বাড়িতে অতিথি হয়ে গেলেন, খেলেন, চলে এলেন। শুধু নিমন্ত্রণ রক্ষা হল মাত্র। কারও বাড়িতে যেমন নিমন্ত্রণ পেলে যেমন ভাল লাগে, আবার কারও বাড়িতে যেতে ঠিক ইচ্ছা হয় না। অতিথি আপ্যায়নে কোন বিষয়ে নজর দিলে, অতিথির নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে হবে না। অতিথি আপ্যায়নেরও কায়দা আছে। অতিথিদের সঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্তকে স্মৃতির খাতায় আজন্ম বাঁধিয়ে রাখতে হলে, কোনটি করা ভাল, কোনটিতে অতিথি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, খেয়াল রাখা দরকার। ভারতীয়রা অতিথি অ্যাপায়নে বেশ পটুই। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাতে হলে,
উদ্দেশ্য: আতিথেয়তা মানেই শুধু মনমতো খাবার পরিবেশন, সুন্দর টেবিলসজ্জা নয়। বরং এর লক্ষ্যই হল ভাল কিছু মুহূর্ত তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। স্বাচ্ছন্দ্য সেখানে খুব জরুরি, আর চাই আন্তরিকতা। আয়োজন কম হলেও অসুবিধা নেই, কিন্তু তাতে যেন ভালবাসা ও আন্তরিকতার উষ্ণ স্পর্শ থাকে। মেগানের পরামর্শ, অথিতি অ্যাপায়নেরর আয়োজন যদি একটু আগেই করা যায়, তা হলে শেষমুহূর্তে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন পড়ে না। মেগান সেটাই অনুসরণ করেন। যাতে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে অতিথিদের সঙ্গে গল্পগুজবে ফাঁক না পড়ে যায়।
সহজ-সরল আয়োজন: ঘরের প্রতিটি কোণ নিখুঁত ভাবে সাজিয়ে তোলা, অঢেল রান্নার আয়োজনের দিকে না গিয়ে সহজ সরল ভাবেই দিনটি বা সন্ধ্যাটি অতিথির সঙ্গে কাটানো যায়। যত বেশি আয়োজন, তত বেশি জটিলতা, ব্যস্ততা। এই সবে ব্যস্ত হয়ে পড়লে অতিথিদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিসরই কমে যাবে। সেই কারণে, প্রচুর রান্নার দিকে না গিয়ে, অতিথি তৃপ্তি করে খেতে পারবেন এমন কয়েকটি পদই বেছে নিন। বেশির ভাগ রান্না সেরে রাখুন অতিথি আসার আগেই।
আন্তরকিতা: নিখুঁত আয়োজনের চেয়েও উষ্ণ অভ্যর্থনা, আন্তরিকতা জরুরি। অতিথি এসে যদি গল্প করার লোক না পান, একা বসে কী করবেন ভেবে না পান— অতিথির পক্ষেও তা সুখকর হবে না। অতিথি যাতে সেই বাড়িতে এসে গুরুত্ব পান, মন খুলে বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তা দেখা জরুরি। গল্প-আড্ডায় মনের আদান-প্রদান হবে, ভাল মুহূর্ত তৈরি হবে, সেটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে আড্ডায় এমন প্রসঙ্গ তোলা ঠিক নয়, যাতে কেউ অস্বস্তিতে পড়েন।
অন্দরসজ্জা এবং উপস্থাপনা: অতিথি আপ্যায়নে বাড়ি, ঘরদোর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা অবশ্যই জরুরি। এটি হল আতিথেয়তার নীরব ভাষা, যা সমগ্র আয়োজনকে এক সুতোয় বাঁধতে সাহায্য করে। বাড়িতে ঢুকেই এলোমেলো জিনিস দেখলে কারও তা ভাল লাগে না। বরং একটি ছিমছাম ঘর, পরিচ্ছন্নতা মনের উপরও প্রভাব ফেলে। একই ভাবে কী খেতে দেওয়া হচ্ছে সেটির পাশাপাশি জরুরি কী ভাবে তা দেওয়া হচ্ছে। খাওয়ার থালাটি কেমন, টেবিলসজ্জা, বসার জায়গা, ঘরের আবহ— এই সব কিছুই মনোজগতে ছাপ ফেলে।
রান্নাঘর হোক উন্মুক্ত: আতিথেয়তা মানে কেবল অতিথিকে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসিয়ে রাখা নয়। মেগান মনে করেন, রান্না করতে করতেও অতিথির সঙ্গে গল্প করা যায়। অতিথিও যাতে সেই আয়োজনের অংশীদার হতে পারেন, তেমন পরিবেশও গড়ে তোলা যায়। এতে নিজেদের মধ্যে আগল ভাঙে, সম্পর্ক সহজ হয়।প্রথাগত নিমন্ত্রণে যে আড়ষ্ট ভাব থাকে, তা কেটে যেতে পারে অতিথিকে রান্নাঘরে ডেকে নিলেও।
স্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে খুব শৌখিন বা বাহারি রান্না করার কথা ভাবেন না অনেকেই। স্বাস্থ্যকর রান্না মুখে তোলার মতো স্বাদু হলেই অধিকাংশে নিশ্চিন্ত হন। চাইলে স্বাস্থ্যকর উপকরণ দিয়েও বাহারি রান্না রাঁধা যেতে পারে। চাইলে তা পরিবেশন করা যেতে পারে অতিথিকেও। স্বাস্থ্যকর ওটস দিয়ে তৈরি তেমনই পাঁচ রাজকীয় রান্নার হদিশ রইল।
জাফরানি ওটসের পায়েস
শেষপাতের খাবার দিয়েই শুরু। মিষ্টিমুখে ভাতের পায়েস বা চালের পায়েসের বদলি হিসাবে বানাতে পারেন ওটসের পায়েস। স্বাদে নতুনত্ব আনতে তাতে মিশিয়ে দিন জাফরান। স্বাদ, গন্ধ এবং রং পাল্টে যাবে মুহূর্তে। তা ছাড়া ওটসের পায়েস চালের পায়েসের থেকেও বেশি ঘন আর ক্রিমের মতো হয়। বানানোর উপকরণ হিসাবে দরকার হবে রোলড ওটস, ঘন দুধ, চিনি বা স্টেভিয়া, জাফরান, এলাচ গুঁড়ো এবং পেস্তা-কাজু বাদাম।
চিকেন কেবসা
কবসাকে বলা যেতে পারে আরব দেশের বিরিয়ানি। তবে বিরিয়ানির মতো এর চাল ঝরঝরে হওয়া আবশ্যিক নয়। যেহেতু এক পাত্রে মাংসের ঝোলের সঙ্গে রান্না হয়, তাই এর চালে সামান্য ভিজে ভাব থাকে। রান্নাটি ওটস দিয়েও করা যেতে পারে। মশলা হিসাবে দরকার দারচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, পেঁয়াজ, রসুন, সুগন্ধী লেবুর রস আর অনেক খানি টম্যাটোর পিউরি। এই রান্নার মূল স্বাদ টম্যাটো থেকেই। আর পরিবেশনের সময় উপরে বেরেস্তা আর কালো কিশমিশ ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মাশরুম রিসোতো
ইতালীয় রান্না। তৈরি হয় ভাত দিয়ে। মুখে দিলেই গলে যাওয়া ক্রিমের মতো ভাত। তাতে থাকে নানা ধরনের ভেষজ এবং মশলাপাতির গন্ধ। সঙ্গে মেশানো থাকে মাশরুম বা মাংসের মতো উপকরণও। ওটস দিয়ে এই রান্নাটি বানালে স্বাদের তেমন হেরফের হবে না। অথচ স্বাস্থ্যকরও হবে। মূল উপকরণ মাখন, রসুন এবং চিজ়। তার সঙ্গে সামান্য গোলমরিচ এবং ধনেপাতা দিলে এর স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়।
পোলাও
চালের পোলাওয়ের মতো ঝরঝরে হবে না নিঃসন্দেহে। তবে সেটুকু বাদ দিলে ওটস দিয়ে একই রকমের সুস্বাদু পোলাও বানানো যেতে পারে। পদ্ধতিটি প্রায় একই রকম। শুধু পোলাও বানানোর জন্য সবচেয়ে বড় দানার রোলড ওটস নিতে হবে। রান্নার আগে ওটস শুকনো খোলায় ২-৩ মিনিট ভেজে নিলে রান্নার পর তা আঠালো হবে না। আর যেহেতু চালের তুলনায় ওটসে জল কম লাগে, তাই ১ কাপ ওটসের জন্য ১.৫ কাপ গরম জলই যথেষ্ট।বাকি মশলা একই থাকবে। সেই ছোট এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, তেজপাতা এবং ঘি। এর সঙ্গে চাইলে কাজু, কিশমিশ এবং রঙিন সবজি, যেমন— গাজর, মটরশুঁটি, বিনস হালকা ভেজে নিয়ে দিতে পারেন। নামানোর আগে সামান্য শাহী গরম মশলা এবং এক চামচ কেওড়া জল ছিটিয়ে দিতে পারলে তো কথাই নেই।
তেহরি
তেহরিহল একপাত্রের রান্না। যে রান্নায় চাল, আলু, অন্যান্য সুগন্ধী মশলাপাতি থাকে। আর রান্নাটি হয় সর্ষের তেল দিয়ে। তবে এই রান্নার দু’রকম সংস্করণ রয়েছে। একটি উত্তরপ্রদেশের। সেই তেহরি হয় নিরামিষ। তাতে নানা ধরনের সব্জি যেমন ফুলকপি, গাজর, কড়াইশুঁটি ইত্যাদি থাকে। আবার বাংলাদেশের তেহরি হয় আমিষ। তাতে মাংসের টুকরো দেওয়া হয়। আর থাকে প্রচুর কাঁচা লঙ্কা। চাইলে ওটস দিয়েও সব্জি বা মাংসের টুকরো দিয়ে এই রান্নাটি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওটস যাতে গলে না যায় তাই রান্না করার সময় পোলাও বানানোর পদ্ধতিটি মনে রাখতে হবে। এছাড়া মশলা হিসাবে দরকার পড়বে হলুদ, আদা, রসুন, জিরে, গরম মশলা। চাইলে দই বা সামান্য দুধও দেওয়া যেতে পারে।





