Sunday, June 28, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ধর্মের ভেদ ঘুচিয়ে দিল কেক-মিলন্তি!‌ বড়দিনের ম্যাজিক, ধর্মভেদ মুছে গিয়ে একাকার কলকাতা

কে বলে কেক সাহেবি খাবার? কোন কালে বাঙালি তাকে আপন করে নিয়েছে! ক্রিসমাসের মরসুমে মহানগরের কেক-টহল। ময়দা-মাখনের মখমলি মিলমিশ! নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান পেরিয়ে নানা ধর্মের মানুষকে মিলিয়ে মিশিয়ে সে-ই তো এক করে ছাড়ল! কেকের হাত ধরেই বরাবরের মতো এক হয়ে গেল বড়দিনের কলকাতা। শহরটা আসলে চিরকালের মেল্টিং পট। এ দেশ-ও দেশ থেকে মানুষ এসেছে। নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষ আস্তানা গেড়েছে। আলাদা হয়েও মহানগরের মিলিজুলি সংসারে যেন এক হয়ে গিয়েছে তাদের খাবারদাবার, সাজগোজ, জীবনযাপনের অনেক কিছুই। কলকাতা তাই অবলীলায় তার বড়দিনে গড়ে নিয়েছে কেকের এক নিজস্ব কালচার। যে সংস্কৃতিতে সাহেবি কেক খ্রিস্টানি কিচেন পেরিয়ে আজও অনায়াসে তৈরি হয়ে চলেছে ইহুদি-অ্যাংলো ইন্ডিয়ান-হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধদের হেঁশেলে। ডিসেম্বর মাসভর নানা ভাষা, নানা গোষ্ঠীর হাতে তৈরি সেই কেকের খোঁজে পুরনো বেকারিগুলোতে ঢুঁ মারতে ভোলে না কলকাতা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যে সুস্বাদের টান বয়ে নিয়ে চলে সগর্বে। ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় এক সময়ে বড়দিন মানেই ছিল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের বেকারি কিংবা ফ্লুরিজ়ের খাস বিলিতি কেক। তবু ম্যাজিকটা ঘটে গেল অন্য কোনওখানে। তাতেই কলকাতার বড়দিনের সঙ্গে চিরকালের মতো জুড়ে গেল এক ইহুদি পরিবারের নাম। বাগদাদের ইহুদি পরিবারের সন্তান নাহুম ইজ়রায়েল মোরডেকাইয়ের হাত ধরে ১৯০২ সালে এ শহর পেল তার প্রথম এবং একমাত্র ইহুদি বেকারি ‘নাহুমস’ বা নাহুম অ্যান্ড সন্স। বড়দিনের কেকের সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে যাওয়া পুরনো নিউ মার্কেট অর্থাৎ হগ মার্কেটের এই বেকারিতে কাঠের তাকে থরে থরে সাজানো প্লাম কেক, রিচ ফ্রুট কেক, স্পেশ্যাল ক্রিসমাস ফ্রুট কেক, ম্যাকারন বা লেমন টার্ট কিনতে এখনও ফি বছর লম্বা লাইন পড়ে ২৫ ডিসেম্বরের ঢের আগে থেকেই। থিয়েটার রোডের বড়দিন মানেই ঘরদোর সেজে ওঠে আলো, গ্রিটিং কার্ড, ক্রিসমাস ট্রি, সান্তা ক্লজে। আর অবশ্যই থাকত কেক আর চিপস। বড়দিনের সকালে কেক আর চিপস চাই-ই চাই। ধর্মতলা পেরিয়ে এ বার যাওয়া যাক ওয়েলেসলির দিকে। তারই এক চিলতে গলিতে হলদে বাড়িটার গায়ে লেখা ‘সালদানহা’। গোয়ান দম্পতির হাতে গড়া এই বেকারি আজও চালান পরিবারের লোকেরাই। এখন যার ভার নিয়েছেন তৃতীয় প্রজন্মের ডেবোরা আলেকজান্ডার ও তাঁর মেয়ে আলিশা। সেই ১৯৩০ সাল থেকে আজও বাড়িতেই মহিলাদের হাতে হাতে তৈরি