স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন ১২ জানুয়ারী। ঠিক তার আগের দিন ১১ জানুয়ারী পাঁচ শতাধিক শিশুদের নিয়ে আনন্দ উৎসব উদযাপন করলেন সর্বভারতীয় হরিজন সেবক সঙ্ঘের প্রধান শঙ্কর স্যান্যাল। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। প্রান্তিক শিশুরা ভিড় জমিয়েছে। ঘুসুড়ি শঙ্করমঠের বিশাল প্রাঙ্গন জুড় বসেছে যেন লাল নীল সবুজের মেলা। এদিক ওদিক খেলে বেড়াচ্ছে শিশুরা। শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির থেকে শুরু করে দেদার খাওয়াদাওয়া। তৎসহ খেলার সরঞ্জাম প্রদান। শিশুদের অভিভাবকরাও বাদ গেলেন না। শিশুদের সঙ্গে একইভাবে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠলেন। দু:স্থ মানুষজনেদের কম্বল, শাল, শাড়ি, বেডশিট, চাল ও ভোজ্য দ্রব্য বিতরণ চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশুদের আনন্দ ও অংশগ্রহণের চিত্র। শিশুদের সঙ্গে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ। শিক্ষা এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন। যেখানে শিশুরা উপহার, খেলা, ম্যাজিক শো, গান এবং বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবে শামিল হয়। উৎসবের আনন্দকে শিশুদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার ঘটনা বর্ণনা করে, যেখানে বড়রা শিশুদের সাথে মিলে আনন্দ ভাগ করে নেন। শিশুদের চকলেটসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী বিতরণ। লায়ন্স ক্লাব অব ক্যালকাটা মঙ্গলম এবং হরিজন সেবক সঙ্ঘের যৌথ উদ্যোগে জাঁকজমকের সঙ্গে পালন শিশুদের নিয়ে আনন্দ উৎসব। উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি দীপক সাহা, লায়ন্স ক্লাবের শীর্ষ ব্যাক্তিত্ব রাজকুমার আগরওয়াল, মঠের মহারাজ সহ বিশিষ্টরা। প্রধান উদ্যোগী শঙ্কর স্যান্যাল বলেন, ‘মানুষদের সেবা করাই প্রধান উদ্দ্যেশ্য। বছরের অধিকাংশ দিনই এভাবেই মানুষের পাশে থেকে সেবা প্রদানের আনন্দই আলাদা। শিশুদের নিয়ে আনন্দ উৎসবে শামিল হতে পেরে আমরা সত্যিই খুব প্রসন্ন।’

পরদিনই যুব দিবস। ১২ জানুয়ারী স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন উপলক্ষে সিমলা স্ট্রিট, বেলুড় মঠ-সহ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানের আয়োজন। প্রতিবার সাড়ম্বরে পালিত হয় দিনটি। এই উপলক্ষ্যে বেলুড় মঠে প্রতিবছরের মত নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন। ভোর ৫টায় স্বামী বিবেকানন্দের মন্দিরে মঙ্গলারতি দিয়ে পুজো শুরু। সকাল থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল, ক্লাব এবং মঠের বিভিন্ন শাখা সংগঠনের সদস্যরা স্বামীজীর প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে বেলুড় মঠে আসেন। দিনভর শাস্ত্রপাঠ ও হোমযজ্ঞ। স্বামী বিবেকানন্দর জন্মদিন উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই বেলুড়মঠে ভক্ত সমাগম। উত্তর কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে স্বামীজির বাড়িতেও বিশেষ অনুষ্ঠান। স্বামীজিকে শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই ভক্ত সমাগম। বিবেকানন্দের জন্মদিনটি জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয় সারা