Sunday, April 26, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

হৈমন্তিকার আগমনে জমজমাট মুখার্জ্জী বাড়ির পূজো!‌ উদয়নারায়ণপুরের জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজনেও চমক

দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর পর এ বার জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজনেও সকলকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিল মুখার্জ্জী বাড়ির পূজো! পারিবারিক পূজোয় জোর টক্কর। উদয়নারায়ণপুরের মুখার্জ্জী বাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজা। তাদের এ বারের আয়োজন নিয়ে ইতিমধ্যেই সোশাল মিডিয়ায় চর্চা। হাওড়া হুগলীর সীমারেখায়। গ্রামের নাম আতড়া। পুজো কেবল পরিবারের সদস্যদের নিয়েই। গ্রাম্য পরিবেশের অনুকরণেই গোটা মণ্ডপ এবং সংশ্লিষ্ট চত্বর সাজিয়ে তোলা হয়েছে। আলোর ঝলকানি। ঢাকের তালে কোমর দোলে। সেই সঙ্গে কানে আসছে কাঁসর ও ঘণ্টার শব্দ। সব মিলিয়ে মণ্ডপে ঢুকলেই এক শান্তিপূর্ণ আধ্যাত্মিক আবহ দর্শনার্থীদের মন ভাল করে দেবে। এই পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ভাবেই এ বারের জগদ্ধাত্রী প্রতিমাটিও নির্মাণ করা হয়েছে। এই প্রতিমার গঠন ও গড়নে বনেদিয়ানার ছোঁয়া।

শান্তির বার্তাবরণে মাতৃমূর্তির আদল অনুসরণ। প্রতিমার উচ্চতা প্রায় ১২ ফুটেরও বেশী। মায়ের অঙ্গসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে ডাকের সাজ। গহনা সজ্জিত। সব মিলিয়ে এই পুজো ইতিমধ্যেই পারিবারিক আবহ এমনকি আমজনতার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারের সদস্যদের আশা, পুজোর দিনগুলিতে মণ্ডপে ভিড় হবে ভালোই। নেই আড়ম্বর। নেই প্রচুর আলোর রোশনাই। গাছগাছালি, পুকুর, ধানক্ষেত ঘেরা গ্রাম্য পরিবেশ বেষ্টিত ঘরোয়া পুজোর আবহ। তবে, প্রগাঢ় ভক্তির অর্ঘ্যে সেজে ওঠে মুখার্জ্জীবাড়ি। আর এই বহু পুরানো জগদ্ধাত্রী পুজো মানেই এক অন্য আবেগ। এখানকার পুজোকে ঘিরে থাকা আকর্ষণ যেন শুধু উৎসবের নয়, তা এক অলৌকিক বিশ্বাসের সুতোয় বোনা। পুজো শুরু বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর। সকাল থেকেই দেবীর আরাধনা শুরু হলেও, দূর দূরান্ত থেকে মানুষের ভিড় জমে সন্ধ্যার আরতিতে। সূদুর বিদেশ থেকেও। এই আরতি দেখতে ভিড় জমানো মানুষের ঢলই প্রমাণ করে দেবীর মাহাত্ম্য। বাংলার এই নিজস্ব চালচিত্র মণ্ডপের আনাচে-কানাচে যেন এক বিশেষ ছোঁয়া দিয়েছে। শিল্প আর সংস্কৃতির এমন বুনন সত্যিই দেখার মতো। মা এখানকার মানুষের কাছে কেবল প্রতিমা নন, তিনি জাগ্রত দেবী। এক মর্মস্পর্শী কাহিনি। দেবীর এমন মহিমা আর ভক্তির গভীরতা, এই পারিবারিক মেলবন্ধনের গল্পেই প্রমানিত হয়।

এবার আসা যাক, পরম ভক্তিভরে মা’‌র আরাধনা, দেবীর আরাধনা নয়, এক আবেগ, এক ভালবাসার উদযাপনের কথায়। তাঁর সঙ্গে কখনও কারও ঝগড়া হয়নি। ছেলেবেলার সঙ্গিনী অঘোরমণি স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, ‘‌মা খুব সাদাসিধে ছিলেন। সরলতা যেন মূর্তিমতী। অন্যান্য মেয়েদের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া হলেও মিটিয়ে দিতেন।’‌ মা সারদার বাল্যকালেই তাঁর মধ্যে দেবত্ব ও মানবত্বর অত্যাশ্চর্য মিশ্রন ঘটেছিল। কন্যা সারদমণির জন্মলগ্নের আগে থেকে মা শ্যামাসুন্দরী এবং বাবা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতেন। শ্রীমায়ের নিজের কথায়, ‘‌ছেলেবেলায় দেখতুম আমারই মতো এক মেয়ে সর্বদা আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকে আমার সকল কাজের সহায়তা করত- আমার সঙ্গে আমোদ আহ্লাদ করত। কিন্তু অন্য কেউ এলেই সেই মেয়েটিকে আর দেখতে পেতেম না।’‌ তাঁর জীবনের প্রায় ১০-১২ বছর পর্যন্ত এ রকম চলেছিল। এক বার জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় হলদেপুকুরের স্থানীয় ব্যক্তি রামহৃদয় ঘোষাল গ্রামে উপস্থিত ছিলেন। ছোট্ট সারদামণিকে জগদ্ধাত্রীর সামনে ধ্যান করতে দেখে তিনি অবাক হয়ে অনেক ক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। কিন্তু কে জগদ্ধাত্রী আর কে মা কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। তখন ভয়ে স্থানত্যাগ করলেন। শ্রীমাকে ঘোষাল মহাশয়ের জগদ্ধাত্রীরূপে দেখা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মায়ের অনুগামিনী সহায়িকা বাসনাবালা নন্দীরও অনুরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। দশ বছর বয়সে মায়ের বাড়িতে কাজ করতে আসেন তিনি। মায়ের প্রয়াণ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এক বার জয়রামবাটীতে থাকাকালীন পাশের গ্রামে জগদ্ধাত্রী পুজো দেখতে যাওয়ার জন্য করে মায়ের কাছে খুব কান্নাকাটি করছিলেন। কিন্তু মা একা মেয়েকে ছাড়তে নারাজ। সে দিন রাতে এক অপার্থিব ঘটনার সাক্ষী হলেন তিনি। মায়ের পায়ে তেল মালিশ করার সময় তিনি বাসনাবালা দেবীকে বললেন,‘তুই যা দেখার জন্য ব্যস্ত হয়েছিস তা তুই এখানে বসেই দেখতে পাবি।’ এ দিকে তেল মালিশ করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বাসনাবালা। অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম গেল ভেঙে। তাকিয়ে দেখেন, গোটা ঘর ভরে গিয়েছে এক অদ্ভুত আলোয়। এমন আলো তিনি আগে কখনও দেখেননি। আর সেই আলোর মধ্যে বসে আছেন জীবন্ত মা জগদ্ধাত্রী। কিন্তু মা কোথায় নেই! প্রচন্ড ভয়ে তিনি মাকে ডাকতে লাগলেন। দরজার খিল খুলে বাইরে এসেও কোথাও মায়ের দেখা পেলেন না। ঘরে ফিরে দেখেন, মা যেমন শুয়েছিলেন, তেমনি ঘুমোচ্ছেন। তবে ঘরের মধ্যে সেই স্বর্গীয় আলো আর নেই। এ বার শ্রীমাকে ডাকতে তিনি উঠে বসলেন, বললেন, ‘তুই দেখেছিস তো?’ বাসনাবালা দেবী মাকে সব বললেন তিনি কী দেখেছেন। শুনে মা হাসলেন। বললেন, ‘যা দেখেছিস সব সত্যি…. ‘ এক বার গ্রামের কালী পুজোয় শ্যামাসুন্দরী দেবী নৈবেদ্য দানে বঞ্চিত হন। সে রাতেই এক রক্তবর্ণা দেবী তাঁকে দেখা দেন। বলেন, মা কালীর জন্য রাখা চাল তিনি গ্রহণ করবেন। তিনিই জগদম্বা। এই ঘটনার পর থেকে জগদ্ধাত্রী রূপে জয়রামবাটির শ্যামাসুন্দরী গৃহে তাঁর পুজো শুরু হয়। প্রথম চার বছর এই পুজোর সংকল্প হয় শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে। দ্বিতীয় চার বছর সারদা দেবীর নামে। তৃতীয় চার বছর তাঁর কাকা শ্রীযুক্ত নীলমাধবের নামে। ১২ বছর পুজো হওয়ার পর শ্রীমা পুজো বন্ধের ভাবনা শুরু করেন। কারণ পরিবারের সকলের নামেই যে পুজো হয়ে গিয়েছে! কিন্তু যে দিনই সেই অভিপ্রায় প্রকাশ করলেন সেই রাতেই দেবী দর্শন হল তাঁর। স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবী জগদ্ধাত্রী তিন বার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘‌তবে আমি যাই?’‌ শ্রীমা বুঝতে পারেন জগদ্ধাত্রী ত্রিসত্য করে চলে যেতে চান। তখন সারদা দেবী বলেন, ‘‌আমি আর ছাড়ব না মা তোমাকে, বছর বছর তোমাকে আনব।’‌ এই সংকল্পানুসারে তিনি প্রায় সাড়ে ১০ বিঘার বেশি চাষের জমি দেবোত্র করে দেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভাষায়, “মন করীকে যে বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হন।… ভক্তরা আজও বিশ্বাস করে জগদ্ধাত্রী শ্রীমায়ের মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সুতরাং দেবী আরাধিত হলে শ্রীমাও আরাধিত হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles