ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসেই সেঞ্চুরি হাঁকালেন। ২৭ কোটির ক্রিকেটার ঋষভ পন্থ। টেকনিক, টেস্টের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন। ব্যাটিং স্টাইল নাকি ‘অদ্ভুত’, ‘অসুন্দর’, টেস্টের সঙ্গে মানানসই না হলেও সেঞ্চুরি আসে। ১৩০ বলে সেঞ্চুরি হাঁকালেন। প্রথম ইনিংসেও সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। কেরিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় ইনিংসেও ইংরেজদের শাসন করলেন ভারতের সহ-অধিনায়ক। লিডসে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ ৩৬৪ রানে। প্রথম ইনিংসে ৬ রানে পিছিয়ে থাকায় ইংল্যান্ডের জয়ের লক্ষ্য ৩৭১। রান তাড়া করার জন্য প্রায় ১০০ ওভার পাবেন বেন স্টোকসেরা। অসম্ভব নয়। নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট তুলতে হবে ভারতীয় দলকে। শুভমন গিলদের প্রধান ভরসা জসপ্রীত বুমরাহ। লিডসের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে তাঁর হাতেই। মঙ্গলে টেস্টের পঞ্চম দিন জয়ের জন্য ভারতের দরকার ১০ উইকেট। ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ৩৫০ রান।
পন্থ প্রথম ইনিংসে ১৩৪ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৮। দু’ইনিংসেই শতরান। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের কৃতিত্ব ছুঁয়ে ফেললেন পন্থ। ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্টের দু’ইনিংসেই শতরান করেছিলেন ফ্লাওয়ার। ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় উইকেটরক্ষক হিসাবে টেস্টের দু’ইনিংসেই শতরান করলেন পন্থ। শতরান পূর্ণ হওয়ার আগ্রাসী ব্যাটিং শুরু করলেন। মাসুল দিলেন উইকেট দিয়ে। আর একটু ধরে খেলতে পারতেন ১৪০ বল খেলা সহ-অধিনায়ক। লোকেশ রাহুলও শতরান করলেন। ১৩৭ রান। ওপেন করতে নেমে ৮৫তম ওভার পর্যন্ত ২২ গজের এক প্রান্ত আগলে রাখলেন। ২৪৭ বলের ইনিংসে সম্পদ হয়ে উঠলেন বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মাহীন ভারতীয় শিবিরের। লিডসে প্রথম ইনিংসে ৪২ রান করে আউট হয়ে যান। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ভুলটা আর করেননি। ২০২ বলে কেরিয়ারের নবম সেঞ্চুরি করেন রাহুল। চতুর্থ উইকেটে তাঁদের ১৯৫ রানের জুটি একটা সময় দিশেহারা করে তুলেছিল বেন স্টোকসদের। ভারতের পরের দিকের ব্যাটারদের ব্যর্থতায় দিনের শেষে ইংরেজ শিবির অনেকটাই স্বস্তিতে। জয়ের আশাও দেখছেন স্টোকসেরা। লিডস টেস্টে পাঁচটি শতরান করলেন ভারতীয়েরা। চিন্তায় রাখছে শুভমনের দলের ব্যাটিং লেজ। প্রথম ইনিংসে ভারতের শেষ ৬ উইকেট পড়েছিল ২৪ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে শেষ ৬ উইকেট পড়ল ৩১ রানে।
বুমরাহ ছাড়া বাকিরা ভরসা দিতে পারছেন না। বল হাতেই পারছেন না, আর ব্যাট হাতে! প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, শার্দূল ঠাকুরেরা হতাশ করছেন লিডসে। অস্ট্রেলিয়ায় রান পাওয়া নীতীশ কুমার রেড্ডিকে সাজঘরে বসিয়ে রেখে শার্দূলকে খেলাচ্ছে ভারত। প্রথম ইনিংসে তাঁকে দিয়ে মাত্র ৬ ওভার বল করিয়েছেন শুভমন। ব্যাট হাতে দু’ইনিংসে শার্দূলের অবদান ১ এবং ৪ রান। অভিষেক হওয়া সাই সুদর্শন বা আট বছর পর টেস্ট খেলতে নামা করুণ নায়ারও লিডসে দলকে ভরসা দিতে পারলেন না। দু’ইনিংস মিলিয়ে ভারতের প্রথম পাঁচ ব্যাটার করেছেন ৭২১ রান। এর মধ্যে রয়েছে সুদর্শনের দু’ইনিংস মিলিয়ে ৩০ রানও! শেষ ছ’জন মিলিয়ে করেছেন ৬৫। চতুর্থ দিনের শেষে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের রান ২১। অপরাজিত দুই ওপেনার জ্যাক ক্রলি এবং বেন ডাকেট। ইংরেজ ব্যাটারেরা যে টুকু সমীহ করছেন, সেই বুমরাহকেই।ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টের সিরিজ় খেলবে ভারত। সব ম্যাচে জসপ্রীত বুমরাহকে পাবেন না শুভমন গিলেরা। দেশের অন্যতম সেরা জোরে বোলার সম্ভবত তিনটি টেস্ট খেলবেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সুনীল গাভাসকার এবং চেতেশ্বর পুজারা চান সব ম্যাচ খেলুক বুমরাহ। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজ়ের দুই ধারাভাষ্যকার বুমরাহকে রাজি করানোর দায়িত্ব দেন তাঁর সঞ্চালিকা স্ত্রী সঞ্জনা গণেশনকে।
ভারত-ইংল্যান্ড প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন সম্প্রচারকারী চ্যানেলে আলোচনার সময় সানি বলেন, ‘‘ভাল বিরতি আছে। পরের টেস্টের আগে আট দিন বিরতি রয়েছে। মনে হয় না পরের টেস্ট খেলতে কোনও সমস্যা হবে। তার পরের ম্যাচটা লর্ডসে। লর্ডসে খেলার সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক নয়। সেই ম্যাচের পর আবার আট দিনের বিরতি। চতুর্থ ম্যাচটা হবে ম্যাঞ্চেস্টারে। পরের ম্যাচ ওভালে। পাঁচটা দিনের ব্যাপার। আমার তো মনে হয় বুমরাহের নজর পাঁচটা ম্যাচের দিকেই রয়েছে। আসলে জলপ্রীত, তোমাকে আমাদের দরকার। জসপ্রীত দয়া করে তুমি সব ম্যাচ খেল।’’ সঞ্জনাকে অনুরোধ করেন পুজারা। ওই অনুষ্ঠানেই পুজারা বলেন, ‘‘তোমাকে (সঞ্জনাকে) একটা অনুরোধ করতে চাই। তুমি একটু বুমরাহকে বোঝাও, যাতে ও কয়েকটা ম্যাচ বেশি খেলে দেয়। একটু চেষ্টা করে দেখ। পারলে তুমিই পারবে ওকে বোঝাতে। ব্যাপারটা আমরা তোমার উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি।’’ স্বাভাবিক ভাবেই সঞ্জনা সে সময় কোনও উত্তর দেননি। হেসে পরিস্থিতি সামাল দেন। বুমরাহ হাসি মুখে বলেন, ‘‘এটা নিয়ে আমরা অন্য এক দিন আলোচনা করব।’’ অতিরিক্ত চাপ এড়াতেই সব ম্যাচ খেলতে চান না বুমরাহ। ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁকে তেমনই পরামর্শ দিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) চিকিৎসকেরাও। কারণ গত বর্ডার-গাওস্কর ট্রফির শেষ টেস্টে পিঠের পুরনো জায়গায় আবার চোট পান বুমরাহ। সে জন্য বেশ কিছু দিন মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। খেলতে পারেননি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। আইপিএলের শুরুর দিকেও কয়েকটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। এখনও পাঁচটি টেস্ট খেলার ধকল নেওয়ার মতো ফিটনেস নেই তাঁর। অতিরিক্ত চাপ তাঁর ক্রিকেটজীবনের বড় ক্ষতি করতে পারে। দু’ম্যাচের মধ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বুমরাহকে।
প্রথম ইনিংসে ৪১ রানে সাত উইকেট হারিয়েছিল ভারত। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩১ রানে ছয় উইকেট হারাল। তারপরও কেএল রাহুল এবং ঋষভ পন্তের শতরানের সুবাদে বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা পরবর্তী যুগের প্রথম টেস্টেই জয়ের আশা জিইয়ে রাখল ভারত। তবে মঙ্গলবার হেডিংলেতে বাকি দুটি ফলাফলের রাস্তাও খোলা আছে। ইংল্যান্ডও জিততে পারে। ড্রও হতে পারে টেস্ট। রাহুলের ১৩৭ রান এবং পন্তের ১১৮ রানের সুবাদে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬৪ রান তোলে ভারত। একটা সময় ভারতের স্কোর ছিল চার উইকেটে ৩৩৩ রান। সেখান থেকে ৩৬৪ রানে অল-আউট হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছিলেন, ভারতের ইনিংসে ধস নেমে শাপে বর হয়েছে। নাহলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ ব্যাট করত টিম ইন্ডিয়া। ২০২২ সালে বার্মিংহ্যামে ইংল্যান্ড যে ৩৭৮ রান তাড়া করে জিতেছিল, সেটাই ভারতের মাথায় ঘুরছিল। তাই ভারত আরও কিছুক্ষণ ব্যাট করতে চাইছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের। অনেকের মতে, সেই ভয় না পেয়ে আরও আগে ডিক্লেয়ার করা উচিত ছিল শুভমন গিলদের। তাহলে চতুর্থ দিনের শেষে ইংল্যান্ড ব্যাটারদের আরও কিছুক্ষণ চ্যালেঞ্জ ছোড়া যেত। ৩৭১ রানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খেলতে নেমে ইংরেজ ওপেনারদের মাত্র ছয় ওভার সামলাতে হয়েছে। দিনের শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর বিনা উইকেটে ২১ রান। তিনটি ওভার করেছেন জসপ্রীত বুমরাহ। মহম্মদ সিরাজ প্রথম ওভারে ভালো বোলিং করলেও দ্বিতীয় ওভারে যা করেছেন, তাতে পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য বুমরাহকেই সম্ভবত বেশিরভাগ কাজটা করতে হবে। তবে পঞ্চম দিনের পিচে রবীন্দ্র জাদেজার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জাদেজাকে কী করতে হবে, তার কিছুটা ঝলক দেখিয়েছেন ইংরেজ স্পিনাররা। পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের আরও ৩৫০ রান চাই। হাতে আছে ১০টি উইকেটই। ব্যাজবল যুগে সেটা অসম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালের প্রথম ঘণ্টায় কেমন বোলিং করবেন ভারতীয়রা, তার উপরে নির্ভর করবে টেস্টের ভাগ্য। ভারতের জন্য এই টেস্ট জয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বুমরাহ ছাড়া ভারতের বোলিংয়ের হাল খারাপ। বুমরাহ যে টেস্টে খেলবেন না, সেখানে কী হাল হবে, তা ভেবেই আঁতকে উঠছেন সকলে। তাই বুমরাহ যে টেস্টে খেলছেন, তাতে জিতলে না পারলে আরও বিপদ আছে। হেডিংলেতে ইতিহাস গড়েছে টিম ইন্ডিয়া। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথমবার টেস্টে পাঁচটি ব্যক্তিগত শতরান হল। সার্বিকভাবে ছ’বার এরকম হয়েছে। বিদেশের টেস্টে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সেই নজির গড়ল কোনও দেশ। আর সেই পাঁচটি শতরানের সুবাদে বাংলাদেশ লজ্জা থেকে মুক্তি পেল। এতদিন বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি টেস্টে চারটি করে ব্যক্তিগত শতরান পেয়েছিল ভারত।
প্রয়াত হলেন ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার দিলীপ দোশী। লন্ডনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। ভারতের প্রাক্তন বাঁহাতি স্পিনার ৩৩টি টেস্ট এবং ১৫টি এক দিনের ম্যাচ খেলেছেন। ১৯৭৯ সালে দেশের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়। ১৯৮৩ সালে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে টেস্টে ১১৪টি এবং এক দিনের ক্রিকেটে ২২টি উইকেট। ১৯৪৭ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজকোটে জন্ম দোশীর। একটু দেরিতে ৩২ বছর বয়সে চেন্নাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্টে তাঁর আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসেই ১০৩ রানে ৬ উইকেট নেন। অভিষেক টেস্টেই ইনিংসে ৫ বা তার বেশি উইকেটে নেওয়ার কৃতিত্ত্ব মাত্র ৯ জন ভারতীয়ের আছে। দোশী তাঁদের মধ্যে এক জন। এরাপল্লি প্রসন্ন, ভাগবত চন্দ্রশেখর, শ্রীনিবাসরাঘবন বেঙ্কটরাঘবন এবং বিষান সিংহ বেদির পর ভারতীয় ক্রিকেটের স্পিন আক্রমণের দায়িত্ব সামলেছেন দোশী। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলা এবং সৌরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছেন। ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন নটিংহ্যামশায়ার ও ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে। সব মিলিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ৮৯৮টি উইকেট রয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পিনার অনিল কুম্বলে। এক্স হ্যন্ডলে কুম্বলে লিখছেন, “দীলিপ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ হৃদয়বিদারক। ঈশ্বর ওঁর পরবিবার ও পরিজনদের শক্তি দিক।” দোশী রেখে গেলেন স্ত্রী কালিন্দী, পুত্র নয়ন ও কন্যা বিশাখাকে। গত মাসে লন্ডনে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালও দেখেছেন দোশী। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও ছিলেন। অভিমানি দোশী নিঃশব্দে বিদায় জানান ক্রিকেটকে। সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেট যে ভাবে চালানো হচ্ছিল তার সঙ্গে একেবারেই সহমত হতে পারেননি দোশী। পুত্র নয়নও ক্রিকেটার। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু এবং রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে আইপিএল খেলেছেন। ভারতে সৌরাষ্ট্রের হয়ে এবং ইংল্যান্ডে ডার্বিশায়ার ও সারের হয়ে খেলেছেন নয়ন।




