RK NEWZ ইন্দ্রনীলের বিলাসবহুল বাগানবাড়ি ‘মোহর’। হুগলির সিঙ্গুরে। বিলাসবহুল বাগানবাড়ি ‘মোহর’-এর সামনে বিক্ষোভ। কোমরে দড়ি বেঁধে ইন্দ্রনীল সেন সাজানো হল এক ব্যক্তিকে, ‘চোর ধরা পড়েছে’ লিখে জুতো ঝুলিয়ে দেওয়া হল প্রাক্তন মন্ত্রীর ছবিতে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, দুর্নীতির কোটি কোটি টাকায় তৈরি করা হয়েছে বাগানবাড়ি। এর সঙ্গে আরো অনেকে জড়িত আছে বলে অভিযোগ। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি। সিঙ্গুরের বাগডাঙা ছিনামোর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় রয়েছে ইন্দ্রনীলের বাগানবাড়ি। তার ভিতরে রয়েছে সুইমিং পুল, নাচমহল। সেখানে আমোদ প্রমোদ হত বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। এলাকার বাসিন্দারা বলেন, “রাত ১১টা বাজলেই ঝুমুর আওয়াজ পাওয়া , নর্তকী, অপ্সরারা আসত। এখানে গ্রামের মানুষ রাত ৯টা বাজলেই ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর নেতা-মন্ত্রীরা লালবাতি জ্বালিয়ে এসে আমোদ প্রমোদ করত।” বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, এই বাগানবাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে নিকাশি বন্ধ করে পঞ্চায়েতে টাকায় নিয়ম বহির্ভূত ভাবে রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয়। বাগানবাড়ির জায়গা নেওয়ার ক্ষেত্রে সিঙ্গুরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মন্ত্রী বেচারাম মান্নার ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা সাহায্য করেছিলেন বলেও দাবি।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহধন্য ও মমতারও ঘনিষ্ঠর ইন্দ্রপতন!
ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে জনতার দরবারে নালিশে ঋদ্ধি-দোলারা। ইডির জেরার পর সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরতেই রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারের গোয়েন্দা সেল। পুজোর ই-পাস মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মমতা সরকারের আমলে তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী ছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। অভিযোগ, তাঁর আমলে বিপুল অঙ্কের পাস দুর্নীতি হয়েছে। সেই আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত বলেই দাবি। মাস কয়েক আগেই ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রেপ্তারিতে খুশি গায়িকা। মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে গিয়ে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা মুখোপাধ্যায়-সহ একাধিক সঙ্গীত শিল্পী। তৃণমূল সরকারের আমলে সঙ্গীতজগতেও ‘সিন্ডিকেটরাজ’ চলত বলে অভিযোগ করেছিলেন ঋদ্ধি, দোলা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। তৎকালীন তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ‘চাকরি বিক্রির মতো মঞ্চ বিক্রি’র অভিযোগ তুলেছিলেন। প্রাক্তন মন্ত্রীর গ্রেপ্তারের ঘটনায় খুশি সঙ্গীতশিল্পীরা। সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি মনে করি যে যা করবে সে তার ফল এ জীবনেই পেয়ে যাবে। এই গ্রেপ্তারে আমি খুশি। বিগত সরকারে থাকাকালীন ইন্দ্রনীল সেন এবং আরও কিছু মানুষ তাদের ক্ষমতার স্বার্থে এমন কিছু কাজ করেছেন। আমার মনে হয় আমি ২৬ বছর ধরে ‘ইন্ডাস্ট্রি’তে আছি, আমি ‘ইন্টারন্যাশনালি’ কাজ করি। আমার সঙ্গে যদি এই ঘটনা ঘটে, সব জায়গায় ব্যান করা, আমি হল পাব না সরকারের। তাহলে গ্রামগঞ্জ থেকে যে সব ছেলেমেয়েরা কাজ করতে আসবে তারা ‘অ্যাজেন্ডা মেকআপ’ না করতে পারলে তাদের অবস্থা কী হবে। আজকে যে রাজ্যের অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এগুলোই তার অন্যতম কারণ। যিনি প্রশাসনে-চেয়ারে থাকবেন তার চারপাশে যে চাটুকারদের দল ঘুরঘুর করবে নিজেদের ধান্দার জন্য। এটা আমাদের আগের মুখ্যমন্ত্রীর ভাবা উচিত ছিল।”
‘মমতার তানসেন’ ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন’ দুর্নীতি ও লবিবাজির অভিযোগ
কলকাতায় জন্ম। বেড়ে ওঠা। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে টিকিট পান ইন্দ্রনীল। তিলোত্তমাতেই প্রথম সারির সংগীতশিল্পী হিসাবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ইনিংসও কম বর্ণময় নয়। রাজনৈতিক দুনিয়ায় ইনিংস শুরুর আগে সঙ্গীতজগতে পায়ের মাটি শক্ত করেছিলেন। আধুনিক বাংলা গানের সিরিজ ‘দূরের বলাকা’ দিয়ে প্রায় সকলের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে যান। তারপর একের পর এক গান গেয়ে সাড়া ফেলেছেন। পরবর্তী সময়ে ‘অধরা মাধুরী’, ‘একা’ এবং ‘অনুপমা’র মতো অ্যালবামেও গান গেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কার পান। রাজনৈতিক জীবনে বারবার নিজের পথ বদলেছেন ইন্দ্রনীল সেন। একসময় তিনি ছিলেন বামপন্থী। ২০১১ সালের মে মাসে বাম শাসনের অবসান। তারপরও ২০১২ সালের জানুয়ারিতে লালপতাকা না ছাড়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সিপিএমের মুখপত্রর প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে ‘ধরো হাল শক্ত হাতে’ গেয়েছিলেন। ইন্দ্রনীলের গ্রেপ্তারির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার সময় সিপিএমের সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রীর সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সিপিএমের সবচেয়ে বড় ক্যাম্পেনার ছিলেন ইন্দ্রনীল। সিপিএমের ব্লু আইড বয় বলেও খোঁচা দেন শুভেন্দু। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের এনজিও-র সঙ্গে ইন্দ্রনীল যুক্ত ছিলেন বলেই জানান মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সময়ে সময়ে জল যেমন আকার ধারণ করে তেমন আকার ধারণ করেন ইন্দ্রনীল। মমতার ‘ছায়াসঙ্গী’ হয়ে ওঠার কাহিনি যেন সে-ই ইঙ্গিতই দেয়। কারণ, যে ইন্দ্রনীল বামেদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন, তারই মমতার আশপাশে আনাগোনা বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে পান ‘ঘনিষ্ঠতা’র পুরস্কার। লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর থেকে টিকিট দেওয়া হয়। ভোটে জিততে পারেননি। তা সত্ত্বেও মমতার সঙ্গ ত্যাগের কথা ভাবেননি ইন্দ্রনীল। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে ফের ইন্দ্রনীলকে প্রার্থী করেন মমতা। চন্দননগর থেকে বিধানসভা ভোটে লড়েন। জেতেনও। প্রথমবার বিধায়ক হয়েই মন্ত্রিত্ব পান। তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয় তাঁকে। পর্যটন মন্ত্রীও ছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও টিকিট পান। ভোটে জিততে পারেননি। মমতার মঞ্চে সবসময় গায়কের ভূমিকায় দেখা যেত ইন্দ্রনীলকে। অনেকেই ‘মমতার তানসেন’ বলে টিপ্পনি কাটতেন তাঁকে। মমতা একবার বলেছিলেন, “আমি ফটাফট গান লিখে পাঠিয়ে দিই। ইন্দ্রনীল স্যাটস্যাট কী সুন্দর করে সুর করে দেয়। ইচ্ছে থাকলে সব কজ সামলেও ক্রিয়েটিভ কাজ করা যায়।” এরপর একাধিক মঞ্চে একসঙ্গে মমতা-ইন্দ্রনীলকে গাইতে দেখা যায়। গানের সুর নিয়ে কখনও কখনও ধমকও দিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সুতরাং দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক যে বেশ ভালো ছিল তা বলাই বাহুল্য। সেই ইন্দ্রনীলের পুজো পাস দুর্নীতির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগসূত্র রয়েছে বলেই মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। সবদিক খতিয়ে দেখে সকলের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। এবার দেখার তদন্তের মোড় কোনদিকে ঘোরে।রাজ্য সরকারের পালাবদলের পর সেই ইন্দ্রনীল সেনই আজ জেলবন্দি। ইন্দ্রনীল গ্রেপ্তারিরর পর শুভেন্দু বলেন, “ওঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল। তদন্ত চলছে। ইডি, পুলিশ সকলেই তদন্ত করছিল। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রত্যক্ষ মদতে, একই গাড়িতে ঘুরতেন, একই সঙ্গে গান করতেন। তারপরেই গান করেন মুখ্যমন্ত্রী। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার। আইনি প্রক্রিয়া চলবে। মমতা ব্যানার্জি, ইন্দ্রনীল সেন একে অন্যের পরিপূরক ছিলেন। যা পরিণতি হওয়ার হচ্ছে। সবে তো চা-বিস্কুট। এখনও ব্রেকফাস্ট হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক চোরেদের সব জেলে যেতে হবে। ঠিক সময়ে বড় জায়গাতেও হাত পড়বে।”





