Thursday, July 23, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘‌পন্থ’‌ দি গ্ল্যাডিয়েটর! সেঞ্চুরি করে শূন্যে সামারসল্টের নায়ক — এক আহত যোদ্ধার কথা

ওল্ড ট্রাফোর্ডের ড্রেসিং রুমের সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে নামা। এক-পা এক-পা করে। প্রথমে বাঁ পা সিঁড়ির ধাপে। ব্যাটটা বাঁ হাতে আলগোছে ধরা। ডান হাতে আঁকড়ে ধরে সিঁড়ির রেলিং। প্রতি পদক্ষেপে যন্ত্রণায় মুখের পেশি সংকোচন। সিঁড়ির শেষ ধাপ। ডান হাতের সহায়ক রেলিংটাও নেই। গুটি গুটি পায়ে বাউন্ডারির দড়ির দিকে। ততক্ষণে আউট হয়েও প্রায় এক মিনিট মাঠের মধ্যে অপেক্ষায় শার্দূল ঠাকুর। পরের যোদ্ধা মাঠে ঢোকার আগে শার্দূল ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন, আসল ‘শার্দূল’ ওই নেমে আসছে ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি বেয়ে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাউন্ডারির দড়ি টপকাতেই প্রস্থানোদ্যত শার্দূল ডান হাতের গ্লাভসটা খুলে তাঁর শিরস্ত্রাণ পরিহিত মাথায় হাত। যেন সারা ভারতবর্ষই মাথায় হাত রাখল আহত যোদ্ধার। অকালবৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল শুভেচ্ছাবারি। নিচু হয়ে মাঠের মাটিকে প্রণাম করে গণ্ডি অতিক্রম করে এগোলেন। গ্যালারি এবং ক্রিকেটবিশ্ব বিস্ফারিত, বিমোহিত, বিমুগ্ধ। গোটা মাঠ দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। শব্দব্রহ্ম হেডফোনের ‘নয়েজ ক্যানসেলেশন’-এর লক্ষ্মণরেখা ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছে শব্দনিরোধক কাচঘেরা কমেন্ট্রি বক্সে বসে থাকা ধারাভাষ্যকারদের কানে। তাঁদের কণ্ঠে আকণ্ঠ বিস্ময়। ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্যালারি ওই সাতাশের যুবকের একাগ্র সমর্থক। সমর্থন দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী কাঁটাতারে আবদ্ধ না। বীরত্ব কখনও ভূগোলের দাসত্ব করে না। দেশকাল নির্বিশেষে বীরের সামনে সকলে নতজানু, নতশির। অ্যাম্ফিথিয়েটারের ঠিক মাঝখানে অস্ত্র-হাতে দাঁড়ানো এক গ্ল্যাডিয়েটরের মতো লাগছিল ঋষভ পন্থকে।

ঠিক আগের দিন এই সময় নাগাদ তিনি মেডিক্যাল কার্টে, চোট এতটাই গুরুতর। সাপোর্ট স্টাফদের কাঁধে ভর দিয়েও ডান পা ফেলতে পারছিলেন না। মোজা খোলার পরে টিভি ক্যামেরায় যা ধরা পড়ল, ডান পায়ের পাতার বাইরের দিকে ফোলা। ছিটে ছিটে রক্তও। জুতো গলাতে গেলেও প্রাণান্তকর যন্ত্রণা হবে। মেডিক্যাল কার্টে বসে থাকা মুখে যন্ত্রণা আর হতাশা মিলেমিশে একাকার। দ্রুত ক্রিকেটবিশ্বে খবর, ‘ঋষভ পন্থ রিটায়ার্ড হার্ট। ঋষভ পন্থ আহত অবসৃত’। চোটের জায়গায় স্ক্যান করানোর জন্য তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওল্ড ট্রাফোর্ডের মাঠে ঋষভ পন্থের ফিরে আসার অনিশ্চয়তা। ছ’সপ্তাহের মতো মাঠের বাইরে ঋষভ। ডান পায়ের পাতার হাড় ভেঙেছে। রিভার্স সুইপ মারতে গিয়েছিলেন। ডেলিভারিটা সামনে ভাঁজ-করা ডান পায়ের পাতার বাইরের দিকে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল। বুটের এমন একটা জায়গায়, যেখানে কোনও আলাদা বা অতিরিক্ত সুরক্ষা থাকে না। বিভ্রান্তি!‌ সংশয়!‌ ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন বোধহয়! আহত ঋষভ পন্থের পরিবর্তে ধ্রুব জুরেল কিপিং করবেন। ঋষভ পন্থ হলেন আধুনিক ক্রিকেট মহাকাব্যের নায়ক। লেখকও। নিজের মহাকাব্য নিজেই রচনা করেন তিনি। ৩৭ রানে আহত হয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। সেই অবস্থাতেই পরদিন আবার অস্ত্র-হাতে ময়দানে নেমে পড়তে হল। দলের প্রয়োজন। দেশের প্রয়োজন। যন্ত্রণা সহ্য করেও সটান দাঁড়িয়ে। উন্নতশির।

