আজ জন্মাষ্টমী। বাংলার ঘরে ঘরে পূজিত হচ্ছেন গোপাল ঠাকুর। গোপাল ঠাকুরের ইচ্ছায় এই প্রথমবার দি রেফিউজ প্রাঙ্গণে গোপাল ঠাকুরের পূজার্চনা শুরু হয়েছে। এই গোপাল ঠাকুরকে আমরা পেয়েছি এক অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে। আমাদের এই গোপাল ঠাকুরের নিজের বাড়ি বৌবাজারের ১৪ নং স্যাকরা পাড়া লেনে। এই বাড়িতে তাঁর বাস ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ২০১৯ সালে বৌবাজারে মেট্রো বিপর্যয়ের সময় গোপাল ঠাকুরের নিজের বাড়ি ভেঙে পরে। তারপর অনেকেই গোপাল ঠাকুরকে তাঁদের নিজেদের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গোপাল ঠাকুর তাঁর নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাননি। বহু মামলা মোকদ্দমা হয়েছে কিন্তু গোপাল ঠাকুর কোনো স্থানে স্থানান্তরিত না হয়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁর নিজের বাড়ি ১৪ নং স্যাকরা পাড়া লেনেই। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০১৯ সালে পুলিশ প্রশাসন, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় মানুষরা গোলাল ঠাকুরকে একটি বদ্ধঘরে চারপাশ সিল করে দিয়ে আবদ্ধ করে রাখেনা।ওই সময় ঘরে আলো বাতাস ঢোকা দূরের কথা মশা মাছিও গলতে পারেনি। নিরন্ন অবস্থায় দিন কেটেছে ঠাকুরের। সেই সময় থেকে এ বছরের ৩০শে মে পর্যন্ত একটি জীর্ণ বাড়িতে সিল করা ঘরেই আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু এমনই তাঁর ইচ্ছা সেই ঘরটিও এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। বাধ্য হয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ,পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় কাউন্সিলর বিশ্বরূপ দে’র প্রয়াসে পুলিশি নিরাপত্তায় গোপাল ঠাকুর হাজির ১২৫ বছরের সুপ্রাচীন দি রেফিউজ প্রতিষ্ঠানে। ৩০শে মে আসার পর আজ জন্মাষ্টমীতে এই প্রথমবার তিনি মহা সমারোহে পূজিত হচ্ছেন দি রেফিউজ প্রাঙ্গণে। গোপাল ঠাকুরের যতদিন ইচ্ছা তিনি রেফিউজ প্রতিষ্ঠানেই থাকবেন। আবার তাঁর যখন ইচ্ছা হবে তিনি ফিরে যাবেন তাঁর নিজের বাসস্থানে।

দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রথম জন্মাষ্টমী। কলস অভিষেকও। কলকাতা ইসকনের ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য রাধারমণ দাস বলেন, “সকাল থেকে শুরু হয় মঙ্গলারতি ও কীর্তন। দুপুরে প্রসাদ বিতরণ হয়। রাত ১২টায় হবে শ্রীকৃষ্ণ জন্মোৎসব পুজো।” প্রথম জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে ভক্তদের জন্য রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। এবার দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে পূণ্যস্নিগ্ধ কলস অভিষেকের আয়োজন করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, জন্মাষ্টমীর দিন মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের স্নানের জল কলসে করে রাখা হবে। প্রতিদিন রাত ৯ টার মধ্যেই মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়। জন্মাষ্টমীর শুভলগ্নে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকবে। ভোর ৬টা থেকেই শুরু হয় দর্শনার্থীদের প্রবেশ। ভক্তরা মন্দিরের মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। মন্দির চত্বরে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত নাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একটানা চলবে ভক্তিমূলক অনুষ্ঠান। সন্ধের পর গোটা মন্দির আলোকসজ্জায় সেজে উঠবে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন হয়েছে। ভক্তদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য মন্দির চত্বরেই পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকছে। জন্মাষ্টমীর সারাদিনই ভক্তদের জন্য মহাপ্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টানা তিনদিনের ছুটি কাটাতে এবং দিঘার জগন্নাথ ধামে প্রথম জন্মাষ্টমীর আনন্দ উপভোগ করতে ভিড় জমিয়েছেন বহু পর্যটক। তাই বাড়তি নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। পর্যটকদের সমুদ্র স্নানে নজরদারির জন্যেও বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। সমুদ্রে জেটস্কিতে চেপে নজর রাখবে পুলিশ। ওড়িশা সীমান্তে নাকা চেকিংও হচ্ছে। মন্দারমণিতেও নজরদারি শুরু করেছে পুলিশ। মেরিন ড্রাইভ ধরে লাগাতার পেট্রলিংয়ের ব্যবস্থা। দিঘা-শংকরপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক বিপ্রদাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, “প্রতি বছরই ১৫ অগস্ট বহু পর্যটক দিঘায় আসেন। কিন্তু এবার দিঘায় হোটেল হাউসফুল হয়ে গিয়েছে। কারণ, এই প্রথম দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে জন্মাষ্টমী উদযাপন হবে। ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত হোটেল বুকিং হয়ে গিয়েছে।” হোটেলগুলিতে কারা আসছেন, কারা বেরোচ্ছেন তার উপরেও সাদা পোশাকে নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ।

মথুরা ও বৃন্দাবন-সহ সারা ভারতজুড়ে পালিত হয় জন্মাষ্টমী। ১৫ আগস্ট, শুক্রবার রাত ১১টা ৫১ মিনিটে শুরু হয়েছে পূণ্য জন্মাষ্টমী তিথি। থাকবে ১৬ আগস্ট, শনিবার রাত ৯টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত। শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে বালিগঞ্জের ভারত সেবাশ্রম সংঘে চলছে দুদিনব্যাপী উৎসব। এ উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছে বিশেষ পুজোপাঠ, গীতা পাঠ, শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা। রয়েছে অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। ভোর থেকেই ভক্তের দল বিশেষ পূজা ও আরতিতে অংশ নিতে মন্দিরে ভিড় জমান। ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রধান সম্পাদক স্বামী বিশ্বাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, “শ্রীকৃষ্ণ হলেন আদর্শ ও বীরত্বের প্রতীক। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে প্রতি বছরই মহা ধুমধামের সঙ্গে জন্মাষ্টমী উদযাপন করা হয়।” শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন সেই উপদেশাবলি নিয়ে রচিত গীতার বানী সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এদিন গীতাপাঠের মধ্যে দিয়ে জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। গীতাপাঠে অংশ নেন স্বামী ত্যাগাত্মানন্দ, স্বামী দিব্যজ্ঞানানন্দ, স্বামী সংঘাত্মানন্দ মহারাজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অংশ নেন সংঘের ছাত্ররা ও আরও বহু ভক্ত।

বাড়িতে গোপালের মূর্তি? কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর শুভ মুহূর্তে প্রাণপ্রতিষ্ঠা। জন্মাষ্টমী আজ ১৬ আগস্ট, শনিবার। পুজোর শুভ মুহূর্ত থাকবে ১৬ আগস্ট রাত্রি ১২টা ৪ মিনিট থেকে রাত ১২টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে গোপালের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলে গৃহের কল্যাণ হবে। বিশেষ কিছু নিয়ম মেনে প্রাণপ্রতিষ্ঠা গোপালের।
নিয়ম মেনে গোপালের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন
(১) ঠাকুরঘর ভালো করে পরিষ্কার করুন। গঙ্গা জল ছিটিয়ে ঘর শুদ্ধ করে নিন। এরপর ঘরের উত্তর-পূর্ব দিক চিহ্নিত করে সেখানে গোপালের সিংহাসন রাখুন।
(২) গোপালের মূর্তি স্থাপনের জন্য পরিষ্কার ও উপযুক্ত স্থান বেছে নিন। স্থানটি পরবর্তীকালে পরিবর্তন যাতে না করতে হয়, এমন ভাবেই স্থির করুন।
(৩) জন্মাষ্টমীতে গোপালের মূর্তিকে দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি (পঞ্চামৃত) দিয়ে স্নান করান। স্নানের উপকরণে গাঁদা ফুলের কুচি ও তুলসীপাতা মেশান। মনে মনে ‘ওম ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ’ মন্ত্রোচ্চারণ করে পঞ্চামৃতটি দিয়ে গোপালকে স্নান করান। পঞ্চামৃতে অভিষেকের পর গোপালকে গঙ্গজলে ধুয়ে তার গা মুছিয়ে দিন।
(৪) গোপালকে নতুন জামা, মুকুট, বাঁশি, নূপুর ও ময়ূরের পালক দিয়ে মনের মতো করে সাজান। সম্ভব হলে জন্মাষ্টমীতে গোপালকে হলুদ রঙের পোশাক পরান। এরপর ফুল দিয়ে সিংহাসনটি সাজান।
(৫) গোপালকে পাঁচ রকমের ফল ও মিষ্টি দিন। আরতি ও মন্ত্রপাঠ করুন। কিংবা মনে মনে গোপালের ধ্যান করতে পারেন।
(৬) আপনি মনের মতো ভোগ রেঁধেও গোপালকে নিবেদন করতে পারেন। খিচুড়ি, পায়েস, লুচি ও সুজি প্রভৃতি ভোগ দেওয়া যেতে পারে।
(৭) মনে রাখবেন জন্মাষ্টমীতে এই নিয়ম পালনের তিন দিন আগে থেকেই প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
(৮) প্রথম দিনে একটা পরিষ্কার পাত্রে গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে তার মধ্যে গোপালকে বসিয়ে রাখতে হবে।
(৯) দ্বিতীয় দিনে চাল সরিয়ে রেখে সেই পাত্রে পাঁচ ধরনের সবজি রেখে তাতে গোপালকে বসিয়ে রাখুন।
(১০) তৃতীয় দিনে সেই পাত্রে ফুল ও ফল রাখুন। এই সময় গোপালের চোখ ছোট্ট লাল কাপড়ে বেঁধে রাখবেন।
(১১) প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় সেই কাপড়ের টুকরোটি খুলে ফেলুন। প্রাণপ্রতিষ্ঠার শুভ মুহূর্তে গোপালের মূর্তিকে আয়না দেখান।




