার চেষ্টা করছে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য গ্রুপের অন্য সদস্যদের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। পরীক্ষা করা হতে পারে তাঁদের মোবাইলও। শনিবার সন্ধ্যায় অভিযুক্তদের কলেজে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্গঠন হয়। ইউনিয়ন রুম, গার্ড রুম-সহ কোথায় কী ঘটনা ঘটেছিল, তার বিবরণ দিয়েছে অভিযুক্তরা। পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে নতুন কলেজ-ছাত্রীদের টার্গেট করে তাঁদের প্রতি অশালীন আচরণ করাটা রীতিমতো ‘হবি’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মনোজিতের। ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাঁদের ইউনিয়ন রুমে বসার জন্য চাপ দিত মনোজিৎ। নিজের ইচ্ছামতো তাঁদের পদ দিত সে। আরও উঁচু পদের লোভ দেখানো হত। এর পর প্রায় প্রত্যেক ছাত্রীকেই বিয়ের টোপ দিত সে। বিভিন্ন সময় গার্ডরুমে নিয়ে যাওয়া হত ওই ছাত্রীদের। সেখানে মদ্যপান করে ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করত মনোজিৎরা। আবার কখনও কয়েকজন মিলে কোথাও আউটিংয়েও যেত। সেখানেও ছাত্রীদের বিভিন্ন ধরনের অশালীন আচরণের ছবি ও ভিডিও করত মনোজিতের সঙ্গীরা। ওই ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করা হত। কাউকে এই অশ্লীল আচরণের কথা জানালে বা অভিযোগ দায়ের করলে ওই ভিডিও ও ছবি ফাঁস করে দেওয়া হবে বলে হুমকিও দেওয়া হত ছাত্রীদের। ‘প্রভাবশালী’ মনোজিতের উপর কোনও কথা বলা বা মন্তব্য করার ক্ষমতা কোনও ছাত্র-ছাত্রীর ছিল না। ওই ভিডিওগুলি যে ল্যাপটপ ও পেন ড্রাইভে কপি করা হয় বলে অভিযোগ, সেগুলির সন্ধানে এদিন অভিযুক্তদের বাড়িতে চলে তল্লাশি। অভিযুক্ত প্রমিত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে রবিবার সকালে তার চ্যাটার্জিহাটের হরিনাথ ন্যায়রত্ন লেনের বাড়িতে যান ‘সিট’ সদস্যরা। কয়েকশো মানুষের ভিড়ের মধ্যে থাকা বাসিন্দারা মারমুখী হয়ে ওঠেন। তাঁরা পুলিশের সামনেই অভিযুক্তের কঠিনতম শাস্তির দাবি জানাতে থাকেন। তার প্রতিবেশীরা জানান, প্রমিত আর জি করে অভয়া কাণ্ডের বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে রাত জেগেছিল। তার বাবা লাইব্রেরিয়ান। মা আবৃত্তি শেখান। দিদিও উচ্চশিক্ষিতা। মূলত প্রমিতের বৈদ্যুতিন গ্যাজেটের উপরই নজর ছিল পুলিশের। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিন নথি উদ্ধারও হয়েছে বলে পুলিশের কাছে খবর। সূত্রের খবর, কালীঘাটে মনোজিৎ ও তিলজলায় জায়েবের বাড়িতেও একইভাবে তল্লাশি চালিয়ে ল্যাপটপ ও পেন ড্রাইভের সন্ধান চলছে। ইতিমধ্যেই তিনজনের পোশাক, জুতোও পুলিশ উদ্ধার করে ফরেনসিকে পাঠায়। এ ছাড়াও ঘটনাস্থল তথা কলেজের ইউনিয়ন রুমের বাথরুম ও গার্ডের রুমে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ও ফরেনসিক ছেঁড়া চুল, রক্তের দাগ-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী উদ্ধার করেছে। নির্যাতিতাকে পরীক্ষা করে যৌন নিগ্রহ ছাড়াও যে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল, সেই প্রমাণও পুলিশ পেয়েছে। গত বুধবার নির্যাতিতাকে ধর্ষণের আগে পরিকল্পনা করা হয় বলে জেনেছে পুলিশ। বেশ কিছুদিন ধরে ছক কষার পর দুই সঙ্গী জায়েব ও প্রমিতকে সঙ্গে রেখে এই কুকীর্তি করে মনোজিৎ। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে মনোজিতের বিরুদ্ধে আরও বহু অভিযোগ। গত বছর সহ-আইনজীবীদের সঙ্গে মারপিটের ঘটনার পর মনোজিৎ কসবা থানায় গিয়ে থানার আধিকারিকদের হুমকি দেয়। থানায় তাণ্ডবও চালায়। সেই অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। তবে আলিপুর আদালত থেকে সে জামিন পেয়ে যায়। আইন কলেজ ছাড়াও দক্ষিণ কলকাতার অন্য একটি কলেজে সে কিছুদিনের জন্য ভর্তি হয়েছিল। সেই সুবাদে মনোজিতের যাতায়াত ছিল ওই কলেজে। কলেজটিতে গ্র্যাজুয়েশন অনার্সে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নাম করে দুই ছাত্রর কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাঁদের প্রতারণার অভিযোগও উঠেছিল মনোজিতের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও ২০২২ সালে মনোজিতের বিরুদ্ধে যে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ উঠেছিল, সেই তদন্তের অগ্রগতিও জানার চেষ্টা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কসবার ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করতে চেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন আইনজীবীরা। একাধিক জনস্বার্থ মামলার আবেদন জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে দ্রুত শুনানির আবেদনও জানিয়েছেন মামলাকারীরা। হাই কোর্টের বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি স্মিতা দাসের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তা নেই। ওই বিষয়ে সকল মামলা দায়ের করে বিপরীত পক্ষকে নোটিস দেওয়া হোক। তার পরে শুনানি চেয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন আইনজীবীরা। আগামী বৃহস্পতিবার এই মামলাগুলির শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতায় এসে পৌঁছলেন কসবাকাণ্ডে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্বারা গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দলের সদস্যরা। আর বিমানবন্দরে নেমেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন দলের অন্যতম সদস্য বিপ্লব দেব। বিপ্লব দেবকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ছিলেন বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিপ্লববাবু বলেন, ‘আমরা কলকাতার পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলাম, মুখ্যসচিবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু পাইনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাথরসে, পহেলগাঁওয়ে প্রতিনিধিদল পাঠাবেন, কিন্তু বিরোধী কোনও দল তাঁর রাজ্যে প্রতিনিধিদল পাঠালে তিনি সহযোগিতা করবেন না। এখানে অগণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন সরকার চলছে। মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর শাসনে একের পর এক রেপ হচ্ছে। তাও এমন এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মেডিক্যাল কলেজে, আইন কলেজে… তার পর তাদের নেতাদের যা মন্তব্য… কেউ বলছে, বন্ধুদের মধ্যে হয়ে যেতে পারে। কেউ বলছে সিপিএমের কাজ। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র করছে, হাত পা ভেঙে দেব। এই মানসিকতার জন্যই ধর্ষণ আরও বেশি করে হচ্ছে। বাংলায় মহিলাদের কোনও নিরাপত্তা নেই।’ মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রকে নিয়ে বিপ্লব দেব বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকেই ওর কাহিনী আছে। তৃণমূল সব নেতাদের সঙ্গে ওর ছবি প্রমাণ করে। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা সবাই প্রত্যক্ষভাবে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত। এরা পেশাদারি ধর্ষক। তৃণমূল করে বলে এদের মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা স্টেট স্পনসর্ড।’
কসবায় সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হল জনস্বার্থ মামলা। সোমবার আদালতের কাজ শুরু হতেই বিচারপতি সৌমেন সেনের এজলাসে মামলা করার অনুমতি চান ৩ আইনজীবী। মূলত তদন্তের স্বচ্ছতা ও রাজ্যের কলেজগুলিতে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আইনজীবীরা। ৩টি মামলায় দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন বিচারপতি সেন। শুক্রবার কসবা ল’ কলেজের গণধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তার পর থেকে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত বুধবারের ওই ঘটনার তদন্তে নেমে মূল অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতা মনোজিৎ মিশ্রসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু পুলিশি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিরোধীরা। বিশেষ করে এফআইআরএ অভিযুক্তদের নামের উল্লেখ না থাকায় উঠছে প্রশ্ন। সোমবার সকালে আদালতের কাজ শুরু হতেই সৌম্যশুভ্র রায়, সায়ন দে ও বিজয় কুমার সিংহল নামে ৩ আইনজীবী কসবার ঘটনায় মামলা দায়েরের অনুমতি চান। তাদের দাবি, ওই ঘটনার তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্দেশ দিক আদালত। পাশাপাশি রাজ্যের কলেজগুলিতে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করছে তাও জানাতে হবে আদালতকে। এই অভিযোগে বিচারপতি সৌমেন সেনের এজলাসে মামলা দায়েরের অনুমতি চান ৩ আইনজীবী। বিচারপতি মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষকে নোটিশ পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। বৃহস্পতিবার এই মামলাগুলির শুনানি হতে পারে।
কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ইতিমধ্যে চার জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দু’জন ওই কলেজের বর্তমান ছাত্র। এক জন প্রাক্তনী এবং বর্তমানে ওই কলেজের অস্থায়ী কর্মী। তিনিই মূল অভিযুক্ত। এ ছাড়া, কলেজের নিরাপত্তারক্ষীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার দক্ষিণ শহরতলি প্রদীপকুমার ঘোষালের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল সিট গঠন করে। সোমবার এই সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলা দায়ের করতে চেয়ে হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আইনজীবী সৌম্যশুভ্র রায়, সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়েরা। আইনজীবী সৌম্যশুভ্র মূলত তিনটি আবেদন জানিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত এক জন বিচারপতির নজরদারিতে কসবার ঘটনার সিবিআই তদন্ত চেয়েছেন তিনি। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন। এ ছাড়া, নিরাপত্তার স্বার্থে সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে সিসি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দেওয়া হোক, আবেদনে জানিয়েছেন আইনজীবী। নির্যাতিতার অভিযোগ, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত তাঁর উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রথমে ইউনিয়ন রুমে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। তার পর রক্ষীর ঘরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয় তাঁকে। ওই দিনের সাড়ে সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ সংগ্রহ করেছে। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া, ঘটনাস্থল থেকে ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। নির্যাতিতা এবং অভিযুক্তেরা প্রত্যেকেই তৃণমূলের ছাত্র পরিষদ টিএমসিপি-র সঙ্গে যুক্ত। নির্যাতিতার পরিবার জানিয়েছে, তারা কলকাতা পুলিশের তদন্তেই আস্থা রাখছে। সিবিআই তদন্তের প্রয়োজন নেই।
আরজি করের ‘পুনরাবৃত্তি’ হবে? এই আশঙ্কাও রয়েছে। তার মধ্যেই ঘরের কোন্দল! কসবার আইন কলেজের ঘটনাকে কেন্দ্র জোড়া চাপে শাসক তৃণমূল। কলেজে ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্তদের তৃণমূল যোগ নিয়ে আগেই অস্বস্তিতে পড়েছিল শাসক শিবির। দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি করে সেই অস্বস্তি কমানোর চেষ্টা তারা করেছে। সাংসদ-বিধায়কের ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য এবং দুই সাংসদের ‘কাজিয়া’ প্রকাশ্যে চলে আসায় এ বার বিড়ম্বনায় শাসকদল। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচি জারি। পথে নেমেছেন শুভেন্দু অধিকারী। মিছিল করেছেন গোলপার্ক থেকে গড়িয়াহাট পর্যন্ত। আগামী ২ জুলাই কসবা অভিযানেরও ডাক দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। রাজ্যের নানা প্রান্তে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেছে বিজেপি। রবিবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিল জাতীয় মহিলা কমিশনও। মনে করা হচ্ছে, রাজনৈতিক অস্ত্রে তো বটেই, প্রশাসনিক দিক দিয়েও শাসক তৃণমূলকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে বিজেপি। কসবাকাণ্ডে মহিলা কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ করে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মার সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা। এখনও পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট আকারে কমিশনের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর কমিশনের সদস্যা অর্চনা মজুমদার জানান, নির্যাতিতার বাবার সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। নির্যাতিতার পরিবার জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই মুহূর্তে সিবিআই তদন্ত চায় না। পুলিশি তদন্তের উপরেই আস্থা রয়েছে। এ সবের মাঝেও রবিবার নিজেদের মতো করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। শনিবার রাতেই ঘটনার পুনর্নির্মাণ করেছিলেন তদন্তকারীরা। নির্যাতিতাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশ সূত্রে খবর, দু’ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ঘটনার পুনর্নির্মাণ হয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসে। এর পর রবিবার নির্যাতিতা এবং অভিযুক্তদের ডিএনএ-র নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ধর্ষণকাণ্ডের তদন্তে শনিবারই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল সিট গঠন করেছিল লালবাজার। সেই দলে আরও চার জনকে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা সাব ইনস্পেক্টর। পুলিশ নিজেরমতো কাজ করলেও, শাসকদলের অন্দরে বিতর্ক থামছেই না। কলেজে ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলীয় বিধায়ক মদন মিত্রের মন্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হতেই দূরত্ব রচনা করেছিল দল। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দুই নেতা যা বলেছেন, তা তাঁদের ব্যক্তিগত মত। দলের অবস্থান নয়। তা নিয়ে ফুঁসে উঠেছিলেন কল্যাণ। পাল্টা সুরও চড়ান সমাজমাধ্যমে। সেই আবহে নাম না করে কল্যাণ-মদনকে আক্রমণ করেছেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘ভারতে নারীবিদ্বেষ দলের গণ্ডিতে আটকে নেই। কিন্তু তৃণমূলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে একটাই বিষয়, আমরা এই ধরনের বিরক্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদ করি, তা সে যে-ই করুন না কেন।’’ মহুয়ার এই মন্তব্য নিয়েও আবার ফুঁসে উঠেছেন কল্যাণ। তিনি বলেছেন, তিনি নারীবিদ্বেষী নন। কেবল এক জন নারীকেই ঘৃণা করেন। সেই নারী আর কেউ নন, কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া! এ-ও বলেন, ‘‘দেড় মাসের হানিমুন শেষ করে দেশে ফিরেই কি ওঁর আমার পিছনে লাগা শুরু হল? আমি সব নারীকে সম্মান করি, কিন্তু মহুয়া মৈত্রকে ঘৃণা করি। যাঁকে পার্লামেন্টের এথিক্স কমিটি বহিষ্কার করে, তাঁকে ঘৃণাই করি।’’ কল্যাণের সঙ্গে মহুয়ার ‘মধুর’ সম্পর্কের কথা অবশ্য কারও অজানা নয়। লোকসভাতেও এর আগে প্রকাশ্যে তাঁরা বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে নেতাদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দলকে অস্বস্তিতে রাখছে, মেনে নিচ্ছেন তৃণমূলের অনেকেই। কসবার ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য রবিবার মদনকে শো কজ করেছে তৃণমূল। রবিবার দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী শো কজ়ের চিঠি পাঠিয়েছেন মদনকে। তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কসবাকাণ্ড নিয়ে মদন যে মন্তব্য করেছেন, তাতে জনসমক্ষে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তাঁকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ক্যাম্পাসের ভিতরেই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। যে তিন জনের বিরুদ্ধে নির্যাতিতা অভিযোগ তুলেছেন, তাঁরা তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের টিএমসিপি সদস্য। এই ঘটনার পর তৃণমূলের তরফে সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়েছিল, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু মদন শনিবার বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন। জানান, ওই ছাত্রীর একা একা কলেজে যাওয়াই উচিত হয়নি। কেন তিনি একা গিয়েছিলেন, প্রশ্ন তোলেন বিধায়ক। রাতেই এই মন্তব্যের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছিল তৃণমূল। বলা হয়েছিল, মদনের মন্তব্য ‘ব্যক্তিগত’। দল তা সমর্থন করে না। বিজেপির পক্ষ থেকে ‘কন্যা সুরক্ষা যাত্রা’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। গোলপার্ক থেকে গড়িয়াহাট পর্যন্ত মশাল মিছিলে অংশ নেন বিজেপি নেতা-কর্মীরা। কর্মসূচি শেষে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘আর বাড়িতে বসে থাকলে হবে না। পার্কস্ট্রিট, কামদুনি, হাঁসখালি, আরজি কর এবং কসবার ঘটনায় কন্যা সুরক্ষা যাত্রা চলবে।’’ ওই ঘটনার প্রতিবাদে শাসকদল তৃণমূল এবং কলকাতা পুলিশকে একযোগে আক্রমণ করেন বিরোধী দলনেতা। তিনি বলেন, ‘‘এরা কারা? ভাইপো গ্যাং! মমতা হঠাও, কন্যা বাঁচাও। কলকাতা পুলিশ ধর্ষকদের রক্ষাকর্তা। ছাত্রীর মা-বাবাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার? মনোজ বর্মা কোথায় লুকিয়ে দিলেন ছাত্রীকে?’’ ওই কর্মসূচি থেকে বিজেপি জানায়, নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। রবিবার আরজি কর প্রসঙ্গ তুলে নবান্ন অভিযানেরও ডাক দেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর কথায়, ‘‘আরজি করের নির্যাতিতার বাবা-মাকে বলব ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানের ডাক দিন। সব নাগরিককে বলব বেরিয়ে আসুন। রাজনীতি সরিয়ে রেখে আমিও যোগ দেব।’’ রবিবার ওই ঘটনার প্রতিবাদে কসবা থানার সামনে বিক্ষোভ দেখায় ‘নারী ঐক্য মঞ্চ’। সেখান থেকে আরজি করের মতো ‘আমরা বিচার চাই’ স্লোগান ওঠে। তারা থানায় একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। তাদের বক্তব্য, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির ২০টি অভিযোগ রয়েছে। সেগুলির নতুন করে তদন্ত শুরু হোক। কসবাকাণ্ডের খিদিরপুরে প্রতিবাদ মিছিল করে কংগ্রেস। গড়িয়াহাট থেকে হাজরা পর্যন্ত অভয়া মঞ্চও মিছিল করেছে। যোগ দিয়েছে নাগরিক মঞ্চও। এই মিছিলে রয়েছে আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ আসফাকুল্লা নাইয়া। এ ছাড়াও সিনিয়র ডাক্তার তমোনাশ চৌধুরী, পুণ্যব্রত গুণ, সুবর্ণ গোস্বামীকেও দেখা গিয়েছে এই মিছিলে। কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রী ধর্ষণে ধৃত ‘পি’কে নিয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়েছে পুলিশ। রবিবার সকাল থেকে তাই নিয়ে শোরগোল এলাকায়। বেশ কিছু ক্ষণ ধরে ধৃতের বাড়িতে তল্লাশি চালায় কলকাতা পুলিশের একটি দল। স্থানীয় সূত্রে খবর, কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণকাণ্ডে ধৃত ‘পি’ পুলিশের খাতায় কোডনেম হাওড়ার চ্যাটার্জিহাট থানার বাসিন্দা। এলাকায় তিনি বেশ পরিচিত। ধর্ষণের ঘটনায় তাঁর নাম জড়ানোর প্রতিবেশীরা অবাক। বৃহস্পতিবার ‘পি’ গ্রেফতার হন। প্রথম বার তাঁকে নিয়ে বাড়িতে যায় পুলিশ। জানা যাচ্ছে, বাড়িতে বেশ কিছু ক্ষণ তল্লাশি চলে। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে পুলিশ। তার পর বেশ কিছু নথি উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছেন তদন্তকারীরা। ধৃত যুবককে নিয়ে পুলিশ যখন গাড়িতে ওঠে ভিড় জমে যায় আশপাশে। বস্তুত, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ হাতে পেয়েছে পুলিশ। সেখানে ধৃত ‘পি’ উপস্থিত ছিলেন বলেই জানা গিয়েছে। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, ‘পি’ বরাবরই পড়াশোনায় ভাল। হাসিখুশি তরুণ। তাঁর সম্পর্কে এর আগে খারাপ কিছু কেউ শোনেননি। এক প্রতিবেশীর কথায়,‘‘তবে যে অপরাধ ও করেছে বলে অভিযোগ,তা যদি সত্যি হয়, কঠোর শাস্তি হোক। দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’’ ‘পি’-র বাড়ির কেউ কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি।
কসবার আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে রাজ্য পুলিশ। চারজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজেই জানিয়েছেন তিনি এই ঘটনায় সিবিআই তদন্ত চান না। তিনি চান রাজ্য পুলিশই এই ঘটনার তদন্ত করুক। প্রশ্ন উঠছে নির্যাতিতার পরিবার কী চাইছে? তাদের কি রাজ্য পুলিশের তদন্তে আস্থা রয়েছে? নাকি তারা চাইছেন এবার তদন্তে নামুক সিবিআই? মুখ খুলেছেন নির্যাতিতা ছাত্রীর মামা। তিনি রবিবার জানিয়েছেন, ‘কলকাতা পুলিশের তদন্তে আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আমরা সিবিআই চাই না।’আপনারা কী শাস্তি চাইছেন? সেই প্রশ্নের উত্তরে নির্যাতিতার আত্মীয় জানিয়েছেন ‘তাঁরা সর্বোচ্চ শাস্তি চাইছেন।’ আরজি করের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রশ্ন করার পরেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘কলকাতা পুলিশেই তাঁদের আস্থা রয়েছে।’ জাতীয় মহিলা কমিশন থেকেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘জাতীয় মহিলা কমিশন দেখা করতে আসুক। কিন্তু আপনি আসবেন আর সঙ্গে ২০০ সাংবাদিক আসবেন এটা চাই না।’ এদিকে মদন মিত্র ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্য়ায় পৃথকভাবে এই কসবাকাণ্ডকে ঘিরে এমন মন্তব্য করেছেন যার জেরে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে পড়েছে দল। তবে এনিয়ে নির্যাতিতার আত্মীয় কোনও মন্তব্য করতে চাননি। বলেন, ‘তদন্ত হোক। শাস্তি পাক।’এমনকী নির্য়াতিতার শারীরিক পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঠিকই তো পরীক্ষা হয়েছে।’ সেই সঙ্গেই তিনি জানিয়েছেন, ‘কোথাও কোনও হুমকি নেই। প্রশাসনের উপর আস্থা রয়েছে।’




