RK NEWZ রবি দূপুর। কলকাতার এক অনাথ আশ্রমে বসেছিল বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সাধারন সভা। প্রশ্ন উঠেছিল বিওএর এজিএম কেন অনাথ আশ্রমে? বিওএ ইতিহাসে প্রথমবার এজিএম-এ দেওয়া হল ‘রিফিউজি’র কম্বল! উত্তর মিলল, ফান্ডিংএর অবস্থা খুব খারাপ হওয়ার কারণে এই স্থানে করতে হল। বললেন খোদ সংস্থার সচিব জহর দাস। আবার এর সত্যতা যাচাই করার জন্য প্রেসিডেন্ট চন্দন রায়চৌধুরীকে ফোন করা হলেও, তিনি রিসিভ করেননি। তৃণমূল সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ঘনিষ্ঠ চন্দন রায় চোধুরী রাতারাতি পোষাকের রঙ বদলে গেরুয়া ধারনের চেষ্টা করবেন তা স্বপ্নেও ভাবেননি খোদ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাও। পদ দখলে রাখার জোর প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করছেন প্রাক্তন আন্তজার্তিক সাইক্লিস্ট রিক্তা চন্দ। চন্দন রায়চোধুরী ও জহর দাসেদের রাজত্বে হওয়া একের পর এক দুর্নীতির কথা প্রকাশ করে তীব্র ক্ষোভ জানান তিনি। প্রায় অধিকাংশ অ্যাসোসিয়েশন ক্ষুব্ধ। ২০২৪ এ চন্দন বাহিনী ক্ষমতায় আসার পরই স্বরূপ বিশ্বাসের উপর দায়িত্ব পড় স্টেট গেমস আয়োজনের। চুড়ান্ত অব্যবস্থার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এমনকি ৪০-৫০ লক্ষ টাকার কাটমানি দুর্নীতির কথাও জানা গিয়েছিল সূত্র মারফৎ। আজও বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কমিটিতে অধিকাংশই সত্তোর্দ্ধো। অথচ পদ ছাড়ার নামগন্ধই নেই। রামানুজ থেকে কমল মৈত্র। পদ দখলের তালিকায় অসংখ্য নাম। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিক্তা দেবী। কমল মৈত্র একটা পাপেট্ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অলিম্পিয়ান কমলাকান্ত সাঁতরা অভিযোগ করেন, দিনের পর দিন চন্দনের কাছে ওয়েটলিফ্টিং অ্যাসোসিয়েশনের অভাব অভিযোগ জানাতে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। নিজেদের পেটোয়া লোক বসিয়ে কাজ সারেন চন্দনরা। হ্যান্ডবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট গৌতম নাগ বলেন, জহর দাস ঠিক কত পরিমান টাকা নয়ছয় করেছেন তা বলে বোঝানো যাবে না। স্টেট গেমসের সময় টি-শার্ট দুর্নীতি থেকে শুরু করে অ্যাথলিটদের বাসস্থান, শৌচাগারের অব্যবস্থা। আজকের এজিএমএ মঞ্চে বসে রয়েছে দেবাশীষ ওরফে দেবু। ওর নামেও হাজারো দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ। দিনের শেষে বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সচিব জহর দাস স্পষ্ট জানালেন, ফান্ডিংএর অবস্থা খুবই খারাপ। তাই কম্বল থেকে অনাথ আশ্রম কক্ষ, সবকিছুই স্পনসর করেছেন বিশ্বরূপ দে। যিনি বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, তিনি আপাতত গেরুয়া শিবিরের দিকে প্রবলভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি চন্দন রায়চৌধুরী।
কে এই চন্দন রায়চৌধুরী? বর্তমানে বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন। বিওএ এবং বেঙ্গল প্যারালিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন উভয়েরই সভাপতি। আরও অনেক অ্যাসোসিয়েশন রয়েছেন দখলে রেখেছেন বলে শোনা যায়। এছাড়াও, তিনি বিগত দুই দশক ধরে কলকাতা রোয়িং ক্লাবের (সিআরসি) সচিব হিসেবে দায়িত্বে। অনেকেই উপহাস করে বলেন “সিআরসি-র সবকিছুই সিআরসি-র আজীবনের দখল”। ক্রীড়ামহল বলছে অনেক আগেই সত্তর পেরিয়েছেন চন্দন। চন্দনের দেওয়া বয়স অনুসারে ৬৭ বছর বয়সী রায়চৌধুরীর একই ভাবে বিওএ দখলে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন । কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় ক্রীড়া নীতি (National Sports Code) এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশের সমস্ত ক্রীড়া ফেডারেশন ও রাজ্য অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনগুলির প্রশাসনে বা পরিচালন সমিতিতে (Executive Council) ন্যূনতম ২৫% প্রাক্তন সক্রিয় খেলোয়াড়দের (Athletes) উপস্থিতি এবং ভোটাধিকার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের শীর্ষ স্তরে ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (IOA) তাদের সংবিধানে এই বদল আনলেও, বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) সহ বেশ কিছু রাজ্য সংস্থায় এখনও এই নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর করা বা গঠনতান্ত্রিক সংশোধন হয়নি। মূল সমস্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি ভোটের অধিকার ও পদের দ্বন্দ্ব। জাতীয় স্তরের সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী রাজ্য অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনগুলির কেন্দ্রীয় সংস্থায় (IOA) সরাসরি ভোট দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই কারণে রাজ্য সংস্থাগুলির অভ্যন্তরীণ নির্বাচনেও খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি ও তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। স্বার্থের সংঘাত ও অনীহার ফলে বহু বছর ধরে ক্রীড়া প্রশাসনে অ-খেলোয়াড় বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আধিপত্য থাকা, সংবিধানে আমূল পরিবর্তন এনে খেলোয়াড়দের হাতে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়তে রাজ্য স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা লক্ষ্য করা গেছে। আইনি জটিলতা কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতের অনড় অবস্থানের পরেও, রাজ্য স্পোর্টস বডিগুলোর নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন এবং গঠনতন্ত্রের ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা। ৩০ নভেম্বর ২০২৪ এ ছিল অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনমুখী সাধারণ সভা। সভায় ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের পর্যবেক্ষকও উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সভাপতি হিসেবে স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় (বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়) পুনরায় দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে চন্দন রায়চৌধুরী নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার নেন। সেক্ষেত্রেও তৃণমূল শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ চন্দনের কারসাজিতে ভোটে জেতার কথাও শোনা গেছে ক্রীড়ামহলে। তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রীর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে মালদায় অনুষ্ঠিত রাজ্য গেমসের পুরো দায়িত্ব দিয়েছিলেন চন্দন রায়চৌধুরী। এই গেমস আয়োজনে খামতি এমনকি প্রচুর পরিমান আর্থিক তছরূপের অভিযোগও শোনা গিয়েছিল। একসময় অরূপ-স্বরূপ ঘনিষ্ঠ চন্দন রায়চৌধুরী আপাতত নিজের জামা বদলে গেরুয়া শিবিরে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে চলেছেন বলেও শোনা যাচ্ছে ক্রীড়ামহলে। পদ দখলে রাখার উদ্দ্যেশ্যেই এই প্রয়াস বলে জানাচ্ছেন ক্রীড়াবিদরা। সিংহভাগ অ্যাসোসিয়েশনের একের পর এক অভিযোগের ভিত্তিতে হলফ করে বলা যেতেই পারে চন্দন-জহররা বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে অধ:পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।




