রাজনীতিতে যোগদানের সম্ভাবনা। জোর জল্পনা। বারবার একই কথা। রাজ্যে গত বিধানসভা ভোটে শোনা গিয়েছিল, তাঁকে ‘মুখ্যমন্ত্রী-মুখ’ করেই ভোটের ময়দানে নামতে পারে বিজেপি। শেষ পর্যন্ত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই সমস্ত জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন। আসন্ন বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে আবার নতুন করে জল্পনা তৈরি। জবাব দিলেন ‘মহারাজ’। সৌরভকে প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে চান কি না। জবাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রাক্তন সভাপতি সৌরভ স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে বললেন, ‘‘আমার কোনও ইচ্ছে নেই।’’ সৌরভের কাছে পরের প্রশ্ন, তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ দেওয়া হলে কি তিনি রাজনীতিতে যোগ দেবেন? তার জবাবেও সৌরভ বলেন, ‘‘আমার কোনও ইচ্ছে নেই।’’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ভারতীয় ক্রিকেটের প্রাক্তন অধিনায়ক, প্রাক্তন বিসিসিআই প্রধান, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বড় দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে স্পেন সফরে সঙ্গী হয়ে গিয়েছিলেন। লন্ডনেও মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফরে তিনি ও স্ত্রী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে এক মঞ্চ ভাগ করে প্রবল সমালোচনারও সম্মুখীন হন। অনেকের মনে হয়েছিল হয়তো শাসক দলে যোগ দেবেন।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ক্রিকেটার থেকে ক্রিকেট প্রশাসক হওয়া সৌরভ খেলার সঙ্গে জুড়ে থাকতে আগ্রহী। ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার সুযোগ পেলে, সেই বিষয়ে যথেষ্টই আগ্রহী, কোনওরকম দ্বিধা না করেই সেটা জানিয়ে সৌরভ বলেন, আমি এই বিষয়ে কখনও তেমন ভাবিনি কারণ আমি খুব পরপরই ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৩ সালে ক্রিকেট খেলা শেষ করি আমি, তারপর বোর্ড সভাপতি হই। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা ভবিষ্যতই বলবে। আমার বয়স তো এখন সবে ৫০ (৫৩), তাই এখনও খানিকটা সময় রয়েছে। দেখা যাক। কিন্তু হ্যাঁ, এইরকম কোনও সুযোগ পেলে আমি আগ্রহী। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। বর্তমান কোচ গৌতম গম্ভীরের প্রসঙ্গে অবশ্য বেশ আশাবাদী। গম্ভীর শুরুটা মন্থরভাবে করলেও তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিখে, ভুলত্রুটি শুধরে আরও উন্নত হবেন বলেই আশাবাদী সৌরভ বলেন,গৌতম ভালই কাজ করছে। নিউজ়িল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হেরে ওর শুরুটা মন্থরভাবে হয়েছিল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছে। ইংল্যান্ড সিরিজ়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে ওর জন্য। মাত্র এক বছরই হয়েছে দায়িত্ব নিয়েছে। আমার তরফে ওর জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল। অস্ট্রেলিয়া সফরে ও কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল বটে। কিন্তু বাকিদের মতো ও শিখবে, আরও উন্নত হবে।
গত বিধানসভা ভোটের সময় সৌরভের রাজনীতিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর স্ত্রী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘ও (সৌরভ) যে পিচেই খেলুক না কেন, তাতেই সেরা হয়। হয়তো স্বাভাবিক অবস্থা থেকে শুরু করে, কিন্তু ঠিক শীর্ষে পৌঁছয়। যদি রাজনীতিতে যোগ দেয়, তা হলে আশা করছি, হি উইল ফিনিশ দ্য টপ।’’ ২০২১ সালের আগে সৌরভকে সরাসরি বাংলার বিধানসভা ভোটে তাদের ‘মুখ’ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিজেপি। ওই বছর ব্রিগেডে নরেন্দ্র মোদীর জনসভায় গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে তিনি পদ্মশিবিরে যোগদান করতে পারেন বলেই শোনা গিয়েছিল। সব জল্পনা জল্পনাই। কখনওই বাস্তব রূপ নেয়নি। সৌরভের ঘনিষ্ঠদের দাবি, ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনে লড়তে চান না। তবে বিজেপির হয়ে প্রচার করতে পারেন, যদি পরে বিজেপি তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠায়। অমিত শাহ সেই প্রস্তাব মানতে রাজি হননি। বিজেপির শীর্ষনেতৃত্ব চেয়েছিলেন, সৌরভ বিজেপির হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বিরুদ্ধে ভোটে লড়ুন। প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনও পক্ষই কখনও মুখ খোলেনি। সৌরভ-বিজেপির সম্পর্ক প্রকাশ্যে আন্তরিক। বিজেপির রাজ্যনেতাদের নিয়ে সৌরভের বাড়িতে নৈশভোজে গিয়েছিলেন শাহ। সৌরভের সঙ্গে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কও মসৃণ। মমতাও সৌরভের বাড়িতে গিয়েছেন বেশ কয়েক বার। সাম্প্রতিক সময়ে মমতার সরকারের অধিকাংশ বাণিজ্য সম্মেলনেও সৌরভকে দেখা যায়। রাজনীতিতে আসতে ইচ্ছুক নন, তা আবার জানিয়ে দিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক।
ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের উপর আস্থা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। সুযোগ পেলে নিজেও দায়িত্ব নিতে চান। ক্রিকেট প্রশাসক হিসাবে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা সৌরভ আবার ফিরতে চান ভারতীয় দলের সাজঘরে। সৌরভ জানান, ভারতীয় দলের কোচ হতে তিনি আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘‘অবসর নেওয়ার পর কিছু দায়িত্ব পালন করেছি। সিএবির সভাপতি হয়েছি। বিসিসিআই সভাপতি হয়েছি। তখন সময় পাইনি। জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। আমার বয়স এখন ৫০। আমি কোচিংয়ের জন্য প্রস্তুত। দেখা যাক কী হয়। ও ভালই কাজ করছে। শুরুটা হয়তো দারুণ হয়নি। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে সিরিজ় হারতে হয়েছে। তবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছে। এখন ইংল্যান্ড সিরিজ় চলছে। এই সিরিজ়টা গম্ভীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। খুব কাছ থেকে তো দেখিনি। তবে ক্রিকেট নিয়ে গম্ভীর ভীষণ আবেগপ্রবণ। একসঙ্গে কাজ করিনি। তাই ওর কৌশল সম্পর্কে বলা সম্ভব নয়। একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মানুষ হিসাবে গম্ভীর দুর্দান্ত। আমাকে বা দলের সিনিয়রদের শ্রদ্ধা করত। গম্ভীরকে একই রকম আবেগপ্রবণ মনে হচ্ছে। একদম সোজাসাপ্টা। সব ব্যাপারে স্বচ্ছ। সমাজ, দল, ক্রিকেটার— সব বিষয়ে কথা বলে। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় খুব সোজাসাপ্টা মানুষ। ওর জন্য সব সময় আমার শুভেচ্ছা থাকবে। সকলের মতো গম্ভীরও শিখবে এবং এগিয়ে যাবে।’’ রবি শাস্ত্রী, অনিল কুম্বলে, রাহুল দ্রাবিড়েরা ভারতীয় দলের কোচ হয়েছেন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই ভারতীয় কোচদের উপরই আস্থা রাখে। সৌরভ আগেও ভারতীয় দলের কোচ হওয়া নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এখনও আগ্রহী ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক। সৌরভ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসির ক্রিকেট কমিটির প্রধান। আইপিএলের দল দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গেও যুক্ত মহারাজ।

এদিকে, হেডিংলি টেস্টের তৃতীয় দিনেও কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলতে নামল ভারত এবং ইংল্যান্ড। শুক্রবার অর্থাৎ টেস্টের প্রথম দিন আহমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানিয়ে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিলেন শুভমান গিল-বেন স্টোকসরা। তৃতীয় দিনে কেন কালো ব্যান্ড দেখা গেল দুই দলের ক্রিকেটারদের হাতে। রবিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন পেসার ডেভিড লরেন্স। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতেই তৃতীয় দিনের খেলার শুরুতে এক সারিতে দাঁড়ান দুই দলের ক্রিকেটাররা, হাতে কালো আর্মব্যান্ড। হাততালি দিয়ে সদ্যপ্রয়াত লরেন্সের জীবনকে অভিনন্দন জানান দুই দলের ক্রিকেটাররা। সেই ছবি পোস্ট করা হয় বিসিসিআইয়ের এক্স হ্যান্ডেলে। ৬১ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন লরেন্স। ১৯৬৪ সালে গ্লসটারশায়ারে তাঁর জন্ম। ১৯৮৮ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম টেস্ট খেলেন তিনি। যদিও জাতীয় দলের জার্সিতে খুব বেশি খেলতে পারেননি, চোটের কারণে। মাত্র পাঁচটি টেস্ট এবং একটি ওয়ানডে’তে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন। ১৯৯১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরের বছরই হাঁটুতে বড়সড় চোট পেয়েছিলেন লরেন্স। চোটেই শেষ হয়ে যায় লরেন্সের কেরিয়ার। ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যানের নিরিখে লরেন্সের অবদানকে বিবেচনা করা যায় না। ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার হিসাবে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন লরেন্স। তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের তরুণ প্রজন্ম। তবে গতবছর থেকেই লরেন্সের শরীরে একাধিক রোগ বাসা বেঁধেছিল। চলতি বছরে ইসিবির অনারারি লাইফ ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। অবশেষে ঘুমের দেশে চলে গেলেন লরেন্স। তাঁর প্রয়াণে শোকাহত ক্রিকেটমহল। জশপ্রীত বুমরাহ নেন ৫ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ভারতের ৪৭১ রানের জবাবে ইংল্যান্ডের ইনিংস থামে ৪৬৫ রানে। দ্বিতীয় দিনের শেষ ওভারে বুমরাহের বাউন্সার পুল করতে গিয়ে আউট হন হ্যারি ব্রুক। টিম ইন্ডিয়ার ক্রিকেটাররা সেলিব্রেশনও করতে শুরু করেন। ঘটনাচক্রে সেটা নো বল ছিল। তৃতীয় দিনও তাঁর ক্যাচ ফসকান যশস্বী। তখন ইংরেজ ব্যাটারের রান ৮২। প্রথমে বেন স্টোকস ২০ কে সঙ্গে নিয়ে ৪১ এবং জে স্মিথ ৪০ কে সঙ্গে নিয়ে ৭৩ রানের পার্টনারশিপ গড়েন হ্যারি ব্রুক। স্মিথ আউট হতেই বাদ সাধে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণর শর্ট বল। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে থামে ২৬ বছরের ইংরেজ ক্রিকেটারের ইনিংস। বর্তমান বিশ্বের সেরা বোলার হিসাবে গণ্য করেন অনেকেই। ফর্ম্যাট, বলের রং, পরিবেশ, কোনও কিছুই যেন তাঁর ওপর প্রভাব ফেলে না। ইংল্যান্ডে প্রথম টেস্টে মাঠে নেমে যশপ্রীত বুমরা প্রমাণ করলেন টিম ইন্ডিয়ার সম্পদ। প্রথম ইনিংসে পাঁচ পাঁচটি সাফল্য। টেস্ট কেরিয়ারে ১৪তম বার পাঁচ উইকেট নিলেন ভারতের তারকা ফাস্ট বোলার।