‘স্টুপিড-স্টুপিড-স্টুপিড’ এবং ‘সুপার্ব-সুপার্ব-সুপার্ব’ খ্যাত সুনীল গাভাসকার বলছেন নরি কন্ট্রাক্টর, বিজয় মার্চেন্ট, কপিল দেবের কথা। অভিভূত দীনেশ কার্তিক বলছিলেন, ‘‘আই অ্যাম অ্যাস্টাউন্ডেড দ্যাট হি ইজ আউট দেয়ার!’’ ক্রিস ব্রড বলছিলেন, ‘‘উই জাস্ট ডোন্ট নো হোয়াট্‌স কামিং!’’ মেল জোন্স বলছিলেন, ‘‘ব্যাটার্ড, ব্রুইসড। বাট স্টিল স্ট্যান্ডিং!’’ অতীতের ভারতীয় ক্রিকেটারদের নজির তুলে এনে তুলনামূলক বীরত্বের আলোচনা। পায়ের ছিঁড়ে-যাওয়া পেশি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কপিলের পাঁচ উইকেট নেওয়ার কাহিনি। ২০০২ সালে অ্যান্টিগায় ভাঙা চোয়াল তার দিয়ে জুড়ে তার উপর ব্যান্ডেজ জড়িয়ে অনিল কুম্বলের বীরত্বের কথা। গ্রেম স্মিথ থেকে নাথান লায়নের চোট নিয়েও ক্রিকেটমাঠে লড়াইয়ের লোকগাথা। এ কী বীরত্ব! গাড়ি দুর্ঘটনার পরে বেঁচে উঠে শরীরের দুশোর বেশি সেলাই নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসা। মৃত্যুর চৌকাঠে পৌঁছে যাওয়া ‌মানুষকে নিয়ে চার জন মিলে তুলে ধরে দাঁড় করাতে হত। একটা টুথব্রাশ হাতে তোলারও ক্ষমতা ছিল না। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা তো দূর অস্ত, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছেন। আইপিএলের ধকল। দেশের সহ-অধিনায়ক। ইংল্যান্ডের মাঠে সেঞ্চুরি করে শূন্যে সামারসল্ট! গ্ল্যাডিয়েটর?

খোঁড়াতে খোঁড়াতে সিঙ্গল্‌স। যন্ত্রনায় কাতর ঋষভ। তবুও কাতর নন। ক্রিকেট-ধুরন্ধর বেন স্টোক্‌স চোট-জর্জরিত ডান পা লক্ষ্য করে পর পর বল করছেন। নিঁখুত নিশানায় প্যাডে আছড়ে পড়ছে একের পর এক এক্সপ্রেস ডেলিভারি। ডান পা আড়াল করে করে খেলছেন ঋষভ। যিনি নিজের মহাকাব্য যিনি নিজেই লেখেন, তাঁকে থামানো যাবে কী করে? তাঁর কলম তো তাঁরই হাতে। ভাঙা পায়ে ওজন ট্রান্সফার না করে কার্যত বাঁ পায়ে ভর করে স্ট্রোক নিতে শুরু করলেন ঋষভ। জফ্রা আর্চারের স্লোয়ার শর্ট পিচ্‌ড ডেলিভারি উড়িয়ে দিলেন মিড উইকেটে, ডান পা-কে বাঁ পায়ের আড়ালে রেখে প্যাডের গোড়া থেকে ফ্লিক। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ।কষ্ট করে ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তাঁকে আগলে আকাশ দীপ। পিছনে আরও দু’-তিন জন সতীর্থ। যদি টাল সামলাতে না পারেন? যদি সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে পা ফস্কে যায়? যন্ত্রণা সহ্য করার সীমারেখা নেই ওঁর। স্টোক্‌সকেই কভার-মিড উইকেট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে ৫০ পেরোলেন ঋষভ। ব্যাট তোলার সময যন্ত্রণার অভিঘাতে মুখ বিকৃতি স্পষ্ট। মাইকেল আর্থারটন বলছেন, ‘‘দ্য মোস্ট রিমার্কেব্‌ল ফিফটি, ইন দ্য সারকামস্টেন্সেস।’’ তখন ব্যক্তিগত ৫৪ রান। জোফ্রা আর্চারের ডেলিভারিটা আহত ঋষভের স্টাম্প ছিটকে দিল। তারপরও ১৭ রান। রানের নিরিখে মূল্য কম। জীবনের নিরিখে অমূল্য! আবারও হয়তো দরকার হলে নির্ঘাত আবার ব্যাট হাতে নেমে পড়বেন ঋষভ পন্থ। কারণ, তিনি গ্ল্যাডিয়েটর। গ্ল্যাডিয়েটরদের পালালে চলে না। তারা যুদ্ধ করে। শত্রু নিকেশ করে। তার পরে রক্ত মুছে, ক্ষতস্থান সেলাই করে বিক্ষত দেহে বর্ম এঁটে, মাথায় শিরস্ত্রাণ চাপিয়ে আবার পরের লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়। গ্ল্যাডিয়েটর ঋষভ পন্থ, কখনও পালিয়ে যান না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles