দেড় বছরের মধ্যে কলকাতার সিপি বদল হল দু’বার। প্রথম বার আন্দোলনের চাপে। দ্বিতীয় বার আইনি জটিলতার আশঙ্কায়। এ ছাড়াও রাজ্য পুলিশে আরও একগুচ্ছ রদবদল হয়েছে। আপাতত রাজ্য প্রশাসন অপেক্ষা করছে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানির দিকে। ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন সুপ্রতিমকে সরিয়ে দিলে সেটিও মমতা তথা তৃণমূল ‘রাজনৈতিক’ ভাবে ব্যবহার করতে পারবে। তারা বলতে পারবে যে, একজন বাঙালি অফিসারকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। ওই সিদ্ধান্তকে ‘বাংলা ও বাঙালির উপর আক্রমণ’ হিসাবে প্রচারে তুলে ধরতে পারবে শাসকদল। সুপ্রতিমকে কলকাতার সিপি করে সেই সম্ভাবনারও বীজও পুঁতে রাখল শাসক শিবির। কলকাতার বাসিন্দাদের বড় অংশ অবাঙালি হলেও সারা রাজ্যেই লালবাজারের সিংহাসনের গুরুত্ব রয়েছে। সুললিত বাংলা বলা এবং বাংলা লেখায় পারদর্শী সুপ্রতিমকে এনে মমতা সেই বৃহত্তর বাঙালি সমাজকেই ‘বার্তা’ দিতে চেয়েছেন।
কেন সুপ্রতিম? প্রশাসনিক মহলের মতে, এর নেপথ্যে শাসকদলের বাঙালি গরিমার রাজনৈতিক ‘লাইন’ একটি কারণ। কলকাতা পুলিশের শেষ বাঙালি কমিশনার ছিলেন সৌমেন মিত্র। প্রথম দফায় সৌমেন সিপি হন ২০১৬ সালে। বিধানসভা ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন রদবদল করে সৌমেনকে কলকাতার সিপি করে। মাস খানেকের জন্য সেই দায়িত্বে ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় সৌমেন কলকাতার সিপি হন ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু ওই বছর ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসর নেন। তাঁর জায়গায় ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি সিপি হন বিনীত। তার পরে আবার বাঙালি সিপি পেল কলকাতা। পীযূষকে যেহেতু ডিজি-র পদে আনা হয়েছে, সেই পদে কাউকে আনতে হত। কারণ, নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর চলাফেরা এবং সফর আরও বাড়বে। এর আগে ওই দায়িত্ব পালন করেছেন বিনীত এবং মনোজ। এঁদের মধ্যে বিনীতকে ওই পদে নিয়োগ করা হলে আরজি করের ঘটনাপ্রবাহ তুলে বিরোধীরা তা নিয়ে পথে নামতে পারত। সেই নিরিখে মনোজ অনেক ‘নিরাপদ’। দ্বিতীয়ত, ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে বদল আনতই। সেই বদল আগেই করে দিল নবান্ন।
মনোজকে রাজ্য পুলিশের নিরাপত্তা নির্দেশক (ডিরেক্টর সিকিউরিটি) করা হয়েছে। ওই পদে যিনি থাকেন, তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁকে সবসময়েই মুখ্যমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকতে হয়। পুলিশবাহিনীর সাপেক্ষে সেটি বড় পদ হলেও জনমানসে সেই পদ সম্পর্কে তেমন স্বচ্ছ ধারণা নেই। ওই পদের ওজন সম্পর্কেও সাধারণ নাগরিকেরা ওয়াকিবহাল নন। ফলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার শাস্তির মুখে পড়লে যে অভিঘাত তৈরি হত, ‘রাজ্য পুলিশের নিরাপত্তা নির্দেশক’ মনোজকে শাস্তি পেতে হলে তা হবে না। মমতার শাসনে কলকাতার বাইরে বিধাননগর, হাওড়া শহর, চন্দননগর, ব্যারাকপুর, শিলিগুড়ি, আসানসোল-দুর্গাপুরে কমিশনারেট তৈরি করা হলেও কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদের পৃথক ওজন রয়েছে। সেই পদকে আইনি ঝঞ্ঝাট থেকে বাঁচাতে চেয়েছে নবান্ন। আইপ্যাক মামলা। গত ৮ জানুয়ারি কয়লা মামলার সূত্রে আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সংস্থার দফতরে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। তল্লাশি চলতে চলতে লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়ি এবং আইপ্যাকের সল্টলেকের দফতরে ঢুকে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রতীকের বাড়ি থেকে ফাইল, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং আইপ্যাকের দফতর থেকে মমতা বেশকিছু নথিপত্র নিয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রী প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছোনোর অব্যবহিত আগে সেখানে গিয়েছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ। আর সল্টলেকের দফতরে পৌঁছে গিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব। মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে তদন্তের কাজে ‘বাধা’ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে ইডি। সেই মামলায় প্রথম শুনানির দিন বিচারপতিরা যা বলেছেন, তা রাজ্য সরকার তথা প্রশাসনের কাছে ‘বিড়ম্বনাজনক’। আগামী মঙ্গলবার ওই মামলার আবার শুনানি। প্রথম শুনানিতে শীর্ষ আদালতের বক্তব্যে খুব ভাল ‘সঙ্কেত’ দেখেনি নবান্ন। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তরের ধারণা, মঙ্গলবারের শুনানিতে রাজীব এবং মনোজের বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ করার নির্দেশ দিতে পারে শীর্ষ আদালত। তেমন হলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার শাস্তি পাবেন। যা বাহিনীর পক্ষে ভাল নয়। রাজীব যেহেতু অবসর নিলেন, তাই তাঁকে শাস্তি দিলেও রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শাস্তি পেতে হবে না। সে ক্ষেত্রে বলা হবে, এক আইপিএস এবং এক প্রাক্তন আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হল। অর্থাৎ, দুই বাহিনীর শীর্ষপদের আধিকারিকদের নয়, শাস্তি দেওয়া হল দুই অফিসারকে। রাজ্য তথা কলকাতা পুলিশের যে রদবদল হয়েছে, তা নিয়ে নবান্ন এবং ক্যামাক স্ট্রিট উভয় তরফই সহমত। মনোজকে সরিয়ে সুপ্রতিমকে আনার সিদ্ধান্তও সুচিন্তিত।





