Saturday, July 25, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বাৎসরিক কার্নিভাল? বুক ফুলিয়ে গাঁজায় দম প্রকাশ্যে!‌ অন্য সময়ে গাঁজায় ‘কেসের’ ভয় থাকলেও শ্রাবণে সেই ভয় নেই?‌

জয় ‘বাবা তারকনাথ’!‌ ‘ভক্তি বনাম ফূর্তি’র ফোয়ারা। দম মারো দম! মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেড রোডে দুর্গা কার্নিভালের ‘আইডিয়া’?‌ বাবার অভয়মন্ত্র?‌ বাৎসরিক কার্নিভাল?‌ কার্নিভাল গুরুমন্ত্রের জোরে। অন্য সময় গাঁজায় ‘কেসের’ ভয় থাকলেও শ্রাবণে সেই ভয় নেই। বাবার নামে গাঁজায় দম দেওয়া যায় প্রকাশ্যে। বুক ফুলিয়ে। গাঁজার বাক্সে আলো লাগিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেড রোডে দুর্গা কার্নিভালের ‘আইডিয়া’ হুগলি থেকেই পেয়েছিলেন। রাজ্যের তৃতীয় কার্নিভালের জন্ম হুগলিতে। তবে এটি ‘বেসরকারি’। এবং ‘স্বতঃস্ফূর্ত’। গঞ্জিকার বাক্সে আস্ফালন। থিম ‘অপারেশন সিঁদুর’। জলযাত্রায় ক্রমবিবর্তন। শ্রাবণের তারকেশ্বর হন্টনে এখন কার্নিভালের মেজাজ। বাঁকের নকশা বদল। বদলা নয় বদল চাই -‌এর পরিপন্থী। সময়ের সঙ্গে মাটি থেকে প্লাস্টিকের ঘটের রমরমা। মূর্তি নিয়ে যাওয়ারও হিড়িক। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বর হন্টন। পথ দেখছে আরও পরিবর্তন। গাঁজার ভক্তিতেই মুক্তি।

এক হাতে গাঁজার কল্কেতে সুখটান। তারস্বরে জয় বাবা ভোলানাথ। মদও রয়েছে। ‘‌দিদি’‌র রাজ্যে কার্ণিভালে মদ থাকবে না তা কি হয়?‌ হাঁটতে হাঁটতে পেপসির বোতলে জল পানের নাম করে মদের ফোয়ারা। এরা সকলেই এখন ‘‌বাবা’‌র অনুগামী। অন্য সময়ে ‘‌দিদি’‌র অনুগামী!‌ শ্রাবণের রবি। রাত ১১টা ১৫ মিনিট। ‘বাবা ভক্ত’দের দখলে হাওড়া-ব্যান্ডেল লোকালের ভেন্ডার বগি। শ্রাবণের শনি-রবির পরিচিত দৃশ্য। ট্রেনের কামরার ভিতরে ‘পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে’ নিয়মমতো ঘোষণা, ‘ট্রেন কম্পার্টমেন্টে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ’। সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত গাঢ় ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে। জনা পঞ্চান্নর একটি দল। সামনে খোলা গঞ্জিকার বাক্স। সহজ কথায় গাঁজার বাক্স। এলইডি টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো। বাক্সের ভিতরে বসানো টেরাকোটার শিবমূর্তি। জেলা থেকে আগত ওই দলের গন্তব্য তারকেশ্বর। এই শ্রাবণেরই এক রবিবারের দুপুর। শেওড়াফুলির ‘সুষমা’ সিনেমা হলের সামনে জিটি রোডের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিল যুবকের দল। ঠিক বিশ্রাম নয়। দম নেওয়া। হাতে হাতে ঘুরছে ছিলিম। সঙ্গে ব্লু টুথ বক্সে তারস্বরে বাজছে ওড়িয়া গান, ‘আমাকু সাইড দিও রে, আমি তো কাউরিবালা!’ এই গান এ বারের তারকেশ্বর যাত্রায় ‘সুপারহিট’! দম নিতে নিতেই রাস্তা জুড়ে উদ্দাম নাচ। সরাতে এসেছিলেন এক সিভিক ভলান্টিয়ার। এমন চমকানি। আমরা সবাই ‘‌দিদি’‌র ভাই। হে সিভিক, জানো তুমি?‌ হতোদ্যম হয়ে ফিরতে হল নিরূপায় সিভিককে। দমদার নাচ। অন্তত মিনিটকুড়ি। তার পরে আবার হন্টন। হাঁটা আর হাঁটা। পায়ে ব্যাথা হলে ভ্যানো। ভ্যানে ইঞ্জিন বসিয়ে বেশ জোরে ছোটে এই ভ্যানো। ন্যানো তাড়ানোর পর রাজ্যজুড়ে এই লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ভ্যানোর রমরমা।

‘ভোলেবাবা পার করেগা’র জনস্রোত। তোলা বাবার দল এখন নিস্পৃহ। সক্রিয় গাঁজাতে। রবিবার রাত সাড়ে ৮টা। বাঁকের নকশা বদলে হরেক সাজ। মাটি থেকে প্লাস্টিকের ঘটে। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাস। অনেক বদল। তারকেশ্বর হাঁটার পথ দেখছে আরও বদল। বদল শিবভক্তদের গাঁজার বাক্সেও। বদলাচ্ছে নাচের গান। বদলাচ্ছে স্লোগানও। খিস্তিভরা স্লোগানও বাদ পড়ে না। শ্রাবণের জলযাত্রায় তারকেশ্বরের পথে হনুমানের মূর্তি। এখন অনেকে আবার হনুমানেরও ভক্ত। বজরংবলীর আগ্রাসী মুখ আঁকা পতাকা। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিও। নানা ধরনের নতুন স্লোগান। ‘রাস্তায় রাস্তায় বাম্পার, বাবার কত টেম্পার’। ‘জল নিয়েছি ঘটে, বাবা যেন পটে’। প্রমীলাবাহিনীর স্লোগান, ‘জয় মা তারা জয় মা কালী, আমরা হলাম বাবার শালি। অর্থ হল বাবার শ্যালিকা। সম্পর্কটা কী দাঁড়াচ্ছে বোঝা দায়?‌ তারকেশ্বরের জলযাত্রীদের ‘উপদ্রব’। ট্রেনে বসে মদ্যপানের নালিশ। বাঁকের গুঁতো। গাঁজার কটূ গন্ধ। কুকথা। ড্রাম-বাঁশি, কাঁসর, ঘুঙুরের জগঝম্প আওয়াজ। ট্রেনের নিত্যযাত্রী। গোটা শ্রাবণ মাস ভয়ে সিঁটিয়ে বহু নিত্যযাত্রীর। কারণ, তারকেশ্বরের জলযাত্রীদের ‘উপদ্রব’! জলযাত্রীদের আনন্দের আতিশয্যে দিশাহারা নিত্যযাত্রীরা। প্রতিবাদ বা আপত্তি। কাজে লাগে না। জলযাত্রীদের বচসা খিস্তির ফোয়ারা। অসভ্যতা দেখা যায়। প্রতিবাদ করলে কুকথা থেকে মারধর। কিছুই বাদ যায় না। গোটা যাত্রাপথে সারাক্ষণ ড্রাম, কাঁসর, বাঁশি, ঘুঙুরের কান পাতা দায় হয়। গাঁজা-সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরে ওঠে কামরা। আর থেকে থেকে ‘ভোলেবাবা পার করে গা’ চিৎকার! তারকেশ্বর থেকে ছাড়া ট্রেনগুলিতে ওঠার জো থাকে না। গোটা ট্রেনই কার্যত জলযাত্রীদের দখলে চলে যায়। ঠান্ডা পানীয়ের বোতলে মদ ঢেলেও খাওয়া চলে কিছু জলযাত্রীর। গাঁজাও চলে। ট্রেনগুলিতে কাদামাখা প্রায় ঘুমন্ত জলযাত্রীদের ফুটবোর্ডটাই দখল। সবাই নেশায় চুর।

নিছকই মজা। উস্কানিমূলক স্লোগানও ভাইরাল। বৃদ্ধি পেয়েছে রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের পুণ্যার্থীদের সংখ্যা। পরিবর্তন? তা তো বটেই। এলাকার বাসিন্দাদের কথায়, ‘‘তারকেশ্বর যাত্রায় গত কয়েক বছর ধরেই জাঁকজমক বেড়েছে। তবে এ বার জলযাত্রা যেন কার্নিভালের আকার নিয়েছে। পরের বার না প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়!’’ শ্রাবণের এই তারকেশ্বর যাত্রাকে পটভূমি করেই ১৯৭৭ সালে তৈরি হয়েছিল ‘বাবা তারকনাথ’। যে ছবির মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং সন্ধ্যা রায়। ছবিতে দেখানো হয়েছিল, স্বামীর মঙ্গলের জন্য কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে স্ত্রী সন্ধ্যা রায়ের তারকেশ্বর যাত্রা। যে ছবি বক্স অফিসে ঝড় তুলে দিয়েছিল। অনেকে বলেন, তার বহু বছর পরেও ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে মেদিনীপুরের মতো গ্রামীণ আসনে তৃণমূল প্রার্থী সন্ধ্যাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল ‘বাবা তারকনাথ’। তবে প্রায় পাঁচ দশক আগের সেই ছবির সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির কোনও মিলই নেই। বদল শ্রাবণীমেলায়। তীব্র উচ্ছ্বাস। আগে ভক্তির একটা বিষয় ছিল। এখন তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ফূর্তি এবং দেখনদারি!

দিদি’‌র ভক্তরাই শ্রাবণে বাবা’‌র ভক্ত। ‘বাবা তারকনাথ’ ‘ভক্তি বনাম ফূর্তি’। শ্রাবণীমেলায় উদ্দাম উচ্ছ্বাস। তারকেশ্বর যাত্রায় মানুষের ঢল। হুগলির এই জনপদে পরিচিত বচন। ‘শ্রাবণ মাসে টাকা ওড়ে’। কারণ, শ্রাবণে তারকেশ্বরে লক্ষ লক্ষ জোড়া পা পড়ে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের বহু শ্রমিক এই শ্রাবণে শনি-রবিবার নিজেদের কাজ ফেলে শ্রাবণীমেলায় যুক্ত হন। কারণ, উড়ন্ত টাকা ধরতে হবে। রাজমিস্ত্রির সঙ্গে জোগাড়ের কাজ করা কর্মীর, ‘‘মেলায় তিন ডবল রোজগার। দশের মাল পঞ্চাশে বেচে দেওয়া যায়! পুজোর খরচ উঠে আসে।’’ নান্টুর মতো অনেকেরই জীবনে শ্রাবণেই বেজে ওঠে আশ্বিনের আলোকমঞ্জির। ভিড়কে সবসময়ই রাজনৈতিক দলগুলির ‘ব্যবহার’। শ্রাবণের ভিড়ের সামনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চায় তারা। বৈদ্যবাটি-শেওড়াফুলিতেও দেখা যাচ্ছে তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস জল খাওয়াচ্ছে পুণ্যার্থীদের। দলীয় ভাবে বামেদের উপস্থিতি নেই। বাম বাম মনে করে এসব ফালতু কাজে ফিরে আসা যায় না। ভক্তিও নেই। থাকার কথাও নয়। তাঁরা ঈশ্বরভক্ত নন। হওয়ার কথাও নয়। তবে দুর্গাপুজোয় বিভিন্ন বড় বাজেটের মন্ডপের ধারেপাশে সিপিএমের বইয়ের স্টল দেওয়ার মতো উদ্যোগ কি শ্রাবণীমেলার ভিড়ের পথে নেওয়া যেত না? তাতে সাপও মরত, লাঠিও ভাঙত না। অভিজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, সেটা সম্ভব হত না। একে তো দুর্গাপুজোর ভিড়ের সঙ্গে এই ভিড়ের তুলনা চলে না। দ্বিতীয়ত, সিপিএমের সেই সংগঠনও আর নেই।

তারকেশ্বরে যাঁরা হেঁটে জল ঢালতে যান, তাঁদের ৮০ ভাগই জল তোলেন বৈদ্যবাটি নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে। তবে অনেকে কালীঘাট থেকে জল তুলে নিয়ে আরও দীর্ঘপথ হাঁটেন। যেতে হয় বৈদ্যবাটির উপর দিয়ে। বৈদ্যবাটি থেকে তারকেশ্বর। ৩৬ কিলোমিটার রাস্তায় পুণ্যার্থীদের সেবায় কেউ জল দেন, কেউ শরবত, কেউ লুচি-আলুর দম বা খিচুড়ি খাওয়ান। এ বার সেই মেনুতেও বদল। সিঙ্গুরের ডাকাত কালীবাড়ির কাছে পূণ্যার্থীদের খাওয়ানোর বন্দোবস্ত। উদ্যোগ বেলুড়ের কয়েক জন ব্যবসায়ীর। মেনুতে ছিল সয়াবিনের বিরিয়ানি আর আলুর দম। প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুণ্যার্থী পাত পেড়ে খেয়েছেন সেই নতুন মেনুর ভোজ।
কার্নিভাল। রাজ্যের তৃতীয় কার্নিভাল। হুগলিতে। এটি ‘বেসরকারি’। ‘স্বতঃস্ফূর্ত’। ‘বাবা তারকনাথ’ ‘ভক্তি বনাম ফূর্তি’র। আছে বাবার অভয়মন্ত্র। দম মারো দম! কার্নিভালের দম গুরুমন্ত্রের জোরে। অন্য সময় গাঁজায় ‘কেসের’ ভয় থাকলেও শ্রাবণে সেই ভয় নেই। বাবার নামে গাঁজায় দম দেওয়া যায় প্রকাশ্যে। বুক ফুলিয়ে। গাঁজার বাক্সে আলো লাগিয়ে। ছুটে চলা ‘‌দিদি’ই ভাইদের দল। গাঁজা-‌মদ-‌বিড়ি-‌সিগারেটে আজ সকলেই বাবা’‌র ভক্ত?‌ আর ‘‌দিদি’র অনুগামী ‌মহিলারাও উদ্দাম আনন্দে শামিল। পরিচয় বাবা’‌র শালি।‌ এ হল আধুনিকতায় মোড়া ঈশ্বর সাধনা!‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles