দুই দিনের বঙ্গ সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার মালদহে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন ও পাশাপাশি একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন করার পর মালদহে কচিকাঁচাদের সঙ্গে কথা বলছেন। মালদহ স্টেশনে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার কোচের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সবুজ পতাকা নাড়িয়ে নতুন ট্রেনের যাত্রা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সরকারি সভা থেকে তিনি মোট ৩,২৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন। বাংলা সফরের প্রথম দিনে মালদহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মালদা টাউন থেকে চালু হল বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন। এই ট্রেনের উদ্বোধনে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত মালদহবাসী। অসমের উদ্দেশে রওনা হল সেই ট্রেন। এদিন ট্রেন উদ্বোধনের পর ট্রেনের ভিতরে প্রবেশ করে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন মোদী। এদিন মালদহে সভাও করেন। ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার সর্বোচ্চ গতিবেগ এই ট্রেনের। তবে ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিবেগে চলবে এই ট্রেন। মোট ১৮টি কামরা রয়েছে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনে। মোট ৮২৩ যাত্রী এই ট্রেনে সফর করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মালদহের জনসভা থেকে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রায় গোটা পূর্ব ভারত বিজেপির শাসনাধীন। ‘প্রায়’ কারণ, পূর্ব ভারতের ঝাড়খন্ড এখনও বিজেপির দখলে নয়। কিন্তু তাঁদের ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ আটকে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে। সেই বাধা এ বার টপকাবেন বলে ‘আত্মবিশ্বাস’ দেখালেন মোদী। উন্নয়ন চাইলে বিজেপি-কে যে ক্ষমতায় আনতেই হবে, সে বার্তাও প্রকারান্তরে শুনিয়ে দিলেন।
মোদীর কথায়, ‘‘আজ আমাদের দেশ কাজ করছে ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। আর উন্নত দেশ হয়ে উঠতে গেলে পূর্ব ভারতের উন্নতি খুব জরুরি।’’ পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে বিজেপির পতাকা উড়তে যে অনেকটা সময় লেগেছে, মোদীর ভাষণে শনিবার সে সংক্রান্ত আক্ষেপের আভাসও স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, ‘‘দশকের পর দশক ধরে ঘৃণার রাজনীতি করা লোকেরা পূর্ব ভারতকে কব্জা করে রেখেছিল। বিজেপি এই রাজ্যগুলিকে ঘৃণার কারবারিদের কব্জা থেকে মুক্ত করেছে। আজ পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির আস্থা কোনও দলের উপরে যদি থাকে, তা হলে সেই দলের নাম হল ভারতীয় জনতা পার্টি।’’রবিবার মোদী আসছেন সিঙ্গুরে সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন তথা জনসভায় বক্তৃতা করতে। আশা করা যায়, দুপুরের ওই সভা থেকে তিনি টাটা, ন্যানো, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের প্রসঙ্গ তুলে রাজ্য সরকার তথা মমতার কড়া সমালোচনা করবেন। শনিবার মালদহের সভা সেরে প্রধানমন্ত্রী চলে গিয়েছেন অসমে। গুয়াহাটিতে রাত্রিবাস করে তিনি আবার রবিবার ফিরবেন পশ্চিমবঙ্গের কর্মসূচির জন্য। সিঙ্গুরের সভা সেরে তাঁর দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর তথা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্ক চলছে। সেই আবহেই অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গ টেনেছেন মোদী। বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর যে সব দেশ উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ, যেখানে অর্থের কোনও অভাব নেই, তারাও নিজেদের দেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো খুব জরুরি।’’ মোদীর কথায়, ‘‘তৃণমূলের নেতা, তৃণমূলের সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে এখানে অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকাচ্ছে, তাদের ভোটার বানানোর খেলা খেলছে। সেই অনুপ্রবেশকারীরা গরিবের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে, যুব সমাজের কাজ ছিনিয়ে নিচ্ছে, মেয়েদের সম্মান ছিনিয়ে নিচ্ছে, আর সন্ত্রাস ছড়ানোর কাজ করছে।’’ মালদহ, মুর্শিদাবাদ-সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার জনবিন্যাস শুধু নয়, এই অনুপ্রবেশের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভাষাও বদলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন।পাশাপাশিই মতুয়া তথা শরণার্থীদের উদ্দেশে মোদীর আশ্বাসবাণী, ‘‘যাঁরা শরণার্থী, যাঁরা মতুয়া, নমশূদ্র সমাজের লোক, যাঁরা প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় কারণে হওয়া হিংসার হাত থেকে বাঁচতে এখানে এসেছেন, তাঁদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সংবিধান তাঁদের ভারতে থাকার অধিকার দিয়েছে। মোদী সিএএ-র মাধ্যমে শরণার্থীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে।’’ গত কয়েক দিন ধরে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় চলতে থাকা অশান্তির খবরও যে তাঁর কাছে রয়েছে, মোদী তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। মহিলা সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, ‘‘এর থেকেই স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গে নারীদের কোনও নিরাপত্তা নেই।’’
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আবহে পূর্ব ভারতে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির কথা বলতে গিয়ে মোদী প্রথমেই ওড়িশায় প্রথম বার বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার কথা বলেন। তার পরে অসম ও ত্রিপুরায় একাধিক বার সরকার গঠন এবং গত কিছু বছরের একের পর এক নির্বাচনে জয়ের কথা মনে করিয়ে দেন। সব শেষে বিহারের কথা এবং সেই সূত্র ধরেই পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে বিহারে আবার বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার হয়েছে। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের চার দিকে এখন বিজেপির সুশাসনের সরকার রয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গে সুশাসনের পালা।’’ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় তথা সরকার গঠন যাতে কারও কাছে ‘অসম্ভব কল্পনা’ বলে মনে না-হয়, তার জন্য সদ্যসমাপ্ত মহারাষ্ট্র পুরভোটের প্রসঙ্গ টেনেছেন মোদী। মুম্বই কী ভাবে প্রথম বার বিজেপির মেয়র পেতে চলেছে, কী ভাবে কেরলের রাজধানী তিরুঅনন্তপুরমে প্রথম বার বিজেপির মেয়র শপথ নিয়েছেন, সে কথাও উল্লেখ করেছেন। তার পরে বলেছেন, ‘‘যেখানে আগে বিজেপির জয় অসম্ভব মনে করা হত, সে সব জায়গাতেও বিজেপি অভূতপূর্ব সমর্থন পাচ্ছে। এতে প্রমাণ হয়, দেশের ভোটদাতা, দেশের জেন-জ়ি বিজেপির উন্নয়নমূলক কাজের উপরে কতটা ভরসা করে।’’
দুর্নীতি প্রসঙ্গে তৃণমূলকে আক্রমণ করতে গিয়ে আবাস যোজনা, নলবাহিত পানীয় জল, বিনামূল্যে রেশন-সহ নানা প্রকল্পের সুবিধা ‘লুট’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। মালদহে বন্যাত্রাণের নামে কতটা দুর্নীতি হয়েছে, সে সংক্রান্ত সিএজি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে নিখরচায় চিকিৎসা বা ‘পিএম সূর্যঘর’ প্রকল্পে বাড়ির ছাদে সোলার প্ল্যান্ট বসিয়ে বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামিয়ে আনার সুযোগ থেকে তৃণমূল সরকার পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বঞ্চিত রাখছে বলে অভিযোগ করেছেন। মালদহের আমচাষি, রেশমচাষি, পাটচাষিদের উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, তৃণমূলের সরকার এই চাষিদের জন্য বা তাঁদের উৎপাদনকে কাজে লাগানোর জন্য কোনও উদ্যোগ নেয়নি বলে এই চাষিদের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে না। গঙ্গা, ফুলহার, মহানন্দার ভাঙন এবং প্রতি বছর হওয়া বন্যার হাত থেকে মালদহবাসীকে রক্ষা করার জন্য তৃণমূলের সরকার কিছুই করেনি বলেও তোপ দেগেছেন।
পশ্চিমঙ্গের সব দিকেই বিজেপি সরকার গঠিত হয়ে গিয়েছে বলে মোদী বোঝানোর চেষ্টা করলেও ঝাড়খন্ডেও এখন অ-বিজেপি সরকার চলছে। তা সত্ত্বেও মমতার ‘দুর্গ’ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকি পূর্ব ভারতকে বিজেপির দখলে আনা সম্পন্ন হয়েছে বলে কেন বোঝাতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। জবাবে অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সম্প্রতি স্ত্রী কল্পনা সোরেনকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। সেই বৈঠকের পর থেকেই জল্পনা ছড়িয়েছে যে, ‘ইন্ডিয়া’ শিবির ছেড়ে হেমন্ত এনডিএ-তে শামিল হতে পারেন। তেমন হলে ঝাড়খন্ডও মোদীর ছাতার তলাতেই চলে আসবে।





