RK NEWZ ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সিঙ্গুরে শিল্প গড়তে উদ্যোগী হয়েছিলেন তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। হুগলির সিঙ্গুরে ফিরছে শিল্প। এ ব্যাপারে ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে কথাও হয়েছে। বৃহস্পতিবার নিউটাউনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করার পর এ কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিঙ্গুরে সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মোদীর সভার পাল্টা হিসেবে সিঙ্গুরের অদূরে সভা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সিঙ্গুর কেন্দ্রে পরাজিত হন মমতার দলের প্রার্থী। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্পমহলের নজর ছিল তাই সিঙ্গুরের দিকেই। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় আগেই জানিয়েছিলেন, সিঙ্গুর নিয়ে তাঁদের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। এ বার খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেই সিঙ্গুরে নতুন করে শিল্পায়নের কথা শোনা গেল।
২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সিঙ্গুরে শিল্প গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। টাটা গোষ্ঠীর ‘ন্যানো’ প্রকল্পের হাত ধরে সেই শিল্পায়নের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলনের জেরে শেষপর্যন্ত সিঙ্গুর থেকে ‘পাততাড়ি গোটায়’ টাটা গোষ্ঠী। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেন মমতা। সিঙ্গুরের মাটিতে নেমে ধানের বীজ ছড়িয়ে কৃষকদের জমি ফেরানোর বার্তাও দিয়েছিলেন তিনি। কর্মসূচিতে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে জানান, বামফ্রন্ট জমানার মতো জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কৃষকদের রক্ত ঝরবে না। তিনি বলেন, “শিল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষকের উপর গুলি চলবে না। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় দু’কোটি শিক্ষিত বেকার। কাজের অভাবে ভিন্রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন ৭০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক। আদানি গোষ্ঠী আমাকে জানিয়েছিল, তাজপুরে রাজ্য সরকারের নিজস্ব এক একর জমিও ছিল না। ফলে সেখানে বন্দর তৈরি সম্ভব হয়নি। তবে সিঙ্গুরে আমরা কিছু একটা করবই। নামী বাণিজ্যিক ভারী গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে কথাও হয়েছে। কিন্তু আমরা শুধু মৌ স্বাক্ষর করে লোকদেখানো চমক দিতে চাই না। আগের সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন করত। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমরা সেই রাস্তায় হাঁটব না।”
নতুন শিল্পনীতির রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিলবে বিশেষ সুবিধা। বড় শিল্পের জন্য আলাদা প্যাকেজ ঘোষণা করে সংস্থাগুলিকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে। মহিলা কর্মীদের কর্মসংস্থানে মিলবে অতিরিক্ত সুবিধা। প্রয়োজনে কর্মরত মহিলাদের হস্টেল তৈরিতে অনুদান দেবে রাজ্য। উৎপাদনকারী ইউনিটগুলির জন্য এসজিএসটি-র ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, “আগের সরকারের আমলে চিত্তরঞ্জন ও হলদিয়া শিল্পাঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাংলায় আর কোনও সিন্ডিকেট বা তোলাবাজি চলবে না। সঙ্কল্পপত্রে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পালন করা হবে।” নতুন নীতিতে হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা এবং ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ ও পরিষেবা ক্ষেত্র— সব ধরনের শিল্পকেই এই সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনগ্রসর এলাকায় কারখানা গড়লে মিলবে অতিরিক্ত উৎসাহ ভাতা। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন, সবুজ বিদ্যুৎ এবং গবেষণা-উন্নয়নমূলক কাজকে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৫টি ক্ষেত্র। এ ছাড়াও বৈঠকে পণ্যবাহী লরির ওভারলোডিং বন্ধ করতে শিল্পপতিদের কাছে আর্জি জানান মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে বকেয়া উৎসাহ ভাতার বিপুল বোঝা রয়েছে জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, “রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেই বকেয়া ভাতা মিটিয়ে দেওয়া হবে। আমরা যা বলি, তা-ই করি। তবে এখনই কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া বাস্তবসম্মত হবে না।”
বাংলায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করল জয় বালাজি গোষ্ঠী। আগামী কয়েক বছরে বিশেষ ধরনের ইস্পাত ও সংকর ধাতু, প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ শিল্পের উপযোগী যন্ত্রাংশ তৈরি-সহ একাধিক ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায় সংস্থাটি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে আরও ২০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাদের দাবি।
রেল, প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্পে নজর
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বড় অংশে গুরুত্ব পাবে রেল, প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ সংকর ধাতু ও উন্নত মানের ইস্পাত। পাশাপাশি সূক্ষ্ম ও নির্ভুল মাপের ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, বিশেষ ধরনের তামার সামগ্রী এবং ইস্পাতের ঢালাই ও ফোর্জিং তৈরির ক্ষেত্রেও উপস্থিতি বাড়াতে চায় জয় বালাজি।
এই সব পণ্যের ব্যবহার রয়েছে রেল, প্রতিরক্ষা, গাড়ি এবং মহাকাশ শিল্পে। অ্যালুমিনিয়াম ও তামার সংকর ধাতু এবং সেগুলি থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্যও সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। সংস্থার বক্তব্য, দেশে এই ধরনের উৎপাদন বাড়লে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দশটি উৎপাদন কেন্দ্রের আটটিই বাংলায়
জাজোদিয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠিত জয় বালাজি গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলার শিল্পের সম্পর্ক চার প্রজন্মের। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ছত্তীসগঢ় মিলিয়ে তাদের দশটি উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। তার মধ্যে আটটিই পশ্চিমবঙ্গে।
স্পঞ্জ আয়রন, পিগ আয়রন, ফেরো অ্যালয়, বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত, ডাকটাইল আয়রন পাইপ, টিএমটি বার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য তৈরি করে গোষ্ঠীটি। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের জীবিকা যুক্ত। বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে তাদের পণ্য রফতানি হয়।
এই উৎপাদন পরিকাঠামো, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহণের জন্য নির্দিষ্ট রেল সাইডিংকে কাজে লাগিয়েই পরবর্তী সম্প্রসারণ করতে চায় সংস্থা।
সৌরবিদ্যুৎ ও সহযোগী শিল্পেও সম্ভাবনা
উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে জয় বালাজির। উদ্দেশ্য, কারখানাগুলির বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে শক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর করা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো।
বর্তমানে গোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যবহারের জন্য প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। তাদের পরিকাঠামোয় কারখানার উদ্বৃত্ত তাপ ও কঠিন শিল্পবর্জ্য কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
জয় বালাজির আশা, সম্প্রসারণের সুফল শুধু তাদের কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সহযোগী শিল্প, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী, পণ্য পরিবহণ এবং অন্যান্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ৬ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে। কোন প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ হবে, কোথায় নতুন পরিকাঠামো গড়ে উঠবে কিংবা কোন সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে—তার নির্দিষ্ট বিবরণ তারা দেয়নি। একই ভাবে, সম্ভাব্য ২০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কাজের পৃথক হিসাবও জানানো হয়নি।





