পৃথিবীতে তুষারযুগ ডেকে এনেছিল মঙ্গল? লালগ্রহের গোপন টানেই বরফে ঢাকে ধরিত্রী! পৃথিবীর জলবায়ুর উপর মঙ্গলগ্রহের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের দাবি, আকারে ছোট হলেও পৃথিবীর উপর মঙ্গলের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। পৃথিবীর চেয়ে তার প্রতিবেশী মঙ্গলগ্রহ আকারে অনেক ছোট। ভর পৃথিবীর ভরের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। তবু এই ‘ক্ষুদ্র’ মঙ্গলকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কী ভাবে সাড়ে ২২ কোটি কিলোমিটার দূরে থেকেও ছোট্ট লালগ্রহটি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, বিজ্ঞানীরা তা জানতে নানারকম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তেমনই একটি গবেষণায় মিলেছে নতুন হদিস। বিজ্ঞানের এত দিনের ধারণাকেই তা বদলে দিতে পারে। পৃথিবীর জলবায়ুর উপর মঙ্গলগ্রহের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের দাবি, ছোট হলেও পৃথিবীর উপর মঙ্গলের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এই মঙ্গলই পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অনেকাংশে দায়ী। এমনকি, পৃথিবীর বুকে তুষারযুগও ডেকে আনতে সাহায্য করেছিল মঙ্গলগ্রহ। আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই নতুন হদিস পেয়েছেন। গবেষণাপত্রে তা ব্যাখ্যাও করেছেন। তুষারযুগের সঙ্গে মঙ্গলের কী সম্পর্ক? বিজ্ঞানীদের দাবি, মঙ্গলের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অক্ষের ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করে। তারই প্রভাব পড়ে জলবায়ুতে। আসলে মঙ্গলের আকর্ষণ পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অক্ষকে সর্বক্ষণই ধাক্কা দিচ্ছে। এই ধাক্কার প্রভাব চট করে টের পাওয়া যায় না। সঙ্গে সঙ্গে কক্ষপথে কোনও পরিবর্তনও হয় না। তবে কয়েক হাজার বছর ধরে মঙ্গলের এই ধাক্কা কক্ষপথের আকার বদলে দিতে পারে। কক্ষপথের সঙ্গে পৃথিবীর অক্ষ যে কোণ তৈরি করে রয়েছে, বদলে যেতে পারে তা-ও। এর ফলে পৃথিবীতে সূর্যালোকের বিকিরণে তারতম্য ঘটে। তুষারযুগের সময়েই তা-ই হয়েছিল, দাবি বিজ্ঞানীদের। পৃথিবীর উপরিভাগে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণকে নিয়ন্ত্রণ করে মিলানকোভিচ চক্র। এই চক্রে মঙ্গলের প্রভাব আবিষ্কার করে চমকে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অত্যাধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তাঁরা গবেষণাগারে সৌরজগতের একটি মডেল (প্রতিরূপ) তৈরি করেছিলেন। সেখানে মঙ্গল গ্রহকে রেখে এবং মঙ্গলকে সরিয়ে দিয়ে পৃথিবীর গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। কয়েক হাজার বছরের গবেষণার তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়। মঙ্গলের ধাক্কা সম্পর্কে তার পর নিশ্চিত হন গবেষকেরা। বিজ্ঞানীদের দাবি, মঙ্গলের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে প্রতি বছরই পৃথিবীর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন ঘটছে। কক্ষপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে অক্ষের কৌণিক অবস্থানও। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিভিন্ন ঋতুতে সূর্যালোকের বিকিরণ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। হিমবাহের গতিবিধি, ঋতুচক্র কক্ষপথের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মঙ্গল না থাকলে পৃথিবী বর্তমান অবস্থায় পৌঁছোতেই পারত না। যে অবস্থায় থাকত, তার সঙ্গে বাস্তবের ফারাক হত আকাশ-পাতাল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ছোট আকারের গ্রহগুলি সৌরজগতে তার পারিপার্শ্বিকের উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। মঙ্গল নিয়ে নতুন গবেষণা সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর ভবিষ্যতের জলবায়ু সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পৃথিবীর উপর মঙ্গলের প্রভাব পড়েই চলেছে। তার ফলে আগামী দিনেও তুষারযুগের মতো জলবায়ুর কোনও চরম পর্যায়ের সাক্ষী হতে পারে পৃথিবী। এমনকি, প্রতিবেশী গ্রহের বাসযোগ্যতাকেও মঙ্গল প্রভাবিত করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাস, বাস্তুতন্ত্রের দিকে নতুন এই গবেষণা আলোকপাত করেছে। এর ফলে আগামী দিনেও বিজ্ঞানীরা উপকৃত হবেন। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত একাধিক বার তুষারযুগ এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তা চলেছে। প্রাচীম হিমযুগগুলি তুলনামূলক তীব্রতর ছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেই সময় বরফে ঢেকে গিয়েছিল সমগ্র পৃথিবী। কোনও অংশই বাদ যায়নি। কেন প্রাচীন তুষারযুগ পরের তুষারযুগগুলির চেয়ে বেশি তীব্র ছিল, তার ব্যাখ্যা এত দিন মেলেনি। নতুন গবেষণার পর এখানেও মঙ্গলের কারসাজি দেখছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তবে আগামী দিনে ফের মঙ্গলের প্রভাব পৃথিবীতে হিমযুগ ঘনিয়ে তুলবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট করে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি।
উষ্ণায়ন এবং তুষারযুগ— আপাত ভাবে দু’টি বিষয়কে বিপরীতধর্মী বলে মনে হতেই পারে। তবে আসলে তা নয়। বরং, দু’টি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে ভীষণ ভাবে জড়িত। এমনকি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা প্রভাবিত করতে পারে তুষারযুগকেও। এগিয়ে আনতে পারে পরবর্তী তুষারযুগ। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনটাই দাবি করা হয়েছে। উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমশ ঘেঁটে যাচ্ছে পৃথিবীর কার্বন ডাই অক্সাইডের স্বাভাবিক চক্র। এবং তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমুদ্রের তলার বাস্তুতন্ত্রে। এমনটা চলতে থাকলে পৃথিবী ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে যাবে। উষ্ণায়নকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরবর্তী হিমযুগ এগিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর জলবায়ু কেমন থাকবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে পাথরের ক্ষয়ের উপর। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাছে এ তত্ত্ব অনেক আগে থেকেই স্বীকৃত। তবে গত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, জলবায়ুর উপরে শিলাক্ষয়জনিত প্রভাবের প্রক্রিয়াটি ধীর এবং নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এটিকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসাবে দেখা হত, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রায় খুব বেশি হেরফের হওয়া আটকায়। কিন্তু এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন, অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পৃথিবীকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শীতল করে তুলতে পারে এই প্রক্রিয়া। সম্প্রতি ‘সায়েন্স’ জার্নালে ওই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। পাথরের ক্ষয় কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে জলবায়ু? এটি আসলে একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। পাথরের ক্ষয়কে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বলা চলে। কী ভাবে চলে এই প্রক্রিয়া? বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড সহজেই জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। পরে সেই কার্বন ডাই অক্সাইড বৃষ্টির সঙ্গে ভূপৃষ্ঠে নামে আসে। এই বৃষ্টির জল যখন কোনও পাথরের উপরে, বিশেষ করে গ্রানাইটের মতো সিলিকেট শিলার উপরে পড়ে— তা এক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায় এবং পাথর ক্ষয়ে যেতে থাকে। ওই ক্ষয়ে যাওয়া পাথর গিয়ে মেশে সমুদ্রে। ওই পাথরের সঙ্গে মিশে থাকা কার্বনও সমুদ্রে মিশে যায়। সমুদ্রের নীচে তা-ই ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিশে তৈরি করে চুনাপাথরের প্রবাল প্রাচীর। সমুদ্রগর্ভে তা জমতে থাকে। এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কার্বনকে সমুদ্রগর্ভে আটকে রাখে। ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষকদলের প্রধান অ্যান্ডি রিজ়ওয়েলের কথায়, “পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, পাথরও তত দ্রুত ক্ষয় হবে। ফলে আরও বেশি পরিমাণে কার্বন সমুদ্রে জমা হবে। এতে পৃথিবী আবার শীতল হয়ে যাবে।” পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত অনেকগুলি তুষারযুগ এসেছে। বিশ্বের প্রাচীনতম হিমযুগগুলি অনেক বেশি তীব্র ছিল। ওই সময়ে প্রায় গোটা পৃথিবীই বরফ এবং তুষারে ঢেকে গিয়েছিল। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই প্রশ্ন থেকেই এই গবেষণার সূত্রপাত। এত দিন গবেষকদের ধারণা ছিল, শিলাক্ষয়ের মাধ্যমে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় ভাবে তাপমাত্রার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। তবে প্রাচীন হিমযুগগুলি কেন এত চরম ছিল, সেই ব্যাখ্যা মেলেনি শিলাক্ষয়ের মাধ্যমে জলবায়ু নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থেকে। সেই সূত্র ধরেই গবেষণায় নতুন তথ্য উঠে আসে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের হাতে। নতুন গবেষণায় সমুদ্রগর্ভের কার্বন চক্র বিশ্লেষণ করে দেখেন বিজ্ঞানীরা। তাতে দেখা যায়, এর সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে শিলাক্ষয়ও বেশি হয়। একই সঙ্গে প্রচুর ফসফরাসও ধুয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে। এই ফসফরাস প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন (জলজ পরিবেশে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র উদ্ভিদের সমষ্টি)-কে পুষ্টি জোগায়। ফলে সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই প্ল্যাঙ্কটন সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। মারা যাওয়ার পরে এগুলি ডুবে যায় সমুদ্রের তলায়। একই সঙ্গে এদের মধ্যে থাকা কার্বনও সমুদ্রের তলায় জমে যায়। ফরে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড কমে গিয়ে তা সমুদ্রের নীচে জমা হতে থাকে। উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে এই প্রক্রিয়া বদলে যেতে পারে। সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটন বৃদ্ধি পেয়ে তা অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। অক্সিজেন কমে যাওয়ায় সমুদ্রের তলায় চাপা পড়ে যাওয়া ফসফরাস আবার জলে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। এই ফসফরাস সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটন আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সেগুলি মারা যাওয়ার পরে অক্সিজেনের মাত্রা আরও কমে আসবে। ফলে প্ল্যাঙ্কটন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চক্রাকারে চলতে থাকবে। এমনটা হতে থাকলে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড প্রচুর পরিমাণে সমুদ্র গর্ভের কার্বন হিসাবে জমতে থাকবে। ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কমে জলবায়ুকে শীতল করে তুলতে পারে। এমনকি পরবর্তী হিমযুগকে আরও এগিয়ে আনতে পারে। পরবর্তী হিমযুগ এগিয়ে আসতে পারে কি না, সেটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ‘গৌণ’ বলেই মনে করছেন গবেষকদলের প্রধান রিজ়ওয়েল। বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কী ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটিই আগে দেখা উচিত বলে মনে করছেন তিনি। রিজ়ওয়েলের কথায়, “পরবর্তী তুষারযুগ ৫০ হাজার, ১ লক্ষ নাকি ২ লক্ষ বছর পরে শুরু হবে— তাতে কি দিনের শেষে আমাদের খুব বেশি কিছু যায় আসে? আমাদের এখন দেখতে হবে উষ্ণায়নকে কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সে দিকেই মন দিতে হবে। এক সময় না এক সময় পৃথিবী আবার শীতল হয়ে যাবে— তা সে যতই ধীর গতিতে হোক না কেন।” পৃথিবীর পড়শি গ্রহ মঙ্গলে যে একসময় তরল জলের অস্তিত্ব ছিল, তা প্রমাণিত। কিন্তু যে দিন এই তথ্য সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সে দিন থেকে তাঁরা হিসাব মেলাতে পারছেন না। মঙ্গলগ্রহ তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে মস্ত এক ধাঁধা। হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা হওয়া সত্ত্বেও কী ভাবে জল তরল অবস্থায় ছিল মঙ্গলে? শুধু তো জল নয়, আস্ত নদী বইত মঙ্গলের মাটিতে! কী ভাবে তা সম্ভব? নতুন গবেষণায় অবশেষে সেই ধাঁধার উত্তর মিলেছে।
বর্তমানে মঙ্গল গ্রহে তরল জল নেই। রয়েছে বরফ। এখন যে গ্রহকে পৃথিবী থেকে দেখা যায়, মহাকাশযান বা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যে গ্রহের ছবি তুলে আনা হয়, তা রুক্ষ, শুষ্ক এবং তুষারাবৃত। কিন্তু এই মঙ্গলে অতীতের জলের অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। স্রোতের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া খাদ, নদী অববাহিকা, বিশাল হ্রদ এবং মাটিতে তৈরি হওয়া পলির আস্তরণ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। কোনও বিধ্বংসী বন্যার কারণে এক ধাক্কায় সেই পলি জমেনি। তা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। মঙ্গলের মাটি সেই পলির স্তরকে লালন করেছে বছরের পর বছর ধরে। মঙ্গলের আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল নিয়ে পৃথিবীতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানসম্মত মডেলই দেখিয়েছে, ওই আবহাওয়ায় জল তরল অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়। তাপমাত্রা সেখানে থাকে হিমাঙ্কের নীচে। তার পরেও দীর্ঘস্থায়ী নদী, হ্রদ কী ভাবে মঙ্গলে টিকে থাকল, তা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত এবং বিভ্রান্ত করেছে বার বার। জল কি তার স্বাভাবিক শর্ত থেকে সরে এসেছিল? সম্প্রতি আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী গবেষণার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এর ফলে মঙ্গল নিয়ে দীর্ঘ দিনের রহস্যের কিনারা হতে চলেছে বলে মত মহাকাশবিজ্ঞানীদের একাংশের। গবেষণাগারে কৃত্রিম ভাবে মঙ্গলের অতীতের বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, মঙ্গলে জল তরল রাখতে গরম আবহাওয়ার প্রয়োজনই পড়ত না! বরফের পাতলা চাদর তৈরি হত নদী এবং হ্রদের টলটলে জলের উপরে। তা-ই ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। বরফের ওই পাতলা আস্তরণ আসলে জলের উপর শীতকালীন কম্বলের মতো কাজ করত। উপরে থাকত বরফের স্তর, আর তার নীচ দিয়ে দিব্যি বয়ে যেত নদী! বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তরল জলের উপর কঠিন বরফের এই পাতলা আবরণ ছিল আসলে মরসুমি। শীতকালে ওই আস্তরণ পড়ত। শীত কেটে গেলে আবার তা মিলিয়ে যেত। ফলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নীচে থাকলেও বরফের ওই চাদরের নীচে তার কোনও প্রভাব পড়ত না। দশকের পর দশক ধরে এ ভাবেই মঙ্গলে নদী এবং হ্রদ জলে ভরে থেকেছে। সেই জল জমে বরফ হয়ে যায়নি। পৃথিবীর মতো উষ্ণ আবহাওয়া না-থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে দীর্ঘ দিন ধরে মঙ্গলগ্রহে হ্রদগুলি জলে ভরে ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও মিলছে মার্কিন বিজ্ঞানীদের এই নতুন ব্যাখ্যা থেকে। মঙ্গলের সঙ্গে সূর্যের দূরত্ব ২২ কোটি ৮০ লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবীতে সূর্যের যে পরিমাণ আলো এসে পৌঁছোয়, মঙ্গল তার চেয়েও অনেক কম সূর্যালোক পায়। সেখানে সূর্যের আলো যথেষ্ট ক্ষীণ। কোটি কোটি বছর আগে সেই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও ছিল অনেক বেশি। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে কৃত্রিম বায়ুমণ্ডলের মডেল তৈরি করা হয়েছিল আমেরিকার গবেষণাগারে। সেখান থেকেই বরফের পাতলা আস্তরণের তত্ত্ব উঠে এসেছে। এই আস্তরণ মরসুমের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেত। মঙ্গলের তরল জলের উপর শক্ত, ভারী কোনও বরফের ঢাকনা বা পুরু হিমবাহের আস্তরণ ছিল না, বিজ্ঞানীরা তা নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন হিউস্টনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এলিনর মোরল্যান্ড। তিনি বলেছেন, ‘‘মঙ্গলের মাটিতে প্রাচীন হ্রদের অববাহিকা দেখেছিলাম। এক মরসুমের বেশি সেখানে তরল জল থাকা সম্ভব কি না, আমার মনে সে প্রশ্ন জেগেছিল। কিন্তু আমাদের নতুন মডেল দেখাল, শুধু পাতলা একটা মরসুমি বরফের চাদরের নীচেই দশকের পর দশক ধরে হ্রদ জলে ভরে থাকতে পারে। এখন আমরা মঙ্গলে যা দেখতে পাই, তার একটা ব্যাখ্যা এখান থেকে পাওয়া গেল। এতে আমরা খুব খুশি।’’বরফের পাতলা আস্তরণ আসলে শীতে জলের বাষ্পীভবন প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দিত। কমিয়ে দিত জলের তাপহ্রাসের গতি। শীত কমলে সূর্যালোক সেই আস্তরণের উপর পড়ত এবং জল গরম হত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রদগুলির জলস্তরে তেমন পরিবর্তন হয়নি। গবেষক ক্রিস্টেন সিব্যাচের কথায়, ‘‘এই বরফের আস্তরণ জলের উপর প্রাকৃতিক কম্বলের মতো কাজ করত। যেহেতু বরফ খুব পাতলা ছিল, তার কোনও প্রমাণ বা ছাপ এত দিন পরে মঙ্গলের মাটিতে নেই। আমাদের কোনও রোভারও তা খুঁজে পায়নি।’’ মঙ্গলের নিরক্ষরেখা সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে বিশাল গর্ত গেল ক্রেটার। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কিউরিয়সিটি রোভার দীর্ঘ দিন সেই এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে চলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই নমুনাও কাজে লেগেছে। বলা হচ্ছে, তাপমাত্রা বা জলবায়ুর খুব বড় কোনও পরিবর্তন না-হলে পাতলা বরফের চাদরের নীচে কয়েক দশক পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে তরল জল। মঙ্গলে সেটাই ঘটেছে। পৃথিবীর প্রাচীন আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল কৃত্রিম ভাবে পুনর্নির্মাণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি জলবায়ুর মডেল আগেই তৈরি করেছিলেন। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল বানাতে সেই মডেল ব্যবহার করেছেন মার্কিন গবেষকেরা। মঙ্গলে কোনও গাছ নেই। তার পরিবর্তে বিজ্ঞানীদের পাথরের স্তর এবং খনিজের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।





