‘অন্য দল থেকে অফার…,’ বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক মনোজ তিওয়ারি। গতবারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। এবারের নির্বাচনে তিনি টিকিট না পাওয়ায় অবাক হয়েছিলেন প্রায় সকলেই। আর এবার নিজের দল তৃণমূলের উপর ক্ষোভ উগরে দিলেন মনোজ তিওয়ারি। টিকিট পাচ্ছেন না বুঝতে পেরেই কি তবে দাঁড়াতে চাননি মনোজ? প্রশ্ন উঠছে তা নিয়ে। হাওড়ার শিবপুর থেকে মনোজের পরিবর্তে এবার বালির বিধায়ক রানা চ্যাটার্জিকে প্রার্থী করেছে দিদির দল। এ বার প্রার্থী না হতে পারে নিয়ে অভিমান থেকে ক্ষোভ ঝরে পড়ল মনোজের গলায়। তৃণমূল প্রার্থী না করায় অন্য দলগুলির কাছে তার কাছে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন মনোজ তিওয়ারি। মনোজ বলেন, অন্য দল থেকে অফার আছে। তবে এখনও কিছু ঠিক করিনি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।”গত বিধানভা ভোটে শিবপুর থেকে ৩২ হাজারের বেশি ভোটে বিজেপির রথীন চক্রবর্তীকে হারিয়ে ছিলেন। অভিমানী মনোজ আরও বলেন, খারাপ তো লাগবেই। পাঁচ বছর আগে একদিন প্র্যাকটিসের সময় অনেক মিসড কল দেখি। পরে ফোন করলে জানানো হয়, দিদি কথা বলতে চান। তখন যেভাবে বিরোধী নেতারা দিদিকে আক্রমণ করছিলেন, তা আমাকে আরও জেদি করে তোলে।”মনোজের গলায় অভিমানের সুরও স্পষ্ট। তাঁর কথায়, “আমি খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি। রাজনীতিতে এসে মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। আমার এলাকার মানুষ জানেন, আমি কী কাজ করেছি।’ ২০২১ সালে ব্যাটিং প্র্যাকটিশ করার সময় ১৩ তেকে ১৪টা মিসড কল দেখে পরে ফোন করেছিলেন। এরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা শুনে চমকে গিয়েছিলেন। তারপরই রাজনীতিতে আচমকা যোগদান, এরপর বিধায়ক, আর ভোট জিতে রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও হয়ে যান। পুরোনো কথাও জানাতে ভুললেন না মনোজ। শিবপুরে কঠিন লড়াই। বিজেপি প্রার্থী করেছে রুদ্রনীল ঘোষকে। ২০২১-এর নির্বাচন জেতার পর, বারবার অরূপ রায়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময় গোষ্ঠী দ্বন্দে বারবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে শাসক দলকে। প্রকাশ্যে হাতাহাতিও হয়েছে। ফলে ক্ষোভ বাড়ছিল। সে কারণেই তাঁকে প্রার্থী না করার সিদ্ধান্ত তৃণমূলের। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী রথীন চক্রবর্তীকে ৩২,৬০৩ ভোটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিধানসভায় পা রেখেছিলেন বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক। জয়ের পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়ে বড় চমক দিয়েছিলেন। সেই কঠিন লড়াই জয়ের পর এবার নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে কিনা, তা নিয়েই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। মনোজ অবশ্য একা নন। এবার টিকিট পাননি রাজ্যের আরও ৩ বিদায়ী মন্ত্রী। তাজমুল হোসেন, বিপ্লব রায়চৌধুরী ও জোৎস্না মান্ডি। বাদ পড়েছেন ৭৪ জন বিধায়কও। যেমন, বেলেঘাটায় এবার টিকিট পাননি পরেশ পাল। জোড়সাঁকোয় নেই বিদায়ী বিধায়ক বিবেক গুপ্ত। বারাসতেও চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর বদলে সব্যসাচী দত্ত।
রাজনীতিতে মনোজের আগমন খুব বেশি দিন আগে নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বর্ষীয়ান বিধায়ক জটু লাহিড়ীকে সরিয়ে ক্রিকেটার মনোজকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। টিকিট না পেয়ে বিজেপিতে চলে যান জটু। তাতে মনোজের জয় আটকায়নি। বিজেপির প্রার্থী রথীন চক্রবর্তীকে ৩২,৬০৩ ভোটে হারিয়ে জিতেছিলেন মনোজ। তিনি প্রথম বার জেতার পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোজকে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। ক্রিকেট জগতের সঙ্গে যেমন বলিউডের যোগসূত্র রয়েছে ঠিক তেমনই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ক্রিকেটারদের মাঝেমধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করতে দেখা যায়। মহম্মদ আজহারউদ্দিন থেকে গৌতম গম্ভীর, ইউসুফ পাঠান ভারতীয় রাজনীতিতে পা রেখে আরও জনপ্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন ইউসুফ। অন্যদিকে বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক মনোজ তেওয়ারিও বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিমন্ত্রী তিনি। কিন্তু তাও আসন্ন বিধানসভা ভোটের টিকিট পেলেন না। কেন বঞ্চিত হলেন তা নিয়ে আলোচনা চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মনোজ তিওয়ারি ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে বাংলাকে এনে দিয়েছেন অসংখ্য সম্মান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এবং আইপিএলেও নিজের ছাপ ফেলার চেষ্টা করেছিলেন মনোজ। দেশের হয়ে খেলেছেন ১২ টি ওডিআই ম্যাচ ও ৩ টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স সহ দিল্লি এবং পাঞ্জাব ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। এই টুর্নামেন্টে ৯৮ ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে ১৬৯৫ রান। ২০২৪ সালে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এর আগে ২০২১ সালে শিবপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীকে ৩২ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হন। এমনকি মনোজ তেওয়ারিকে ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। এই বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট দুই দফায় অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফা রয়েছে ২৩ মার্চ এবং ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফার ভোট রয়েছে। তৃণমূলে সম্পূর্ণ প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত। তালিকায় বর্তমানে বাংলা দলের বোলিং কোচ শিবশঙ্কর পাল জায়গা পেয়েছেন। তুফানগঞ্জ থেকে লড়াই করবেন। কিন্তু মনোজ তিওয়ারি টিকিট পেলেন না। শিবপুরের বিধায়ক ছিলেন। সেখানে প্রার্থী করা রানা চট্টোপাধ্যায়কে। চমক ছিল শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। মনোজ তিওয়ারির মতো মন্ত্রী নেতার টিকিট না পাওয়া রাজনৈতিক মহলে বেশ চর্চার বিষয়। শিবপুরে তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে বিজেপি লড়াইয়ে নামিয়েছে তারকা প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষকে। পরিস্কার আউট মনোজ তিওয়ারী! তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে মন্ত্রী আউট হওয়ায় ক্ষুণ্ণ। সক্রিয় বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও শিবপুরে টিকিট পেলেন না কেন? এই বিষয়ে নিয়ে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শশলততণ শুরু জোরকদমে। জনমতের ভিত্তিতে উঠে আসছে দশ কারণ —
প্রথম কারণ : কলকাতা লিওনেল মেসিকে নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সেই সময় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মনোজ তেওয়ারি। এই কারণেই কি টিকিট পেলেন না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে এক অংশ। সেই সময় মনোজ তেওয়ারি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবিতে যাদের মেসির পাশে দেখলাম তাদের প্রত্যেককেই এই ঘটনার দায় নিতে হবে। ঘটনাচক্রে মেসিকে এক্কেবারে বগলদাবা করে রেখেছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী ছেড়ে কথা বলার পাত্র নন বলে ধারনা ক্রীড়ামহলের। এককথায় বাংলার বিনোদন জগতে যেমন এক ভিলেন ‘বিশ্বাস’-এ বারংবার আহত বাংলা চলচিত্রের সুপারস্টার নায়ক দেব। সেরকমই, আরও এক ‘বিশ্বাস’-এ ক্লিন বোল্ট ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারী।
দ্বিতীয় কারণ : টিকিট না পাওয়া ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি। মন্ত্রী পরিচিত ছিলেন শিবপুর এলাকার ‘দাম্ভিক হামবড়া’ বলে। এ হেন পরিচিতিতে বিভিন্ন মহল বিব্রত। নানান অভিযোগে অভিযুক্ত মনোজ তিওয়ারীকে ছেঁটে ফেলল তৃণমূল! প্রত্যাশামতোই সকল স্তরে পরিচিত‘দাম্ভিক হামবড়া’ মনোজ তিওয়ারীকে ছেঁটে ফেলে তৃণমূল! গতবার এই আসনে ঘাসফুলের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি। হাওড়ার শিবপুরের মনোজ তিওয়ারীকে নিয়ে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি থেকে বিভিন্ন তোলাবাজির অভিযোগও রয়েছে মনোজের বিরুদ্ধে। এছাড়াও অবাঙালিদের বেশী বিশ্বাস করায় ক্ষিপ্ত শিবপুরের বাঙালি সম্প্রদায় বলেও অভিযোগ। মনোজ-সহকারীর উপর অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন বলেও অভিযোগ। মিডিয়ার প্রথিতযশা ব্যাক্তিকে প্রকট হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ ছিল। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকেও কটাক্ষ। ইত্যাদি অভিযোগের বিস্তর পাহাড়। শেষমেশ প্রত্যাশামতোই বাদ পড়লেন প্রাক্তন ক্রিকেটার বলে সূত্রের খবর। গত নির্বাচনে বিজেপির রথীন চক্রবর্তীকে হারালেও প্রশ্ন উঠছে, রুদ্রনীলকে ‘সেফ জোনে’ খেলতে নামিয়ে গেরুয়া শিবিরের মুখে হাসি ফোটাতে সচেষ্ট? উত্তর মিলবে ৪ মে। রুদ্রনীল বলছেন, “মা-কাকিমারা ঘরের ছেলেকে ভোট দেবেন।
তৃতীয় কারণ : বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে বিধায়কদের একাংশ দলীয় ‘হুইপ’ অমান্য করায় কড়া পদক্ষেপ নেয় তৃণমূল পরিষদীয় দল। কিন্তু হুইপ অমান্যকারী বিধায়কদের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে রাজ্যের এক মন্ত্রীর অনুপস্থিতির বহর দেখে কার্যত স্তম্ভিত তৃণমূল পরিষদীয় দল। বাজেট অধিবেশনের জোড়া পর্ব তো বটেই, গত বছর শীতকালীন অধিবেশনেও যোগ দেননি শিবপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। বস্তুত, শেষ কবে এই প্রাক্তন ক্রিকেটারকে বিধানসভায় দেখা গিয়েছে, তা মনেও করতে পারছেন না সতীর্থ বিধায়কেরা। মনোজের এ-হেন আচরণে ‘ক্ষুব্ধ’ তৃণমূল পরিষদীয় দলের একাংশ। সাধারণত শাসক বা বিরোধীদলের কোনও বিধায়ক বিধানসভার অধিবেশন বা কোনও কমিটির বৈঠকে হাজির হতে না-পারলে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেন। কিন্তু বিধানসভার সচিবালয় সূত্রে খবর, মনোজের তরফে তেমন কিছু করা হয়নি। বিরক্ত দলের সিংহভাগ।
চতুর্থ কারণ : সেই সূত্রেই প্রশ্ন উঠেছিল, মনোজ কি আর মন্ত্রী থাকতে চান না? বস্তুত, অনেকে এমন প্রশ্নও তুলছেন যে, মনোজ কি আদৌ রাজনীতিতে থাকতে চান? মন্ত্রিত্ব, রাজনীতিতে থাকতে চান না বলেই তিনি এ ভাবে মাসের পর মাস বিধানসভার অধিবেশনে অনুপস্থিত থেকে দল এবং সরকারের কাছে ‘বার্তা’ পাঠাতে চাইছিলেন? তাঁর অনুপস্থিতির কারণ জানতে মনোজকে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর-সহ ফেসটাইম এবং হোয়াট্সঅ্যাপে একাধিক বার ফোন করা হলেও জবাব মেলেনি। জবাব আসেনি তাঁকে মোবাইলে পাঠানো হোয়াট্সঅ্যাপ এবং টেক্সট মেসেজেরও। মনোজের তরফে কোনও জবাব এলে তা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে বলেও জানা গিয়েছিল। মনোজের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি তৃণমূলের কোনও বিধায়কও।
পঞ্চম কারণ : সাম্প্রতিক কালে হাওড়ার রাজনীতিতে মনোজ কয়েক বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁর সঙ্গে বিবাদ বেধেছে হাওড়া পুরসভার প্রশাসক সুজয় চক্রবর্তী এবং বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা তথা মন্ত্রী অরূপ রায়ের। শিবপুরে একটি মেলায় পার্কিং নিয়ে মনোজ-সুজয়ের মধ্যে গোলমাল হয়েছিল। দু’পক্ষ ধস্তাধস্তিতেও জড়িয়ে পড়েছিল। বিবাদ মেটাতে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে যেতে হয়েছিল শিবপুরে। ওই ঘটনার উৎস মনোজ-অরূপ রায়ের দীর্ঘ দিনের ‘দ্বন্দ্ব’ বলেই মনে করেন তৃণমূলের অনেকে। বস্তুত, শিবপুর বিধানসভা এলাকায় অরূপ-মনোজ বিবাদ সর্বজনবিদিত। ২০২১ সালে মনোজ বিধায়ক হওয়ার পর থেকে বিবাদের সূত্রপাত। হাওড়া জেলার রাজনীতিতে তৃণমূলের ‘প্রবীণ মুখ’ অরূপ। তাঁর হাত ধরেই তৃণমূলের হাওড়ায় প্রবেশ। তাই অরূপের বিচরণ হাওড়া সদর জেলার সর্বত্র। কিন্তু মনোজ আবার নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে কারও ‘হস্তক্ষেপ’ বরদাস্ত করেন না। রাজনৈতিক এলাকা ‘দখল’ নিয়েই অরূপ-মনোজ বিবাদ শুরু হয়েছিল। তা ক্রমশই জারি। যদিও প্রকাশ্যে দু’পক্ষের কেউই অপর পক্ষকে নিয়ে কটু মন্তব্য করতেন না।
ষষ্ঠ কারণ : মনোজের সঙ্গে গোলমাল হয়েছে হাওড়া পুরসভার প্রশাসক সুজয়েরও। শিবপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংস্কার শুরুর পর এলাকার বিধায়ক মনোজের অনুগামীরা একটি ফ্লেক্স লাগিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, মনোজের উদ্যোগে এবং হাওড়া পুরসভার সহযোগিতায় রাস্তাটি নির্মিত হচ্ছে। কাজ শেষের পর আবার সুজয়ের পক্ষ থেকে আর একটি ফ্লেক্সে উল্লেখ করা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় এবং সুজয়ের আন্তরিক উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ওই ফ্লেক্স লাগানো নিয়ে দু’জনের বিরোধ আরও বাড়ে। ২০২৪ সালের জুন মাসে মনোজ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তাঁর বিধানসভা এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের গতি ‘ধীর’। সুজয় তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেন না। সুজয় সেই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শিবপুরে যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে।
সপ্তম কারণ : ২০১৬ সালে উত্তর হাওড়া কেন্দ্র থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা তৃণমূলের টিকিটে জেতার পরে তাঁকেও ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন মমতা। কিন্তু ২০২১ সালে লক্ষ্মীরতন ভোটে দাঁড়াতে চাননি। তাই ভোটের পরে মমতা সেই দফতরের দায়িত্ব দেন মনোজকেই। নব মহাকরণে তাঁকে দেওয়া হয়েছে একটি ঝাঁ-চকচকে দফতরও। সেখানেও মনোজ যে নিয়মিত আসেন, তা-ও নয়। প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মী মন্ত্রী এবং বিধায়ক হিসাবে তুলনায় ‘সপ্রতিভ’ ছিলেন বলেই মনে করে তৃণমূল পরিষদীয় দল। পরিষদীয় দলের নির্দেশ মতো বিধানসভার অধিবেশনে নিয়মিত যোগদান করতেন। দলের শীর্ষনেতাদের পরামর্শও নিয়মিত নিতেন। অথচ মনোজ সেই সব কিছু তোয়াক্কাই করতে না।
