ভারতের মহিলা দলের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন কোচ অমল মুজুমদারকে। সেই ছবি ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। সময়-যুগ বদলালেও, হরমনপ্রীত দেখিয়ে দিলেন যতই উত্তর আধুনিকতা আসুক, যতই পরিবর্তনের পথে এগোক দেশ, দেশের সংস্কৃতি একই আছে। বদলায়নি একটুও। গুরুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন ভারত অধিনায়ক। যা ভারতীয় সংস্কৃতিরই নিদর্শন। অমল মুজুমদার ও হরমনপ্রীতের সম্পর্ক কেবল কোচ আর অধিনায়কের মতো নয়। তাঁদের রয়াসন আরও গভীর। হরমনপ্রীতদের চাণক্য অমল মুজুমদার। খেলোয়াড় জীবনে দারুণ প্রতিভাবান ছিলেন। কিন্তু যে ফুল পাপড়ি কোনওদিন মেলল না। অমল মুজুমদারের খেলোয়াড় জীবনের অপূর্ণতা অবশেষে দূর হল রবি-রাতে। তাঁর পাওয়ার কলস পূর্ণতা পেল অবশেষে।
হরমনের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিয়েছেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ। ট্রফি নেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হরমনপ্রীত আইসিসি চেয়ারম্যানের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জয় শাহ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে হরমনের প্রণাম নেননি। হরমনপ্রীত দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে নিজেও ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর একটি ছবি পোস্ট করলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পাশে বিশ্বকাপ নিয়ে শুয়ে আছেন তিনি। তাঁর টি শার্টে লেখা, ”ক্রিকেট ইজ জেন্টলম্যানস(কেটে দেওয়া হয়েছে),এভরিওয়ানস গেম।”
মেয়েদের অভিনন্দন জানান শচীন তেণ্ডুলকর। মাস্টার ব্লাস্টার লেখেন, ”১৯৮৩ সালের ঐতিহাসিক জয় যেমন এক প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও সেই স্বপ্নকে তাড়া করতে অনুপ্রাণিত করেছিল, আজ ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল সেই ইতিহাস নতুন করে লিখল। তাঁদের এই সাফল্য দেশের অগণিত কন্যাকে অনুপ্রাণিত করবে হাতে ব্যাট-বল তুলে নিতে, মাঠে নামতে, এবং বিশ্বাস রাখতে—একদিন তাঁরাও সেই বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরতে পারবে। এই জয় নিঃসন্দেহে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের যাত্রাপথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। অভিনন্দন টিম ইন্ডিয়া! তোমরা পুরো দেশকে গর্বিত করেছো।”
বিরাট কোহলি পোস্ট করেন, ”ভারতের মেয়েরা ইতিহাস গড়লেন! তাঁদের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে গর্বে ভরে উঠেছে গোটা দেশ। বহু বছরের পরিশ্রম ও অধ্যবসায় আজ বাস্তবের রূপ নিয়েছে। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর এবং গোটা দলকে আন্তরিক অভিনন্দন। শুধু খেলোয়াড়রা নয়, দলের সঙ্গে যুক্ত সমগ্র সাপোর্ট স্টাফ ও ম্যানেজমেন্টকেও ধন্যবাদ জানানো উচিত, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল এই জয়। ওয়েল প্লেড টিম ইন্ডিয়া। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপভোগ করো হৃদয়ভরে।”

আমনজ্যোৎ কৌরের ক্যাচ নতুন জীবন দিয়ে গেল তাঁর ঠাকুমাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক লরা উলভার্ট ভয়ঙ্কর হয়ে ধরা দিয়েছেন তখন। ১০১ রানে ব্যাটিং করছে মানেই প্রোটিয়া-ব্রিগেডের সাজঘরে জয়ের গন্ধ ঢুকে পড়া। সেই লরার ক্যাচ একাধিক প্রচেষ্টায় ধরলেন আমনজ্যোৎ। সোশ্যাল মিডিয়া বলছে জাগলিং ক্যাচ। তাঁর ক্যাচ ভারতের জয়ের রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়। তিরাশিতে ৩৩ গজ দৌড়ে ভিভিয়ান রিচার্ডসের ক্যাচ ধরেছিলেন কপিল। ওই ক্যাচ না ধরলে লর্ডসের অলিন্দে বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে ভুবনজয়ীর হাসি হাসতেই পারতেন না কপিল। একই ভাবে মিলারের ক্যাচ অবিশ্বাস্য ভাবে ধরে রোহিতের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন সূর্যকুমার যাদব। ক্যারিবিয়ান মুলুকে সেদিন ভারতীয় ক্রিকেটের সূর্যোদয় হয়েছিল। ঠিক তেমনই এই ২০২৫-এর রবিবারে আমনজ্যোৎ কৌর ওই ক্যাচ না ধরলে আজ গোটা দেশের গান হতো না, ‘মা তুঝে সালাম।’ আমনজ্যোৎ-এর গল্প চোখে জল আনার মতো। তাঁর গল্প প্রেরণা দেয়। তাঁর গল্প নতুন জীবন দেয়। যেমন তাঁর শয্যাশায়ী ঠাকুরমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেল আমনজ্যোতের ক্যাচ। ৭৫ বছরের ভগবন্তী কৌর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন সেপ্টেম্বর মাসে। আমনজ্যোতের বাবা ভুপিন্দর ছুতোর মিস্ত্রি। তিনিই প্রথমে কাঠ কেটে মেয়েকে ব্যাট বানিয়ে দিয়েছিলেন। ৫৪ বছরের ভুপিন্দর বলন, ”১ নভেম্বর হাসপাতাল থেকে মাকে বাড়ি নিয়ে এসেছি। আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করি ফাইনাল রয়েছে ২ তারিখ। সেই সময়ে যেন বাড়িতেই থাকে মা। শয্যাশায়ী হলেও মা কিন্তু জ্ঞান হারায়নি। আমরা মা-কে বললাম, তোমার নাতনি বিশ্বকাপ জিতেছে। মা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে তাকিয়ে রইল।” ১৫ বছর বয়সে চণ্ডীগড়ের নাগেশ গুপ্তার অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন আমনজ্যোৎ। গোড়ার দিকে বোলার হিসেবেই ছোট্ট মেয়েটাকে ট্রেনিং দিতেন কোচ নাগেশ। পরে আমনজ্যোৎ হয়ে ওঠেন অলরাউন্ডার। ভুপিন্দর জানান, তাঁর মা-ই আমনজ্যোৎকে ক্রিকেট খেলার কথা বলেন। রাস্তায় ছেলেদের সঙ্গে আমনজ্যোৎ ক্রিকেট খেলতেন। ঠাকুমা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেন নাতনির খেলা। রবি রাতে বিশ্বজয়ের পরে রাত একটা নাগাদ বাড়িতে ফোন করেছিলেন আমনজ্যোৎ। ভুপিন্দর বলছেন, ”মেয়ের বিশ্বজয়ের কাহিনি বাঁচার ইচ্ছা বাড়িয়ে দিয়েছে মায়ের। আমনজ্যোতের সাফল্যের পিছনে আমার মা-ই চালিকাশক্তি।” আমনজ্যোৎ শুধু ক্যাচ ধরে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিলেন তা নয়, তাঁর ঠাকুমাকেও জীবন দিয়ে গেলেন।





