বয়স ৫০ বছর। অর্থাৎ খাওয়াদাওয়া নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বয়সের সঙ্গে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। কমে যায় অস্থির জোর। তাই ৫০-এ পা দেওয়ার পর থেকে প্রতি দিনের ডায়েট থেকে কয়েকটি খাবার বাদ রাখলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
১) ভাজাভুজি: বয়সের সঙ্গে হৃদপিণ্ডের উপরেও চাপ তৈরি হয়। সেখানে অতিরিক্ত মাত্রায় ভাজাভুজি খাওয়ার ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা হার্টের উপর আরও চাপ তৈরি করে। ভাজাভুজি বেশি খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
২) মিষ্টি খাবার: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়েটে শর্করা জাতীয় খাবার এবং পানীয়ের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে দেহে প্রদাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। হার্টের অসুখ এবং রক্ত শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধির নেপথ্যেও এই ধরনের খাবার দায়ী।
৩) নোনতা খাবার: মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম হার্টের ক্ষতি করে। অতিরিক্ত মাত্রায় নুন খেলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। অনেক সময়ে উচ্চ রক্তচাপ থেকে হাইপার টেনশন বা ডিমেনশিয়া হতে পারে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দিনে ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের কম নুন খাওয়া উচিত।
৪) ময়দা: বাজারের প্রক্রিয়াজাত ময়দা ক্ষতিকারক। বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডায়েটে ময়দা নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে রাখা উচিত। অর্থাৎ পরোটা, পাউরুটি জাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকা উচিত। ময়দার মধ্যে উপস্থিত কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি করে ইনসুলিনের কাজে বাধা সৃষ্টি করে।
৫) মদ্যপান: বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মদ্যপানে রেশ টানা উচিত। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সামান্য পরিমাণেও মদ্যপান মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপান অস্থির ক্যালশিয়াম শোষণে বাধা দেয়। মদ্যপানের ফলে দেহে মেদের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বয়সের সঙ্গে সেই মেদ ঝরাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হতে পারে।
লিভার ভাল রাখার জন্য জীবন যাপনে পরিবর্তন আনার কথা বলেন চিকিৎসকেরা। কারণ লিভারের রোগের আসল কারণ মানুষের দৈনন্দিন কিছু ভুল অভ্যাস। লন্ডন নিবাসী এমসের চিকিৎসক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট সৌরভ শেট্টি জানাচ্ছেন, নানা ধরনের ভুল অভ্যাসের মধ্যে তিনটি মারাত্মক। সেগুলিকে যত তাড়াতাড়ি সংবরণ করা যায় ততই ভাল। অতিরিক্ত এবং নিয়মিত মদ্যপান লিভারের ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ। লিভার অ্যালকোহলকে ভেঙে শরীর থেকে বের করে দেয়, কিন্তু যখন মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করা হয়, তখন লিভারের কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এর ফলে ফ্যাটি লিভার বা লিভারে চর্বি জমার সমস্যা হয়। অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস হতে পারে। যা লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। হতে পারে সিরোসিস। যা লিভারের কোষগুলি নষ্ট হয়ে সেখানে ফাইব্রোসিস তৈরি করে। ফলে লিভার কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট রয়েছে এমন খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ থেকে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার হতে পারে। কারণ অতিরিক্ত চিনি, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ, লিভারে চর্বি হিসাবে জমা হয়। অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবারে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স ফ্যাট থাকে। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় তাই এড়িয়ে চলাই ভাল। এ ছাড়া শরীরের অতিরিক্ত ওজনও ফ্যাটি লিভারের কারণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনেকেই নানা ধরনের ওষুধ খেয়ে থাকেন। বিশেষ করে প্যারাসিটামল বা ব্যথা কমানোর ওষুধ। এ ছাড়া অনেকে বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজেরও হার্বাল সাপ্লিমেন্ট অতিরিক্ত পরিমাণে খেয়ে থাকেন। এই অভ্যাস লিভারের বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ লিভার শরীরের বেশিরভাগ ওষুধকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শরীরের প্রয়োজনীয় অংশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ভুল ওষুধ গ্রহণে লিভারের ওপর চাপ পড়ে এবং লিভারের কোষের ক্ষতি হতে পারে। যা থেকে লিভার ফেলও করতে পারে।
বদহজম মানেই যে লিভারের রোগ হবে, তা নয়। আর যদি তা ক্রনিক সমস্যায় পৌঁছে যায়, তা হলে তো সর্বনাশ। ঘন ঘন অম্বল, কিছু খেলেই বমি, গলা-বুক জ্বালা, মাঝেমধ্যে জন্ডিসের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়া মোটেই সাধারণ সমস্যা নয়। পেটের রোগ ভেবে এড়িয়ে গেলেই বিপদ। এই ভুলটাই অধিকাংশ মানুষজন করছেন বলেই দাবি গবেষকদের। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ও দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থের গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কিছু ব্যতিক্রমী লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, যেগুলিকে রোজের সমস্যা ভেবেই ভ্রম হচ্ছে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ হল ‘প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডিনোকার্সিনোমা’। এই ক্যানসার ছড়াতে শুরু করলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব। গবেষকেরা পরীক্ষা করে দেখেছেন,কিছু বিশেষ প্রোটিনের আধিক্য হলে অগ্ন্যাশয়ের কোষগুলির অস্বাভাবিক ও অনিয়মিত বিভাজন শুরু হয়ে যায়। শুধু খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম বা অত্যধিক নেশা করা এর জন্য দায়ী না-ও হতে পারে। জিনগত কারণেই এমন মিউটেশন (রাসায়নিক বদল) আসে, যা খুব দ্রুত ছড়াতে শুরু করে। আর সে কারণেই এমন কিছু উপসর্গ দেখা দিতে থাকে, যা ক্যানসারের লক্ষণ বলে মনেই হয় না। খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম করছেন না, অথচ হঠাৎ করে ওজন কমতে শুরু করবে। বিশেষ করে শরীরের পেশির ক্ষয় হতে থাকবে। এতে হাঁটাচলা, কাজকর্ম করতে সমস্যা হবে। ডায়াবিটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে এই বদলটা সবচেয়ে আগে ধরা পড়ে। ওষুধ খাওয়া বা ইনসুলিন নেওয়ার পরেও রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে না এবং ওজনও কমতে শুরু করে। পিঠ বা কোমরের পিছন দিকে যন্ত্রণা হলে পেশির ব্যথা ভেবে ভুল করেন অনেকে। কেউ আবার কিডনির সমস্যাও ভেবে ফেলেন। যদি দেখা যায়, পিঠের ব্যথা উত্তরোত্তর বাড়ছে, বেশি ক্ষণ বসে থাকতেও সমস্যা হচ্ছে, তা হলে সতর্ক হতে হবে। ক্যানসার কোষের বাড়বৃদ্ধি শুরু হলে তার প্রভাব পড়ে স্নায়ুর উপরেও। ফলে ওই অংশের স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। যে কারণে ব্যথাবেদনা শুরু হয়। শুয়ে থাকার সময়ে ব্যথা আরও বাড়ে। ঘন ঘন জন্ডিসে আক্রান্ত হলে কিন্তু সেটি মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। এই ক্যানসারে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায় জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে হেপাটাইটিস ভেবে ভুল করে ফেলেন। হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে সব সময়ে বমি বমি ভাব থাকবে, খিদে কমে যাবে। আর অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে পেটে অসহ্য ব্যথা শুরু হবে, ওজন কমতে থাকবে, গাঢ় রঙের প্রস্রাব হবে, মলের সঙ্গে রক্ত বার হতে পারে। ডায়াবিটিস ছিল না বা বাড়িতে কারও সুগার নেই, অথচ হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে শুরু করবে। ওষুধ খেয়ে বা ইনসুলিনেও সুগার নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এমন লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। কারণ ছাড়াই শরীরের একাধিক জায়গায় কালশিটে পড়বে, রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। চোট-আঘাতের ফলে কিংবা অন্য একাধিক কারণে শিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনও আঘাত ছাড়াই রক্ত জমাট বাঁধা বা ডিপ ভেন থ্রম্বোসিসের লক্ষণ দেখা দেবে। পা ফুলে যাওয়া, পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে কালো ছোপ তৈরি হওয়া, হাঁটতে হাঁটতে বসে পড়া, হঠাৎ অসহ্য যন্ত্রণা— এই ধরনের লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।




