রবি রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল রায়। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। বঙ্গ রাজনীতির একদা চাণক্য দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ভর্তি ছিলেন নিউ টাউনের এক বেসরকারি হাসপাতালে। রবিবার রাতে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে কিডনি-সহ নানা শারীরিক সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন মুকুল রায়। প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হতো তাঁকে। সম্প্রতি কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বঙ্গ রাজনীতির একদা চাণক্য। সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। মুকুলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে রাজ্য রাজনীতিতে। মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই মুকুলের বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। হাসপাতাল থেকে দেহ বাড়িতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাঁচড়াপাড়ার ঘটক রোডের বাড়ি থেকে হালিশহর শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই শেষকৃত্য হবে তাঁর।
ডানপন্থী রাজনীতিতে বাকিদের মতো কংগ্রেসের হাত ধরে ছাত্র রাজনীতি থেকে সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন মুকুল। কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন মুকুল। তৃণমূল দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এক সময়ে রাজ্যসভার সদস্য পদের দায়িত্ব সামলেছেন। জাহাজ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলানোর পরে রেলমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই কংগ্রেস ছেড়ে চলে আসেন তৃণমূলে। এর পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া থেকে দিল্লির রাজনীতি। মুকুল রায়ের কর্তৃত্ব দেখেছে দেশ। সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিভাবকত্বে রকেটের মতো ছুটেছে তৃণমূল। বঙ্গে বাম সাম্রাজ্যের পতন থেকে দিল্লির মন্ত্রীপদ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক যেন মুকুলের জন্যই সাজিয়ে রেখেছিল ‘রাজনীতির ঈশ্বর’। রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে উঠে আসেন তিনি। তাঁর একের পর এক কূটনৈতিক চাল ও দলের বিপুল সাফল্যের জেরে বঙ্গ রাজনীতিতে চাণক্য উপাধি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সেই ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা তো বটেই ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও নিজেদের বীজ বপন করে ঘাসফুল। রাজনীতির ময়দান থেকেও অনেক দূরে। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়ে দল বদলের পরে গত ২০২১ সালে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন মুকুল। জিতে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ফের তৃণমূলে যোগ দেন। তবে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেননি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। তাঁর বিধায়কপদ খারিজের মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কলকাতা হাই কোর্ট খারিজের রায় দিলেও সেই সিদ্ধান্তের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তবে রাজনীতির ময়দানে ‘বিধায়ক’ হিসাবেই যাত্রা শেষ করলেন এক সময়ের ‘বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য’।
কেউ বলতেন ‘চাণক্য’। কেউ বলতেন ‘তৃণমূলের অনিল বিশ্বাস’। বরাবর অন্তরালে থেকেই সংগঠন করেছেন। কপালের ফেরে অবশ্য এক বার দেশের রেলমন্ত্রী হতে হয়েছিল তাঁকে। আর জীবনের উপান্তে এসে বিধায়ক। কিন্তু বিধায়ক হিসেবে সে ভাবে কোনও ভূমিকা পালন করতে পারেননি। খানিকটা ভগ্নমনোরথ এবং ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েই জীবন শেষ হল। একদা বঙ্গ রাজনীতির আকাশে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মুকুল রায়। ১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বীজপুরের কাঁচরাপাড়ায় জন্ম। সেখান থেকে তিনি রাজ্য তো বটেই, জাতীয় রাজনীতিতেও একটা সময়ে ছাপ ফেলেছিলেন। যুগল রায়-রেখা রায়ের চার কন্যাসন্তান। একমাত্র পুত্র মুকুল। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মুকুলের জীবন সে ভাবেই শুরু হয়েছিল, যে ভাবে আর পাঁচটা মফস্সল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারে হয়। কাঁচরাপাড়া হর্নেট হাই স্কুল থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা। নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। পরে অবশ্য রাজনীতি করতে করতেই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রশন’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। কলেজ জীবন থেকেই দু’টি বিষয়ে অগ্রহী ছিলেন মুকুল। এক, রাজনীতি। দুই, ক্রিকেট। তবে ধুমধড়াক্কা টি-টোয়েন্টিতে তাঁর অগ্রহ ছিল না। তিনি ধ্রুপদী টেস্ট ক্রিকেটের ভক্ত। রাজনীতির মধ্যগগনে থাকার সময়েও ফাঁক বার করে ইডেনে টেস্ট ম্যাচ দেখতে গিয়েছেন। তিনি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ভারত টেস্ট জেতায় বিরাট কোহলিকে ফোন করে বসেছেন! রাজনীতিতে অবশ্য তিনি ‘ধ্রুপদী’ খেলা সব সময় খেলতে পারেননি। বরং মুকুলের প্রসিদ্ধি ছিল দল ভাঙানোর রাজনীতিতে। যাকে তিনি বলতেন, সকলকে নিয়ে চলা। অর্থাৎ, সকলকে তৃণমূলে নিয়ে আসা। দলের অঘোষিত ‘দু-নম্বর’ থাকার সময়ে বাছবিচার না-করেই মুকুল বিভিন্ন দলের ‘বঞ্চিতদের’ জন্য তৃণমূলের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছিলেন। ঠিক যেমন করেছিলেন বিজেপিতে গিয়েও। প্রথম ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল অতটা খারাপ না-হলেও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিপর্যয় হয়েছিল। ২০২১ সালের ভোটে তা টের পেয়েছিল বিজেপি। সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাম আন্দোলনের ঢেউ। কলেজছাত্র মুকুল জড়িয়ে পড়েছিলেন বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সঙ্গে। কিন্তু সেই সম্পর্ক খুব বেশি দিন টেকেনি। কংগ্রেসনেতা সোমেন মিত্রের ‘অনুগামী’ বলে পরিচিত ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের নেতা মৃণাল ওরফে আবু সিংহরায়। তিনিই মুকুলকে নিয়ে আসেন কংগ্রেসে। তখন থেকেই মুকুল আবুর ‘অনুগামী’। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসে তখন গনি খান, সোমেনদের জমানা। মফস্সলের ছেলে মুকুল আবুর সুবাদে কলকাতায় যাতায়াত শুরু করেন। কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতিতে খুব বেশি উত্থান হয়নি মুকুলের। তিনি ‘অনুগামী’ হয়েই ছিলেন। সেই সময়েই বাংলার রাজনীতিতে উদয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যা মুকুলের রাজনৈতিক জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আসলে তা-ও নয়। মুকুলের রাজনৈতিক জীবনের মোড়-ঘোরানো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে সোমেন শিবির ছেড়ে মমতার ছাতার তলায় চলে আসা। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় মমতার সঙ্গে পরিচয় মুকুলের। ধীরে ধীরে মমতার ‘বিশ্বস্ত’ হয়ে ওঠেন মুকুল। মমতা যুব কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পর থেকে মুকুলের ‘রান’ আরও বাড়তে থাকে। ধুরন্ধর মুকুল জানতেন, এটা ব্যাটিং উইকেট। টিকে থাকতে পারলে রান আসবেই। ১৯৯২ সালে মমতার যখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদের জন্য সোমেনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তখন মুকুল মমতারই পক্ষে। ১৯৯৬ সালের বিধানসভা ভোটের সময় থেকে যখন কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছে মমতার, তখন থেকেই নতুন দলগঠনের সলতে পাকানোর কাজ শুরু করেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেন মুকুল। ১৯৯৭ সালে যখন তৃণমূল গঠনের নথিপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা পড়েছে, তখন নতুন দলের প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয় মুকুলকেই।
ঘনিষ্ঠমহলে মুকুল দাবি করতেন, কংগ্রেস মমতাকে বহিষ্কার করার সময় তিনিই নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে দক্ষিণ কলকাতার সাংসদ হিসেবে মমতাকে তৃণমূলে ‘যোগদান’ করিয়েছিলেন। মুকুলের প্রতি মমতার আস্থার প্রমাণ মিলেছিল ২০০৬ সালের রাজ্যসভার নির্বাচনে। সেই সময় তৃণমূলের এক বরিষ্ঠ নেতা রাজ্যসভায় প্রার্থী হতে চাইলে তাঁর দাবি উপেক্ষা করে তুলনায় নবীন মুকুলকে রাজ্যসভার সাংসদ করেন মমতা। তার পরেই উল্কার গতিতে বাংলার রাজনীতিতে পথচলা শুরু হয় মুকুলের। ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে পরাজিত হন মমতা। তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা নেমে আসে ৩০-এ। মুকুলও জগদ্দল থেকে বিধানসভা ভোটে ফরওয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হন। তার পরেই শুরু হয় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন। বাংলার রাজনীতিতে আরও এক ‘মোড়-ঘোরানো’ পর্যায়। সেই সব আন্দোলনেই মমতার পাশে দেখা গিয়েছে মুকুলকে। ধর্মতলার অনশন মঞ্চ থেকে শুরু করে সিঙ্গুরের ধর্না, সবেতেই মুকুল হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট গড়তেও বড় ভূমিকা ছিল মুকুলের। প্রকাশ্যে জোট গড়ার কারিগর হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও মমতা থাকলেও অন্তরালে কংগ্রেস হাইকমান্ডের সঙ্গে জোটের আলোচনা এবং আসন সমঝোতা চালিয়েছিলেন মুকুলই। ২০০৯ সালের সেই ভোটে বাংলা থেকে ১৯টি আসন জিতেছিল তৃণমূল। জিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শামিল হয় তারা। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের রেলমন্ত্রী হন মমতা। আরও ছ’জন সাংসদকে প্রতিমন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়। সেই অধ্যায়ে কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী হন মুকুল। ২০১১ সালে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা। মুকুলের ‘প্রভাব এবং প্রতিপত্তি’ তখন আরও বেড়েছে। সেই ভোটে তৃণমূলের হয়ে বীজপুর থেকে বিধায়ক হন মুকুল-পুত্র শুভ্রাংশু রায়। যদিও ঘনিষ্ঠমহলে মুকুল বলতেন, তাঁর মতামত না নিয়েই শুভ্রাংশুকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মমতা। ২০১১ সালে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর জায়গায় দলের সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদীকে রেলমন্ত্রী করা হয়। কিন্তু ২০১২ সালের রেল বাজেটে দীনেশ প্রতি কিলোমিটারে ২ পয়সা রেলভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলে রুষ্ট হন মমতা। তাঁর নির্দেশে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন দীনেশ। বদলে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মুকুল। কিন্তু সেই মন্ত্রিত্ব বেশি দিন উপভোগ করতে পারেননি মুকুল। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে মমতা ইউপিএ সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন মুকুল।
২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট থেকেই আড়েবহরে বাড়তে শুরু করেছিল তৃণমূল। বিভিন্ন দল থেকে নেতা-কর্মীদের তৃণমূলে নেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন মুকুলই। ২০১২ সাল থেকে তৃণমূলে যোগদান পর্ব প্রায় সংক্রমণের চেহারা নিয়েছিল। সেই ‘সুযোগে’ মুকুল দলে ‘বেনোজল’ ঢুকিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছিল দলেরই একাংশ। কিন্তু তত দিনে যোগদানের ‘ক্ষমতা’ পেয়ে বসেছে তৃমমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের। এলাকা ‘বিরোধীশূন্য’ করার তাগিদে বাছাবাছির বালাই ছিল না। মুকুলের ক্ষমতা আরও বাড়ছিল দলের অন্দরে। অভিযোগ ছিল, দলের সিনিয়র নেতাদের থেকে তিনি মমতাকে ‘আড়াল’ করছেন। সে কারণে জনান্তিকে মুকুলকে ‘পাঁচিল’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন তাঁরই সমবয়সি সহকর্মীরা। তাতে অবশ্য মমতার কাছে মুকুলের গুরুত্ব কমেনি। ২০১২ সালে তৃণমূলের হয়ে দ্বিতীয় বার রাজ্যসভার সাংসদ হন তিনি। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ‘ম্যাজিক’ দেখিয়েছিলেন মুকুল। সেই নির্বাচনে ৩৪টি আসন জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু ঘটনাচক্রে, সেই সময় থেকেই তৃণমূলে মুকুলের পড়তির দিন শুরু হয়। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বছর অক্টোবর মাসে তাঁকে দলের যুব সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দেন মমতা। তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই জানতেন, ‘নবীন’ অভিষেকের ভোটে লড়া এবং তাঁকে যুব সংগঠনের প্রধান করার সিদ্ধান্তে সায় ছিল না মুকুলের। অনেকে বলেন, সেই থেকেই তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ পর্বের সূচনা। ২০১৫ সালে দল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তৃণমূলের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সেই সময়ই তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেন মমতা। তৃণমূলের অভ্যন্তরে তখন কানাঘুষো, সারদা মামলা থেকে বাঁচতে মুকুল যোগাযোগ শুরু করেছেন বিজেপির সঙ্গে। অধুনাপ্রয়াত বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি তাঁকে ‘বাঁচিয়েছেন’ বলে ঘনিষ্ঠদের বলতেন মুকুল। তখনই তাঁর বিজেপিতে যোগদান নিয়ে আলোচনা এগিয়েছিল। এমনকি, নতুন দল গঠন করা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছিলেন মুকুল। কিন্তু অরুণের পরামর্শে তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচান তিনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে মুকুলকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়। সেই ‘কঠিন’ ভোটে ২০০-র বেশি আসন দিয়ে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরেন মমতা। কিন্তু মুকুলের সঙ্গে তাঁর ‘সমীকরণ’ আর আগের জায়গায় ফেরেনি। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন মুকুল। নভেম্বরে দিল্লিতে গিয়ে যোগ দেন বিজেপিতে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বাংলায় ‘আশাতীত’ ফল করে বিজেপি। অনেকেই বলেন, সেই সাফল্যের পিছনে ছিল মুকুলের ‘মস্তিষ্ক’। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে মুকুলের রাজনীতির ‘মৌলিক’ পার্থক্য ছিল। তৃণমূলে ক্ষমতার ‘একচ্ছত্র’ ভরকেন্দ্র মুকুল বিজেপিতে সে ভাবে মানিয়েও নিতে পারছিলেন না। অনেকে বলেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ‘মন দিয়ে’ ভোটের ময়দানে নামেননি তিনি। তবে তৃণমূল ভাঙানোর খেলায় তাঁর ‘হাতযশ’ ছিল বলেই শোনা যায়। ভোট লড়াতে বিজেপিতে নিয়ে এসেছিলেন টলি-তারকা যশ দাশগুপ্তকেও। কিন্তু সে বার আর ‘সফল’ হননি। ভোটে প্রত্যাশিত ফল পায়নি বিজেপি। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে নাকি ‘অনিচ্ছা’ সত্ত্বেও ভোটে লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে। যদিও কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভায় ৩০ হাজার ভোটে জিতেছিলেন মুকুল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সেই তাঁর প্রথম জনতার ভোটে জয়। কিন্তু সেই ভোটেই বিজেপির প্রার্থী হয়ে হেরে যান মুকুলের পুত্র শুভ্রাংশু। সেই ভোটের দেড় মাসের মধ্যেই মুকুল ফিরে আসেন তৃণমূলে। ২০২১ সালের ভোটের ফলঘোষণা হয়েছিল ২ মে। ১১ জুন মমতার উপস্থিতিতে তৃণমূল ভবনে পুত্র শুভ্রাংশুকে নিয়ে উপস্থিত হন মুকুল। তৃণমূলে ফেরেন। ঘটনাচক্রে, তাঁর গলায় প্রত্যাবর্তনের উত্তরীয়টি পরিয়ে দেন অভিষেক। ঘটনাচক্রেই, যিনি তার কয়েক মাস পরেই একদা মুকুলের ‘সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক’ পদে নিযুক্ত হবেন। বিধায়ক হিসেবে খুব একটা দাগ কাটতে পারেননি মুকুল। তৃণমূলেও পুরনো জায়গা আর ফিরে পাননি। বিধানসভার ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’র চেয়ারম্যান করা হলেও কিছু দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেছিলেন। স্ত্রী কৃষ্ণা রায়ের মৃত্যুতে আরও ভেঙে পড়েন তিনি। তার পর থেকেই তাঁর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যেতে থাকে। মাঝে এক বার নিজেই দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিজেপিতে ফিরতে চান। কিন্তু তেমন কিছু বাস্তবে ঘটেনি। ধীরে ধীরে বিস্মৃতিতে চলে গিয়েছিলেন মুকুল। অসুস্থতার কারণে কাঁচরাপাড়ার বাড়ির বাইরে বেরোনোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রশ্ন করলে বুঝতে পারতেন না। টেস্ট ম্যাচের ব্যাটিং করতে করতে তৃণমূলে ‘মুকুল’ থেকে ‘মহীরুহ’ হয়ে উঠেছিলেন। শেষটা সেই অভিঘাত নিয়ে এল না। জমানা বদলে গিয়েছে। এখন টি-টোয়েন্টির যুগ।





