RK NEWZ সম্প্রতি হুমকির শিকার ভারতজোড়া খ্যাতির অধিকারী বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। বলা হয়, আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে মুম্বইতে অমিতাভ বচ্চনের বাসগৃহ ‘জলসা’ গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে। আমরা যেন আগ্নেয়গিরির উপর বাস করছি। বাইরে থেকে তেমন হদিশ পাই না পাহাড়ের গভীর অন্দরমহলে তৈরি হচ্ছে কেমন বিস্ফোরক আলোড়ন ও উত্তাপ। সারা পৃথিবীব্যাপী এই অবস্থা। সমস্ত বাহ্যিক আনন্দ উৎসবের মধ্যেও ‘থ্রেট কালচার’ বা ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র নেপথ্যস্রোত বিচিত্র ধারায় ছড়িয়ে চলেছে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা। মানুষ বড় শঙ্কায় আছে। হুমকির জোর এবং ত্রাস- মানবসভ্যতার সঙ্গে আদিকাল থেকে জড়িয়ে। ‘থ্রেট কালচার’ থেকে মানুষের মুক্তি কোনও কালেই ঘটেনি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, যত বাড়ছে বিনাশের অস্ত্র, পদ্ধতি ও শক্তি, ততই যেন হুমকির সংস্কৃতি আরও ব্যাপ্ত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সমাজ-সংসার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ধর্মনীতি- সর্বত্র যখন-তখন থাবা বসাচ্ছে হুমকি। সম্প্রতি হুমকির শিকার ভারতজোড়া খ্যাতির অধিকারী বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। হুমকির বার্তা হল: আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে মুম্বইতে অমিতাভ বচ্চনের বাসগৃহ ‘জলসা’ গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে। এই হুমকির বার্তা পাঠানো হয় মুম্বইয়ের মেয়র ঋতু রাজেশ তাওরের অফিশিয়াল মেল আইডি এবং বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্সের একটি স্কুলে। মেলের দাবি অনুসারে, এ বার্তা পাঠিয়েছে ‘খলিস্তান ন্যাশনাল আর্মি’। কেন ‘বিগ বি’-কে এই হুমকি? সে বার্তা দেওয়া হয়নি। দু’-বছর আগে বান্দ্রায় আরও এক বলিউড সুপারস্টার সলমন খানের বাড়ি ‘গ্যালাক্সি’ লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়। এবং সলমনকে হত্যার হুমকি জারি থেকেই গিয়েছে। উদ্বেগ থেকে তাঁর এবং তাঁর রক্ষীদের নিস্তার নেই। গত সপ্তমীর দিন থেকে আরও এক আতঙ্ক: জুহুর ফুটবল মাঠের বাইরে টাইগার শ্রুফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি! শুধু যে সেলিব্রিটি বা বিপুল ধনী মানুষরাই হুমকির শিকার, তা তো নয়। এক-এক সময় মনে হয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে কোনও না কোনওভাবে হুমকির অভিজ্ঞতা আসে। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে সাধারণ সংসারে খুনোখুনির খবর। রক্তারক্তি হত্যার ঘটনা ঘটছে সাধারণ সংসারে, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, নিকট আত্মীয়স্বজনের মধ্যে। যে-কাহিনি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে তার সঙ্গে কি মিশে থাকতে পারে না নিত্যদিনের হুমকি, ত্রাস, জবরদস্তি, অত্যাচার? হুমকির কারণ হতে পারে প্রেম, ঈর্ষা, বঞ্চনা, নানাবিধ হতাশা, প্রতিশোধ, বা আর্থিক দেনাপাওনার গরমিল। এসবের বাইরেও স্কুল-কলেজ ও ছাত্রদের হস্টেলে আরও একরকম হুমকির সংস্কৃতি চালু আছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল, মানসিক বা শারীরিকভাবে দুর্বল নতুন ছাত্রের উপর নানারকম অমানবিক অত্যাচার, এও ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র আর-একটি রূপ। হস্টেলের র্যাগিং থেকে রাজনৈতিক দাদাগিরি থেকে কূটনীতির চাপসৃষ্টি থেকে সামরিক ক্ষমতার ত্রাসন- সবই কিন্তু মানুষের ইতিহাসে ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র অঙ্গ। দুঃখের বিষয়, শঙ্কারও বিষয়- যতই মানুষ আপাতভাবে সভ্য হচ্ছে, ততই যেন বাড়ছে তার হুমকির জোর ও আধিপত্য। অধিকার ও ক্ষমতার শাসন বজায় রাখতে বাড়ছে নাশের প্রবণতা।
মেয়েদের প্রতি সামাজিক অবিচারের ক্ষেত্রে গত চার দশকে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববাজারের বহুস্তর জটিলতা। নারীর শ্রম, শরীর ও অধিকারের উপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দখলদারি কীভাবে প্রতিদিনের বাস্তবতায় টিকে থাকে, তারই নির্মম দলিল স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘তিলোত্তমা টোটো স্ট্যান্ড: খেটে খাওয়া মেয়েদের কথা’। তত্ত্বের ভারী বুলি নয়, জীবন্ত ক্ষেত্রসমীক্ষা ও প্রান্তিক নারীদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে বাজার অর্থনীতির মানবতাহীন মুখ। লিখছেন চিন্ময় গুহ। রবীন্দ্রনাথ বহু আগে একটি অমোঘ সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বুলিটা যেন বাটখারা না হয়।’ অথচ ৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই বিরাট দেশে, যেখানে পৃথিবীর নারীসংখ্যার ১৭ শতাংশর বেশি ভারতীয়, প্রশাসনিক স্তরে এমনটাই চলে, বিশেষত মেয়েদের প্রতি সামাজিক অবিচার ও বৈষম্যের ক্ষেত্রে। তার উপর গত চার দশকে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববাজারের বহুস্তর জটিলতা, মতাদর্শের পতন, আমাদের প্রতিদিনের লোভ ও স্বার্থপরতা, প্রায়োগিক তথ্যপ্রমাণের ক্রমবর্ধমান অপ্রাসঙ্গিকতা। বাজার অর্থনীতির নিও-লিবারালিজ্মের আড়ালে ‘দ্য সোশিওলজি অফ গ্রিড’, যা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক প্রশান্ত রায় সম্প্রতি একাধিক বই লিখেছেন। স্বাতী ভট্টাচার্যর লেখায়, সেগুলি যেন সত্যের আগুনে পরিশোধিত জীবনসংগ্রামের দলিল। তিনি জানেন একটা বাড়তি আঁশ থাকলেও কলমের নিবের মধ্য দিয়ে সত্য গলবে না। আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানোয় তিনি আমাদের সামনে এক উদাহরণ স্থাপন করেছেন। যেন তাঁর জ্বলন্ত ক্ষেত্রসমীক্ষাগুলিই তাঁর মুখপাত্র, তিনি নিজে কেউ নন। এ যেন ‘defetishization of the author’। নতুন প্রশ্ন, নতুন উত্তর খোঁজা থামে না। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মকে তিনি বলিষ্ঠভাবে ব্যবহার করেছেন নারীজীবনের সত্যানুসন্ধানের জন্য, যা শেষ পর্যন্ত নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের অনেকের আত্মানুসন্ধান হয়ে ওঠে। ১৯৯৫ সালে বেজিং কনফারেন্সে পাঁচ দিনের আলোচনাচক্রে যোগ দিয়ে দর্শনের মেধাবী ছাত্রী (স্পেশাল পেপার ছিল ‘বেদান্ত’), এমআইটিতে গবেষণা করা নেহরু-ফুলব্রাইট স্কলার, সেই সময় ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ কাগজে কর্মরতা স্বাতী ভট্টাচার্য প্রত্যক্ষভাবে মানবীবিদ্যায় দীক্ষিত হন। সেই সূত্রে দেখা হয় পামেলা ফিলিপস, আম্মু জোসেফ, কল্পনা শর্মা, উর্বশী বুটালিয়া এবং দুই নেপালি মহীরুহ কুন্দমণি দীক্ষিত ও কনকমণি দীক্ষিতের সঙ্গে। আগেই কাগজে মেয়েদের বিভাগে লিখলেও সেই সময় থেকে দেশের মেয়েদের জন্য কাজ করার ইচ্ছে গাঢ় হয়। প্রথম থেকেই ছুরির ফলার মতো জীবনের ভিতর প্রবেশ করতে চেয়েছেন স্বাতী। অর্থনীতিবিদ নির্মলা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বুঝিয়েছিলেন সমাজে ও অর্থনীতিতে মেয়েদের প্রতি বঞ্চনা, প্রতারণা কতরকমভাবে কাজ করে।
১৯৯৯ সালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় বদলি হন লেখক। ক্রমশ জীবন্ত কাহিনি (live stories) উপস্থাপন করতে শুরু করেন। প্রস্তুতির জন্য যাবতীয় লিটারেচার পড়ে নেন, তথ্য বিশ্লেষণ করেন, নোটস নেন, এনজিও-দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, অন্য প্রদেশের খবর নেন, চাহিদাগুলিকে সম্মান করে মেয়েদের কথা শোনেন, পারিপার্শ্বিকের খোলস ছাড়িয়ে, যুক্তি-তর্ক দিয়ে এক স্নায়ুমোহনায় পৌঁছে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার চেষ্টা করেন। যেদেশে সব কিছু ‘সরকারের দায়, আমার নয়,’ যেখানে রাষ্ট্রের ভয়ে সত্যি কথা বলার উপায় নেই, এবং অমর্যাদা জীবনের অঙ্গ, সেখানে ধীরে ধীরে আস্থা অর্জন করে, তৈরি কথার বাইরে এসে দরিদ্র মেয়েদের বঞ্চনার যন্ত্রণাকে ধরা তাঁর প্রধান শক্তি। শ্রমজীবী, প্রান্তিক মেয়েদের জন্য তাঁর বিরামহীন চিরুনিতল্লাশির পাশে অ্যাকাডেমিকদের প্রশাধনিক বুলিসর্বস্বতাকে অনেক সময়ই শূন্যগর্ভ বলে মনে হতে পারে। আশা করি, উৎসর্গপত্রে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে শঙ্খ ঘোষকে লেখা গৌরকিশোর ঘোষের ‘এই কি নিয়তি’ নামে কবিতাটি পাঠকের নজর এড়াবে না, যেখানে ‘অবিরাম নিষ্ফলা ব্যায়ামে/ শব্দের ওজন হারানোর কথা’ বলা হয়।
যেদেশে সব কিছু ‘সরকারের দায়, আমার নয়,’ যেখানে রাষ্ট্রের ভয়ে সত্যি কথা বলার উপায় নেই, এবং অমর্যাদা জীবনের অঙ্গ, সেখানে ধীরে ধীরে আস্থা অর্জন করে, তৈরি কথার বাইরে এসে দরিদ্র মেয়েদের বঞ্চনার যন্ত্রণাকে ধরা তাঁর প্রধান শক্তি।রাজনীতির বীভৎস নৃত্যের মধ্যেও লিঙ্গ রাজনীতি বদলায় না। ভারতের মতো জটিল দেশে মেয়েদের নিয়ে রাশি রাশি ভারী ভারী কথা হয়, কিন্তু সত্যিকারের জরিপ হয়তো খুব একটা হয় না। স্বাতী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, মেয়েদের জীবনের অধিকার, সম্পদের অধিকার, শিক্ষার অধিকারের কথা দিয়ে বাংলার ‘নবজাগরণের’ শুরু। সেই পথে না গিয়ে মেয়েদের পরাধীনতা যেন চক্রাকারে ঘুরে আসে, প্রতি প্রজন্মকে লড়তে হয় একই লড়াই। মহিলা শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যের জন্য পুরুষতন্ত্র যে দায়ী হতে পারে, সে-সম্ভাবনাকে আমল দেওয়া হয় না। লেখক মনে করিয়ে দেন যে, মেয়েদের শ্রমের অমর্যাদা, এবং মেয়েদের যৌন হয়রানি একই অসাম্য, একই অন্যায়ের দু’টি পিঠ। অসাম্যের কথা বলতে গিয়ে স্বাতী ভট্টাচার্য তত্ত্বের কুহকের আড়ালে মুখ লুকোন না।
