ইরানের তিন পরমাণু ঘাঁটিতে বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে পর পর আঘাত হেনেছে আমেরিকা। আর মার্কিন মুলুক তাদের এই অভিযানে অস্ত্র হিসাবে ভরসা করেছে জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার বাস্টার বম্বকে। এই বিশেষ বম্বের ক্ষমতা রয়েছে, মাটি ফুঁড়ে বহু গভীরে ঢুকে যাওয়ার। এই বম্ব ইরানের মাটিতে চার্জ করেছে মার্কিন বি২ স্টেলথ বোমারু বিমান। কতটা শক্তিধর এই বিমান? কী কী ক্ষমতা রয়েছে? দেখে নেওয়া যাক। ইরানের ৩ পরমাণু কেন্দ্রে মোট ৬ টি জিবিইউ৫৭ বা ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনেট্রার’ বোমা ফেলেছে আমেরিকা। এই তথ্য দিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। সাধরণ চিরাচরিত ঘরানার বোমার নিরিখে এই জিবিইউ-৫৭ বোমা মার্কিন অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। এর ক্ষমতা রয়েছে মাটি ফুঁড়ে ২০০ ফুট গভীরে যাওয়ার। আর ওপরে কংক্রিট থাকতলে এই বোমা ৬০ ফুট পর্যন্ত গভীরে গিয়ে ধ্বংস করে। ফলত এই বোমা দিয়ে মাটির নিচের বাঙ্কার কিম্বা মাটির নিচে শত্রুর দুর্ভাদ্য ঘাঁটিতে হানা দেওয়া কোনও বড় কথা নয়! ইরানের কিউওম শহরের কাছে সেদেশের পরমাণু ঘাঁটি ফরডো। বহু কাল ধরেই জল্পনা রয়েছে, সেখানে ইরানের সবচেয়ে কঠিনতম ঘাঁটি রয়েছে বলে। পাহাড়ের গায়ে এই কেন্দ্রের অবস্থান। যা কার্যত ভৌগলিক দিক থেকে দুর্ভেদ্য। ফরডোতে ৬০ থেকে ৯০ মিটার পর্যন্ত ছিল পাথুরে আস্তরণ। আর সেখানের হামলায় এই বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। যার প্রতিটির ওজন ৩০ হাজার পাউন্ড। তথ্য বলছে, মার্কিন নৌসেনার সাবমেরিন থেকে ৩০ টি তোমহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইলও ইরানকে টার্গেট করে ছোঁড়া হয়। যা ইরানের নাতানজ ও এসফাহানকে নিশানা করে। এমওপি বম্ব বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা। যা জিপিএস দিয়ে চলে। আর তা তৈরি করেছে বোয়েইং। এর দৈর্ঘ্য ২০.৫ ফুট। ৩১.৫ ইঞ্চি চওড়া। থাকে, ৫,৩০০০ পাইন্ডের বিস্ফোরক। এর আগের প্রজন্মের বোমা বিএলঅই-১০৯র চেয়ে ১০ গুণ বেশি আঘাতের ক্ষমতা রয়েছে এই বোমার। প্রতিটি বোমারু বিমান বি২ দুটি করে এমন বোম্ব নিয়ে যেতে পারে। বি২ স্টেলথ বোমারু বিমান এই বোমা নিয়ে যায় ইরানে। এই বোমারু বিমানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, একে সহজে লক্ষ্য করা যায় না। ব়্যাডারের চোখে ধুলো দেওয়ার ক্ষমতা এর সাংঘাতিক ভালো। সব অক্ষাংশে চলতে পারে। বিশ্বের যেকোনও আকাশপথ প্রতিরক্ষাকে এটি ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। সাধারণ ব়্যাডারে এটি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ব়্যাডার-অ্যবসরভেন্ট উপাদান থাকে। ৬০০০ নউটিক্যাল মাইল দূরে গিয়ে এই বিমান দাপট দেখা পারে। এই পথের মাঝে জ্বালানিও তাকে ভরতে হয় না।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নাতানজ়, ফোরদো এবং ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা চালাতে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ এবং ‘বি ২ বম্বার’-কে কাজে লাগানো হয়েছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন বলছে, ইরানের ফোরদো পরমাণুকেন্দ্রে ছ’টি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ফেলা হয়েছে। জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) নামেও পরিচিত এই বোমা। তা ফেলার জন্য বি ২ স্পিরিট বোমারু বিমানকে ব্যবহার করেছে আমেরিকা। যে বিমান ১৫ টন ওজনের বোমা বহনে সক্ষম। ইরানে হামলা চালাতে এই দু’টি ঘাতক অস্ত্রের ব্যবহারে উল্লসিত ট্রাম্প। হামলার সেই মুহূর্তকে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি এই বার্তাও দিতে চেয়েছেন যে, প্রয়োজনে এই হামলার তেজ আরও বাড়াতে প্রস্তুত আমেরিকা। শুধু ‘বাঙ্কার বাস্টার’ই নয়, আমেরিকার নৌবাহিনীও টোমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানের দু’টি পরমাণু কেন্দ্র নাতানজ় এবং ইসফাহানে হামলা চালিয়েছে। ‘বাঙ্কার বাস্টার’, যার আর এক নাম জিবিইউ-৫৭। বলা হয়, এটি আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা। মাটির ২০০ ফুট নীচে থাকা লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করে তা ধুলিসাৎ করে দিতে সক্ষম। এক একটি বোমার ওজন প্রায় ১৪ হাজার কেজি। মার্কিন বায়ুসেনার এই অস্ত্র ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার অনায়াসে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। এই বোমাটি শক্তিশালী এবং অতি-সহনশীল ইস্পাতের আবরণে মোড়া। ফলে পাথর বা কংক্রিটের তৈরি ভূগর্ভস্থ কোনও পরিকাঠামোকে অনায়াসে ধ্বংস করতে পারে। ২৪০০ কেজি বিস্ফোরকে ঠাসা পেলোড বহন করতে সক্ষম এই বোমা। বোমার ওজন ১৩,৬০৭ কেজি। দৈর্ঘ্য ২০.৭ ফুট। আমেরিকার বায়ুসেনার মতে, এই বোমাটি জিপিএস-গাইডেড। এই বোমা ফেলার জন্য একমাত্র বি ২ স্পিরিট স্টেল্থ বোমারু বিমানই ব্যবহার করা হয়। সামরিক অভিযানের জন্য এক বারে একটি বা দু’টি এই বোমা বহন করতে পারে বি ২ বম্বার। বিএলইউ-১০৯ এবং জিবিইউ-২৮, এই দুই বোমার উত্তরসূরি জিবিইউ-৫৭ এমওপি। বি ২ স্পিরিট স্টেল্থ বম্বার।আমেরিকার অত্যাধুনিক বোমারু বিমানগুলির মধ্যে একটি। ‘বাঙ্কার বাস্টার’-এর মতো বিশাল ওজনের বোমাগুলি বহন করা এবং হামলা চালানোর জন্যই এই বিমান তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকার কাছে ১৯টি বি ২ বম্বার (অপারেশনাল) রয়েছে। বাদুড়ের মতো দেখতে এই বিমান শত্রুপক্ষের রেডারে ধরা পড়ে না। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে নর্থরপ গ্রুম্যান এই বিমান তৈরি করে। এক বার জ্বালানি ভরলে ১১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এই বিমান। ১৮ হাজার কেজিরও বেশি পেলোড বহন করতে পারে বি ২ বম্বার।
ইরানকে বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাস মদতকারী রাষ্ট্র বলে ব্যাখ্যা করে, সেদেশের বুকে ৩ পরমাণু কেন্দ্রে মার্কিন হামলা নিয়ে বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই হামলায় ইজরায়েলকে পাশে পাওয়া নিয়ে সেদেশ ও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুরও ভূয়সী প্রশংসা করেন ট্রাম্প। আর এরই সঙ্গে ইরানকে তুমুল হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আমেরিকায় জাতীর প্রতি ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা ধ্বংস করা এবং বিশ্বের এক নম্বর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দ্বারা সৃষ্ট পারমাণবিক হুমকি বন্ধ করা। এর আগেই এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন তাঁর দেশ, ইরানের বুকে ফরডো, নাতানজ, ইসফাহানে হামলা করেছে। সেখানের পারমাণিক কেন্দ্রে চালিয়েছে হামলা। তবে এরপর ইরান শান্তির পথে না এলে, ফল যে ভালো হবে না, তার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, আমি বিশ্বকে জানাতে পারি যে এই হামলাগুলি ছিল এক অসাধারণ সামরিক সাফল্য। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে।’ এরসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান এবার উচিত শান্তির পথে আসা। যদি তারা সেটা না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় হামলা হবে, আর তা অনেক সহজ হবে।’ তেলের দেশ হিসাবে প্রসিদ্ধ ইরানকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই মার্কিন মুলুক থেকে বহু হুঁশিয়ারি এসেছে। আর আজ, রবিবার, রবিবার ইরানে মার্কিন সেনার হামলার পর ট্রাম্প বলেন, এটা চলতে পারে না। হয় শান্তি আসবে, নয়তো ইরানের জন্য ট্র্যাজেডি হবে, যা গত আট দিনে আমরা যা দেখেছি তার চেয়েও অনেক বড়। মনে রাখবেন, এখনও অনেক টার্গেট বাকি আছে। এদিনের বক্তব্যেও ট্রাম্প জানিয়ে দেন যে তাঁর সরকার,ইরানের কোন কোন জায়গায় আঘাত এনেছে। ট্রাম্প বলেন, আমরা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনার উপর আমাদের অত্যন্ত সফল আক্রমণ সম্পন্ন করেছি, যার মধ্যে রয়েছে ফোরদো, নাতানজ এবং এসফাহান।’ তিনি জানিয়েছেন পরমাণু কেন্দ্রগুলি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধ বিমান বি২ বম্বারকে সহজে দেখা যায় না। সাধারণ ব়্যাডার দিয়ে এই প্লেনকে কিছুতেই বোঝা যায় না। এর ওড়াফ নক্সা, ব়্যাডারের চোখে ধুলো দেওয়ার কায়দা, এই বিমানকে আলাদা রকম করে শক্তিশালী করেছে। এটি ৬ হাজার নউটিক্যাল মাইলস পর্যন্ত এক ধাক্কায় যেতে পারে। তাতে মাঝে কোনও জ্বালানি ভরার দরকার পড়ে না।
পাকিস্তান ‘২০২৬ নোবেল শান্তি পুরস্কার’র জন্য মনোনীত করেছিল। নোবেল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্যও রাখেন ট্রাম্প। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে হামলা আমেরিকার। পরমাণু অস্ত্র ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের মাঝেই এবার মার্কিন যুদ্ধবিমান হানা দিল ইরানের বুকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে যে বার্তা দিয়েছেন, তা বেশ ইঙ্গিতবহ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল নামে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন, যেখানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে মার্কিন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরানে মার্কিন হামলার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে প্রথম পোস্টে লেখেন, আমরা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা, যার মধ্যে ফোরডো, নাতানজ এবং এসফাহান রয়েছে, আমাদের অত্যন্ত সফল আক্রমণ সম্পন্ন করেছি। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে সাফ লিখছেন, সমস্ত বিমান এখন ইরানের আকাশসীমার বাইরে। প্রাথমিক স্থাপনা, ফোরডোতে বোমার একটি পূর্ণ পেলোড ফেলা হয়েছে। সমস্ত বিমান নিরাপদে বাড়ি ফেরার পথে। পোস্টে একজায়গায় সাফ লেখা রয়েছে, ফরডো শেষ। স্থানীয় সময় রাত ১০ টা নাগাদ ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন ট্রাম্প। আমেরিকার স্থানীয় সময় রাত ১০ টা নাগাদ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। ট্রাম্প বলেছেন যে অভিযানে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে তবে মোতায়েন করা অস্ত্রের ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন এখনও আরও তথ্য প্রকাশ করেনি। ইরানের তরফে আগেই মার্কিন মুলুককে সতর্কতা জানানো হয়। ইরানের বিদেশমন্ত্রকের তরফে মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, আমেরিকান হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলে সর্বাত্মক যুদ্ধের সূত্রপাত করবে। ইরানে স্থলসেনা মোতায়েনের বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর এই বিষয়ে কোনও আগ্রহ নেই। সব মিলিয়ে আপাতত ইরানের ৩ জায়গায় আমেরিকা হানা দিয়েছে বলে খবর। এই পরিস্থিতিতে ইরান কোন পদক্ষেপ করে, বা তেহরানের নীতি কোনপথে হাঁটে সেদিকে তাকিয়ে দুনিয়া।




