হরমনপ্রীত কৌরের দলের একমাত্র বাঙালি প্রতিনিধি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় পারেননি। ঝুলন গোস্বামী পারেননি। রিচা ঘোষ পারলেন। শিলিগুড়ির মেয়ের হাত ধরে বাঙালি প্রথম বার ক্রিকেট বিশ্বকাপ হাতে ছুঁয়ে দেখল। রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ ফাইনালে রিচার ৩৪ রান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ম্যাচের পর রিচা জানালেন, জীবন বাজি রেখে নেমেছিলেন ফাইনালে। বিশ্বকাপ জিতে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে মোক্ষম সময়ে ব্যাট হাতে গর্জে উঠেছেন তিনি। আবার উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি ক্যাচ ধরেছেন আবার তাঁর গ্লাভস জোড়া উইকেট ভেঙে দিয়ে রান আউটও করেছেন। বঙ্গতনয়া রিচা ঘোষ দেশের শ্বাসপ্রশ্বাসে। আর মুম্বইয়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গেও।ঘরের মেয়ের বিশালাকায় সব ছক্কা দেখে স্থানীয় মানুষ আনন্দে আত্মহারা। রিচা তাঁদের গর্বিত করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ”শিলিগুড়ির মানুষ হিসেবে আমরা গর্বিত। এর আগে ঋদ্ধিমানকে আমরা পেয়েছি। আজ শিলিগুড়ির মেয়ে, আমাদের ঘরের মেয়ে রিচা যেভাবে ক্রিকেট খেলেছে, উইকেটের পিছনে যেভাবে দাঁড়িয়ে ক্যাচ নিয়েছে, রান আউট করেছে এবং যেভাবে গোটা টুর্নামেন্টে ব্যাট করেছে, তাতে রিচাকে দেখে বাংলার মেয়েরা আরও বেশি করে ক্রিকেটে ঝুঁকবে। শিলিগুড়ি দেখিয়ে দিল, এ শহর কেবলই বাণিজ্যিক শহর নয়, শিলিগুড়ি খেলাধুলোর শহর, ক্রিকেটের শহর।” মেয়ের হাতে কাপ উঠুক। এই দৃশ্য চাক্ষুষ করতে মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন রিচার বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ ও মা স্বপ্না ঘোষ। বিশ্বকাপের প্রথম দিন থেকেই তাঁদের প্রত্যাশা ছিল মেয়ে ফাইনাল খেলুক। কাপ ঘরে তুলুক। সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে অবশেষে।মেয়ে রিচা কী বলছেন? মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো ফিনিশার হতে চাইতেন তিনি। তাঁর ব্যাটিং দর্শন একটাই, ”দেখো আর মারো।” রিচা এখন ভারতীয় দলের হার্ডহিটিং ব্যাটসম্যান। যখনই রানের দরকার তখনই তিনি বল গ্যালারিতে পাঠান। এদিন ফাইনালে দলের প্রয়োজনে ২৪ বলে চটজলদি ৩৪ রান করে যান। ৩টি চার ও ২টি বিশাল ছক্কা হাঁকান তিনি। গ্রুপ পর্বে এই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রিচার ব্যাট থেকে এসেছিল ৯৪ রানের ইনিংস। ভারত হেরে গেলেও রিচার ইনিংস দাগ কেটেছিল সমর্থকদের মনে। রবিবার ফাইনাল জেতার পরে রিচা বলছেন, ”আমরা এই ট্রফিটার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আজ আমরা চ্যাম্পিয়ন। আমি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারব না। আমরা যখন হাডল করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখনই আমরা স্থির করেছিলাম, এটাই আমাদের শেষ ম্যাচ। নিজেদের সেরাটা দেব। ফাইনালের চাপ তো ছিলই। তবে তা নিয়েও আমি ভাল পারফরম্যান্স করেছি। আমি বড় শট খেলতে পারি, এই বিশ্বাস সবাই আমার উপরে রেখেছিল। এটাই আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।” ঘুম নেই শিলিগুড়িরও। মায়ের হাতের ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খেতে পছন্দ করেন রিচা। বিশ্বজয়ের পরে ঘরে ফিরে এই মেন্যুই চেখে দেখবেন সোনার মেয়ে।

রিচা জানিয়েছেন, নিজেদের সেরাটা দেওয়ার পণ করেই নেমেছিলেন তাঁরা। তাঁর কথায়, “সকলে একটাই কথা বলেছিলাম, এটাই প্রতিযোগিতার শেষ দিন। নিজেদের মধ্যে যা আছে পুরোটা উজাড় করে দিতে হবে। নিজের শরীর, শক্তির শেষ বিন্দু সমর্পণ করতে হবে। একে অপরের জন্য খেলব আমরা। সব উজাড় করে দাও, এটাই ছিল আসল মন্ত্র। চাপ ছিল ঠিকই। মাঠে প্রচুর লোক এসেছিলেন। এই পরিবেশে আমরা খুব একটা খেলিনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, অনেক পরিশ্রম করেছি। এ বার নিজের উপর বিশ্বাস রাখার পালা। দলের সকলে বিশ্বাস করেছিল যে আমি ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারি। সেই আস্থা আমাকে খুব সাহায্য করেছে। বিশ্বকাপ জয় আমাদের কাছে স্বপ্নপূরণ। বহু দিন অপেক্ষা করেছি। স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হল। আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কী রকম লাগছে সেটা বলতেই পারব না। সকলে আমাদের দেখছে। এটুকু বলতে পারি, এই অনুভূতি বাকি সব কিছুর চেয়ে আলাদা।” নাদিন ডি ক্লার্কের ক্যাচ হরমনপ্রীত কৌর ধরার পরেই শুরু হয়েছিল আবেগের বিস্ফোরণ। হরমনপ্রীত হাত তুলে ডিপ কভারের দিকে দৌড়তে থাকেন। তাঁকে ঘিরে ফেলেন সতীর্থেরা। একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন সকলে। আকাশে প্রবল শব্দে ফাটছিল বাজি। দর্শকাসনে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের পাশে বসে আবেগ সামলাতে পারেননি রোহিত শর্মাও। তাঁরও চোখ ভিজে আসে। মাঠে দেখা যায়, স্মৃতি এগিয়ে গিয়ে হরমনকে জড়িয়ে ধরেছেন। একের অপরকে ছাড়ছিলেনই না। এর পর স্পিনত্রয়ী রাধা যাদব, শ্রী চরণী এবং দীপ্তি শর্মা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। যে বলটি ক্যাচ ধরেছেন সেটি কাছছাড়া করছিলেন না হরমনপ্রীত। কিছু ক্ষণ পরেই তাঁর চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসে জল। পিঠ চাপড়ে সামাল দিতে থাকেন রিচা। সাপোর্ট স্টাফের এক সদস্য কয়েকটি পতাকা নিয়ে এসে ক্রিকেটারদের হাতে তুলে দেন। কোচ অমল মুজুমদার, স্নেহ রানাদের দেখা যায় সেই পতাকা জোরে জোরে নাড়াতে। শেফালি বর্মা এবং রেণুকা সিংহ একটি স্টাম্প তুলে নেন স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে। আবেগ সামলে কোনও মতে সঞ্চালকের সামনে যখন স্মৃতি পৌঁছলেন, তখনও তাঁর চোখে জল। বললেন, “যত বার বিশ্বকাপ খেলেছি তত বার হৃদয় ভেঙেছে। তবে বরাবরই জানতাম আমাদের কাঁধে একটা বড় দায়িত্ব আছে। শুধু জেতা নয়, মহিলাদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব। সত্যি বলতে, গত কয়েক মাসে যে সমর্থন আমরা পেয়েছি তার সঙ্গে কিছুর তুলনা হয়। আজ বিশ্বকাপটা হাতে তুলতে পেরে আমি গত ৪৫টা না ঘুমনো রাত ভুলে যেতে পারি।”স্মৃতি আরও বলেন, “আগের বিশ্বকাপ আমাদের সকলের কাছে একটা কঠিন শিক্ষা ছিল। তার পর আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, প্রতিটা বিভাগে আরও শক্তিশালী এবং উন্নতি করা। আরও ফিট থাকা। সত্যি বলতে, এই দলের আমরা যে ভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকেছি সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। সব সময়ে একে অপরকে সমর্থন করেছি। খারাপ দিন, ভাল দিন দুটোই দেখেছি। একে অপরের সাফল্য উপভোগ করেছি। এ বার যে পরিবেশে প্রতিযোগিতা জুড়ে ছিল সেটাই ভাল খেলতে আমাদের সাহায্য করেছে।” বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন প্রতিকা রাওয়াল। ফাইনালে তিনিও হাজির হয়েছিলেন হুইলচেয়ারে চড়ে। ট্রফি তোলার সময়েও তাঁকেও মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়। প্রতিকা বলেন, “এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমার কাঁধের পতাকাই অনেক কথা বলে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে দলের সঙ্গে থাকাটাই একটা বিশেষ অনুভূতি। চোট তো খেলারই অংশ। এখনও যে দলের সঙ্গে রয়েছি এটাই বড় ব্যাপার। আমি নির্বাক। অত্যন্ত গর্বিত। মেয়েরা এই মুহূর্ত উপভোগ করার যোগ্য দাবিদার। কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসে ভর করে ওরা সকল ভারতবাসীকে গর্বিত করেছে। ভারতের মহিলাদের ক্রিকেটে এটা যুগান্তকারী মুহূর্ত। আগামী কয়েকটা প্রজন্ম এর সুফল পাবে।” উলভার্টের ক্যাচ তাঁর হাত থেকে আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। তৃতীয় বারের প্রচেষ্টায় ক্যাচ নিয়েছিলেন। সেই ক্যাচ প্রসঙ্গে আমনজ্যোৎ কৌর বলেছেন, “আমরা সকলেই জানতাম ওই উইকেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। খুশি যয়ে ক্যাচটা নিতে পেরেছি।”