দেশে। সেই উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জীবনের সব লড়াইয়ে শক্তি জোগায় স্বামীজির বাণী। স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী পালিত গোটা দেশজুড়ে। তাঁর জন্মদিবসকে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি এই মহান মনীষীর জন্ম হয়। সন্ন্যাস গ্রহণের আগে তাঁর নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়িতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ভারতীয় বেদ ও বেদান্তের দর্শনকে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় প্রচার করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। দীর্ঘদিন পরাধীনতার অন্ধকারে থাকা জাতিকে স্বামীজি মহিমান্বিত করে তোলেন। ১৮৯৩ সালে শিকাগোয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে হিন্দু ধর্মের গরিমার কথা তুলে ধরেন। মানুষের সেবায় ব্রতী হয়ে পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আজ স্বামীজির জন্মজয়ন্তীতে আমরা জেনে নেব তাঁর কয়েকটি অমর বাণী, যা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

স্বামীজির বাণী
“যাঁরা তোমায় সাহায্য করেছে, তাঁদের কখনও ভুলে যেও না। যাঁরা তোমাকে ভালোবাসে, তাঁদের কোনওদিন ঘৃণা করো না। আর যাঁরা তোমাকে বিশ্বাস করে, তাঁদের কখনও ঠকিয়ো না।”
“উঠে দাঁড়াও, শক্ত হও, দৃপ্ত হও। যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে নাও। আর এটা সব সময় মাথায় রেখো, তুমিই তোমার নিয়তির স্রষ্টা। তোমার যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, সবটা তোমার মধ্যেই রয়েছে। সুতরাং নিজের ভবিষ্যত্ নিজেই তৈরি করে নাও।”
“মনের মতো কাজ পেলে অতি মূর্খও করতে পারে। যে সকল কাজকেই মনের মতো করে নিতে পারে, সেই বুদ্ধিমান। কোনো কাজই ছোট নয়।”
“শক্তি হল জীবন, দুর্বলতা হল মৃত্যু। সম্প্রসারণ হল জীবন, সংকোচন হল মৃত্যু। প্রেম হল জীবন, ঘৃণা হল মৃত্যু।”
“নিজের ভেতর থেকে জাগ্রত হও। অন্য কেউ তোমাকে শিক্ষা দিতে পারবে না। অন্য কেউ তোমাকে ধর্মের পথে চালাতে পারবে না। অন্য কেউ নয়, তোমার আত্মাই তোমার শিক্ষক।”
“যে কোনও একটা ভাবনা মাথায় আনো। সেই একটা ভাবনাকেই তোমার জীবন করে ফেলো – সেটা নিয়েই ভাবো, সেটা নিয়েই স্বপ্ন দেখো, সেটা নিয়েই বাঁচো। সেই ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে তোমার মস্তিষ্ক, তোমার পেশি, তোমার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গকে কাজে লাগাও। প্রত্যেকটা ভাবনাকে অন্য ভাবনার থেকে আলাদা করে রাখো। এই পথেই সাফল্য আসবে।”
“তুমি খ্রিস্টের মতো ভাবলে তুমি একজন খ্রিস্টান, তুমি বুদ্ধের মতো ভাবলে তুমি একজন বৌদ্ধ। তোমার ভাবনা, অনুভূতিই তোমার জীবন, শক্তি, জীবনীশক্তি। যতই বুদ্ধি দিয়ে কাজ করো, এগুলি ছাড়া ভগবানের কাছে পৌঁছনো সম্ভব নয়।”
“যখন নেতৃত্ব দিচ্ছো, তখন সবার সেবা করো। স্বার্থশূন্য হও। নিজের মনে অসীম ধৈর্য্য রাখো, তাহলেই সাফল্য তোমার কাছে ধরা দেবে।”
“আমি বিশ্বাস করি যে, কেউ কিছু পাওয়ার উপযুক্ত হলে জগতের কোনো শক্তিই তাকে বঞ্চিত করতে পারে না।”
“সারাদিন চলার পথে যদি কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হও, তাহলে বুঝবে তুমি ভুল পথে চলেছ।”





