সাড়ে চার বছরের মধ্যে উলটপুরাণে ‘পাল্টে গেল মত, বদলে গেল পথ’। বরাহনগর একসময় ছিল ‘লালদুর্গ’। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে জিতেই বিধানসভায় গিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। ১৯৭২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই আসন ছিল সিপিআই এবং আরএসপি-র দখলে। ২০১১ থেকে টানা তিন বার তৃণমূলের হয়ে জিতেছিলেন তাপস।‘নজির’ গড়ল বরাহনগর। নজির গড়ল দলবদলের রাজনীতিতে। তা-ও মাত্র সাড়ে চার বছরের মধ্যে। যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরলের মধ্যে বিরলতম। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বরাহনগরে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন তাপস রায়।। তৃণমূলের তাপসের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন অভিনেত্রী পার্নো মিত্র। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূলের সেই তাপস যোগ দেন পদ্মশিবিরে। বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন উত্তর কলকাতা লোকসভা আসনে। জেতেননি। তবে সক্রিয় ভাবে এখনও বিজেপিই করছেন প্রবীণ রাজনীতিক। পার্নো শুক্রবার যোগ দিলেন তৃণমূলে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বরাহনগরে যিনি যে দলের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, আরও একটি বিধানসভা ভোটের আগে সেই তাঁরাই পারস্পরিক দল বদলে ফেলেছেন। সাড়ে চার বছর আগে যে দলের বিরুদ্ধে তাঁরা সরব ছিলেন, তাঁরা এখন সেই দলেই! নির্বাচনের ময়দানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরব ছিলেন পার্নো। বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিকে বিঁধেছিলেন তাপস। তৃণমূল সূত্রের খবর, মাসখানেক আগে পার্নোই শাসকদলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলে যোগদানের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। দলের প্রথম সারির নির্দেশ যায় এক নেতার কাছে। বলা হয়, পার্নোর যোগদানের কর্মসূচিতে তাঁকে থাকতে হবে। কারণ, তাঁর সঙ্গে টলিউডের ‘সখ্য’ রয়েছে, তাই টলিউড সংক্রান্ত গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে। কিন্তু ওই নেতা দলীয় নেতৃত্বের কাছে অনুরোধ করেন, তাঁর বদলে বরং কোনও মন্ত্রীকে দিয়ে পার্নোকে দলে যোগদান করালে ভাল। পার্নোকে দলে যোগদান করিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। অনুরোধ রাখা হয়েছে।

নতুন বছরে ‘ফুল’ বদলালেন পার্নো মিত্র! ছ’বছর পদ্মফুলে থাকার পরে ২০২৫-এর শেষে তিনি ‘ঘাসফুল’-এ। শিবির বদলেই অভিনেত্রী-রাজনীতিবিদের দাবি, “মানুষমাত্রেই ভুল করে। সেই ভুল সংশোধনের সময় এসে গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করে নিজেকে ধন্য মনে করছি।” বিরোধী শিবির ছেড়ে শাসকদলে যোগ দিচ্ছেন পার্নো। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক শাসকদলের ঘনিষ্ঠ এক রাজনীতিবিদ খবরের সত্যতায় সিলমোহর দিয়েছিলেন। মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে শুক্রবার বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ তৃণমূল ভবনে আনুষ্ঠানিক ভাবে যোগ দেন অভিনেত্রী। কেন বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলবদলের সিদ্ধান্ত নিলেন পার্নো? সবিস্তার জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। ব্যস্ত অভিনেত্রীর ফোন তখন বেজে গিয়েছে। সদ্য শাসকদলে যোগ দেওয়া অভিনেত্রীর কথায়, “ছ’বছর আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলাম। আপনাদের সে কথা মনে আছে। মনে হচ্ছে, এ বার নিজেকে শুধরে নেওয়া উচিত। সেটাই করলাম।” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ড তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁকে দলের অংশ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ জানান মন্ত্রী চন্দ্রিমা, রাজনীতিবিদ জয়প্রকাশ মজুমদারকে। পার্নোর হাতে এ দিন দলীয় পতাকা তুলে দেন চন্দ্রিমা।

তাঁর কথাতেও অভিনেত্রীর বক্তব্যের সুর। তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমাদের দলে আসার কথা জানিয়েছিলেন পার্নো। মুখ্যমন্ত্রী দলকে নির্দেশ দিয়েছেন পার্নোকে দলে সংযুক্ত করার।” বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি ছেড়ে অভিনেত্রীর শাসকদলে যোগদান নিয়ে আলোচনা টলিপাড়ায়। ইন্ডাস্ট্রি স্বাগত জানিয়েছে পার্নোর এই পদক্ষেপকে। পার্নোর অভিনয়জীবন শুরু ২০০৭-এ। ছোটপর্দায় রবি ওঝার ‘খেলা’ ধারাবাহিক দিয়ে শুরু। বড়পর্দায় তাঁকে নিয়ে আসেন অঞ্জন দত্ত। ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছবির নায়িকা তিনি। অভিনেত্রীর ঝুলিতে ‘বেডরুম’, ‘মাছ মিষ্টি অ্যান্ড মোর’, ‘রাজকাহিনী’, ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’, ‘অপুর পাঁচালি’, ‘অঙ্ক কী কঠিন’-এর মতো ছবি। ২০১৯-এ পদ্মশিবিরে যোগ দেন তিনি। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বরাহনগর নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল। ওই বছরে বিজেপি বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছিল পায়েল সরকার, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, তনুশ্রী চক্রবর্তীর মতো একাধিক তারকাকে। ওই নির্বাচনে শাসকদলের প্রার্থী তাপস রায়ের কাছে পরাজিত হন পার্নো। নির্বাচনের আগে শাসকদলের বিধায়ক মদন মিত্রের সঙ্গে দোলযাত্রা উদ্যাপনে ‘নৌকাবিহার’ পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন পার্নো। সেই ছবি সেই সময়ের রাজনীতি এবং টলিউডে আলোচনার বিষয় হয়েছিল। এই ঘটনাকে সামনে রেখে ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা বিরোধী শিবিরের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তথাগত রায় তীব্র কটাক্ষ করেছিলেন।





