Saturday, July 25, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বিশ্বভুমে পরিচিত উলুবেড়িয়ার শাট্‌ল কক! পি ভি সিন্ধুরও অজানা ছিল, কোথায় শাট্‌ল কক তৈরী হয়?‌

অলিম্পিকে পদকজয়ী ব্যাডমিন্টন তারকা পি ভি সিন্ধু কলকাতায় ঝটিকা সফরে এসেছিলেন। সেদিনটা ছিল শরৎকালের এক সোনা ঝরা সন্ধ্যা। শারদোৎসবের প্রারম্ভিক পর্বে সাজো সাজো রব। বাগুইহাটির হেভিওয়েট মন্ত্রীর নামজাদা দূর্গাপূজোর উদ্বোধনের আমন্ত্রণ রক্ষার্থে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস বিমানবন্দরে পা রাখা। রাতের ফ্লাইটেই আবার উড়ে যাওয়ার তাড়াহুড়ো। ঠিক অনেকটা ব্যাডমিন্টনের ব্যাটের আলতো টোকায় যেরকম পলকের নিমেষে বাঁধা পালকের ঝুটি উড়ে যায়। সিন্ধুর সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যায় সবুজ ফিতে কেটে প্রতিমা উন্মোচন করে ফিরে যাওয়াটাও সেরকমই ছিল। মিনিট পাঁচেক কথা বলার সুযোগ। তাতে প্রশ্ন ছিল, আপনি কি জানেন শাট্‌ল কক তৈরী হয় কোথায়?‌

সিন্ধু যেটা জানতেন, তা সঠিক ছিল না। পি ভি সিন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‌আই নো, ইট্‌স দা প্রোডাক্ট অব কলকাতা’‌। এক ক্রীড়া সাংবাদিক ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, কলকাতা থেকে ৭০ কিমি দূরে হাওড়ার উলুবেড়িয়া গ্রামে তৈরী হয় আপনাদের ব্যাডমিন্টন খেলার এই গুরুত্বপূর্ণ বস্তুটি। অতএব কলকাতা নয়, হাওড়ায় তৈরী হয় শাট্‌ল কক। সিন্ধু সহাস্যে নিজের অজানা তথ্য জেনে বেশ খুশি হয়েছিলেন। অবশ্য এটা সকলের পক্ষে জানা সম্ভবও নয়। ব্যাডমিন্টনে সাইনা নেওহাল, জ্বালা গাট্টা, পারুপাল্লি কাশ্যপও হয়তো জানেন না এই তথ্য। অথচ উলুবেড়িয়ার শাটল ককের খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে। ভারতের বহু নামী ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় শাটল কক ব্যবহার করেছেন। অন্যতম কুটির শিল্প এই শাট্‌ল কক। উলুবেড়িয়ার শাটল ককের খ্যাতি আরও বৃদ্ধি করতে পার্মানেন্ট পিক্টোরিয়াল ক্যান্সেলেশনের উদ্যোগ নিয়েছিল ভারতীয় ডাকবিভাগ। পোস্ট অফিস থেকে চিঠিপত্র আদান প্রদানের সময় প্রতিটিতে শাটল ককের পার্মানেন্ট পিক্টোরিয়াল ক্যান্সেলেশনের ছাপ মারা হত। শতাধিক বছরের পুরনো শাটল কক শিল্পের জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদনও জানানো হয়।

শাট্‌ল ককের ইতিহাসটা ছিল বেশ মনোমুদ্ধকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শুরু হওয়ার মুখে। ভারতের নানা জায়গায় ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছে ইংরেজ সেনাদল। তেমনই একটা ছাউনি তৈরি হয়েছিল উলুবেড়িয়ার হাসপাতাল মাঠে। যুদ্ধ তখনও বাঁধেনি। সেনারা বিশ্রামেই ছিলেন। বিকাল হলেই শুরু হত ব্যাডমিন্টন। সাহেবদের ব্যাডমিন্টন খেলা দেখেই নতুন ফন্দি মাথায় এসে গেল উলুবেড়িয়া বাণীবন পিরপুরের জ্ঞান বসুর। জে বসু নামে এলাকায় সর্বাধিক পরিচিত। বিলেতি মদের বোতলের ছিপির কক এবং স্থানীয় হাঁসের পালক গেঁথে তৈরি করেছিলেন শাটল কক। আর সেই কক পছন্দ হয়ে গেল সাহেবদের। সেই থেকেই প্রচলিত কক। ব্যবসার শুরু। আজও সেই ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে উলুবেড়িয়ার শাট্‌ল কক শিল্প। সারা দেশে একমাত্র এখানেই হাতে তৈরি শাটল কক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় মন্দা এসেছে। গত কয়েক বছরে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন উলুবেড়িয়ার শাটল কক ব্যবসায়ীরা। বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতের বাজারে চলে এসেছে চীনা যন্ত্রে তৈরি শাটল কক। যা ভারতের শাটল ককের চেয়ে দামেও সস্তা। চিনের তৈরি সিন্থেটিক শাটল ককে হাঁসের পালক লাগে না। প্লাস্টিকের তৈরি। ফলে পালকের উপরেও নির্ভর করতে হয় না।

উলুবেড়িয়ার কারখানাগুলির কাঁচামালের একমাত্র উৎস স্থানীয় পুকুরের হাঁস। হাঁসের দল গা ঝাড়ার সঙ্গে পালক খসিয়ে ফেললে তবে সেই পালক সংগ্রহ করে আনা হয়। আর সেগুলো দিয়ে তৈরি হয় শাটল কক। এই হাঁসের পালক আসে সাধারণত বাংলাদেশ থেকে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে পালক আসার নানান সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে উলুবেড়িয়ায় ছোট ছোট শাটল কক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, প্রকাশ পাড়ুকন যখন খ্যাতির মধ্যগগনে, তখন পাড়ুকন স্পোর্টসের জন্য শাটল কক যেত একমাত্র উলুবেড়িয়া থেকে। হাওড়া জেলায় কারখানা গড়ে উঠেছিল বাণীবন, রাজাপুর, যদুবেড়িয়া, বাহিরতফা, বাণীতলা এলাকায়। গ্রামের প্রত্যেকটা বাড়িতেই প্রায় ছোট বড় কারখানাতেই তৈরী হয় শাট্‌ল কক। ছোট বড় করে প্রায় আড়াইশোর বেশি কারখানা ছিল। ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে ছিল। বর্তমানে কারখানার সংখ্যা ১০-১৫য় এসে দাঁড়িয়েছে। কারখানায় মোট শ্রমিকের সংখ্যাও তলানিতে। নতুন প্রজন্মও এই জীবিকায় বিমুখ।

তবু অনেকেই এখনও শাটল কক তৈরিকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। সাদা হাঁসের পালক সংগ্রহের পর পরিষ্কার করে শুকানো করা হয়। এরপর গুণমান যাচাই করা। ককের গায়ে সেই পালক জুড়ে দেওয়া। গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে শ্রমীকদের নাড়ির টান। একমাত্র সরকারি উদ্যোগই এই ক্ষয়িষ্ণু শিল্পকে বাঁচাতে পারে, এমনটাই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বছর দশেক আগে রাজ্যের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিভাগের উদ্যোগে শিল্পীদের নিয়ে একটি ক্লাস্টার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই কাজও একটুও এগোয়নি। চিন্তাভাবনাও বিশ বাঁও জলে!‌‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles