RK NEWZ প্রয়াত শিল্পী যোগেন চৌধুরী। বেশ কিছুদিন ধরে ব্লাড ক্যানসার এবং মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়ে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। রবিবার সকালে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। যোগেন চৌধুরী প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা শিল্পীমহল। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পীর চলে যাওয়া বড় ক্ষতি বলে তিনি মনে করেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ওঁর অনেক সৃষ্টি অক্ষয়, অমর হয়ে রয়েছে। বিরাট বড় মাপের শিল্পী।” শুধু মুখ্যমন্ত্রীই নন, সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি লিখছেন, ‘বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, পদ্মভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত এবং রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।’ বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদের কথায়, ‘তাঁর তুলির প্রতিটি টানে, রেখার প্রতিটি বিন্যাসে ফুটে উঠত মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং অনুভূতির গভীরতা। নিজস্ব শিল্পশৈলী ও অসামান্য সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় এক স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিল্পকলার পাশাপাশি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও তিনি দেশের জনজীবনে অবদান রেখেছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং শিল্পের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর পরিবার, পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা।’ শিল্পী যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলনে তাঁর সঙ্গী ছিলেন যোগেন। একাধিক ইস্যুতে কখনও রাজপথে তো আবার কখনও মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা গিয়েছে শিল্পীকে। তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদও করেছিলেন মমতা। সমাজমাধ্যমের শোকবার্তায় সেই কথা তুলে ধরেছেন তিনি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লিখছেন, ‘যোগেন চৌধুরী ছিলেন বাংলা ও ভারতের গর্ব। তিনি শিল্পীদের কাছে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাঁর পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং বিশ্বজুড়ে থাকা অনুরাগীদের প্রতি আমি সমবেদনা জানাই।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে এআইটিসির পক্ষ থেকে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১২ সালে তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তাঁর প্রয়াণ শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করবে।
দ্বাস্তু জীবনের ক্ষত ভরেছিল ভাঙাচোরা মুখ। দেশভাগ তাঁকে উদ্বাস্তু করেছিল। সেই উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, শরীরের বিকৃতি সবই হয়ে উঠেছিল তাঁর তুলির ভাষা। দেশভাগ তাঁকে উদ্বাস্তু করেছিল। সেই উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, শরীরের বিকৃতি সবই হয়ে উঠেছিল তাঁর তুলির ভাষা। কালি-প্যাস্টেল-জলরঙে আজীবন ডুবে থাকা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম স্তম্ভ যোগেন চৌধুরী আর নেই। বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার সকালে প্রয়াত হলেন তিনি। গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন ৮৭ বছর বয়সি এই শিল্পী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মূত্রনালীর সংক্রমণ। যার জেরে ষষ্ঠীর দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অবস্থায় বিশেষ উন্নতি হয়নি, বরং আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে। শেষমেশ মৃত্যু হল শিল্পীর। শিল্পী যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পীর চলে যাওয়া বড় ক্ষতি বলে তিনি মনে করেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ওনার অনেক সৃষ্টি অক্ষয়, অমর হয়ে রয়েছে। বিরাট বড় মাপের শিল্পী।” যোগেন চৌধুরী বলতেন, ‘শরীর এক জৈবিক বিস্ময়।’ তাঁর চিত্রকলার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে সেই বিস্ময়। ১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর উচ্চশিক্ষায় প্যারিস পাড়ি দেন তিনি। সেখানে Ecole des Beaux Arts, William Hayter-এর বিখ্যাত Atelier 17-এ অঙ্কনের পাঠ নেন। রেখা জালের অদ্ভুত কারসাজি তাঁকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল ইউরোপ। অন্যদিকে নিজের শিকড়, বাংলার উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত ছিল তাঁর শিল্পের ভিত। দু’য়ে মিলে ভারতীয় চিত্রশিল্পের দুনিয়ায় এক বিরাট মাইলফলক তৈরি করেছিলেন যোগেন। ছবিতে আড়াআড়ি রেখার জাল ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তুলির টানে একে একে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ফোলা, বিকৃত, অথচ অসম্ভব মানবিক সব মুখ। ছবির দুনিয়ায় গণেশ, দম্পতি এবং নারী ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। ১৯৩৯ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের জমিদার। জমিদার পরিবারের সন্তান যোগেনের মধ্যে শিল্পী মন খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মা। আঁকার হাতেখড়ি সেখান থেকেই। কলকাতার নিজের বাড়ির দেওয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকেছিলেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম চিত্র। এরপর ধাপে ধাপে এগোতে থাকে শিল্পকর্ম। প্যারিস থেকে ফেরার পর সমাজ সচেতন শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন যোগেন। সমাজ ও রাজনীতির কদর্য বিষয় নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক চিত্র ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দেয়। খ্যাতির পাশাপাশি আসে একের পর এক সম্মান। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ছিলেন তিনি। পরে শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক, ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। পদ্মভূষণ, ললিতকলা একাডেমি, ফ্রান্সের প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর, সব সম্মানই পেয়েছেন। ২০১৪-তে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী, কিন্তু রাজনীতির চেয়ে অনেক বড় ছিল তাঁর স্টুডিও। কলকাতায় নিজের হাতে গড়া ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ রয়ে গেল তাঁর শেষ স্বপ্ন হিসেবে। বাংলা চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়ের পর যে কয়েকজন নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করতে পেরেছিলেন, যোগেন চৌধুরী তাঁদের শেষ স্তম্ভ। তাঁর জীবন রেখা থামলেও, তাঁর ছবির মায়াজালে আছন্ন রয়ে গেল শিল্পের পৃথিবী।





