ভয়াবহ সেই রাত। একবছর পার হতে চলল। এখনও তাঁরা বিচার পাননি। দাবি আরজি কর নির্যাতিতার পরিবারের। আরজি কর কাণ্ডে ন্যায় বিচার চেয়ে নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছেন খুন হওয়া চিকিৎসকের মা-বাবা। সেই অভিযানের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হাওড়ার এক বাসিন্দা। অভিযোগ, আসন্ন নবান্ন অভিযান ঘিরে শহরের জনজীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। এই কর্মসূচি রুখতে এবার কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে দায়ের হল জনস্বার্থ মামলা। বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি গ্রহণ করেছে। শুনানি নির্ধারিত বৃহস্পতিবার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি উড়ে গেলেন খুন হওয়া চিকিৎসকের মা-বাবা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হবে বলে আশা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী করুণা নন্দীর সঙ্গে আজ দেখা করবেন। সিবিআই ডিরেক্টরের সঙ্গেও দেখা করতে চান নির্যাতিতার মা-বাবা। আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের মামলায় সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তুলেছেন নির্যাতিতার মা-বাবা। আর এবার সুপ্রিম কোর্টে তাঁরা অভিযোগ করলেন, ৭ মাস ধরে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কিত রিপোর্ট সিবিআই জমা দেয়নি। উল্লেখ্য, গতবছর ৯ আগস্ট আরজি করের সেমিনার হলে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল ট্রেনি জুনিয়র ডাক্তারকে। পরিবারের অভিযোগ, তাদের মেয়েকে খুনে একজন জড়িত নয়। আরও অনেকে জড়িত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ৭ অক্টোবর।

আরজি কর কাণ্ডে শুধুমাত্র সঞ্জয় রায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে আদালতে। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় শুধুমাত্র সঞ্জয়কে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করেই চার্জশিট পেশ করেছিল সিবিআই। এই আবহে সিবিআই তদন্তে ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ করেছিলেন নির্যাতিতার মা-বাবা। দাবি, নির্যাতিতার খুনি এখনও আরজি করের চেস্ট মেডিসিন ডিপার্টমেন্টেই আছে। গত ২০ জানুয়ারি শিয়ালদা আদালতে আরজি কর মামলায় চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা সঞ্জয় রায়কে আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা শোনান বিচারক অনির্বাণ দাস। এদিকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমনা দিতে হবে সঞ্জয় রায়কে। এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি আদালতের তরফ থেকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৩ (ধর্ষণ), ৬৪ (ধর্ষণের সময় এমন ভাবে আঘাত করা, যাতে মৃত্যু হয়), ১০৩ (১) নং (খুন) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। এই আবহে সঞ্জয়কে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৪ ধারার আওতায় সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, ৬৬ ধারায় আওতায় আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১০৩ (১) ধারার আওতায় সশ্রম যাবজ্জীবনের সাজা ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দেন বিচারক। এদিকে বিচারক নির্দেশ দিয়েছিলেন, নির্যাতিতার পরিবারকে ১৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে রাষ্ট্রকে। বিচারক বলেছিলেন, এই মামলা বিরলের থেকে বিরলতম নয়। যদিও সঞ্জয়ের ফাঁসির দাবিতে আদালতে জোর সওয়াল করেছিল সিবিআই।

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার পর এক বছর পার হতে চলল। এখনও ন্যায়বিচার পাননি বলেই দাবি নির্যাতিতার বাবা-মায়ের। এই সময়টায় গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। তবে নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, তাঁরা এখনও ন্যায় বিচার পাননি। আগামী ৯ আগস্ট আরজি করের চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের এক বছর পূর্তি। ওই দিন আবারও প্রতিবাদ মিছিলের ডাক শহর থেকে জেলায়। ঠিক এই আবহে ফিরে দেখা আরজি করের সেই নারকীয় কাণ্ডের টাইমলাইন। ৯ আগস্ট, ২০২৪। কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেমিনার হলে অর্ধনগ্ন অবস্থায় উদ্ধার তরুণী চিকিৎসকের মৃতদেহ। কলকাতার খ্যাতনামা ওই সরকারি হাসপাতালের পোস্ট গ্রাজুয়েট চিকিৎসক-ছাত্রী ছিলেন ওই তরুণী। ওই দিন ভোর সাড়ে চারটের সময় হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে সেমিনার রুমের কাছে দেখা যায়। তরুণী চিকিৎসকের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলে। মুখ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ১০ আগস্ট ২০১৪। ঘটনার তদন্তভার হাতে নেয় কলকাতা পুলিশ। গ্রেপ্তার হয় ধর্ষণ-খুনে প্রধান অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় নামে তৎকালীন ওই সিভিক ভলান্টিয়ার।

১২ আগস্ট ২০২৪। কলকাতার খ্যাতনামা সরকারি হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস পরিণতি নিয়ে সমালোচনার সুনামি বয়ে গিয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদের আগুন। এদিন চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের তদন্তভার কলকাতা পুলিশের হাত থেকে নিয়ে সিবিআই-কে হস্তান্তর করার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪। আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় সিবিআই গ্রেপ্তার করে সন্দীপ ঘোষ ও অভিজিৎ মণ্ডলকে। সন্দীপ ঘোষ আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন। অভিজিৎ ঘোষ সেই সময় টালা থানার ওসি পদে চাকরি করতেন। ১১ নভেম্বর ২০২৪। শিয়ালদহ আদালতে মামলার চার্জ গঠন করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪। গ্রেপ্তারির পর ৯০ দিনের মাথাতেও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা চার্জশিট জমা দিতে না পারায় আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকে জামিন দেয় আদালত। শিয়ালদহ আদালতে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় প্রমাণ লোপাটের অভিযোগের মামলা ছিল তাদের বিরুদ্ধে। সেখানেই জামিন পান তারা। ১৮ জানুয়ারি ২০২৫। বেশ কিছুদিন ধরেই শিয়ালদহ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলার পর এদিন সঞ্জয় রায়কে আরজি করে চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচারক অনির্বাণ দাস সঞ্জয়কে চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেন। ২০ জানুয়ারি ২০২৫। শিয়ালদহ আদালত আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় দোষী সঞ্জয় রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন, সেই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আরজি কর কাণ্ডে নির্যাতিতা তরুণীর পরিবার ন্যায় বিচার এখনও পাননি বলেই তাঁদের দাবি। আরজি করের নারকীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া চিকিৎসক এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সংগঠন ‘অভয়া মঞ্চ’-এরও সেই একই দাবি। ন্যায্য বিচারের দাবিতে গত এক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে পথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘অভয়া মঞ্চ’। রাজনৈতিক দলগুলিও আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। আরজি করের ঘটনায় সিবিআই তদন্তে একেবারেই সন্তুষ্ট নয় নির্যাতিতার পরিবার। তাঁর বাবা-মা এখনও মনে করেন শুধুমাত্র সঞ্জয় নয়, তাঁদের মেয়ের এই চরম পরিণতির নেপথ্যে আরও বেশ কয়েকজনের ভূমিকা রয়েছে।

আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে গতবছর নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র সমাজ। ধুন্ধুমার ঘটনা ঘটেছিল সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে রীতিমতো খন্ডযুদ্ধ বেধেছিল। এবার নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে অভয়ার বাব-মা। আরজি কর কাণ্ডের বর্ষপূর্তিতে আগামী ৯ অগাস্ট, শনিবার। তবে এবারও এই আন্দোলনের পুরোভাগে থাকতে চলছে পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র সমাজ। ২৭ অগাস্ট আরজি কর কাণ্ডের বিচার চাইতে নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র সমাজ। এই নয়া সংগঠনের নবান্ন অভিযানে তোলপাড় হয়েছিল কলকাতা-হাওড়া। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি ছিল, ওই অভিযানের পিছনে ছিল গেরুয়া শিবির। মদত ছিল বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অভিকারীর। এবারও সরাসরি নবান্ন অভিযানকে সমর্থন করেছেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। পুলিশও আন্দোলন মোকাবিলা করতে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের বড় কর্তারা রাস্তা পরিদর্শন করে অভিযান রোধের পরিকল্পনা করে ফেলেছেন। নবান্ন অভিযানের প্রস্তুতি চলছে রাজ্যজুড়ে। গতবার হঠাৎ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হলেও এবার অনেক আগেই অভয়ার বাবা-মা নবান্ন চলোর ডাক দিয়েছেন। তৃণমূল ব্যতিরেকে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানিয়েছেন ওই আন্দোলনে অংশ নিতে। বিভিন্ন থানা থকে ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র সমাজের বেশ কয়েকজনকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতবারের আন্দোলনের অন্যতম মুখ সায়ন লাহিড়ীও নোটিশ পয়েছেন। গতবার তার মামলা গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সায়ন লাহিড়ী বলেন, “ইতিমধ্যে আমাদের বেশ কয়েকজনকে পুলিশ নোটিশ পাঠিয়েছে। অভয়াদির বাবা-মায়ের পিছনে রয়েছে ছাত্র সমাজ। নবান্ন অভিযানে এবারও স্তব্ধ হবে কলকাতা ও হাওড়া। ডোরিনা ক্রশিং ও সাতরাগাছি থেকে মিছিল আসবে।।এবার অভয়াদিদির বাবা-মায়ের ডাকে নবান্ন অভিযান হচ্ছে। এই আন্দোলন শুধু ছাত্র সমাজ নয়, বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতার নয়। রাখীবন্ধনের অঙ্গীকার নিয়ে অভয়াদির বিচারের জন্য পা মেলাতে আহ্বান জানানো হচ্ছে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে। ওই দিন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হবে। অভয়াদির বাবা-মা যেভাবে আন্দোলন পরিচালনা করবে সেভাবে হবে। যদি প্রশাসন আগের বছরের মতো মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করতে বিনাপ্ররোচনায় অভয়াদির বাবা-মায়ের ওপর জলকামান বা লাঠি পড়ে, তাহলে তার পরের দায়িত্ব সম্পূর্ণ পুলিশ প্রশাসনের থাকবে। সুষ্ঠুভাবে শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন বজায় রাখার দায়িত্ব পুলিশের। আন্দোলনকারীরাও শান্তি চাইছে।” গত বছর নবান্ন অভিযান ছত্রভঙ্গ করতে একদিকে জলকামান, অন্যদিকে অগুন্তি কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ-আন্দোলনকারীদের খন্ডযুদ্ধে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কলকাতা।

৮, ৯ ও ১৪ আগস্ট কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হবে লাখো লাখো মানুষ। প্রতিবাদে সামিল সাধারন মানুষ। আরজি কর-কাণ্ডের বর্ষপূর্তি’তে কালীঘাট অভিযানের ডাক। ‘ঘুম নেই যে রাতে, জেগে থাকি প্রতিবাদে…’ । এই স্লোগানকে সামনে রেখে আরজি কর-কাণ্ডের বর্ষপূর্তি’তে ফের রাজ্যজুড়ে রাত দখলের ডাক। দিনে হবে নবান্ন ও কালীঘাট অভিযান। রাজ্যের বিরোধীরা ও সাধারণ মানুষের একাধিক গণসংগঠন ফের রাস্তায় নামার অঙ্গীকার করল। ৮, ৯ ও ১৪ আগস্ট কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নাচ-গান ছবি আঁকা, নাটকে ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হবে লাখো লাখো মানুষ। আর তাদের সঙ্গে প্রতিবাদে সামিল হবে রাজ্যের বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও তার গণসংগঠনগুলো। অংশ নেবেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বও। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়াই। নানান মঞ্চে গণসংগঠনের ব্যানারে লেখা থাকবে, আরজি কর হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসক তরুণীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় বিচারের দাবি। একই দাবিতে গত বছর প্রবল নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। তা আদতে এক অনন্য সময়ের সাহসী দলিল। এই আন্দোলনের অংশীদার হন সমাজের প্রায় সব অংশের মানুষ। তাঁরা হাসপাতালে, মেডিক্যেল কলেজে কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘বিষাক্ত’ পরিবেশের বিরুদ্ধে সরব হন।

সমাজের বিভিন্ন অংশের আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ধর্ষণ-সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে রাজ্যে। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অপরাধীদের রক্ষা করতে শাসকদলের ছত্রছায়া রয়ে গিয়েছে। সাম্প্রতিক কসবা আইন কলেজের ঘটনাও সেই চক্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে। ২৬ দফা প্রশ্নের উত্তর-সহ ন্যায় বিচারের দাবিতে আবারও একাট্টা হওয়ার শপথ নেওয়া হবে রাজ্যনৈতিক দল-সহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের তরফে। সেই কথা মাথায় রেখে অভয়া মঞ্চ, জুনিয়র ডক্টরস ফোরাম থেকে শুরু করে একাধিক সংগঠনের তরফে সাধারণ মানুষকে এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, আরজি কর-কাণ্ডের বিচারহীনতার এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এরই মাঝে যত্রতত্র খুন ধর্ষণ রাহাজানি বেড়েই চলেছে। এগুলো থেকে মুক্তির উপায় কী? তাই পশ্চিমবঙ্গের সকল সাধারণ মানুষকে ৯ অগস্ট প্রতিবাদে সামিল হওয়ার আবেদন করা হয়েছে। জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরসের যুগ্ম আহ্বায়ক চিকিৎসক পুণ্যব্রত গুণ বলেন, “এক বছর হতে চলল, কিন্তু এখনও সুবিচারের মুখ দেখেনি অভয়া। অনেকেই আজও ক্ষোভ, দুঃখ আর হতাশা নিয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষীণ কিন্তু জ্বালাময়ী আগুন বুকে লালন করছেন। আবার অনেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা দেখে হতাশ হয়ে গিয়েছেন। বিভীষিকাময় রাতের যে সময়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ ঘটেছিল, সেই তারিখে, সেই সময়ে আমরা আবার রাস্তায় থাকব; জেগে থাকব রাগ, বেদনা, শোক, অঙ্গীকার আর প্রতিবাদের আগুন বুকে নিয়ে। শহর থেকে গ্রাম, দেওয়ালে দেওয়ালে, রাস্তায় রাস্তায় আঁকব মুছে ফেলা স্লোগান আর ছবিগুলো।” আরজি কর-কাণ্ডের বর্ষপূর্তি’তে রাস্তায় নামছে বিজেপিও।

এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট বিবৃতি দিয়ে বলেছে, “কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইও বড়জোর ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ আর ‘তথ্যপ্রমাণ নষ্ট’-এর কথা বলেই থেমে আছে। আজও সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা পড়েনি। যারা আসল মাথা, তারা এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। শাস্তির তো প্রশ্নই আসে না! প্রথম দিনের সমস্ত সহযোদ্ধাদের নিয়ে একসঙ্গে এই লড়াইয়ে সামিল হব। যাঁরা কলকাতায় আসতে পারবেন না, তাঁদেরও অনুরোধ নিজ নিজ এলাকায় বা ক্যাম্পাসে অভয়ার স্মৃতিতে জেগে থাকুন, প্রতিবাদের শপথ নিন।”গত বছর অভয়ার বিচার চেয়ে রাজপথে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের পর, সম্প্রতি কয়েকজন সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসককে পুলিশ তলব করেছে। এই বিষয়টিকে নিছক আইনি প্রক্রিয়া বলে মানতে নারাজ জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস। তাদের তরফে পুণ্যব্রত গুণ বলেন,” যে খুন, ধর্ষণ, প্রমাণ লোপাট আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্তে প্রশাসনের ভূমিকা এতদিন ছিল লজ্জাজনকভাবে নীরব, সেখানে হঠাৎ করে আন্দোলনের দিন খাট পাতা, রাস্তার জ্যাম ইত্যাদি হাস্যকর মামলায় ডাক্তারদের তলব করা, একইসঙ্গে তামাশা ও হুমকি-আমরা এই প্রবণতাকে থ্রেট কালচারের নগ্ন প্রকাশ বলে মনে করি। এভাবে কোনও ডাক্তারকে নয়, গোটা সমাজকে নীরব করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের তথা রাজ্য প্রশাসনের এই ভূমিকা গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলনের সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”

আরজি কর-কাণ্ডের এক বছরে, আগামী ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযান কর্মসূচিতে শামিল হবেন নির্যাতিতার বাবা-মা। আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারেরা জানিয়ে দিলেন, ওই কর্মসূচিতে তাঁরা থাকবেন না। ৮ অগস্ট তাঁদের নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে, তাতে যোগ দেবেন তাঁরা। কেন থাকবেন না, সেই কথাও জানিয়েছেন। তাঁদের কথায়, ওই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তার পরে জানান নির্যাতিতা চিকিৎসক-পড়ুয়ার বাবা-মা। সব রকম রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকেই দূরত্ব রাখতে চান বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা।নবান্ন অভিযানের কর্মসূচি রয়েছে। দিন দুয়েক আগে নবান্ন অভিযানের কথা বলেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। এর পর গত শনিবার তিনি আরজি করের নির্যাতিতার বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর বাইরে বেরিয়ে নবান্ন অভিযানের ডাক দেন তিনি। জানান, আরজি করের নির্যাতিতার মা-বাবাও তাতে অংশগ্রহণ করবেন। এ বার জুনিয়র ডাক্তারেরা জানিয়ে দিলেন, ওই কর্মসূচিতে থাকবেন না তাঁরা। চিকিৎসক-ছাত্রীর দেহ উদ্ধারের পরে তাঁর হয়ে বিচার চেয়ে এবং বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে বসেছিলেন ওই জুনিয়র ডাক্তারেরা বলেন, ‘‘বিরোধী দলনেতা জনসভায় ঘোষণা করেন, আমি অভয়ার বাবা-মাকে বলব, এ রকম কর্মসূচি ডাকুন। দলীয় পতাকা ছাড়া ওই কর্মসূচিতে অংশ নিতে বলেছেন তিনি। আমরা আগেও রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে দূরত্ব রেখেছি। এখনও রাখব।’’ তাঁরা আরও বলেন, ‘‘আমাদের পক্ষে এই অভিযানে থাকা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি, যদি নির্যাতিতার বাবা-মা নিজে কর্মসূচির ডাক দিতেন, সকলে তাতে যোগদান করত, তা হলে অন্য বিষয় হত।’’ এর পরে তাঁরা নাম না-করে বিরোধী দলের দিকেও আঙুল তোলেন।

আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারেরা বলেন, ‘‘সিবিআইয়ের ভূমিকা ন্যক্কারজনক (তদন্তের ক্ষেত্রে)। সেখানে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার পাশে কী করে হাঁটব? এ রকম জায়গায় গেলে আমাদের আন্দোলন কালিমালিপ্ত হবে।’’ ৮ অগস্ট আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট’-এর নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। ওই দিন রাত ১২টা থেকে পরের দিন ভোর ৪টে পর্যন্ত পথে নামবে তারা। হবে মশাল মিছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছর ৮ অগস্ট রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টের মধ্যে। আরজি কর-কাণ্ডের এক বছর পর সেই ৮ অগস্ট রাত ১২টায় শ্যামবাজারে জমায়েতের ডাক দেন জুনিয়র ডাক্তারেরা। তার পরে শ্যামবাজার থেকে কলেজ স্কোয়্যার পর্যন্ত মশাল মিছিল করা হবে বলেও জানান তাঁরা। এই কর্মসূচিতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে যোগদান করার আহ্বান জানিয়েছেন জুনিয়র ডাক্তারেরা।