অষ্টম কারণ : বিধানসভায় এই ‘অনুপস্থিতি’ এবং দফতরে ‘অনিয়মিত উপস্থিতি’ নিয়ে অবশ্য অন্য কেউ কোনও ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। কারণ, মনোজ মন্ত্রী। তাই তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। ফলে তৃণমূল পরিষদীয় দল বা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির পক্ষে কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ১৯-২০ মার্চ দলের দেওয়া হুইপ অমান্য করে কেন মনোজ অধিবেশনে গরহাজির রইলেন, তা তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন তৃণমূল পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ। পরিষদীয় দলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, যোগাযোগের জন্য মুখ্য সচেতকের দফতরে মনোজের একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকলেও সেই নম্বরটি ক্রমাগত বেজে যায়। সেটি কেউ ধরেন না।
নবম কারণ : তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ভোটের আগে মনোজের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ভোটে লড়ার জন্য রাজি করিয়েছিল প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আইপ্যাক। তখন মনোজ পুরোদমে বাংলার হয়ে ক্রিকেট খেলছেন। তাই তাঁর রাজনীতিতে যোগদানের শর্ত ছিল, ভোটে জিতলেও তাঁকে যেন ক্রিকেট খেলতে দেওয়া হয়। সেই শর্তেই তাঁকে শিবপুরে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ২০২৩ সালের অগস্টে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। যদিও ক্রিকেট মাঠে সক্রিয় থাকার সময়েও মনোজ বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অবসর নেওয়ার পরে অধিবেশনে অংশগ্রহণ প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন মনোজ।
দশম কারণ : কানাঘুঁষো ১৩ কোটির ‘গল্প’? কোনও এক কাউন্সিরলকে টিকিট ধরাতে গোপনে ছাঁটতে হল মনোজ তিওয়ারীকে। কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ১৩ কোটি টাকা উপঢৌকন জোগানো প্রার্থী বাংলার ভূমিপুত্রই নন। এমনকি সেই বিধানসভার এলাকারও নন। তাহলে কেন সকলকে টপকে টিকিট পেয়ে গেলেন? এলাকায় কান পাতলে বিপুল অর্থের তোলাবাজির অভিযোগও রয়েছে উক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এলাকাবাসী ও দলীয় সহকর্মীদের থেকে শোনা যায় আরও অনেক কীর্তির কথা। বিরোধী প্রার্থী উমেশ রাই তো সরাসরি ওই প্রার্থীকে ‘বড় তোলাবাজ’ বলে অভিহিত করেছেন। স্বল্প দিনে ভিনরাজ্য থেকে এসে কীভাবে বিপুল অর্থের জোগান ও বিপুল সম্পত্তি করে ফেললেন, তা নিয়েও বিস্তর চর্চা চলছে খোদ দলের অন্দরমহলে। তবে, চাতুর্যপূর্ণ কথাবার্তায় পারদর্শীতা থাকায়, দলের উচ্চ স্তরে মনোভাজন করতে অভ্যস্থ এই ব্যক্তি। ভিন রাজ্য থেকে আগত উক্ত প্রার্থী বিপুল অর্থের জোয়ারে বেশ ভালোমতোই মন কিনেছেন উচ্চস্তরে। এমনিতেই, মনোজের নামে বেশ কিছু স্তরে অভিযোগের পাহাড় জমে ছিল। ব্যাস! মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ১৩ কোটির ‘গল্প’ই কী তাহলে সরাসরি কোপ বসাল ক্রিকেটার থেকে বিধায়ক হওয়া মনোজের উপর?
ঘটনাচক্রে, মনোজের মতোই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন বাংলা দলে তাঁর সতীর্থ অশোক ডিন্ডা। বিজেপির হয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতেছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক। বিধানসভার অধিবেশনে তাঁর উপস্থিতি কিন্তু চোখে পড়ার মতো। যদিও বিধানসভার কোনও বিতর্কে তিনি এখনও বক্তৃতা করেননি। কিন্তু প্রশ্নোত্তরপর্ব, উল্লেখপর্ব এবং দৃষ্টি আকর্ষণীপর্বে ময়না বিধানসভা এলাকার বিভিন্ন বিষয় এবং রাজ্যের সমস্যা নিয়ে অশোককে সরব হতে দেখা গিয়েছে। এমনকি, বিজেপি পরিষদীয় দলের অন্দরে যে ‘হল্লা ব্রিগেড’ রয়েছে, তাতেও সতীর্থদের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে অশোকের। তবে ‘বন্ধু’ মনোজের প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে চাননি প্রাক্তন মিডিয়াম পেসার অশোক। বন্ধু মনোজ তিওয়ারীর এ ভাবে নিশ্চিত টিকিট না পাওয়ায় বিষন্ন বাংলার পেসার।





