Saturday, July 25, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রাখীবন্ধন উৎসবের হালচাল!‌ ভাই এবং বোনের মধ্যে অটুট বন্ধনের পবিত্রতা

ভাইবোনের মধ্যে সম্পর্ক অসাধারণ। বিশ্বের প্রতিটি অংশে এর গুরুত্ব অসীম। ভাইবোনের ভালোবাসার জন্য রক্ষা বন্ধন নামে একটি উৎসব রয়েছে। বিশেষ হিন্দু উৎসব যা ভারত এবং নেপালের মতো দেশে ভাই ও বোনের মধ্যে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে পালিত। রাখি বন্ধন হিন্দু চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডারের শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগস্ট মাসে পড়ে। রাখি বন্ধনের অর্থ। দুটি শব্দ দিয়ে গঠিত, যথা রক্ষা এবং বন্ধন। সংস্কৃত পরিভাষা অনুসারে, এই উৎসবের অর্থ রক্ষার বাঁধন। যেখানে রক্ষা অর্থ সুরক্ষা এবং বন্ধন অর্থ বাঁধা ক্রিয়াপদ। এই উৎসব ভাই-বোনের সম্পর্কের চিরন্তন ভালোবাসার প্রতীক। কেবল রক্তের সম্পর্ককেই বোঝায় না। অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যেও পালিত। ভারতের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে রাখী বন্ধনের গুরুত্ব। হিন্দুধর্মে এই উৎসবটি মূলত ভারতের উত্তর ও পশ্চিম অংশের হিন্দুরা, নেপাল, পাকিস্তান এবং মরিশাসের মতো দেশগুলো উদযাপন করে। জৈনধর্মে এই উপলক্ষটি জৈন সম্প্রদায়ের কাছেও অত্যন্ত সম্মানের, যেখানে জৈন পুরোহিতরা ভক্তদের আনুষ্ঠানিক সুতো প্রদান করেন। শিখ ধর্মে ভাই-বোনের ভালোবাসার প্রতি নিবেদিত এই উৎসবটি শিখরা “রাখারদি” বা রাখরি নামে পালন করে।

রাখি বন্ধন উৎসবের উৎপত্তি। রাখী বন্ধনের উৎসব বহু শতাব্দী আগে থেকেই শুরু হয়েছিল বলে জানা যায় এবং এই বিশেষ উৎসব উদযাপনের সাথে সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি গল্প রয়েছে। হিন্দু পুরাণ মতে, ইন্দ্র দেব এবং শচী ভবিষ্য পুরাণের প্রাচীন কিংবদন্তি অনুসারে, একবার দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। আকাশ, বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের প্রধান দেবতা ভগবান ইন্দ্র, যিনি দেবতাদের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন, তিনি শক্তিশালী রাক্ষস রাজা বালির কাছ থেকে কঠোর প্রতিরোধের মুখোমুখি হন। যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে এবং কোনও চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছায়নি। এটি দেখে, ইন্দ্রের স্ত্রী শচী ভগবান বিষ্ণুর কাছে যান, যিনি তাকে তুলোর সুতো দিয়ে তৈরি একটি পবিত্র ব্রেসলেট দিয়েছিলেন। শচী তার স্বামী ভগবান ইন্দ্রের কব্জিতে পবিত্র সুতো বেঁধে দেন, যিনি শেষ পর্যন্ত অসুরদের পরাজিত করে অমরাবতী উদ্ধার করেন। উৎসবের পূর্ববর্তী বিবরণে এই পবিত্র সুতোগুলিকে তাবিজ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যা মহিলারা প্রার্থনার জন্য ব্যবহার করতেন এবং যুদ্ধে যাওয়ার সময় তাদের স্বামীর সাথে বাঁধা হত। বর্তমান সময়ের বিপরীতে, এই পবিত্র সুতোগুলি কেবল ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজা বালি এবং দেবী লক্ষ্মী, ভাগবত পুরাণ এবং বিষ্ণু পুরাণের বর্ণনা অনুসারে, যখন ভগবান বিষ্ণু দৈত্য রাজা বালির কাছ থেকে ত্রিলোক জয় করেছিলেন, তখন তিনি দৈত্য রাজার কাছ থেকে রাজপ্রাসাদে তাঁর পাশে থাকতে চেয়েছিলেন। ভগবান তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করেছিলেন এবং দৈত্য রাজার সাথে বসবাস শুরু করেছিলেন।

ভগবান বিষ্ণুর স্ত্রী দেবী লক্ষ্মী তাঁর জন্মস্থান বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তাই, তিনি দৈত্য রাজা বালির কব্জিতে রাখি বেঁধে তাকে ভাই করে তোলেন। ফেরত উপহারের কথা জিজ্ঞাসা করার পর, দেবী লক্ষ্মী বালিকে তাঁর স্বামীকে ব্রত থেকে মুক্ত করে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে বলেন। বালি অনুরোধে রাজি হন এবং ভগবান বিষ্ণু তাঁর স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীর সাথে তাঁর স্থানে ফিরে আসেন। সন্তোষী মা, কথিত আছে যে, ভগবান গণেশের দুই পুত্র শুভ এবং লাভ তাদের কোন বোন না থাকার কারণে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তারা তাদের বাবার কাছে একটি বোন চেয়েছিলেন, যিনি অবশেষে সন্ত নারদের হস্তক্ষেপে তাদের বোনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এভাবেই ভগবান গণেশ দিব্য শিখার মাধ্যমে সন্তোষী মাকে সৃষ্টি করেছিলেন এবং ভগবান গণেশের দুই পুত্র রাখি বন্ধনের জন্য তাদের বোনকে পেয়েছিলেন। কৃষ্ণ এবং দ্রৌপদী, মহাভারতের একটি বর্ণনা অনুসারে, মহাকাব্যিক যুদ্ধের আগে পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী ভগবান কৃষ্ণকে রাখি বাঁধেন এবং কুন্তী নাতি অভিমন্যুকে রাখি বাঁধেন। যম এবং যমুনা, আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, মৃত্যুদেবতা যম ১২ বছর ধরে তার বোন যমুনার সাথে দেখা করেননি, যা শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে পড়েন। গঙ্গার পরামর্শে, যম তার বোন যমুনার সাথে দেখা করতে যান, যিনি খুব খুশি হয়ে তার ভাই যমের আতিথেয়তা করেন। এতে যম খুশি হয়ে যমুনাকে উপহার চেয়েছিলেন। যমুনা তার ভাইকে বারবার দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এই কথা শুনে যম তার বোন যমুনাকে অমর করে তোলেন যাতে তিনি তাকে বারবার দেখতে পারেন। এই পৌরাণিক কাহিনী “ভাই দুজ” নামক উৎসবের ভিত্তি তৈরি করে যা ভাই-বোনের সম্পর্কের উপরও ভিত্তি করে। রাখী বন্ধন উৎসব ভাই-বোনের মধ্যে কর্তব্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। এই উপলক্ষটি পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে যে কোনও ধরণের ভাই-বোনের সম্পর্ক উদযাপন করার জন্য, যারা জৈবিকভাবে সম্পর্কিত নাও হতে পারে।

এই দিনে, একজন বোন তার ভাইয়ের কব্জিতে রাখী বেঁধে তার সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এবং মঙ্গল কামনা করে। এর বিনিময়ে ভাই তাকে উপহার দেয় এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো ক্ষতি থেকে তার বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। দূরবর্তী পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন বা চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যেও এই উৎসব পালিত হয়। ভাই-বোনেরা হল বিনা আয়াসে পাওয়া বন্ধু। সম্পর্ক রক্তের হোক বা মনের, তুতো হোক বা সহোদর-সহোদরা— এঁদের বাঁধনে কঠিন শর্ত কম। আপনি যেমনই হোন, ভাইবোনেদের কাছে আপনি ‘কাছের মানুষ’। বিপদে পড়লেই হয়তো তাদের কাছে ছুটে যাওয়া হয় না। কিন্তু মনে মনে জানা থাকে, আর কেউ না থাকলেও এরা থাকবে। অসময়ে প্রাণ লড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ হয়তো সবাই পায় না। দেখা হলে মুখ দেখে প্রশ্ন করতে পারে, “কিছু হয়েছে?” বড় পরিবার ভেঙে ছোট হওয়ার পর ভাই-বোনেদের একজোট হওয়ার সুযোগ কমেছে। উৎসবে আজও বহু পরিবারে কাকা-জ্যাঠা-পিসি-মাসি-মামার সন্তানেরা পরস্পরের দেখা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। একসঙ্গে মিলে চুটিয়ে আড্ডা দেয়। এ দেশে ভাই বোনেদের দেখা হওয়ার দু’টি উৎসবের একটি ভাইফোঁটা আর অন্যটি রাখিবন্ধন। এই দ্বিতীয় উৎসবটির আর এক সপ্তাহও বাকি নেই। আগামী শনিবার, ৯ অগস্ট রাখিপূর্ণিমা। বিশেষ দিনে ভাইবোনেদের সঙ্গে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে মুখ চালানোর জন্য কী থাকবে? পরিকল্পনা করে ফেলুন এখনই। বাড়ি শহরে হোক বা শহরতলি, কিংবা কোনও গ্রাম। এক জন চেনা ফুচকাওয়ালা থাকবেনই, যেখানে ছোটবেলাতেও ফুচকা খেতে যেতেন। হয়তো একসঙ্গে নয়। কিন্তু প্রত্যেকেরই ওই ফুচকাওয়ালার সঙ্গে কোনও না কোনও স্মৃতি জুড়ে আছে। তেমন কোনও ফুচকাওয়ালার কাছে ফুচকা খেতে যাওয়া যেতে পারে রাখি উদ্‌যাপনের সন্ধ্যায়। পুরনো, নতুন গল্প মিলিয়ে অন্য অভিজ্ঞতা তৈরি হবে।

বর্ষার যে কোনও সন্ধ্যাতেই সঙ্গী হতে পারে মুচমুচে চপ, তেলেভাজা-পাকোড়া। রাখির দিনই বা তারা বাদ যায় কেন! বাড়িতে আড্ডা বসলে গরম চায়ের সঙ্গে থাক এলাকার জনপ্রিয় তেলেভাজার দোকান থেকে কিনে আনা চপ-শিঙাড়া-পকোড়া। যার সঙ্গে হয়তো জুড়ে রয়েছে ছোটবেলার স্মৃতি। সঙ্গে মুড়িমাখা থাকলে তো কথাই নেই। ঘরোয়া আড্ডায় রং লাগবে নস্ট্যালজিয়ার। ভাই-বোনেদের খাবার ভাগ করে খেতে শেখানো হয় এ দেশে। সেই ভাগ নিয়ে ছোটবেলায় ঝগড়াঝাঁটি কিংবা অভিমানও হয়নি কি? বড়বেলায় সেই ঝুঁকি না থাকলেও ভাগাভাগির ঝক্কি এড়াতে অর্ডার করতে পারে পিৎজ়া। এ খাবারের সুবিধা হল, এটি দোকান থেকেই ভাগ হয়ে আসে। তবে তা ছাড়াও পিৎজ়া আধুনিক প্রজন্মের আড্ডার সুস্বাদু অনুষঙ্গ হিসাবেও জনপ্রিয়। চাউমিন-চিলি চিকেন, বিরিয়ানি-চাঁপের রমরমা যখন হয়নি তখন একা এগরোলই ছিল বাঙালির পছন্দের ‘জাঙ্ক ফুড’। বাইরে বেরিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার যে ‘গিল্টি প্লেজ়ার’, তা হয় রোল খেলে। এলাকার পছন্দের রোলের দোকানে সদলবলে চড়াও হোন সে দিন। কলকাতায় হলে পার্ক স্ট্রিটের হট কাঠি রোল হতে পারে ঠিকানা। অবশ্য এখন নানা ধরনের ফিউশনও রোল পাওয়া যায়। সে সবও খেতে পারেন। ভাইবোনেরা যদি পাহাড়প্রেমী হন, তবে আড্ডায় থাকুক পাহাড়ি খাবার মোমো। যে কোনও আড্ডায় ফিঙ্গার ফুড সবচেয়ে জমাটি। অর্থাৎ যে খাবার দু’আঙুলে ধরে খাওয়া যায়। মোমোও সেই পর্যায়ে পড়ে। ঝল ঝাল চাটনি সহযোগে মোমোতে যেমন তেলমশলা কম, তেমন সুস্বাদুও। তা ছাড়া কে বলতে পারে, পাহাড়ি খাবার খেতে খেতে দার্জিলিং কিংবা কোনও পাহাড়ি গ্রামে দু’দিনের বেড়ানোর প্ল্যানই করে ফেললেন সকলে মিলে! মুচমুচে আর ভিতরে রসালো। ভাইবোনের বন্ধুত্বও তো সে রকমই। তবে হাতের কাছে একটি কাগজের পাত্র ভরা ফ্রায়েড চিকেন থাকলে এত ভাবনাচিন্তার অবকাশ থাকে না। থমকে যায় আড্ডাও। তবে যে ভালালাগাটুকু থাকে, তার সঙ্গে স্বাদে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা কম খাবারেরই আছে। রাখি উপলক্ষে ডায়েটিংয়ের নিয়ম এক দিন ভাঙা যেতেই পারে। এখন তো পাড়ায় পাড়ায় আইসক্রিম পার্লার। একটি বেছে নিয়ে ঢুকে পড়ুন সবাই মিলে। আবার চাইলে আইসক্রিমের সাদা-লাল ঠেলাগাড়ি দাঁড় করিয়ে মেনু কার্ড মিলিয়ে এক এক জন এক এক রকমের আইসক্রিম অর্ডার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles