এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আরও একবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ ভোটার তালিকা সংশোধনে কমিশনের পদক্ষেপ পক্ষপাতদুষ্ট। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার মহম্মদ শামি, বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামীকে শুনানির নোটিস পাঠানোকে কমিশনের ‘অমানবিক, অসংবেদনশীল’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন মুখ্যমন্ত্রী। যা তিনি জ্ঞানেশ কুমারকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ‘অপরিকল্পিত, জবরদস্তিমূলক প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ভয়, আতঙ্ক এবং উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত।’ বলেও চিঠিতে অভিযোগ করেছেন মমতা ব্যানার্জি। তিন পাতার চিঠিতে এসআইআর আতঙ্কে রাজ্যে মৃত্যু, আত্মহত্যার পরিসংখ্যান-সহ নানা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চিঠির শেষে হাতে লেখা রয়েছে, ‘জানি আপনি হয়তো চিঠির জবাব দেবেন না। কিন্তু আপনাকে বিস্তারিত সব জানানো আমার কর্তব্য।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে লেখা তাঁর চিঠিটি পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্য়ানার্জি। সেখানে লেখা রয়েছে… ‘আজ আমি ক্ষোভ থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে এবং গণতন্ত্রের প্রতি আমার অবিচল অঙ্গীকার থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে একটি বিস্তারিত চিঠি লিখেছি। এসআইআর-এর আড়ালে বাংলায় যা ঘটছে, তা সাধারণ নাগরিকদের মর্যাদা, জীবিকা এবং সাংবিধানিক অধিকারের উপর একটি উদ্বেগজনক আক্রমণ। যে প্রক্রিয়াটি অন্তর্ভুক্তির জন্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভয় দেখানো এবং বাদ দেওয়ার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শুনানিগুলো যান্ত্রিকভাবে, সহানুভূতি ছাড়া, বিচার-বিবেচনা ছাড়া এবং মানবিক বাস্তবতার প্রতি কোনও সংবেদনশীলতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ, ৭৭ জনের মৃত্যু, আত্মহত্যার চেষ্টা, হাসপাতালে ভর্তি—সবকিছুই একটি অপরিকল্পিত, জবরদস্তিমূলক প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ভয়, আতঙ্ক এবং উদ্বেগের সাথে সম্পর্কিত। অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের মতো একজন নোবেল বিজয়ী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ক্রীড়াবিদ, সন্ন্যাসী এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজেদের ‘প্রমাণ’ করার জন্য তলব করা হয়, তখন তা চরম প্রাতিষ্ঠানিক ঔদ্ধত্যকেই প্রকাশ করে। যদি এমন বরেণ্য ব্যক্তিদেরও রেহাই না দেওয়া হয়, তবে দরিদ্রতম মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি, পরিযায়ী শ্রমিক, দিনমজুর এবং বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করা মহিলাদের দুর্দশার কথা ভাবুন। মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ভূমিকা থেকে বিপজ্জনকভাবে সরে যাচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র ভয় দিয়ে টিকে থাকে না। জবরদস্তি করে ভোটার তালিকা শুদ্ধ করা যায় না। আর সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ জবাবদিহিহীন প্রভুর মতো আচরণ করে সম্মান অর্জন করতে পারে না। আমি এই উদ্বেগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সামনে তুলে ধরেছি। এখনও পথ সংশোধনের জন্য খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আমি আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমি আশা করি নাগরিকদের যন্ত্রণার অবসান হবে। এবং আমি আশা করি অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আগেই আমাদের গণতন্ত্রের পবিত্রতা পুনরুদ্ধার করা হবে।’ এই প্রথমবার নয়। এর আগেও এসআইআর সংক্রান্ত নানা ত্রুটির কথা তুলে ধরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। মমতা ব্য়ানার্জির দাবি, কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসলে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি-কে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে, চলতি বছরেই বাঁকুড়ায় বিপুল কর্মসংস্থানের কথা শোনা গেল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির গলায়। বাঁকুড়ার শালতোড়া থেকে তিনি বলেন, “শালতোড়ায় কেন এসেছি? নবজোয়ারের কর্মসূচির আগে আপনাদের কথা দিয়ে গিয়েছিলাম। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরে কিছু জায়গায় ক্রাশারের কাজ আইনি প্রক্রিয়া মেনে চালু হয়েছিল। আবার অনেক বাধ্যবাধকতা, কোর্টের নির্দেশের জন্য সেই কাজ পুরোদমে চালু হয়নি। এখনও পর্যন্ত প্রায় চার-সাড়ে চার হাজার কর্মী এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। পুরোদমে চালু হয়ে গেলে ২৫ হাজার লোক কাজ পাবেন। সরকারি যে ১৩৩ হেক্টর জমি রয়েছে, সেখানে প্রায় ১৮টি মাইন রয়েছে। এই ১৮টি মাইন শুরু হলে কমপক্ষে ২৫ হাজার লোক কর্মসংস্থানের বাড়তি সুযোগ পাবে। গত দু’মাস ধরে এর উপর কাজ করেছি। সকালেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৩১ মার্চের আগে সব কাজ চালু করে ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কথা দিয়ে কথা রাখার নাম তৃণমূল। পাঁচটা খাদান চালু রয়েছে। প্রায় ১২০টি ক্রাশারের কাজ চলছে। ২৫০টির উপরে ক্রাশার রয়েছে। কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। একটি খাদান করতে গেলে অন্তত এক হেক্টর জমির প্রয়োজন হয়। একাধিক সরকারি অনুমতির দরকার হয়। ডাইরেক্টর জেনারেল অফ মাইনিং-এর এনওসি পেতে গেলে মাসের পর মাস লেগে যায়। আইনি প্রক্রিয়া মেনে যদি খাদান চালুও করতে হয়, ৩০-৩২ লক্ষ জমা দিতে হয়। তার পরে অনৈতিক ভাবে ডিজি মাইন-কে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হবে। শালতোড়ার বিধায়ক বিজেপির। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিল বিজেপির। আমি জিজ্ঞেস করে বিধায়ক-সাংসদদের লজ্জা লাগে না! কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাকে ঘুষ দিতে মানুষকে নিজেদের অধিকারের স্বার্থে লড়তে হয়। তখন এদের বড় বড় ভাষণ কোথায় থাকে!” বাঁকুড়ায় তৃণমূলের হাত শক্ত করার ডাক এদিন দেন অভিষেক। তিনি বলেন, “২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বাঁকুড়ার ১২টি আসনের মধ্যে চারটিতে আপনারা তৃণমূলকে জিতিয়েছিলেন। বাকি আটটিতে জিতেছিল বিজেপির প্রতিনিধিরা। ২০২৪ সালের লোকসভায় চার থেকে বেড়ে আমাদের ছয় হয়েছে। এখন তৃণমূল ছয়, বিজেপি ছয়। বিষ্ণুপুর লোকসভার একটি আসন পড়ে খণ্ডঘোষে। বাঁকুড়া লোকসভার একটি আসন পড়ে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে। বিষ্ণুপুরকে ছয় মারতে হবে, বাঁকুড়াকেও ছয় মারতে হবে। দু’টো ছয় মেরে তৃণমূলের পক্ষে ১২-০ করতে হবে। তৃণমূল জিতলে অধিকার পাবেন। বিজেপি জিতলে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তৃণমূল জিতলে দু’মুঠো ভাত। বিজেপি জিতলে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। তৃণমূল জিতলে দুয়ারে রেশন, মোদী জিতলে দুয়ারে ভাষণ। তৃণমূল জিতলে মানুষের পাতে ভাত। বিজেপি জিতলে খালি মোদীজির মন কি বাত। কী নেবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।” অভিষেকের গলায় এসআইআর থেকে শুরু করে ইডি-সিবিআইয়ের কথাও শোনা গেল। তিনি বলেন, “৭০টা বিধায়ক নিয়ে যে দল ব্রিগেডে পেটের দায়ে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করার জন্য এক যুবককে আক্রমণ করছে, তাকে আমরা ছাড়ব? বিজেপি ভাবে কি, ই়ডি দিয়ে, নির্বাচন কমিশন দিয়ে আমাদের আটকাবে? আমি মোদীজিকে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলার ইতিহাস জানুন।”