‘তিলোত্তমা টোটো স্ট্যান্ড: খেটে খাওয়া মেয়েদের কথা’ (‘রাবণ’, ২০২৬) গ্রন্থনাম থেকে আগুন জ্বলে, মুহূর্তের জন্য মনে হয় বুঝি কালপুরুষের কৃপাণ ঝলসে উঠছে– ‘শাসক তোমার কীসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়?’ ৯ আগস্ট ২০২৪ আর. জি. কর হাসপাতালে নারকীয় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, মেয়েদের রাত দখল, পরে ‘মেয়েদের’ শব্দটিকে সুচারুভাবে ছেঁটে ফেলা– এসবকে স্বাতী দমদম ক্যান্টনমেন্টের বাইরে কয়েকজন মেয়ে চালকের রাখা টোটোর পিছনে ফ্লেক্সের লিখনে প্রতীকায়িত করেছেন। অতঃপর অটো চালকরা বাঁশ, রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েদের উপর– ‘তিলোত্তমা স্ট্যান্ড করেছিস? তোদেরও তিলোত্তমা করে দেব।’ পরে ফাঁকা স্ট্যান্ডে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বাঁধা হলুদ বোর্ডে লেখা– ‘তিলোত্তমা বিচার পাক, তিলোত্তমারা এগিয়ে যাক।’ বাউড়িয়ার একটি নারী সংগঠনের নেত্রী রহিমা খাতুন জানান, ‘আমরা ৩০ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম টোটো চালানোর। কিন্তু স্ট্যান্ডের লোকেরা বলল, ছেলেরাই যেখানে করে খেতে পাচ্ছে না, সেখানে মেয়েরা ঢুকবে কেন?’ লেখক জানান, চেন্নাইতে দুটো প্রধান রেল স্টেশন রয়েছে। এখনও সেখান থেকে মেয়েরা যাত্রী তুলতে পারেন না, পুরুষ অটোচালকরা বাধা দেয়। অটোচালকদের রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে স্বাতী ভট্টাচার্য যুদ্ধজয়ী আশ্চর্যময়ীদের কথা বলতে দ্বিধা করেন না, যেমন সোনালি জানা– নিরবচ্ছিন্ন লড়াই করে যিনি বহরমপুর শাখার সভাপতি। তাঁদের ১৮০ জন সদস্য। তঁাকে স্ট্যান্ডে জায়গা না দিলেও কয়েকজন মেয়ে এখন দাঁড়াতে পারছে স্টেশনের লাইনে।
মেয়েদের শ্রমের অমর্যাদা, এবং মেয়েদের যৌন হয়রানি একই অসাম্য, একই অন্যায়ের দু’টি পিঠ। অসাম্যের কথা বলতে গিয়ে স্বাতী ভট্টাচার্য তত্ত্বের কুহকের আড়ালে মুখ লুকোন না। বইটির তিনটি বিভাগ ‘শ্রম’ (১১টি নিবন্ধ), ‘সমাজ’ (১১টি নিবন্ধ) ও ‘সাহিত্য’ (৬টি নিবন্ধ) পরস্পরকে কামড়ে ধরে থাকে। কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়, সবই ইতিহাসের বাঁধনে বাঁধা। ‘মহাভারতের নায়িকা’ নিবন্ধে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা ও অন্যদের দর্শনলালসায় মূক হয়ে থাকা, এবং এ যুগের ধর্ষণের রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেতে অসুবিধে হয় না। স্বাতীর ভাষায়, ‘দ্রৌপদী বিচার চেয়ে আসলে সংকটে ফেলেছিলেন রাষ্ট্রকে।’ কীচকের কুৎসিত আচরণের পর দ্রৌপদী বিরাটসভায় অভিযোগ করেন– ‘রাজা, আপনি কীচকের প্রতি রাজবৎ আচরণ করছেন না, আপনার ধর্ম দস্যুর ধর্ম।’ একই প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, একই পাপ। ধর্ষণকে নির্বাচনী খেলায় নামিয়ে আনা হয়। কেন্দ্র এবং রাজ্যে ক্ষমতাসীন দু’টি দল ধর্ষিত মেয়েদের সুরক্ষিত রাখা, সুবিচারের আশ্বাস দেওয়ার বদলে বিবেকহীনভাবে তাদের ব্যবহার করে। মেয়েদের দেহ ও শ্রম– দু’টি সম্পদের উপরেই পুরুষদের দখলদারিকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সমর্থন করে। ধর্ষণ হয়ে ওঠে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। উন্নয়ন অর্থনীতির পান্ডারা যতই আস্ফালন করুক, স্বাতী লিখছেন, মেয়েরা নিজেদের জীবন দিয়ে জানে কীভাবে ‘কুঁকড়ে থাকে মাঝরাতের বস্ত্রহীন মেয়ে।’ আমাকে ভাবায় আর-একটি নিবন্ধ ‘ঠায় দাঁড়িয়ে দশ ঘণ্টা’। এসি রেস্তরাঁ, শপিং মলের রক্ষী, বিক্রেতা, বাড়িতে বাজার সরবরাহকারিণী ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ‘কতক্ষণ ডিউটি?’ নিচু গলায় উত্তর আসে– “সকাল দশটা থেকে রাত ন’টা।” পা, কোমর, পিঠের ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে মালিক ও ক্রেতা কেউ মাথা ঘামায় না। আমাদের আবাসনে আমি একটি চেয়ার দিতে চাইলে উত্তর আসে– ‘বসতে দিলে শুতে চাইবে!’ দশ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অনলাইন অর্ডারের মাল ব্যাগে ভরেন তরুণ-তরুণীরা। চটকলের কর্মীরা লক্ষ্যপূরণের চাপে ছ’-সাত ঘণ্টা বসতে তো পারেনই না, শৌচাগারেও যেতে পারেন না। স্বাতী জানান, নোংরা দুর্গন্ধময় শৌচাগার এড়াতে মেয়েরা অনেক সময় জল খান না, আক্রান্ত হন মূত্রনালীর সংক্রমণে, যা ছড়িয়ে পড়ে কিডনিতে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকায় কখনও গোড়ালি ফুলে যায়, ভেরিকোজ ভেন আক্রান্ত হয়। স্বাতী জানান, কেরলে মহিলাকর্মীদের ইউনিয়ন নিয়মিত অভিযোগ করে, মালিকরা চেয়ার দিচ্ছে না। তাঁর প্রশ্ন– ‘আইন থেকে কী হবে, যদি তা কাজে না লাগে?’ ৮৬ পাতা দীর্ঘ শ্রমবিধিতে ‘পেশাগত নিরাপত্তা’-র কথা বলা হলেও ৮৬ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক রয়ে গিয়েছেন নিরাপত্তার বাইরে। স্বাতীর প্রশ্ন– ‘ভারতে ছাপ্পান্ন কোটি রোজগেরে মানুষ, মাত্র সাত-আট কোটি সংগঠিত ক্ষেত্রে। বাকিদের কী হবে?’ সব কাজে এখন ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ হয়। ঠিকাদার ‘বৈধ’ না হলে শ্রমিকও ‘অবৈধ’, অসুরক্ষিত। পশ্চিমবঙ্গের ইটভাটায় হতদরিদ্র মানুষ দাবদাহের মধ্যে কাঁচা ইট রোদে দেন। ঠিকাদারের খাতায় পুরুষদের নাম উঠলেও মহিলা ও শিশু মজুরদের নাম থাকে না।এক সময় পুরুষ গৃহশ্রমিকরা অন্য কাজে সরে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীন, মর্যাদাহীন স্বল্প মজুরির কাজে ঢুকেছেন মেয়েরা। গৃহশ্রমিকদের দাবি, ই-পোর্টালে ২২ লক্ষ দেখালেও তাঁদের সংখ্যা আসলে ৫০ লক্ষেরও বেশি। বহু বাধা পেরিয়ে সংগঠন তৈরি হলেও লক্ষ্যপূরণ হয়নি। মাছ নিয়ে গবেষণামূলক নিবন্ধটি হাড়হিম করে দেয়। বিশ্ববাজারের ৮ শতাংশ মাছ আসে ভারত থেকে, আর অন্যদিকে মৎসজীবী মেয়েরা পুরুষ প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং আড়তদারের প্রতারণার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। ময়লা-কুড়ানিদের নিয়ে রিপোর্টটি সর্বশ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক মানের। স্বাতী ভট্টাচার্য জানান, দুর্ঘটনার ভয় ও যৌন হয়রানি-সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত মহিলা মেথরদের অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়, এবং অহরহ অপমানিত হতে হয়। ‘আমাদের কেউ নেই গো। আমরা ধাপা পার্টি।’ চা-বাগানের মেয়েরা, আশাকর্মীরা (ডাক্তার, নার্স, সমীক্ষক, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী) কোথায় রয়েছি আমরা? স্ফীতোদর বাজার অর্থনীতির মানবতাহীন এই শ্মশানে একটু সম্মানের আশা নিয়ে লড়াই করে চলেছেন মেয়েরা। ‘চেয়ার ও একটি মেয়ে’ নামে নিবন্ধে দেখানো হয়, কর্তৃত্বের আসনে বসা স্বল্পসংখ্যক নারীর সাফল্যের পালকে কীভাবে লাগাতার লাগানো হয় কালি। ট্রেড ইউনিয়নে পুরুষদের দাবির (বেতনবৃদ্ধি, পেনশন) সঙ্গে মেয়েদের দাবিগুলি (ভদ্র শৌচাগার, মাতৃত্বের ছুটি, ক্রেশ, যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা) একেবারেই মেলে না। অসাম্য গোখরো সাপের ছোবলের মতো সমাজজীবনে মিশে থাকে। প্রশ্ন, উত্তর, উত্তরহীনতা। এর মধ্যে স্বাতী বিশ্লেষণ করেন মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যে অসমসাহসী বিদ্রোহিনী তারাকে, যে পুত্রসম পুরুষের প্রেমে পড়ে, শূর্পণখাকে, যে লিঙ্গ-রাজনীতির দান উলটে দেয়। “শকুন্তলা’ থেকে ‘জনা’, একাদশ সর্গের প্রতিটি মেয়ের কথায় ফুটে ওঠে তার এই ক্ষোভ যে, পুরুষটি সদয়, সংবেদী না হলে সে অসহায়।” ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য যেভাবে মেয়েদের মুখে ভাষা জুগিয়েছে তার মূল্যায়ন এখনও হয়নি, বিশ্বাস করেন স্বাতী। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মধুসূদন যথোপযুক্তভাবে এই কাব্য উৎসর্গ করেছিলেন বিদ্যাসাগরকে (‘নার্যা ভাবাভিব্যক্তিরিষ্যতে’)। এই বহুকৌণিক বইয়ের একটি বড় আবিষ্কার সাহিত্য বিষয়ক নিবন্ধগুলি, যা বিদ্যাসাগরের দয়া, চটকলে ‘রক্তকরবী’, ‘নটীর পূজা’ এবং সরলা দেবী চৌধুরাণীকে নিয়ে লিখিত। সরলার তিরতীক্ষ্ণ প্রশ্নময়তার সামনে গান্ধীজি ও রবীন্দ্রনাথের হতাশাজনক প্রতিক্রিয়ার দিকে আঙুল তোলেন লেখক। বিদ্যাসাগরের ‘দয়া’ (আমাদের মনে পড়বে রণজিৎ গুহর লেখা রাজা রামমোহনের ‘দয়া’-র কথা) সম্পর্কে কিঞ্চিৎ তাত্ত্বিক (কান্টের ডিয়ন্টোলজি এবং বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুশ্রূষাতত্ত্ব) নিবন্ধটিতে আছে সেই বাক্য, যা লেখকের সামগ্রিক অন্বেষণের কেন্দ্রকোরক হিসাবে গণ্য হবে– ‘নৈতিকতার একেবারে কেন্দ্রে শুশ্রূষার স্থান।’ বিদ্যাসাগর মশাই ‘কাঁদিতে লাগিলেন’, এ-কথা কতবার যে লিখেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এই কান্না দয়ার প্রবেশদ্বার। বইয়ের ছবিগুলি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে আর. জি. কর ধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদের পোস্টার, রাতদখলের মিছিল, আশাকর্মী, মিড-ডে মিল কর্মী, মহিলা তাঁতিদের মিছিল (‘তঁাতিরা খেটে মরে, মহাজনের পকেট ভরে’), নারী দিবস উদ্যাপন মঞ্চে ‘রেখে দে রেশমি চুড়ি, আমি চাই ঠিক মজুরি’ প্ল্যাকার্ড বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও চুনী কোটালের ছবি দেখে হাড়ের ভিতর শীত করে। বাজার অর্থনীতির সৃষ্ট এই অমানবিক দৃশ্যসর্বস্ব ‘সিমুলাক্রা’-র জগতে স্বাতী ভট্টাচার্যের বই বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। ঘনায়মান অন্ধকার আলোড়িত করা এই সমীক্ষাগুলি কল্যাণের কথা বলে। আমরা দেখতে পাই, নীল আসমানে এক-একটি জানালা খুলে যাচ্ছে। এই মৃত্যুহিম অন্ধকারে সেগুলি যেন দূর কোনও ভবিষ্যতের নারীদের জীবনের কবিতা।





