Saturday, April 25, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

নিষিদ্ধ’ অনির্বাণকে নিতে চলেছেন দেব? টলিউড তারকার সরাসরি চ্যালেঞ্জ টলিউডের ‘বিশ্বাস’ স্বরূপকে!‌

স্বরূপের সঙ্গে কার্যত সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হতে চলেছেন দেব। তিনি এবং শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় জুটি বেঁধে যে ছবি করতে চলেছেন, তাতে মূল খলনায়কের চরিত্রে নেওয়া হচ্ছে অভিনেতা অনির্বাণকে। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে এখনও তাঁর কথাই আইন। বলতে গেলে অলিখিত রাজ চালান এই বিশ্বাস। সাধারণত সকলেই ইন্ডাস্ট্রির সেই আইন মেনে চলেন। এখনও পর্যন্ত চলেছেন। স্বরূপ বিশ্বাস। রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সহোদর। ঘটনাচক্রে, অরূপ টালিগঞ্জের বিধায়কও বটে। খানিক দাদার বলে বলীয়ান হয়ে এবং খানিক নিজের এলেমে স্বরূপ ‘দেখভাল’ করেন টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের সংগঠন ফেডারেশনের। যে ফেডারেশনের নির্দেশ মেনে চলতে হয় সকলকে। নইলে টালিগঞ্জে কাজ করা সম্ভব হয় না। পরিস্থিতি এমনই যে, যাঁরা একদা ফেডারেশনের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই ফেডারেশনের ছায়াতলে চলে গিয়েছেন। স্বরূপের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হয়েছে তাঁদের।

এই আবহে স্বরূপের সঙ্গে কার্যত সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হতে চলেছেন টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার দেব। তিনি এবং শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় জুটি (যে জুটির নাম ভক্তদের কাছে ‘দেশু’) বেঁধে যে ছবি করতে চলেছেন, তাতে মূল খলনায়কের চরিত্রে নেওয়া হচ্ছে অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে। যাঁর উপরে ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’ জারি করে রেখেছেন স্বরূপ। শেষমুহূর্তে নাটকীয় কোনও পরিবর্তন না হলে অনির্বাণের নাম দেব নিজেই ঘোষণা করবেন তাঁর আসন্ন ছবির অন্যতম একটি চরিত্রের অভিনেতা হিসাবে। সম্ভবত এই প্রথম বার তিনি খোলাখুলি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছেন। যে চ্যালেঞ্জ বদলে দিতে পারে বাংলা ছবির জগতের রাজনৈতিক ভারসাম্য। এর মধ্যে যতটা না চরিত্রায়ণ রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে টালিগঞ্জকে জড়িয়ে শাসক তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যে রাজনীতিতে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ছেন দেব-স্বরূপ। বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে ছবি করায় দেব দলের অন্দরে একাংশের কাছে প্রবল কটাক্ষের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থেকেছেন। দেব-মিঠুনের অভিনীত ছবি ‘প্রজাপতি ২’ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। সে ছবির বাণিজ্য কেমন হয়েছে, তা ওয়াকিবহাল মহল বলতে পারবে। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি জোরালো ছিল দেবের তরফে ‘বিবৃতি’। যে, প্রযোজক হিসাবে পেশাগত প্রয়োজনে তিনি যাকে উপযুক্ত মনে করবেন, তাঁকেই তাঁর ছবিতে নেবেন। সেখানে সংশ্লিষ্ট অভিনেতার রাজনৈতিক পরিচয় বা বিশ্বাস বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

অনির্বাণকে তাঁর ছবিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তও দেবের তরফে সেই রকমই একটি ‘বিবৃতি’! টালিগঞ্জের যে নির্দেশক, পরিচালক বা অভিনেতারা স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে এখনও বেঁকে বসে রয়েছেন অনির্বাণ এবং পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী (কবি)। পরিচালক সুব্রত সেনও ‘ভুল’ স্বীকার করেননি। বাকি যাঁরা একদা বেঁকে বসেছিলেন, সেই কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল মুখোপাধ্যায়, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, সুদেষ্ণা রায়েরা ভিডিয়ো রেকর্ড করে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ মিটিয়ে নিয়েছেন। মিটিয়ে নেওয়ার তালিকায় সর্বশেষ নাম পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। আর ওই তালিকায় সর্বাগ্রে ছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং অরিন্দম শীল। যাঁরা ‘মিটমাট’-এ যাননি, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম নিঃসন্দেহে অনির্বাণ। যাঁর অভিনয় যোগ্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর ‘রাজনৈতিক যোগ্যতা’ একেবারেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। যে কারণে তাঁকে টালিগঞ্জের ছবিতে কাজ দেওয়ার উপর ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’ রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁকে কোনও ছবিতে নেওয়া যাবে না। নিলে সেই ছবির শুটিংয়ে ফেডারেশনের কোনও কলাকুশলী এবং টেকনিশিয়ান কাজে আসবেন না। প্রসঙ্গত, নিজের ছবির শুটিংয়ে ফেডারেশনের পছন্দমতো (সংখ্যাগত ভাবেও) টেকনিশিয়ানদের নিতে বাধ্য থাকেন পরিচালক-প্রযোজকেরা। সেই নিয়োগ ছবির ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ নয়। নইলে কোনও টেকনিশিয়ানই কাজে আসেন না। প্রসঙ্গত, লাইটম্যান, স্পটবয়-সহ বিভিন্ন ধরনের টেকনিশিয়ানদের মোট ২৬টি গিল্ড রয়েছে। সেই সমস্ত গিল্ড নিয়েই ফেডারেশন। যার মাথায় রয়েছেন স্বরূপ। ফেডারেশনের কথার অন্যথা হলে শুটিং হয় না। অতীতে এই ঘটনা ঘটেছে একাধিক বার। ফলে শুটিং আটকে গিয়েছে। ছবির কাজ পিছিয়ে গিয়েছে। কোনও কোনও প্রযোজনা সংস্থা বিদেশে গিয়ে শুটিং করেছেন তাঁদের ছবির। যাঁরা তা পারেননি, সেই ‘শান্তিকামী’ প্রযোজক-পরিচালকেরা আপস করে নিয়েছেন।

কিন্তু দেবের বিষয় আলাদা। প্রথমত, তিনি নিজের জোরে সুপারস্টার। দ্বিতীয়ত, তিনি তৃণমূলের সাংসদ। তৃতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন। চতুর্থত, গত লোকসভা ভোটের সময় থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের ভোটে ঘাটাল থেকে লড়তে চাননি দেব। মনস্থির করেও ফেলেছিলেন। তখন তাঁকে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে ডেকে বৈঠক করেন অভিষেক। সেখান থেকে দেব যান কালীঘাটে মমতার সঙ্গে দেখা করতে। অতঃপর তিনি ভোটে না-লড়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং ঘাটাল থেকে আবার সাংসদ হন। এই শর্তে যে, ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’-এর কাজ তাঁর এই মেয়াদেই শুরু করতে হবে। সে কাজ শুরুও হয়েছে।

অর্থাৎ, দেব তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ‘ভরসা এবং আস্থা’ অর্জন করে ফেলেছেন। কালীঘাট এবং ক্যামাক স্ট্রিট— উভয় দফতরেই তাঁর গতিবিধি অবাধ। ফলে তৃণমূলের অন্দরে তাঁর প্রাধান্যও অগাধ। তৃণমূল সূত্রের খবর, যত বারই নিজের ছবি নিয়ে দেব কোনও সমস্যায় পড়েছেন, তত বারই মমতার শরণাপন্ন হয়েছেন। অতএব, অনুমান করা আশ্চর্য নয় যে, স্বরূপের ‘অলিখিত ফতোয়া’ তিনি কেন অগ্রাহ্য করতে চলেছেন। এর সমান্তরালে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি অভিষেক আহূত তৃণমূলের ‘ডিজিটাল যোদ্ধা কনক্লেভ’-এ দেবকে দেখা গিয়েছে। আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং তাঁর দফতরে ইডির অভিযানের পর মমতার সঙ্গে দেবকে কলকাতার রাজপথে মিছিলেও দেখা গিয়েছে। আবার বুধবার সন্ধ্যায় নন্দন ২ প্রেক্ষাগৃহে অভিষেক যখন রাজ চক্রবর্তীর তৈরি ছবি ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’ দেখতে গিয়েছেন, তখন সেখানে অরূপকে দেখা যায়নি। এই বদলে-যাওয়া সমীকরণও তৃণমূলের অন্দরে আলোচিত হচ্ছে।

এই আবহে দেব অনির্বাণকে তাঁর ছবিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই অনির্বাণ, যাঁকে টালিগঞ্জে ছবির কাজ না পেয়ে গানের দল খুলে শো করতে হচ্ছে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য। তৃণমূলের অন্দরের খবর, পরিস্থিতি আরও ‘ঘোরালো’ হয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে। যার কেন্দ্রে রয়েছে টালিগঞ্জের স্ক্রিনিং কমিটি। ওই কমিটিকে মানতে রাজি নন দেব। তাদের বৈঠকেও যোগ দেননি তিনি। প্রসঙ্গত, ওই কমিটি গঠিত হয়েছিল গত দুর্গাপুজোর সময় একাধিক বড় ছবির একই সঙ্গে মুক্তি এবং তাদের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বেনজির গোলমালের কারণে। যে সময় দেবকেও তাঁরই দলের একাংশের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল। সূত্রের খবর, তখন তিনি বিষয়টি জানিয়েছিলেন স্বয়ং মমতাকেই।

দুর্গাপুজোর সময় চারটি ছবির মুক্তি নিয়ে যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে ওই স্ক্রিনিং কমিটি ঠিক করে, প্রতি বছরে ছবি মুক্তির জন্য যে পাঁচটি সময় (সরস্বতীপুজো, গরমের ছুটি, ১৫ অগস্টের সপ্তাহান্ত, দুর্গাপুজো এবং বড়দিনের ছুটি) রয়েছে, সেই দিনগুলিতে তাঁরাই ছবি আনতে পারবেন, যাঁরা বছরে অন্তত তিনটি করে ছবি তৈরি করবেন। তিনটির কম ছবি যাঁরা বছরে তৈরি করেন, তাঁরা এই পাঁচটি সময় বা দিন পাবেন না। ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে আগে আপত্তি তোলেন দেব। ১২ সদস্যের ওই স্ক্রিনিং কমিটিতে স্বরূপ তো রয়েইছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পিয়া সেনগুপ্ত (অভিনেতা বনি সেনগুপ্তের মা), শ্রীকান্ত মোহতা, নিসপাল সিংহ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রানা সরকার প্রমুখ। ঘটনাচক্রে, দেব সরাসরি জানিয়ে দেন, তিনি ওই স্ক্রিনিং কমিটির প্রস্তাব (মতান্তরে ‘নির্দেশ’) মানেন না। কমিটি তাঁর সমালোচনাও করে। সূত্রের খবর, তার পরে অন্য এক প্রযোজক দেবকে গিয়ে জানান, তিনি স্ক্রিনিং কমিটি সম্পর্কে যা বলেছেন, তাঁকে তা প্রত্যাহার করতে হবে। অসমর্থিত সূত্রের খবর, দেবকে কমিটির কাছে দুঃখপ্রকাশ করতে বলা হয়েছিল। তেমন কিছু করা তো দূরস্থান, দেব আবার তৃণমূলের শীর্ষস্তরে বিষয়টি জানান। যা ঘটেছে, সে বিষয়ে দলের শীর্ষনেতৃত্ব তাঁদের বিরক্তির কথা যথাযোগ্য স্থানে জানিয়েও দেন। সেখান থেকে আবার দেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অসমর্থিত সূত্রের খবর, ওই পরিস্থিতি স্বরূপের (কমিটির নয়) কী করণীয়, সে বিষয়ে দেব একটি প্রস্তাব দেন। স্বরূপ তা এখনও মেনে নেননি বলেই খবর। এর মধ্যেই দেব তাঁর পরের ছবিতে অনির্বাণকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বলে খবর। শেষমুহূর্তে কোনও নাটকীয় রদবদল না হলে বা দলের শীর্ষমহল থেকে তাঁকে আপাতত পিছিয়ে আসতে না বলা হলে দেব কয়েক দিনের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণাও করে দেবেন, যা আদতে তাঁর তরফে স্বরূপকে চ্যালেঞ্জ করে খোলা বিবৃতি। দেব সেই ঘোষণা করলে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিকে ঘিরে শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার। এ-ও দেখার যে, ওই ঘটনায় বাংলা ছবির জগতের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র বদলে যায় কি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles