Saturday, July 25, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

মুকুটটা তো পড়েই আছে রাজাই শুধু নেই.‌.‌.‌.‌.‌.‌.‌

নয়ডার ফার্ম হাউজে নৈশকালীন পার্টি, মদ্যপান আর দেদার খাওয়াদাওয়ার পর দুই বন্ধুর জোড় তর্ক বাঁধল। দুজনের একজন তখন ভারতীয় ক্রিকেটের মূলস্রোতে সবে এসেছেন। তর্কের ছোট্ট একটা বাংলা তর্জমা।
প্রথম বন্ধু :‌ চোখ বুজে ধোনির রেকর্ডগুলো দেখ, কে ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক আর ভাবতে হবে না
দ্বিতীয় বন্ধু :‌ অধিনায়কত্ব শুধু রেকর্ড দিয়ে হয় না, কে কোন জায়গা থেকে দলকে তুলে এনেছে তা ম্যাটার করে
প্রথম বন্ধু :‌ মাহিভাই -এর কন্ট্রিবিউশন কী জানিস? অশ্বিন-জাড্ডু-রায়না
দ্বিতীয় বন্ধু :‌ রায়না কে ধোনি তোলেনি, তুলেছে দ্রাবিড়, তুই দাদার তোলা নামগুলো শুনতে চাস? আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি – শেহবাগ, যুবরাজ, ভাজ্জি, কাইফ, নেহেরা
এই ছেলেমানুষী তর্ক বাড়তে পারে দেখে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন যুবরাজ সিং, একটু জড়ানো কথা তবু দ্বিতীয় বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বললেন- সাহি বোলা তু।
এই দ্বিতীয় বন্ধুর নাম? বিরাট কোহলি!

অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ চলছে। এক ক্রীড়া সাংবাদিক নিজের মিনিয়েচার ব্যাটে কিংবদন্তী ব্যাটসম্যানদের সই নিচ্ছেন একে একে। প্রথমে ভিভ তারপর গাভাস্কার-সচিন-চ্যাপেল-বয়কট-স্টিভ ওয়-ব্রায়ান লারা। রাহুল দ্রাবিড়ের কাছে ব্যাটটা যেতেই খুব বিনয়ের সাথে বললেন, They are the legends, me? , একটু লজ্জা পেয়েই সবার নীচে সইটা করে দিলেন। নেক্সট টার্ন- সৌরভ গাঙ্গুলি। দাদা একবার ব্যাটটা নিলেন, ওপর থেকে নীচে চোখ বোলালেন, তারপর সবার ওপর টুক করে সই করে একবার চোখ মেরে ব্যাটটা ফিরিয়ে দিলেন। Whoever you are, I am here to fight – সেদিন হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল সারিসারি মানুষ, অসি কিংবদন্তীদের সামনে দিয়ে যখন মেলবোর্ন বা এডিলেডে সৌরভ নামলেন তখন তাঁর হাতে বোলিং পুঁজি বলতে আগরকর-জাহির আর প্রতিপক্ষের ব্রেট লি-ম্যাকগ্রা আর গিলেসপি, এই কথাটা প্রেসের একজন মাঠে নামার আগে মনে করাতেই জামার কলারটা তার মুখের সামনে তুলে দিয়ে মাঠে ঢুকে গেলেন এক জীবন্ত ইতিহাস…

সৌরভ ফেরত এসেছেন দলে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। গ্রেগ চ্যাপেলের প্রবল আপত্তি স্বত্ত্বেও মুম্বই-এর স্ট্যান্ড থেকে, মোহালির প্রেসবক্স থেকে, কলকাতার অলি-গলি থেকে, ভারতীয় ক্রিকেটের দিকপালদের থেকে ভেসে এসেছিল স্লোগান- ” ব্রিং ব্যাক দাদা”, বাধ্য হয়ে সকলের চাপে পড়ে এই বদমেজাজি লোকটা চলে এল আফ্রিকায়। ম্যাচের আগে গোলটেবিল বৈঠকে কোচ চ্যাপেল শুরু করলেন বলা। Dear, How can we avoid loosing this test ? any idea? রাহুল দ্রাবিড়ের কিছু মতামত শোনা হল, প্রথম টেস্টে হার বাঁচালে পরের টেস্টগুলোয় আফ্রিকান পিচে লড়াই করা যাবে, এরকমই কথাবার্তা ঘুরছে গুম মেরে থাকা ঘরটায়। পাশে বসা শচীন বা শেহবাগ কেউ একটা বলে উঠলেন- লেট দাদা স্পিক সামথিং, সৌরভ চুপ করে বসেছিলেন, শুনছিলেন, উঠে দাঁড়ালেন, যেটা কোনোদিন চান নি ধূর্ত গ্রেগ, দাদা এগিয়ে গেলেন সামনের ডায়াসটার কাছে, চ্যাপেলের ঠিক পাশটাতে দাঁড়ালেন। I am here to win this test, who are there with me? নিস্তব্ধতা ভেদ করে দড়াম করে শব্দ হল, গ্রেগ চ্যাপেল বেরিয়ে গেলেন দরজাটা বন্ধ করে। এই সিরিজেই ঘটল দাদার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তণ আফ্রিকার পিচে…

মহারাজ খেলা ছেড়েছেন প্রায় দেড় যুগ হতে চলল। ২০০৮ সালে শেষবার দেশের জার্সিতে মাঠে নামা। সেই নায়ক আজও মানুষের মনের মণিকোঠায়। সেই নায়কের নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সময় যত এগোচ্ছে সৌরভের জনপ্রিয়তা তত বাড়ছে। বিরাট, রোহিত, ধোনিদের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়াই করছেন দাদা। কর
দেওয়ার ভুমিকাতেও তিনি স্বচ্ছ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সৌরভের আয়করের পরিমাণ বিগত বছরের থেকেও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ আর্থিক বর্ষে সৌরভ কর দিয়েছিলেন ২৮ কোটি টাকা। এবার সেই পরিমাণ অনেকটাই বেড়েছে। সৌরভের তরফ থেকে জানা গেছে, আনুমানিক প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাছাকাছি কর দিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভের ব্র্যান্ডিং-এর সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে ৪২ টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে রয়েছেন মহারাজ। কয়েকটি ব্র্যান্ড নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে ৪৮ টি ব্র্যান্ডিংয়ের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর সৌরভ। এছাড়াও ধারাভাষ্য, টেলিভিশন শো, এডুকেশন অ্যাপেরও এনডোর্সমেন্ট থেকে আয়। সেই কারণেই বার্ষিক সমস্ত আয়ের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ট্যাক্স সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছেন সৌরভ। বিভিন্ন সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলের শিকার হন। কারা বা কোন শ্রেণীর মানুষ ট্রোল করেন সে বিষয়ে প্রশ্নচিহ্ন থাকছেই। সামগ্রিক জনপ্রিয়তার নিরিখে সৌরভের চাহিদা ক্রমবর্দ্ধমান। সূত্রের খবর, বর্তমানে খেলা হার্দিক, সূর্যকুমারদের থেকেও বেশি পরিমাণে ট্যাক্স দেন সৌরভ। ব্র্যান্ডিং-এর ক্ষেত্রে শচীন তেন্ডুলকরদের থেকেও বেশি কোম্পানি রয়েছে সৌরভের হাতে। আসলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় মানেই বাঙালির প্রিয় দাদা। রাজ্য থেকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বাঙালির গর্বের নাম মহারাজ। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। বাণিজ্যিক দিক থেকেও সফল সৌরভ। খেলোয়াড় জীবনের পরও অগনিত বিজ্ঞাপনের মুখ সৌরভ। বিভিন্ন সংস্থার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর থেকে ত্রিপুরা পর্যটনের মুখ মহারাজ। জনপ্রিয় টিভি সঞ্চালক তিনি। ইতিমধ্যেই দাদাগিরি ছেড়ে অন্য একটি টিভি চ্যানেলে চার বছরের জন্য ১২৫ কোটি টাকার চুক্তিতে দুটি শো’‌র সঞ্চালনা করবেন বলে চুক্তিবদ্ধ। খেলা ছাড়ার দেড় যুগ পরেও সৌরভের হাতে বর্তমানে মোট ব্র্যান্ডিং সংখ্যা পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। আরও কয়েকটি বিজ্ঞাপনের মুখ হতে চলেছেন দাদা। খুব শীঘ্রই অর্ধশতক স্পর্শ করবেন!‌
ক্রিকেট ছাড়ার এত বছর পরেও সৌরভের আয় বছরে কম করে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। সব মিলিয়ে সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২০০০ কোটি টাকা। বাংলার সর্বাধিক করদাতার মধ্যে সৌরভ-অরিজিৎ সিং-‌রা রয়েছেন। ফলে এর থেকে বোঝা যাচ্ছে সৌরভের জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাঁটা নেই। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু এক বিন্দুও কমেনি।

প্রশ্ন অনেক? একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক,‌ সৌরভ গাঙ্গুলি ঠিক কে? ১,২,৩ কোথাও কি তিনি আছেন? না! এই ঘটনাগুলোর নির্যাস রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের দেওয়ালে, শচীন ভারতের ঈশ্বর, দ্রাবিড় ভারতীয় ক্রিকেটের কর্ণ। এঁদের খেলতে হয় নি বডিলাইনের আক্রমণ, ভারতীয় ক্রিকেটের রাজনীতিতে যখন গড়াপেটা চক্রের, পরপর ব্যর্থতার করাল ছায়া তখন চণ্ডী গাঙ্গুলির বদমেজাজি ছেলেটা এসে পড়লেন এই উত্তপ্ত আঁচে, তার না ছিল দাদা স্নেহাশীষের মতো ক্লাসিক ব্যাটিং স্টাইল, না ছিল শচীন হবার সাধ্য, না ছিল দ্রাবিড়ের স্থৈর্য। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের তখন প্রয়োজন ছিল একজন সৌরভ গাঙ্গুলিকেই। লাক্সারি-গ্ল্যামার-ফ্যানবেস কিচ্ছু না। ভারতীয় ক্রিকেটে সেদিন স্রেফ একটা ডাল-ভাতের মতো নেসেসিটি ছিল সৌরভ গাঙ্গুলি। পাহাড়ি নদী যেমন বয়ে আনে নুড়ি, পাথর আর বুকভরা পলিমাটি। সৌরভ সেদিন যথার্থ দাদার মতোই নিজের দুহাতে ভারতীয় ক্রিকেটের রুখা জমিতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রাণের বীজ, সেই সবুজ চারা এতদিন প্রায় পনেরো বছর মহীরূহের ছায়া দিল সেদিনের প্রায় উলঙ্গ হয়ে যাওয়া ভারতীয় ক্রিকেটকে। কী অমোঘ শক্তি দিয়ে ভারতভাগ্যবিধাতা সেদিন বেঁধে দিয়েছিলেন ভারতকে। একদল হিংস্র শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য পালটা মারের যে ব্যকরণ বইটা লিখে দিয়েছিলেন বেহালার এক ডালভাতে বেড়ে ওঠা বাঙালি। হাজার হাজার আবেগপ্রবণ হেরে যাওয়া প্রাণগুলোর বুকে সেই শৈশবে লিখে দেওয়া প্রাণমন্ত্রের নাম সৌরভ গাঙ্গুলি। আজন্ম অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার নাম সৌরভ গাঙ্গুলি। যার মুকুট আজও পড়ে আছে কোন অচেনা ড্রেসিংরুমে। যে হেলমেটটা আজও বড় হয় অন্য কোনো মাথায়। সেই মুকুটের পাশে ১২ বছর কোনো একলা মূর্শিদ গান গাইছে, বাজছে তার ছেঁড়া সেতারের সেই বিরোহী খাম্বাজ —
‘‌‘‌মুকুটটা তো পড়েই আছে রাজাই শুধু নেই.‌.‌.‌.‌.‌.‌’‌’‌‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles