Monday, July 13, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

কসবা ধর্ষনকাণ্ডে তৃণমূলের ‘‌প্রভাবশালী’‌ টিএমসিপি ছাত্রনেতা ‘‌জে’‌!‌ অভয়া কাণ্ডের পর আবারও কলেজের ইউনিয়নরুমে ধর্ষকদের রাজত্ব?‌

গলায় কামড়। যৌনাঙ্গে ক্ষত। সামনে এল কসবা কাণ্ডে নির্যাতিতার মেডিক্যাল রিপোর্ট। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ছাত্রীর গলায় কামড়ের দাগ রয়েছে। যৌনাঙ্গ ক্ষত রয়েছে। এছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় মারধরের দাগও দেখা গিয়েছে। এই আবহে মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট যে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সেই অভিযোগকারী তরুণী। এদিকে ঘটনায় তিন অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, জেব আহমেদ, প্রমিত মুখোপাধ্যায় গ্রেফতার হয়েছে ইতিমধ্যেই। ২৫ জুন এই ঘটনার পর নির্যাতিতা তরুণী কসবা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করানো হয় পার্ক সার্কাসের কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। এফআইআরে নাকি আবার সেই অভিযুক্তদের পুরো নাম লিখতে দেয়নি পুলিশ। অভিযোগ, নির্যাতিতার লেখার ওপর হোয়াইটনার চালানো হয়। তিন অভিযুক্তের নাম বলা হয়েছে – এম, পি, জে। ‘জে’ হল কলেজের অস্থায়ী কর্মী তথা কলেজেরই প্রাক্তনী। এদিকে নির্যাতিতা সেই প্রস্তাব খারিজ করার পরই শুরু হয় অত্যাচার। একটা সময় নাকি নির্যাতিতা প্রতিরোধ বন্ধ করে দেন। ১০টা ৫০ মিনিটে যখন ‘জে’ চলে যাচ্ছে, তখনও নাকি সে হুমকি দিয়ে যায় যাতে কেউ ‘বিষয়টা’ জানতে না পারে। প্রথম চেষ্টা ইউনিয়ন রুমে। পরে রক্ষীর ঘরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ! কসবার কলেজে কী ঘটেছিল, সবিস্তার লিখলেন নির্যাতিতা ‘‘কলেজের প্রাক্তনী ‘জে’। বকলমে আমাদের কলেজের টিএমসিপি ইউনিটের প্রধান। সকলে ওঁর কথা শোনেন। উনিই আমাদের সকলকে টিএমসিপি-র বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন। আমাকে ছাত্রীদের সেক্রেটারি করেছেন উনিই।’’ নিজের কলেজে ‘ধর্ষিতা’ ছাত্রী। অভিযোগপত্রে মোট তিন জনের নাম রয়েছে। মূল অভিযুক্তকে তাঁর নামের আদ্যক্ষর ‘জে’ দিয়ে সম্বোধন করেছেন ‘নির্যাতিতা।’ বাকি দু’জনকে সম্বোধন করেছেন ‘এম’ এবং ‘পি’ বলে। অভিযোগ, ‘জে’ যখন প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তাঁর উপর নারকীয় অত্যাচার করছেন, তখন ‘এম’ এবং ‘পি’ তাঁর নীরব দর্শক এবং কখনও কখনও সাহায্যকারীর ভূমিকা নিয়েছেন। তরুণীর অভিযোগ, অনুনয়-বিনয় করেও তিনি রেহাই পাননি। পায়ে পড়েছেন। উল্টে মিলেছে হুমকি। শারীরিক নির্যাতনের সময় হকি স্টিক দিয়ে মারধর করতেও উদ্যত হন অভিযুক্ত। ‘ধর্ষক’ পূর্বপরিচিত এবং ছাত্র রাজনীতিতে দু’জনে ‘সহযোদ্ধা’। খাস কলকাতায় একটি আইন কলেজে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শোরগোল। উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। পুলিশের কাছে ঠিক কী জানিয়েছেন ‘নির্যাতিতা’? বয়ানে কার কার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ? পুলিশের কাছে নির্যাতিতার বয়ান অনুয়ায়ী, গত ২৫ মে পরীক্ষার ফর্ম পূরণের জন্য কলেজে গিয়েছিলেন তিনি। দুপুরে নির্দিষ্ট সময়ে ফর্ম পূরণ হয়ে যায়। তার পর তিনি ইউনিয়ন রুমে গিয়েছিলেন। অভিযোগপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘‘দুপুর ১২টা ৫ মিনিট নাগাদ আমি ইউনিয়ন রুমে যাই। ‘জে’ ইউনিয়ন রুমে ঢুকে বলেন, ওখানে উপস্থিত সকলে যেন ইউনিয়ন রুমে থাকি। আমরা তা-ই করি। ওই ব্যক্তি কলেজের প্রাক্তনী এবং বকলমে আমাদের কলেজের টিএমসিপি ইউনিটের প্রধান। কলেজে উনি বিশেষ প্রভাবশালী। সকলে ওঁর কথা শোনেন। উনিই আমাদের সকলকে টিএমসিপি-র বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন। আমাকে ছাত্রীদের সেক্রেটারি করেছেন উনিই।’’

নির্যাতিতা অভিযোগে জানান, ওই দিন দুপুরে সকলে ইউনিয়ন রুমে ঠাট্টা-তামাশা করছিলেন। বিকেল ৪টে নাগাদ অনেকেই ইউনিয়ন রুম থেকে বেরিয়ে যান। তিনিও কলেজের গেটের দিকে এগোচ্ছিলেন। সেই সময় কলেজের জিএস-এর (জেনারেল সেক্রেটারি) সঙ্গে দেখা হয় এবং দু’জনে কথা বলেছিলেন। তার পরে ‘জে’ –এর সঙ্গে দেখা হয় তাঁদের। তিনি এক প্যাকেট বিস্কুট তুলে দেন তাঁর হাতে। সেই সঙ্গে জানান, আবার এক বার ইউনিয়ন রুমে যেতে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হবে। মোটের উপর তাঁরা সাত জন ইউনিয়ন রুমে জড়ো হন। সেখানে ‘জে’ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তিনি কতটা প্রভাবশালী, সে সব উল্লেখ করেন। ‘নির্যাতিতা’ লেখেন, ‘‘এর কিছু ক্ষণ পরে ‘পি’ আমাকে ইউনিয়ন রুমের বাইরে ডাকেন এবং আমার বিশ্বস্ততার প্রমাণ চান। আমি জানাই, আমি তাঁদের অনুগত। আমরা আবার ইউনিয়ন রুমে যাই। সেখানে ‘জে’ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন ‘পি’ আমাকে সব কিছু ব্যাখ্যা করেছেন কি না। তখন আমি বলি, ‘‘হ্যাঁ, দাদা আমি সর্বদা ইউনিটের সঙ্গে আছি। কিছু ভেবো না।’’ তখন উনি আমাকে বলেন, ‘‘না, ও সব কিছু নয়।’’’ তরুণীর দাবি, এর পর কলেজের ‘দাদা’ তাঁকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। ইউনিয়ন রুমের বাইরে বেরিয়ে বলেন, কলেজে প্রথম যে দিন তাঁকে দেখেছেন, সে দিন থেকেই পছন্দ করেন। ছাত্রীটি লিখেছেন, ‘‘উনি (‘জে’) আমায় বলেন, ওঁর গার্লফ্রেন্ডের পরে যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ভালবেসে থাকেন, সেটা আমি। এবং তার পরেই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আমি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলি, আমার ‘বয়ফ্রেন্ড’ আছে। আমি তাকে ছাড়তে পারব না। তার পরে আর কিছু ক্ষণ আমরা দু’জন কথা বলে ইউনিয়ন রুমে ফিরে যাই।’’ তরুণীর দাবি, তখনও সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ইউনিয়ন রুমে উপস্থিত অন্যান্য ছাত্রছাত্রী বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনিও বাড়ি যাওয়ার জন্য বেরোচ্ছিলেন। ঠিক তখন তাঁকে আটকান ‘জে’ এবং বলেন, একটু থেকে যাওয়ার জন্য। তিনি এবং আরও কয়েক জন ছিলেন। সাড়ে ৭টা নাগাদ তিনি বেরোতে গেলে আবার ‘জে’ তাঁকে বাধা দেন। এবং তাঁর চোখের ইশারায় অন্য দুই অভিযুক্ত ‘পি’ এবং ‘এম’ ইউনিয়ন রুমের বাইরে বেরিয়ে যান।

তরুণীর দাবি, ‘‘ওঁরা বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়ন রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরোটা ঘটে যায়। ‘জে’ আমাকে ‘ওয়াশরুমের’ দিকে টেনে নিয়ে যান। এবং জোর করতে থাকেন শারীরিক সম্পর্কের জন্য। আমি বারংবার ‘না’ বলতে থাকি। বাধা দিতে থাকি ওঁকে। কেঁদে ফেলে ওঁকে অনুরোধ করি, আমায় ছে়ড়ে দিতে। কিন্তু আমার কোনও কথাই শোনেননি। আমার উপর আরও জোর খাটাতে থাকেন। আমি ভয়ে পেয়ে যাই। ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয় আমার। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তখন ‘জে’ ‘এম’ এবং ‘পি’-কে হাঁক দিয়ে ডাকেন। আমি ওঁদের সকলকেই বলি, আমায় রুবি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কারণ, আমার শরীর খারাপ লাগছে। কিন্তু ওঁরা কেউ কথা শোনেননি। তখন আমি ওঁদের অনুরোধ করি, আমায় একটি ইনহেলার অন্তত এনে দিন। ‘এম’ তাতে সাড়া দেন। ইনহেলার নেওয়ার পর কিছুটা ঠিক হই আমি। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে প্রায় পালাতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু দেখলাম, ওঁরা মেন গেট বন্ধ করে দিচ্ছেন! আমি গার্ডের (গেটে দাঁড়ানো রক্ষী) কাছে সাহায্য চাই। কিন্তু উনি অসহায় ছিলেন। আমায় সাহায্য করেননি। ‘এম’ এবং ‘পি’ আবার জোর করে আমায় ইউনিয়ন রুমে নিয়ে যান। আমি ‘জে’-এর কাছে কাকুতি-মিনতি করি। আমি ওঁর পা পর্যন্ত ধরি। উনি ‘এম’ এবং ‘পি’ কে বলেন, আমায় গার্ডস রুমে নিয়ে যেতে। এবং রক্ষীকে বাইরে রাখতে। ওঁরা তাই করেন।’’

ছাত্রীর অভিযোগ, এর পর ‘জে’ তাঁকে বিবস্ত্র করেন। এবং ধর্ষণ করেন। যখন আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, তখন আমায় ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করেন উনি। আমায় হুমকি দিয়ে বলেন, এ সব আগেও করেছেন। এমনকি, আমার প্রেমিককে খুন করে দেওয়া এবং বাবা-মাকে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করিয়ে দেবেন বলে হুমকি দেন। তার পরেও যখন আমি বাধা দিই, তখন আমার বিবস্ত্র অবস্থার দু’টি ভিডিয়ো দেখিয়ে উনি বলেন, সকলকে এই ভিডিয়ো দেখাবেন। ‘জে’ যখন আমায় ধর্ষণ করছিলেন, তখন ‘এম’ এবং ‘পি’ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছেন। আমি নিজেকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করে গিয়েছি। কিন্তু পারিনি…।’’ ছাত্রীর বিবরণ আরও ‘ভয়াবহ।’ তিনি লেখেন, ‘‘আমার মাথায় প্রচণ্ড জোরে আঘাত লাগে। কিন্তু তা-ও আমায় ছাড়েননি। আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাই। তখন আমায় হকি স্টিক দিয়ে মারধর করতে চান। এক সময়ে আমি নিজেকে ছাড়ানোর যুদ্ধ বন্ধ করে দিই। অর্ধমৃত অবস্থায় পড়েছিলাম। উনি আমায় ধর্ষণ করে উঠে চলে যান। ১০টা ৫০ মিনিটে যখন আমি কোনও রকমে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি, তখনও ‘জে’ আমায় হুমকির সুরে বলেন, এ সব যেন কাউকে না বলি। আমার ফোন ছিল ‘এম’-এর কাছে। আমি ফোনটা নিই। কলেজ থেকে বেরিয়ে আমার বাবাকে ফোন করি। বলি, আমায় যেন নিয়ে যেতে আসেন। বাবাকে সব বলি। কিন্তু পুলিশের কাছে যেতে আমার ভয় করছিল। আমি ‘জে’-র ক্ষমতা জানি। ওঁর ক্ষমতাকে ভয় পাই। কিন্তু আজ (২৬ জুন) আমি মনস্থির করেছি পুলিশকে জানাব। তাই পুরো ঘটনার কথা লিখলাম।’’ চিঠির শেষাংশে ‘নির্যাতিতা’ লিখেছেন, ‘‘আইনের ছাত্রী হয়ে আজ আমি নিজেই নির্যাতিতা। আমি নিজের জন্য বিচার চাইছি। দয়া করে ‘জে’, ‘এম’ এবং ‘পি’-এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।’’

কসবার ল’ কলেজে ধর্ষণে অভিযুক্ত ‘এম’-এর তৃণমূল যোগ আরও ‘স্পষ্ট’ হল। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং দক্ষিণ কলকাতার তৃণমূল সাংসদ মালা রায়ের সঙ্গেও অভিযুক্তের ছবি প্রকাশ্যে আসায়, তা নিয়ে শাসকদলকে বিঁধতে শুরু করেছে বিরোধীরা। অভিষেকের সঙ্গে অভিযুক্তের ছবিটি প্রকাশ্যে এসেছে। এ ছাড়াও অভিযুক্তকে যে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ছবিতে দেখা গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, তৃণমূল বিধায়ক দেবাশিস কুমার, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দক্ষিণ কলকাতা জেলা সভাপতি সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযুক্ত ‘এম’-এর ফেসবুক প্রোফাইলেও তৃণমূল ছাত্র পরিষদের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে নিজেকে তিনি দক্ষিণ কলকাতা জেলা টিএমসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। এ ছাড়া, তিনি সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের টিএমসিপি ইউনিটের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। নিজের পেশাগত পরিচয় হিসাবে উল্লেখ করেছেন আলিপুর আদালতে ‘ক্রিমিনাল লইয়ার’ বা ফৌজদারি আইনজীবী। অভিযোগ, বাকি দুই ধৃতও টিএমসিপির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘‘তৃণমূলের আশীর্বাদের হাত মাথার উপরে না থাকলে এত বড় সাহস হয় নাকি? এখন বেকায়দায় পড়ে তৃণমূল নানা ভাবে অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন কলেজে কলেজে কিছু অশুভ চক্র তৈরি হয়েছে। তারা নানা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বা ছাত্র সংসদে পদ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ছাত্রীদের নানা ভাবে শোষণ করছে। এই প্রত্যেকটা অশুভ চক্রের সঙ্গে তৃণমূল যুক্ত।’’ কসবাকাণ্ড রাজ্যের নারীসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘‘মমতার আমলে যে নারীসমাজ সুরক্ষিত নয়, তা দক্ষিণ কলকাতার কলেজের বোনের উপর নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার কমিশনার এখন মমতার সঙ্গে দিঘার রথের উৎসবে ব্যস্ত। নিরাপত্তা নিয়ে কাজের সময় কোথায়? রথের দিনে এমন বেদনার খবর শুনতে হচ্ছে। যত দিন মুখ্যমন্ত্রী, ফিরহাদ, জাভেদ খান (কসবার বিধায়ক) থাকবে, তত দিন চলবে।’’ বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। কলেজ সংসদগুলো তৃণমূলের দখলে। নির্বাচন করালে তৃণমূল তৃণমূলকে খুন করবে। সেই পরিস্থিতি এই সরকার দেখতে পারবে না। এখন সব দুষ্কৃতী মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এরকম বিকৃত মনস্ক, সামাজিক ব্যাধি সম্পন্ন মানুষ তৃণমূলের নেতৃত্ব দিচ্ছে।”

কসবা ল’ কলেজের ভিতরে ছাত্রীকে গণধর্ষণে অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতা মনোজিৎ মিশ্রকে আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, এফআইআরএ অভিযোগকারীনিকে দিয়ে অভিযুক্তের নাম মুছে এম লিখতে বাধ্য করেছে পুলিশ। যদিও মনোজিতের ফেসবুক পেজে একের পর এক তৃণমূল নেতার সঙ্গে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। এমনকী ‘কালীঘাটের কাকুর ভাইপো’র সঙ্গে মনোজিতের ছবি প্রকাশ করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। অভিযোগ, কসবা ল’ কলেজে মনোজিতের অনুমতি ছাড়া গাছের পাতাও নড়ত না। একাধিক তাবড় তৃণমূল নেতার হাত ছিল তাঁর মাথায়। সেই তালিকায় নাম রয়েছে টিএমসিপি সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের। একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে মনোজিতের। তার মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, কাউন্সিলর দেবাশিস কুমার। যদিও মনোজিতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল। মনোজিৎ তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পেজে নিজেকে দক্ষিণ কলকাতা টিএমসিপির সাধারণ সম্পাদক বলে উল্লেখ করলেও তৃণাঙ্কুরের দাবি, ২০২২ সালে যে জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল তাতে মনোজিতের নাম নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে ঘরের মধ্যে সান গ্লাস পরা এক যুবকের সঙ্গে আরেক যুবককে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে সানগ্লাস পরা যুবক বসে রয়েছেন একটি দামি চেয়ারে। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অন্য যুবক। এই ছবির ওপরে লেখা, কসবা ল’ কলেজের ধর্ষণকারীর সঙ্গে ‘কালীঘাটের কাকুর ভাইপো’।

পুলিশ সূত্রে খবর, গত ২৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিটের মধ্যে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কসবা থানায় তরুণী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পার্ক সার্কাসের কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ওই তরুণীর শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়। বয়ান রেকর্ড করা হয় সাক্ষীদের। এর পর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যায় তালবাগান ক্রসিংয়ের সামনে থেকে দু’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ তৃতীয় অভিযুক্ত ধরা পড়েন। শুক্রবার তাঁদের আলিপুরের আদালতে হাজির করানো হয়। আদালত চার দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। নির্যাতিতা নিজের অভিযোগপত্রে দাবি করেন, ইউনিয়ন রুম থেকে তিনি যখন পালানোর চেষ্টা করেন, তখন কলেজের মেন গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলেজের রক্ষীর কাছে তিনি সাহায্য চাইলে তিনিও নাকি সাহায্য করতে পারেননি। সেই গার্ডই এই ঘটনার সাক্ষী। পরে নির্যাতিতাকে গার্ডস রুমে নিয়ে যায় এম এবং পি। এদিকে তিন অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, জেব আহমেদ, প্রমিত মুখোপাধ্যায় গ্রেফতার হয়েছে ইতিমধ্যেই। দীর্ঘসময় ধরে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেছেন অভিযোগপত্রে। একটা সময় নাকি নির্যাতিতা প্রতিরোধ বন্ধ করে দেন। ১০টা ৫০ মিনিটে যখন ‘জে’ চলে যাচ্ছে, তখনও নাকি সে হুমকি দিয়ে যায় যাতে কেউ ‘বিষয়টা’ জানতে না পারে। তা সত্ত্বেও সাহস করে সেই নির্যাতিতা অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতার বিরুদ্ধে কসবা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কসবা ল’ কলেজে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর মেডিক্যাল রিপোর্ট সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ছাত্রীর গলায় কামড়ের দাগ রয়েছে। এদিকে যৌনাঙ্গ ক্ষত রয়েছে। এছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় মারধরের দাগও দেখা গিয়েছে। এই আবহে মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট যে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সেই অভিযোগকারী তরুণী। অভিযোগপত্রে সেই ছাত্রী লেখেন, ‘ইউনিয়ন রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল এম এবং পি। সেই সময় ‘জে’ তাঁকে ওয়াশরুমের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।’ ‘জে’ নাকি সেই ছাত্রীকে বলেছিল তাকে বিয়ে করতে। তাহলে নাকি টিএমসিপির পদ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেই অভিযুক্ত। এই ‘জে’ হল কলেজের অস্থায়ী কর্মী তথা কলেজেরই প্রাক্তনী। এদিকে নির্যাতিতা সেই প্রস্তাব খারিজ করার পরই শুরু হয় অত্যাচার।

‘এম’-এর ছবি নিয়ে বিতর্কে সার্থক বলেন, ‘‘যে অভিযুক্তদের সঙ্গে টিএমসিপির যোগের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা ছাত্র পরিষদের পদাধিকারী নন। আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’’ সংবাদমাধ্যমে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘তৃণমূলের কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাক বা না থাক, দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি। যার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, সে বর্তমানে কলেজের কর্মচারী। ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত নয়। যদি এই ঘটনা এবং অভিযোগ সত্যি হয়, তার বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ আইনানুগ ব্যবস্থা যাতে নেওয়া হয় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যাতে হয়, তার জন্য তৃণমূল ছাত্র পরিষদ লড়বে।’’ খাস কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুকে কলেজের ভিতর ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ। কসবা ল’ কলেজের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে কলেজেরই ১ তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নেতা ও ২ ছাত্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ পেয়ে ৩ অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কসবা ল’কলেজের এক ছাত্রী থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন যে তিনি গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গত বুধবার কলেজের ভিতরেই তাঁকে গণধর্ষণ করেছেন ৩ জন। তাদের মধ্যে ১ জন প্রত্যক্ষভাবে ধর্ষণে অভিযুক্ত। যিনি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও পেশায় আইনজীবী। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘটেছে এই ঘটনা। অভিযোগ পেয়েই তদন্তে নামে পুলিশ। তালবাগান এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ২ অভিযুক্তকে। তাদের জেরা করে মূল অভিযুক্তের খোঁজ পান তদন্তকারীরা। মনোজিত মিশ্র ওরফে ম্যাঙ্গো নামে ওই টিএমসিপি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। শারীরিক পরীক্ষার জন্য ছাত্রীকে চিত্তরঞ্জন মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান পুলিশ আধিকারিকরা। ঘটনার সময় কারা কলেজে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কী দেখেছেন তাও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। ধৃতদের শুক্রবার আদালতে পেশ করে হেফাজতে নিতে চলেছেন তদন্তকারীরা। এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। কসবার বিধায়ক জাভেদ খান রাজ্যের অন্যতম বরিষ্ঠ মন্ত্রী। সেখানেই ল’ কলেজের ভিতরে ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠায় রাজ্যে ফের নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল বলে দাবি করেছে বিরোধীরা।

কলেজে ভোট না হওয়াই প্রাক্তন টিএমসিপি নেতার দাপটের কারণ? কসবাকাণ্ডে উঠছে প্রশ্ন। যাদবপুরে ২০২০ সালে এবং প্রেসিডেন্সিতে ২০১৯ সালে শেষবার ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এক প্রাক্তন টিএমসিপি নেতার কলেজে এই দাপট কীকরে? অনেকে বলছেন, বছরের পর বছর কলেজগুলোতে ছাত্র ভোট না হওয়াই এর অন্য়তম কারণ। কসবায় আইন কলেজের ভিতরেই ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ। যা ঘিরে উত্তাল রাজ্য়। এই ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন ওই কলেজেরই প্রাক্তনী, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন নেতা ও তৃণমূলকর্মী মনোজিৎ মিশ্র। যার সঙ্গে তৃণমূলের তাবড় নেতা-মন্ত্রীর একাধিক ছবি সামনে এসেছে। কলেজের টিএমসিপি ইউনিটের অঘোষিত প্রধান এবং অত্য়ন্ত প্রভাবশালী। সবাই তার কথা শোনে। টিএমসিপি ইউনিটে সে সবাইকে পদ দেয়। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, কলেজে একজন প্রাক্তনীর এই দাপট, এই প্রভাব কী করে? তৃণমূল যোগের কারণেই কি এত প্রভাবশালী? শিক্ষাবিদদের মতে, এটা একটা কলেজের ছবি নয়। কলকাতা এবং রাজ্য়ের বিভিন্ন কলেজে গেলে দেখা যাবে প্রাক্তনীদের দাপাদাপির একই ছবি। আর এর এক এবং একমাত্র কারণ বছরের পর বছর, ছাত্র সংসদের নির্বাচন না করানো। জুটার সাধারণ সম্পাদক পার্থপ্রতিম রায় বলেন, “ছাত্র সংসদ ভোট ৮ বছর ধরে হচ্ছে না। এটা হলেই ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। প্রতি বছর বলা হয়, হবে হবে। আগে হলে এই সমস্যা হত না। বহিরাগতদের দাপট।” ২০১৭-র জানুয়ারিতে শেষবার রাজ্যের কলেজে ছাত্র ভোট হয়েছে। তারপর রাজ্যে দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন, দুটো লোকসভা নির্বাচন, একটা বিধানসভা নির্বাচন, একাধিক উপনির্বাচন, পুরসভার নির্বাচন হয়েছে। হয়নি শুধু ছাত্র ভোটটাই। যাদবপুরে ২০২০ সালে এবং প্রেসিডেন্সিতে ২০১৯ সালে শেষবার ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু, আর কোনও প্রতিষ্ঠানে ২০১৭ সালের পর ৮ বছর ধরে ছাত্র ভোট হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলেই কলেজে কলেজে তৃণমূলের বর্তমান থেকে প্রাক্তন ছাত্রনেতাদের এই অবাধ দাপট। মার্চ মাসে, এই সংক্রান্ত একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম বলেছিলেন, একটা অবস্থান নিতে হবে। ছাত্র নির্বাচন না হওয়ায় পড়ুয়াদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু, তারপরও ছাত্র সংসদের নির্বাচন কবে হবে, তার কোনও দিশা আপাতত নেই। বছরের পর বছর ধরে ছাত্রভোট না করানো নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিরোধীরা।

পুলিশ সূত্রে খবর, গত ২৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিটের মধ্যে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরের দিন কসবা থানায় তরুণী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পার্ক সার্কাসের কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ওই তরুণীর শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়। বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে সাক্ষীদের। এর পর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তালবাগান ক্রসিংয়ের সামনে থেকে অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ তৃতীয় অভিযুক্ত ধরা পড়েন। শুক্রবার তাঁদের আলিপুরের আদালতে হাজির করানো হয়। ১ জুলাই পর্যন্ত তিন জনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles