লালরঙা আগুনে পলাশ তো দূর-অস্ত। গাছে গাছে কুঁড়ি পর্যন্ত নেই। শাখায় শাখায় সবে কালো আভা। তা খুঁজতেও দূরবীন দিয়ে দেখার উপক্রম। হাড় হিম ঠান্ডা না থাকলেও উত্তর থেকে দক্ষিণে এই মাঘে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ফলে আবহাওয়া বিজ্ঞান অনুযায়ী বঙ্গ জুড়ে এখনও শীত। ফলে আবহাওয়া একটু উষ্ণ না হলে কুঁড়ি ফাটিয়ে পলাশ আগুন ঝরাবে কী করে? আর এবার তো সেই কুঁড়িরও দেখা নেই। তাহলে পলাশপ্রিয়া-র চরণে নিবেদন হবে কেমনে? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন আগুনে পলাশের আঁতুড়ঘর বনমহল পুরুলিয়া থেকে ঝাড়গ্রাম, লালমাটি বীরভূম ছুঁয়ে তামাম দক্ষিণবঙ্গে। একই অবস্থা উত্তরেও। আর কলকাতা-শহরতলি পলাশ পাবে কোথায়? তাহলে কি নিয়ম-আচার রক্ষায় পলাশের ডাল ভাঙা হবে? এমন শত প্রশ্নের মধ্যেই বনদপ্তরের কড়া নির্দেশ, কোনভাবেই পলাশের ডাল ভাঙা যাবে না। এই আদেশনামা শুধু পুরুলিয়ার বনবিভাগগুলিতে নয়। জঙ্গলমহলের দুই জেলা বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামেও। বসন্তের মরশুমে এই লালরঙা পলাশের উপর নির্ভর করেই জঙ্গলমহলে পর্যটন জমজমাট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পুরুলিয়ায়। তাই এই জেলায় পলাশের ডাল ভাঙা নিয়ে এমনকী কুঁড়ি তোলার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে পুলিশের। সরস্বতী পুজোর সময় সারা বাংলায় বিদ্যার দেবীর চরণে একটি করে পলাশ ফুল দিলে কয়েক কোটি। এই বিপুল সংখ্যক পলাশ মিলবে কোথায়? সেই প্রশ্ন আয়োজক থেকে পুরোহিতদেরও। সরস্বতী পুজোয় বাগদেবীর চরণে পলাশ ফুল দিতেই হয়। না হলে তো বিদ্যার দেবীর আরাধনা সম্পূর্ণই হবে না। আসলে শীত এখনও রয়ে গিয়েছে। আর তার চেয়েও সবচেয়ে বড় কথা ক্যালেন্ডারে সরস্বতী পুজো অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। জানুয়ারি শেষে সরস্বতী পুজো! শেষ কবে এসেছে মনে পড়ে না। ফলে পলাশ ফুটবে কি করে? তাহলে কি প্লাস্টিকের ফুল? কালীপুজোয় প্লাস্টিকের জবা দেওয়ার চল থাকায় তা দেদার বিক্রি হয়। কিন্তু পলাশ প্লাস্টিকের? সেভাবে চোখে পড়ে না। দেবী সরস্বতীর পলাশ ফুল ভীষণই পছন্দ। তাইতো তিনি পলাশপ্রিয়া। তাছাড়া দেবীর পুষ্পপাত্রে আবির, কুমকুম আমের মুকুল ও যবের শিষ ছাড়াও পলাশ ফুল বাধ্যতামূলক। কিন্তু এবার দেবীর চরণে পলাশ দেওয়া যাবে কিনা সত্যি বুঝতে পারছি না। কেন সরস্বতীর আরাধনায় পলাশ থাকা বাধ্যতামূলক? পুরোহিতদের কথায়, প্রজনন এবং উর্বরতার সঙ্গে বাগদেবীর সম্পর্ক রয়েছে। দেবী ঋতুমতীর প্রতীক। আগুন ঝরানো পলাশ লালচে কমলা হয়। তাই প্রতীকীভাবে ওই ফুল থাকা আবশ্যিক। সারা বাংলা ফুল চাষী ও ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র নায়ক বলেন, “অধিকাংশবারেই সরস্বতী পুজো ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে মাঝামাঝি সময়ে হয়। আর সেই সময় আগুনে রূপ না দেখা গেলেও পলাশ হাতে চলেই আসে। তা সে কুঁড়ি হোক না কেন। এবং ওই একটি পলাশ কলি ৫০ টাকা হলেও তা বিক্রি হয় কলকাতা-শহরতলিতে। মল্লিকঘাট ফুল বাজারে কতবার দেখেছি একটি পলাশ কলি ৪০-৫০ টাকা দিয়ে বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকর্তারা নিয়ে যান। কিন্তু এবার তো পলাশ-ই নেই।” উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক বলেন, “পলাশ তো বসন্তের ফুল। সেই বসন্ত তো এখনও আসেনি। শাখায় শাখায় পলাশ আসার জন্য যে সামান্যতম উষ্ণ আবহ প্রয়োজন হয় তা এখন নেই। প্রথমে কলি, তারপর ফুল, এই প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ।” তবে এই জেলায় ২০২২-এ শেষ ডিসেম্বরেও পলাশ ফুটেছে। চলতি বছরের মতো বিগত বছরগুলিতে শীতের এমন কাঁপুনি ছিল না। এই ঝাড়খন্ড ছুঁয়ে থাকা পাথুরে জেলাতেও। তবে বনদপ্তরের রেকর্ড বলছে, ২০২৪ সালের ২২শে জানুয়ারি থেকেই এই জেলায় পলাশ ফুটতে শুরু করেছিল এই জেলার পাহাড়ি জঙ্গলে। সেইবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ভীষণ ওঠানামা করছিল। এবার কিন্তু শেষ ডিসেম্বর থেকে একেবারে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সেই ছবিটা ছিল না। তাই পলাশপ্রিয়া এলেও শীতের আড়ষ্ঠতা না ভাঙায় পলাশে রাঙা হয়ে ওঠেনি। ফাগুনের প্রেমও জাগেনি হৃদয়ে!





