Monday, July 27, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

মায়ায় ঘেরা এই গ্রামে গেলে মুহূর্তে হতে পারেন ভ্যানিশ, আবার কখনও ভেড়া, জানুন রহস্য

চারদিকে গা ছমছমে পরিবেশ। কিছুক্ষণ অন্তর গাছের পাতাগুলো দুলছে। তাও যেন মনে হচ্ছে অলক্ষ্যে থেকে কেউ ইশারা করছে। এ এক রহস্যময়ী জায়গা। এই গ্রাম রয়েছে উত্তর পূর্ব ভারতে। পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে কুলকুল স্বরে ব্রহ্মপুত্র নদ। একটু এগোতেই দেখা মিলবে এক-দুজন পথ চলতি মানুষের। কিন্তু তাদের চোখে মুখেও যেন কিছু একটা গোপন করার চেষ্টা। এই গ্রামের কাহিনী শুনলেই হাড়হিম হয়ে যাবে সাধারণ মানুষের। শোনা যায়, এই গ্রামে জাদুবলে মানুষ থেকে হয়ে যেতে পারেন ভেড়া। কিংবা আপনি চাইলেই যে কোনও কাউকে মানাতে পারবেন পোষ। এক্ষেত্রে কোনও জন্তুর কথা হচ্ছে এমন নয়, যে কোনও মানুষকে আনতে পারবেন বশে। শুনে তাজ্জব মনে হলেও সত্যি আছে এমন এক গ্রাম যেখানে শেখানো হয় এইসব যাদুবিদ্যা। গ্রামের নামটিও বেশ অদ্ভুত, ময়াং। অসম রাজ্যের মরিগাঁও জেলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই গ্রাম অবস্থিত। কাছেই রয়েছে কামাখ্যা দেবীর মন্দির। অসমের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। গ্রাম ঘিরে রয়েছে অনেক ভীতি, অনেক সংশয়। বলা হয়ে থাকে এই জায়গা যাদুবিদ্যার ঠেক। এখানে নাকি ওই গ্রামের কেউ নিয়ে যেতে না চাইলে যাওয়া যায় না। সবটাই মায়ায় ঘেরা। খুব বেশি পর্যটকও আসেন না এখানে। কামাখ্যা সহ এই অঞ্চলটার পুরো নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর। জ্যোতিষের চর্চা থেকে কালা জাদু হরেক কিসিমের খনি ওই অঞ্চল।

সাধারণ মানুষ অসম যান মূলত কামাখ্যা দেবীর কাছে পুজো দিতে। কেউ মানত করেন আবার কেউ মানত পূরণ হয়েছে বলে পুজো দিতে যান। পুরাণে কথিত, এই কামাখ্যাতেই পড়েছিল যোনি। সতীকে হারিয়ে শিব তখন উন্মাদ। শিব মাথায় সতীর দেহ চাপিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করে চলেছেন। জগতে প্রলয় বাঁধতে আর বেশি বাকি নেই। উপায়ন্তর না দেখে বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে ছেদ করেছিলেন সতীর দেহ। সেই দেহ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জায়গায়। সেই দেহেরই একটা অংশ যোনি পড়েছিল এই কামাখ্যায়। পরবর্তীতে সেখানে গড়ে ওঠে মন্দির। মানুষের ভিড় জমতে থাকে। মানুষ এখানে আসেন পূণ্যলাভের আশায়। একটা সময় পর্যন্ত এখানে নরবলিও হত এমনটাই বলছে ইতিহাস। সাধারণত পর্যটকেরা ভুলেও যান না ওই ময়াং গ্রামে। এই ময়াং এর আবার ভাগ রয়েছে। কোনওটার নাম পশ্চিম ময়াং, কোনওটা মধ্য ময়াং। আর সবচেয়ে যাদুবিদ্যা যেখানে প্রখর সেই জায়গার নাম রাজা ময়াং। এই রাস্তায় কোনও সরকারি গাড়ি যেমন বাস, অটো চলতে দেখবেন না। নিজের গাড়ি চালিয়ে রওনা দিলে দেখবেন গোটা পথ কুয়াশা ঘেরা। ময়াং এর গ্রামে গেলে প্রথমেই পড়বে পশ্চিম ময়াং। সেখানে রয়েছে নাট্যমঞ্চ। রাস্তা থেকেই দেখা যায় তা। তিনদিক খোলা অদ্ভুত সেই মঞ্চ। তবে কি এখন সেইখানে যাদু দেখানো হয়। ভেড়া বানিয়ে রাখা হয় মানুষকে? কোনও গ্রামের লোকের দেখা মিলবে না। তবে কি সবাই ওঁত পেঁতে রয়েছে? নাকি সকলে মানুষই নন। এখানে কি টিয়াপাখি কথা বলে? নাকি কোনও মানুষ যাঁরা আগে এসেছিলেন তাঁদের পাখি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ফিরতে পারেননি নিজের দেশে। গোটা পথ কুয়াশায় মোড়া। পাশেই কিছু দূরে শোনা যাবে সমবেত স্বরে কিছু পাঠের আওয়াজ। সেখানেই কি তবে শেখানো হয় কালা যাদু? গ্রামের পথ গিয়েছে আরও গভীরে। এখনও কাঁচা রাস্তা। যেন গোটা গ্রামটাই মায়ায় ঘেরা। মাঝে মধ্যে সর সর করে আওয়াজ আসছে। যেতে গেলে পথে পড়বে বেশ কিছু মন্দির। সরকারি হিসেবে খাতায় কলমে ৩২ টি মন্দির রয়েছে। যেগুলো সবই প্রাচীন। বেশিরভাগই গনেশ এর মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়াংজুড়ে। পুরাণ মতে, এই গনেশ শিব আর পার্বতীর সন্তান। চারপাশে পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলে এই অদ্ভুত নামের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আরও একটি তথ্য। ময়াং জায়গাটির উৎপত্তি হয়েছে মা থেকে। মা অর্থ্যাৎ দেবী শক্তি।

মহাভারত ঘাঁটলে দেখা যায়, হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকোচ এইখান থেকে যাদুবিদ্যা শিখেছিলেন। অসীম ক্ষমতাশালী হয়েছিলেন তারপর। এখান থেকে উদ্ধার হওয়া নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা পাওয়া গিয়েছে যাঁর মধ্যে রয়েছে তরবাড়ি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র। সেই অস্ত্র কাজে লাগানো হত নরবলির ক্ষেত্রে। একজন মানুষকে হত্যা করে অন্য একজন মানুষ অসীম ক্ষমতাশালী হয়ে পড়তেন এই তন্ত্রের সাহায্যে। এই গ্রাম ঘিরে যত রহস্য তত রহস্য বোধহয় আর কোথাও নেই। সত্যিই কি কালা যাদু করেন সেখানকার লোকজন? সেখান থেকে বেঁচে ফেরার উপায় কী? যদিবা কৌতূহলবশত সেই গ্রামে গিয়ে পড়েন লোক দেখবেন না তেমন রাস্তায়। কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলেই অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা। দেখতে অসমীয়াদের মতোই। তাহলে কি সকলেই যাদু জানেন? গল্প শোনা যায়, মেয়েরা ছেলেদের বশীভূত করে রাখেন। কিন্তু তাঁরা শিখলেন কোথা থেকে কালা যাদু? যাঁকেই জিজ্ঞেস করবেন উত্তর মিলবে না। উত্তর খুঁজতে গেলে যেতে হবে রাজা ময়াং। অনেকবার পথ হারিয়ে যাবে। পথে যেতেই পড়বে ময়াং রাজ দরবার। তাতেও তালাবন্ধ। তবে কি সেটাও কোনও মায়াবলে বন্ধ? কীভাবে হল এই মায়া গ্রাম? তখন মধ্যযুগের শেষ। জানা যায়, সেইসময় সেখানে দুই ভাই থাকতেন, যাঁরা জাদুবিদ্যার চর্চাকারী ছিলেন। ভগবান ইন্দ্রের উপাসক ছিলেন এবং প্রতি বছর একবার ভগবান ইন্দ্রের দেখা পাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন যাতে তাদের জাদু শক্তি অক্ষুণ্ন থাকে। সেই মতো প্রতি বছর, ভগবান ইন্দ্রের দর্শনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, তারা লাল নল দিয়ে একটি রথ তৈরি করতেন এবং তিন দিন পর ফিরে আসার সময় একটি তলোয়ার নিয়ে ভগবান ইন্দ্রের কাছে যেতেন। এই তলোয়ারটি পরিচিত ছিল ডাখোর নামে। কিন্তু ভগবান ইন্দ্রের বাসস্থানে রওনা হওয়ার আগে, তাঁরা সর্বদা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের এবং প্রতিবেশীদের নির্দেশ দিতেন যে তাঁদের ফেরার সময় কাউকে বাইরে যেন দেখা না যায় কারণ সেই সময় তাঁরা যাঁকে পারবেন তাঁকে হত্যা করবেন। তাঁদের হুঁশ ফিরে পাওয়ার আগেই তাঁরা রক্ত পান করবেন। তবে এক্ষেত্রে একটা শর্ত রয়েছে। ফিরে আসার সময় যদি তাঁরা কোনও মানুষকে দেখতে না পান তবে তাঁরা একটি কলাগাছ কেটে এই গাছের কাণ্ড থেকে নির্গত রস পান করবেন। এইভাবেই তাঁরা নাকি তাঁদের জাদুকরী ক্ষমতা বছরের পর বছর ধরে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। এছাড়াও কথিত সেই জায়গায় ছিলেন মহিরাম নাথ নামে একজন জাদুকর। তিনি বাঘকে মন্ত্রবলে বশ করতে পারেন। সেই মন্ত্রের নাম বাঘবন্ধন মন্ত্র। যখনই কোনও বাঘ গবাদি পশুদের খাওয়ার জন্য গ্রামে প্রবেশ করত তখনই আমন্ত্রণ জানানো হতো সেই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে। তিনি তাঁর মন্ত্রের বলে বাঘটিকে শান্ত পোষ্য বানিয়ে ফেলতেন। সম্মোহিতের মতো কাজ করত বাঘটি। এমনকী তাঁর গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হতো। এরপর রাজার কাছে তিন চারদিন ধরে সে থাকতো। গ্রামের লোকেরা দেখতে আসতো বাঘটিকে। এরপর রাজার অনুমতিতে সেই বাঘটিকে মেরে ফেলা হতো। তবে বাঘ অবশ্য রাজার বউকে বা রাণীকে মৃত্যুর আগে আশীর্বাদ করে যেতেন। এইসব রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর কাহিনি রয়েছে ময়াং গ্রাম ঘিরে।

যেতে যেতে যদি সময় ভাল থাকে দেখা মিলতে পারে দু’একজন পুরোহিতের। তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করলেও এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা। কিছু অধিবাসীর দাবি, ম্যাজিক দু’ধরনের। একটা ব্ল্যাক ম্যাজিক আর একটা হোয়াইট ম্যাজিক। যত এই গ্রামের গভীরে ঢুকবেন বাড়বে কৌতূহল। আর সঙ্গে ভয়। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী হোয়াইট ম্যাজিক হল যে ম্যাজিক জাদুকরেরা দেখিয়ে থাকেন। যাঁর মাধ্যমে শুধুই মনোরঞ্জন হয় আর ব্ল্যাক ম্যাজিক যাতে সাধারণ মানুষের অনিষ্ট করা হয়। কোন ম্যাজিকের প্রভাব সবচেয়ে বেশি তা জানতে হলে যেতে হবে ময়াং মিউজিয়ামের মধ্যে। চারদিকে ঘাস, সামনে রয়েছে বাঁশের বেড়া। মিউজিয়াম কখন খোলে কখন বন্ধ হয় তাও জানেন না কেউ! চারদিকে গাছে ঘেরা। পাশে একটি পুকুর। তার মধ্যেই একতলা ঘর। ঘরের বাইরে ঝুলছে প্রাচীন প্রাণীর কাটা মুণ্ডু। কিছুটা দূরে রয়েছে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে বাস এক দম্পতির। বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ওই দম্পতির পুরুষ লোকটি দেখতে অদ্ভুত দর্শন। দেখতে মানুষের মত হলেও তিনি সবসময় কপালে পড়ে থাকেন সিঁদুর। আর গায়ে নামাবলী। তাঁর দেওয়া টোটকা কাজ করেছে অনেকের, এমনটাই জনমত। তাঁর গুরুর খোঁজ করতেই উঠে এল এক অজানা তথ্য। শোনালেন হরেক রকম মন্ত্র, তাঁর গুণাগুণ। কোনওটা সাপে কাটলে তাঁর দাওয়াই হিসেবে কাজ হয়, কোনওটা পড়াশোনায় অমনোযোগী হলে, আবার কোনওটা বাস্তুরক্ষার ক্ষেত্রে কাজ দেয়। সেই মন্ত্র বলতে এক চিলতে সিঁদুর। আর সঙ্গে কিছু মন্ত্রপড়া জল, তাবিজ-কবজ। একেকটা বানাতে একেকরকম সময় লাগে। কার টোটকা কাজ দেবে বুঝবেন কী করে? কে সেরা বুঝবেন কী করে? ওই দম্পতির পুরুষ লোকটি সন্ধান দিলেন দূরে এক গ্রামের দিকে। বললেন ওই গ্রামের এক শিবমন্দিরের পুরোহিত জানেন সব।

মিউজিয়ামজুড়ে রয়েছে পরতে পরতে রহস্য। মানুষ কী ভাবে আগুন জ্বালাতে শিখল? কী ভাবে পশুপালন শিখল, কীভাবে তালপাতার পুঁথিতে সমস্ত কিছু লিখে রাখত, কীভাবে সে সভ্য আধুনিক মানুষ হয়ে উঠল? মিউজিয়ামজুড়ে যেন সেইসব কাহিনি। তাহলে মন্ত্র, যাদু? সন্ধান মিলল সেসবেরও। গ্রামের লোককে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এল, অমুক বাবা সব জানেন। তাঁর ঘরে ছড়ানো ছিটানো সার্টিফিকেট। তাতে অমুক পদক প্রাপ্ত, তমুক পদক প্রাপ্ত। গেলে দেখা মিলবে তাঁর। তিনি নিজেই যুগোপযোগী মন্ত্র বানিয়েছেন। লাল কালিতে লিখেছেন তা। বর্তমান প্রজন্ম কেন এই পেশায় আসছেন না? তাঁর উত্তর তাঁরা লেখা পড়া শিখে নিজেদের জীবনধারণের জন্য অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। আর সেই শিবমন্দির? হদিশ মিলল না তাঁর। প্রকৃতির মাঝেই যা সৃষ্টি হয়, প্রকৃতির মাঝেই তা শেষ হয়। সত্য কেবল বিবর্তনবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles