মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের টুর্নামেন্ট। অথচ দাম হাজার হাজার কোটি টাকা। বিশ্বের সেরা লিগগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাচ্ছে আইপিএল। রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানা বদলের খবর সামনে আসতেই এই মন্তব্য করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রাক্তন ভারত অধিনায়ককের কথায়, ‘আইপিএলের এই উত্থান অসাধারণ। ২০০৭ সালে যখন শুরু হয়েছিল, আমি নিজেই লিগের প্রথম বলের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আরসিবি বনাম কেকেআর ম্যাচে। সেখান থেকে আজকের এই জায়গায় আসা অবিশ্বাস্য!’ রাজস্থান রয়্যালসের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার কিনে নিয়েছে মার্কিন উদ্যোক্তা কাল সোমানির নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগকারী দল। দাম প্রায় ১৩,৬০০ কোটি টাকা। সংখ্যাটা শুনেই চমকে গিয়েছেন সৌরভ। তাঁর কথায়, ‘মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের একটা টুর্নামেন্টের ফ্র্যাঞ্চাইজির এই দাম সংখ্যাটা মাথা ঘুরিয়ে দেয়!’ সৌরভের দাবি, আইপিএল এখন দুনিয়ার সেরা লিগগুলোর সমকক্ষ। বললেন, ‘আমি মনে করি এটা এনবিএর সমতুল্য। সম্প্রচার স্বত্বের দিক থেকে ফুটবলের সঙ্গেও তুলনা চলে!’ সম্প্রতি ইংল্যান্ডে গিয়ে কারাবাও কাপের ফাইনাল দেখেছেন সৌরভ ম্যান সিটি বনাম আর্সেনাল। সেই অভিজ্ঞতার রেশ টেনে জোর গলায় জানালেন, আইপিএলের দর্শকসংখ্যা অনেক সময় ইপিএলের ম্যাচকেও ছাপিয়ে যায়। তুলনার জন্য কিছু সংখ্যা রাখা যাক। লস অ্যাঞ্জেলেস ডজার্সের অংশীদার টড বোয়েলি চেলসি কিনেছিলেন প্রায় ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়। লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্স বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮৩,০০০ কোটিতে আমেরিকার পেশাদার ক্রীড়া ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেই তুলনায় আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির দাম এখনও কম। ফলে সৌরভের বক্তব্য আংশিক সত্য। উত্থানের গতি নজরকাড়া নিঃসন্দেহে, কিন্তু তাই বলে খাপে খাপ এনবিএ-ইপিএলের সঙ্গে আইপিলের তুলনা চলে না। সৌরভের চোখে এটাই সবচেয়ে বড় বার্তা। বললেন, ‘ক্রেতাদের একটা বড় অংশ আমেরিকা থেকে আসছেন। যার অর্থ ওখানে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে!’ প্রসঙ্গত, রাজস্থান রয়্যালস কেনার দলে সামিল ছিল ওয়ালমার্ট পরিবারের রব ওয়ালটন ও ডেট্রয়েট লায়নসের মালিক হ্যাম্প পরিবার। পাশাপাশি আমেরিকান এনএফএল ও এনবিএর মালিকরাও এখন আইপিএলে বিনিয়োগ করছেন, এটা নিছক কাকতালীয় নয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চলে প্রায় ছয় মাস। আইপিএল মাত্র তিন মাস। তবু জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফারাক কমে আসছে। সৌরভের নজরে, এটাই প্রমাণ করে, আইপিএল এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলির একটি। আইপিএলের ইতিহাসে নজিরবিহীন চুক্তি। ১.৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তথা ১৫ হাজার কোটি টাকায় রাজস্থান রয়্যালস কিনে নিলেন আমেরিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত উদ্যোগপতি কাল সোমানি। ইতিহাস গড়লেন তিনি, ইতিহাস গড রাজস্থান রয়্যালস এবং ইতিহাস গড়ল ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগও। প্রথমবার কোনও আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল্য এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়াল। এটা যথাযথ, নাকি ফুলিয়ে বেলুন করে তোলা সেটা তর্কের বিষয়। বিসিসিআই-এর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা সমঝোতা। সবুজ সংকেত পেলেই এই চুক্তি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। সোমানির নেতৃত্বে গঠিত কনসোর্টিয়ামই এই ঐতিহাসিক অধিগ্রহণের পিছনে রয়েছে। এই কনসোর্টিয়ামে ওয়ালমার্ট পরিবারের রব ওয়ালটন এবং ডেট্রয়েট লায়ন্সের মালিকানাধীন হ্যাম্প পরিবারের হাতও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
কে এই কাল সোমানি?
কাল সোমানি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার স্কটসডেলে বসবাসকারী এক প্রযুক্তি উদ্যোগপতি। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কাজ করছেন শিক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা প্রাইভেসি এবং স্পোর্টস টেকনোলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে।
তিনি একাধিক সফল সংস্থা গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
IntraEdge: একটি গ্লোবাল টেকনোলজি সার্ভিস সংস্থা
Truyo ও Truyo.AI: ডেটা প্রাইভেসি ও এআই গভর্ন্যান্স নিয়ে কাজ করে
Academian: শিক্ষা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম
শুধু প্রযুক্তি নয়, স্পোর্টস ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। তিনি মোটর সিটি গল্ফ ক্লাবের অংশীদার, এবং আরেকটি স্পোর্টস উদ্যোগ ও টিজিএল গল্ফ লিগে প্রথম লগ্নিকারীও বটে। এই অধিগ্রহণ হঠাৎ ঘটে গেল এমন নয়। কাল সোমানি এর আগেই রাজস্থান রয়্যালসের একজন সংখ্যালঘু অংশীদার ছিলেন। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতেই এবার তিনি নেতৃত্ব দেন নতুন কনসোর্টিয়ামের, যা পুরো ফ্র্যাঞ্চাইজিটি অধিগ্রহণ করল। আইপিএল যে এখন বিশ্বের অন্যতম দামী এবং দ্রুত বর্ধনশীল স্পোর্টস লিগ। এই চুক্তি তারই প্রমাণ। প্রযুক্তি, বিনোদন এবং খেলাধুলার মিশেলে তৈরি এই ইকোসিস্টেমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যে ক্রমশ বাড়ছে, সেটাও স্পষ্ট। কাল সোমানির এই পদক্ষেপ শুধু একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনা নয়, বরং বিশ্বের কাছে আইপিএলের আকর্ষণকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
মাঠে নেমে যেমন পাটা পিচেও বল হাতে ঘূর্ণি ওড়াতেন, ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে যে তেমনই ‘ধুরন্ধর’ ছিলেন শেন ওয়ার্ন, প্রমাণ মিলল গতকাল। রাজস্থান রয়্যালস ১৩ হাজার কোটি টাকায় বিক্রি হল, এ তো সবাই এতক্ষণে জেনে ফেলেছে। কিন্তু খবরের আড়ালে যে অবাক করা হিসেব বেরিয়ে এল, তা বোধ হয় অনেকেই আশা করেনি! প্রাক্তন অজি স্পিনার ২০০৮ সালে রাজস্থান রয়্যালসে যোগ দেওয়ার সময় চুক্তিতে এমন একটি শর্ত রেখেছিলেন, যা আজ তাঁর পরিবারের হাতে এনে দিতে চলেছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। ওয়ার্ন নেই। ২০২২ সালে প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু ১৮ বছর আগে করা সেই চুক্তির ফসল মাঠেই শুকিয়ে যায়নি… তা ঘরে তুলতে চলেছে তাঁর স্বজন-পরিজন! রাজস্থান রয়্যালস যখন ওয়ার্নকে সই করায়, শুধু অধিনায়ক হিসেবে নয়, তাঁকে পুরো ক্রিকেট বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কোচ, অধিনায়ক, দল গড়ার সিদ্ধান্ত—সবেরই দেখভাল করতেন অজি তারকা। একবার তো এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্যও করেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল নিজের মতো করে টিমটা চালাও। আমিই ছিলাম সবকিছু!’ বিনিময়ে চুক্তিতে একটি বিশেষ শর্ত রেখেছিলেন ওয়ার্ন। যা মোতাবেক, প্রতিটি সিজন খেললে ফ্র্যাঞ্চাইজির ০.৭৫ শতাংশ মালিকানা পাবেন। মানে, ফি বছর রাজস্থানের একটুকরো অংশীদারিত্ব তাঁর জিম্মায় চলে যাবে! সাকুল্যে চার মরসুম খেলেছিলেন। প্রথম বছরেই শিরোপা জেতেন। অঙ্ক কষলে মোট মালিকানা দাঁড়ায় ৩ শতাংশ। সম্প্রতি রাজস্থান রয়্যালস বিক্রি হয়েছে। মার্কিন উদ্যোক্তা কাল সোমানির নেতৃত্বে একটি বিনিয়োগকারী গ্রুপ কিনে নিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজির সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার। প্রায় ১৫,২৯০ কোটি টাকায়! সেই হিসেবে এখন ওয়ার্নের ৩ শতাংশ মালিকানার মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৪৫০ থেকে ৪৬০ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে রয়্যালসের মোট দাম ছিল মাত্র ৫,৬০০ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এখনকার মূল্যমান প্রায় তিনগুণ। ওয়ার্নের পরিবার সেই বৃদ্ধির সুবিধা পেতে চলেছেন। তবে টাকাটা এখনই হাতে আসছে না। এবারের আইপিএল মরসুম শেষ হওয়ার পর চুক্তি কার্যকর হবে। তার আগে অবশ্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অনুমোদনও জরুরি। ২০২২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে হৃদরোগে মারা যান ওয়ার্ন। থাইল্যান্ডে। হঠাৎ। বিশ্বক্রিকেট আকস্মিকতায় স্তব্ধ, হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জীবদ্দশায় যে দূরদর্শিতা তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটা মৃত্যুর পরেও ফল দিচ্ছে। ১৮ বছর আগে করা একটি চুক্তির শর্তের সুবাদে আজ তাঁর পরিবারের অ্যাকাউন্টে কয়েকশো কোটি আসতে চলেছে। ওয়ার্ন মাঠে তো অসাধারণ, কিন্তু মাঠের বাইরেও কতটা শানিতবুদ্ধির ছিলেন, এই খবর তারই প্রমাণ।





