পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এসআইআর কারণে বাদ পড়তে চলেছে ৫০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম। ১৬ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। এখনও পর্যন্ত মোট ৫২ লক্ষ ৯৯ হাজার ৬৬৩ জন ভোটারের নাম ওই তালিকায় থাকবে না। মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নানা কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে বলে খবর। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এ রাজ্যে মৃত হিসাবে চিহ্নিত ২৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ৯৫ জন ভোটারের নাম বাদ চলে গিয়েছে। এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় স্থানান্তরিত ১৮ লক্ষ ৫৫ হাজার ৩০২ জনের নামও বাদ পড়েছে। খসড়া ভোটার তালিকায় রাখা যাচ্ছে না ‘নিখোঁজ’ ভোটারদের নামও। যাঁদের কাছে ফর্ম দেওয়া হয়েছে কিন্তু তা ফেরত আসেনি, সেই সমস্ত ভোটারকে ‘নিখোঁজ’ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, কমিশন নিযুক্ত বুথ স্তরের আধিকারিকেরা বিএলও এখনও পর্যন্ত তাঁদের কোনও খোঁজ পাননি। এই ধরনের ভোটারের সংখ্যা ৯ লক্ষ ৪২ হাজার ১৬২ জন। এ ছাড়া, খসড়া তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে লক্ষাধিক ‘ভুয়ো’ ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম। এখনও পর্যন্ত ১ লক্ষ ২২ হাজার ৩০৩ জনকে ভুয়ো হিসাবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। মৃত, স্থানান্তরিত, নিখোঁজ এবং ভুয়ো ছাড়়াও বাদের খাতায় থাকছে আরও ৩১ হাজার ৮০১ জন ভোটারের নাম। কমিশনের পরিসংখ্যানে তাঁদের ‘অন্যান্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারা এই ‘অন্যান্য’? তা এখনও স্পষ্ট নয়। কমিশন সূত্রে খবর, কেউ কেউ এসআইআর প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁরা এনুমারেশন ফর্ম জমা দেওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নন। মনে করা হচ্ছে, এই সমস্ত ভোটারই ‘অন্যান্য’ তালিকায় রয়েছেন। তবে কমিশনের তরফে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কমিশন সূত্রে খবর, বাদ পড়া ভোটারের যে তালিকা প্রকাশ্যে আসছে, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। আরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত বা ভুয়ো ভোটারের সংখ্যায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। যাঁদের নিখোঁজ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের খোঁজ মিললে ওই সংখ্যা কমতে পারে। যে হেতু খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়সীমা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। ৪ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এনুমারেশন ফর্মের তথ্য কমিশনের পোর্টালে আপলোড করার শেষ দিন ১১ ডিসেম্বর। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।
রাজ্যের এসআইআর-এর কাজ নিয়ে আরও বেশি সতর্কতা দেখাল নির্বাচন কমিশন। প্রতিদিনই তাঁদের পক্ষ থেকে মৃত, ডুপ্লিকেট এবং স্থানান্তর হওয়া ভোটারদের তথ্য সহ নানা আপডেট দেওয়া হচ্ছে। এবার এই সংক্রান্ত ব্যাপারে বিএলও সুপারভাইজার, বিএলও এবং বিএলএ-দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কমিশন। তাঁদের জন্য ঘোষণাপত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে নিজেদের দায়িত্বে সই করতে হবে। ভুল তথ্য দিলে বিএলও এবং বিএলএ-দের ওপর নামতে পারে শাস্তি খাঁড়া। বিএলও সুপারভাইজার, বিএলও এবং বিএলএ-দের জন্য মৃত ভোটার, ডুপ্লিকেট ভোটার, স্থানান্তর হওয়া ভোটার এবং অনুপস্থিত ভোটারদের তথ্য দেওয়ার আলাদা ঘোষণাপত্রের ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে এই সব ভোটারদের তথ্য দিয়ে নীচের সংশ্লিষ্ট জায়গায় সই করতে হবে বিএলও সুপারভাইজার, বিএলও এবং বিএলএ-দের এবং তা করতে হবে নিজেদের দায়িত্বে। কোথাও কোনও ভুল হলে যে দায় তাঁদের ওপর বর্তাবে, সেটা আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল কমিশন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মিটিং করে একটি রেজিলিউশন নিতে হবে। সেখানে সই থাকবে বিএলও এবং বিএলএ-দের। সেখানে পরিস্কার করে লেখা থাকবে কত জন মৃত ভোটারকে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন, কত জন স্থানান্তরিত, কত জনের ফর্ম সংগৃহীত নয়। এই পুরো তথ্যগুলো গিয়ে কার্যত একটা হলফনামা দিতে হবে। বিএলও-দের একাংশের দাবি, নির্বাচন কমিশন দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে তাদের ওপর। বিএলও সংগঠনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, সিইও দফতরের পক্ষ থেকে খুব সম্প্রতি একটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিএলও-দের উদ্দেশে, সেখানে পরিস্কার করে বলা হয়েছে, সমস্ত রাজনৈতিক দলের বিএলএ যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। সেখানে একটি রেজুলিউশন দিতে হবে। তাতে চারটি ‘ডিক্লারেশন’ দিতে হবে। সেখানে বলতে হবে বিএলও অ্যাপে যে তথ্য আপলোড করা হয়েছে, সেটাই সঠিক। সিইও দফতরের তথ্য বলছে, বুধবার বিকেলের মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি (৯৮.২১ শতাংশ) ফর্ম ডিজিটাইজড হয়ে গেছে। রাজ্যে এখনও পর্যন্ত মৃত ভোটারের সংখ্যা ২৩ লক্ষ পেরিয়েছে। অনুপস্থিত বা খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ভোটারের সংখ্যা ৮ লক্ষ পেরিয়েছে। অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ১৭ লক্ষের বেশি। ডুপ্লিকেট ভোটারের সংখ্যা ১.২ লক্ষের বেশি। আপাতত আন-কালেক্টেটবল ফর্ম ৫০ লক্ষ ২২ হাজার ৪১০। এখন ভোটারদের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আন-কালেক্টেবল বলতে ঠিক কাদের কথা বলা হচ্ছে। কমিশন আগেই জানিয়েছিল, যারা মৃত, পাওয়া যায়নি বা অনুপস্থিত, পার্মানেন্টলি শিফটেড অর্থাৎ যাঁরা স্থায়ীভাবে সরে গিয়েছে, আগেই এনরোল করা ছিল বা নাম ছিল এবং অন্যান্যদের মিলিয়ে এই আন-কালেক্টেবল। যদিও কমিশনের বক্তব্য, যেহেতু এখনও একাধিক জেলায় এখনও আনকালেক্টেবল ফর্মের সংখ্যাটা আপলোড করা হচ্ছে না, তাই স্বাভাবিকভাবেই আসল সংখ্যাটা পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে বেশ কয়েকজন বিএলও-র কাজের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন দিল্লির নিয়োগ করা স্পেশ্যাল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত। প্রোজেনি ম্যাপিং নিয়েও কড়া মনোভাব নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর অর্থ, যদি কোনও ভোটারের নাম ২০০২-এর ভোটার তালিকায় না থাকে তাহলে সে যদি নিজের বাবা, ঠাকুরদার নাম দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করিয়েছে। কমিশনের নির্দেশ, সবচেয়ে বেশি প্রোজেনি ম্যাপিং যে সব বুথে হয়েছে সেগুলি পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। যে সব বুথে সবচেয়ে বেশি অনলাইন ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলিকেও স্ক্রুটিনির আওতায় আনতে হবে। বুধবারই এই সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর সেই তথ্য দেওয়ার পরই রোল অবজার্ভারদের এই জায়গাগুলিতে বিশেষ নজর দিতে এবং রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিশনের তরফে।