হয় কেক। বছরভর নানা রকম জিনিস তাদের ভাঁড়ারে থাকলেও বড়দিনের ভিড়ের মরসুমে শুধুই ক্রিসমাস স্পেশ্যাল মেনু। ডিসেম্বর পড়তেই ভিড় শুরু হয়ে গিয়েছে। রিচ ফ্রুট কেক, চকো ওয়ালনাট কেক, স্পেশ্যাল ফ্রুট কেক এ বারেও রয়েছে বড়দিনের স্পেশ্যাল মেনুতে। ব্রিটিশ আমলেই বৌবাজারের অ্যাংলো পাড়া বো ব্যারাকে ছোট্ট এক বেকারি খুলেছিলেন যতীন্দ্রনাথ বড়ুয়া। রুজির টানে চট্টগ্রাম থেকে এ শহরে আসা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জেএন বড়ুয়ার সেই বেকারি নিমেষেই হয়ে উঠল গোটা পাড়ার প্রিয় ঠিকানা। আর ক্রমে গোটা কলকাতারও। রংচটা নীল দেওয়ালের ছোট্ট দোকানটা এখন একা হাতেই সামলান যতীন্দ্রনাথের বড় ছেলে রতন বড়ুয়া। শীত পড়তে না পড়তেই হিমশিম খান ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে। ঘরে তৈরি আঙুর, আপেল বা জিঞ্জার ওয়াইনের সুস্বাদে ওয়াইন কেক, রাম কেক, ওয়ালনাট কেক আজও আছে তাঁদের ডিসেম্বরের মেনুতে। তবে একেবারে শুরুর দিনগুলো থেকেই এখনও এই ছোট্ট বেকারি সবচেয়ে মন কাড়ে জেএন বড়ুয়ার সিগনেচার রেসিপি ছানাপোড়া কেকে। লোকে বলে, রান্নার স্বাদে-গুণে মুসলমান বাবুর্চিরা নাকি টেক্কা দিতে পারেন যাকে খুশি! সাহেব পাড়ার কেকের সঙ্গে টক্করে তাঁদের হাতও যে জাদু দেখাবে, তাতে আর সন্দেহ কী! মোমিনপুরের কে আলি বেকারি সেই জাদুতেই পেরিয়ে গিয়েছে ১১০ বছর। ছোট্ট দোকানটায়, তার চেহারায় সেই পুরনো আমলের সুবাস ভরপুর। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানিদের বোমা ফেলার আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকা শহরে প্রথম জার্মান ব্রেড তৈরি করা শুরু করেন কে আলি। সেই রুটির স্বাদের কদরে ‘জার্মান বেকারি’ নামে খ্যাতির আলোয় আসা এই দোকানে আজও জার্মান ব্রেড তো বটেই, পাওয়া যায় হরেক রকম বিস্কুট, রুটি। পাওয়া যায় বাখরখানি বা অর্ডার দিলে শিরমলও। তবু শীত পড়তেই অর্ডারি কেকের পাল্লা ভারী। মূলত রিচ ড্রাই ফ্রুট কেক, অর্ডার বিশেষে ডিসেম্বর স্পেশ্যাল কেক আর জার্মান ব্রেড। এ সময়টায় তার বাইরে আর বিশেষ কিছু তৈরির ফুরসত মেলে না একেবারেই। খিদিরপুরের মহল্লায় কে আলির বেকারি ঝাঁপ খুলেছিল ১৯৪২-এর সেই আগুনে দিনগুলোয়। বছর তিরিশ পরে হাতছানিতে সাড়া দিল হিন্দু পাড়াও। সত্তরের দশকে হাওড়ার নিউ হাওড়া বেকারিতে পুরোদস্তুর কেক-বিপ্লবই করে ফেললেন অলোকেশ জানা। তখন কেক মানেই খাস বিলিতি কিংবা অন্য নামী বেকারির দামি কেক। সাধ জাগলেই তাতে হাত ছোঁয়ানোর সাধ্য কই সকলের? সাহেবি সুস্বাদকে সর্বসাধারণের হাতের নাগালে নিয়ে আসতে, চায়ের সঙ্গে বিস্কুটের বদলে একটু ভারী বিকল্প হিসেবে অলোকেশ তৈরি করলেন নামমাত্র দামের বাপুজি কেক। মোরব্বা, বাদাম, খেজুর, কিশমিশে ঠাসা, বাটার পেপারের মোড়কে সেই সস্তার টিফিন কেক হাতে হাতে ঘুরতে লাগল আট থেকে আশি, সবারই। আজও পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বাসস্ট্যান্ড, সারা বছর সর্বত্র ছেয়ে থাকে এই কেক। পেট ভরানোর চটজলদি উপায়। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল এখন নাম পাল্টে দ্য ললিত গ্রেট ইস্টার্ন। তার সে কালের বেকারি এ কালেও স্বমহিমায় বিরাজমান। পার্ক স্ট্রিটের একচ্ছত্র ঠিকানার ফ্লুরিজ় এখন দরজা খুলেছে শহরের এখানে ওখানে। রিচ প্লাম কেক, ড্রাই ফ্রুট কেক, ডেটস অ্যান্ড ওয়ালনাট কেক বা ডান্ডি কেকে আজও দুই ঠিকানাই মন কাড়ে আগের মতো। সব মিলিয়ে কলকাতার বড়দিন আছে বড়দিনেই। বাকিটা কেক-মিলন্তির ম্যাজিক!

একটু একটু করে ভিড় বাড়তে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট চত্বরে। সময় যত এগিয়েছে, তত বেড়েছে ভিড়। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। লাল রঙের পোশাক। মাথায় সান্টা টুপি। ঝিকমিক আলোর চশমা। মাথার ব্যান্ডেও ঝিকমিক আলোর খেলা। বড়দিনের আগের রাতে পার্ক স্ট্রিটে যে দিকে নজর যাচ্ছে, সে দিকেই ধরা পড়ছে এই ছবি। সেজেগুজে বাহারি পোশাকে থিকথিক করছে ভিড়। উৎসবের মেজাজ। কলকাতা তো বটেই, আশপাশের শহর, মফস্সল, এমনকি ভিন্‌রাজ্য থেকেও অনেকে এসেছেন পার্ক স্ট্রিটের আলোকসজ্জা দেখতে। সন্ধ্যা থেকেই একটু একটু করে ভিড় বাড়তে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট চত্বরে। সময় যত এগিয়েছে, তত বেড়েছে ভিড়। কেউ এসেছেন পরিবারের সঙ্গে, কেউ এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ বা ভিন্‌রাজ্য থেকে আসা বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন পার্ক স্ট্রিটের আলো দেখতে। আট থেকে আশি, কারও মধ্যেই উৎসাহ আর উদ্দীপনার কোনও অভাব নেই। কেউ যাদবপুর, কেউ নিউটাউন, কেউ সল্টলেক, কেউ আবার এসেছেন বারাসত থেকে। রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেউ নিজস্বী তুলছেন, গল্প করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ আবার তুলছেন আলোকসজ্জার ছবি। পথচলতি গাড়ি থেকেও মোবাইল বার করেও ছবি তুলছেন অনেকে। তবে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে দিচ্ছে না পুলিশ। গোটা পার্ক স্ট্রিট চত্বর ছেয়ে রয়েছে পুলিশে। ভিড় যাতে রাস্তায় নেমে না-পড়ে, তা দেখার জন্য যেমন পুলিশ রয়েছে, তেমনই রাস্তায় ট্রাফিক সামলানোর জন্যও মোতায়েন পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী। পার্ক স্ট্রিট চত্বরে একটি বড় অংশ রাস্তার ধার দিয়ে ব্যারিকেড করে রেখেছে পুলিশ। ফুটপাথের পাশাপাশি রাস্তার ব্যারিকেডে ঘেরা অংশও পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে পুলিশ। তবে যে পরিমাণ ভিড় হয়েছে, তাতে লোকজনকে ঠেলে এগোনোর মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে ফুটপাথে। ভিড় সামাল দিতে প্রয়োজন মতো রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণও করছে পুলিশ। যেমন রাত সাড়ে ৮টার দিকে পার্ক স্টিট থেকে মল্লিকবাজারমুখী রাস্তা সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি বুঝে তারা প্রয়োজন মতো যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ। বাড়ি থেকে সান্টা টুপি বা রঙিন চশমা নিয়ে আসেননি, অথচ ভিড়ের মধ্যে সকলকে দেখে পরতে ইচ্ছা করছে— তাঁদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। শখপূরণের জন্য পকেটে অল্প কিছু টাকা থাকলেই চলছে। ফুটপাথের ধারে সান্টা টুপি, মাথার ব্যান্ড, রঙিন আলোর চশমার পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনেক বিক্রেতাই। সেখান থেকে কিনছেনও অনেকে। নিউটাউনের বাসিন্দা মৃত্তিকা খাঁ-র স্বামীর অফিস পার্ক স্ট্রিট চত্বরেই। সন্ধ্যায় সন্তানকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিটে চলে এসেছেন মৃত্তিকা। স্বামীর অফিস ছুটির পরে তিন জন মিলে ঘুরছেন। আবার বন্ধুদের সঙ্গে আলোকসজ্জা দেখতে এসেছেন সৌরশ্রী বণিক। বাড়ি ত্রিপুরায়। পড়াশোনার সূত্রে কলকাতায় থাকেন। ত্রিপুরা থেকে তাঁর দুই বন্ধু এসেছেন কলকাতায়। তাঁদের বড়দিনের আলো দেখাতে পার্ক স্ট্রিটে নিয়ে এসেছেন সৌরশ্রী। ভি‌ন্‌রাজ্য থেকে এলেও পার্ক স্ট্রিটের এমন ভিড়ে কোনও সমস্যাই হচ্ছে না সৌরশ্রীর বন্ধুদের। জানালেন, তাঁরাও বেশ উপভোগই করছেন। বড়দিনের পার্ক স্ট্রিট চত্বর ভিড়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকে রসনাতৃপ্তি। এখানে বেশ কিছু নামী রেস্তরাঁ রয়েছে। বড় দিনের মরসুমে স্বাভাবিক ভাবেই সেগুলিতে প্রচুর বুকিং রয়েছে। ফলে রেস্তরাঁয় টেবিল পেতে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উৎসবের মরসুমে যেমনটা ফি বছর হয়ে থাকে। তাই অনেকে রেস্তরাঁয় টেবিল পাওয়ার অপেক্ষা না করে ভিড় জমিয়েছেন রোলের দোকানগুলিতে। পার্ক স্ট্রিট চত্বরে রোলের বেশ কিছু নামি দোকন রয়েছে। সন্ধ্যার দিকে ওই দোকানগুলির সামনে জটলা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভিড় এবং ট্রাফিক সামাল দেওয়ার জন্য গোটা পার্ক স্ট্রিট চত্বরে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়ার উপায় নেই। পার্ক স্ট্রিটের মোড়, স্টিফেন কোর্ট, অ্যালেন পার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় রাস্তা পারাপার করতে দেওয়া হচ্ছে পথচারীদের। অনেকে পার্ক স্টিট দিয়ে এসে অ্যালেন পার্ক হয়ে ক্যামাক স্ট্রিট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ আসছেন উল্টো পথে। তাঁরা ক্যামাক স্ট্রিট দিয়ে এসে অ্যালেন পার্ক হয়ে পার্ক স্ট্রিট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তবে বাস ধরার জন্য ক্যামাক স্ট্রিটের দিকেই যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles