RK NEWZ এশিয়ান গেমসে তিরন্দাজির মঞ্চে এক অভূতপূর্ব ইতিহাসের লিখলেন ভারতের ১৭ বছর বয়সি কন্যা কুমকুম অনিল মোহদ। মহাদেশীয় এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে রিকার্ভ ইন্ডিভিজুয়াল ইভেন্টে শুধু পদকই জিতলেন না, সরাসরি সোনা ছিনিয়ে আনলেন মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর এই তরুণী। শিয়ান গেমস ২০২৬-এর রিকার্ভ মহিলা একক ফাইনাল ম্যাচটি পৌঁছয় এক টানটান রোমাঞ্চকর মোড়ে। টানা পাঁচ সেট লড়াইয়ের পর পয়েন্ট টেবিল দাঁড়ায় ৫-৫। অর্থাৎ, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে ‘শুট-অফ’-এর মাত্র একটি তীরে। অলিম্পিক ও বিশ্বমঞ্চে তিরন্দাজির পরাশক্তি বলে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়ার ওহ ইয়েজিন চাপ সামলাতে না পেরে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন এবং মাত্র ৮ পয়েন্ট স্কোর করেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই চরম মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন ১৭ বছরের ভারতীয় তিরন্দাজ। ধনুকে টান দিয়ে ছোঁড়া তাঁর শেষ তীরটি সোজা গিয়ে বিঁধে ১০ পয়েন্টের বুলস-আইতে! ফাইনাল ম্যাচটি ৬-৫ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে ভারতের ঝুলিতে সোনা এনে দেন কুমকুম।
ঠাকুমার ৩,০০০ টাকার উপহার থেকে স্বর্ণপদকের মহাকাব্য
আজ যিনি এশিয়ার সেরা তিরন্দাজ, আট বছর আগে তাঁর যাত্রাটা মোটেই সহজ ছিল না। অমরাবতীর এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা কুমকুমের তিরন্দাজির স্বপ্ন শুরু হয়েছিল তাঁর ঠাকুমার দেওয়া মাত্র ৩,০০০ টাকা দিয়ে। সেই টাকায় কেনা একটি সামান্য কাঠের ধনুক হাতেই রিকার্ভের প্রথম পাঠ নেন তিনি। পরিবারের চরম আর্থিক অনটন, সরঞ্জাম কেনার খামতি এবং কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয় – কোনও বাধা থমকে দিতে পারেনি তাঁর লক্ষ্য। সমস্ত প্রতিকূলতার মুখে তাঁর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর পরিবার এবং কোচ প্রফুল্ল ডাঙ্গে। সমস্ত বাধা পেরিয়ে আট বছরের কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা পরিণতি পেল এশিয়ান গেমসের এই ঐতিহাসিক সোনায়। এশিয়ান গেমসে এর আগে ভারতীয় মহিলারা রিকার্ভ বিভাগের এককে কখনও সোনা জেতেননি। ফলে কুমকুমের এই ট্রাইঅ্যাঙ্গেল বুলেট-শট কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ভারতীয় তিরন্দাজির ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রইল।
এশিয়ান গেমসের আসরে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। একদিকে সাফল্যের উজ্জ্বল রোশনাই, অন্যদিকে চরম লজ্জার অন্ধকার। পদক জয়ের গৌরব যখন দেশবাসীকে গর্বিত করছে, ঠিক তখনই এক হকি আম্পায়ারের কুকীর্তিতে আন্তর্জাতিক মহলে হেঁট হল মাথা। একদিকে শুটার নীরু ঢান্ডা সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ভারতের পতাকাবাহক হওয়ার বিরল সম্মান পেলেন, অন্যদিকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগে মাঝপথেই দেশে ফেরত পাঠানো হল হকি আধিকারিক গুরিন্দর সিং সঙ্ঘাকে।
নাগোয়ায় চলতি গেমসে ভারতের অন্যতম সফল অ্যাথলিট ২৭ বছরের ট্র্যাপ শুটার নীরু। ব্যক্তিগত বিভাগে সোনা দিয়ে শুরু। এরপর কায়নান চেনাইয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে মিক্সড টিম ইভেন্টেও সোনা জেতেন। পাশাপাশি মহিলাদের দলগত ইভেন্টে রুপোও এসেছে তাঁর ঝুলিতে। তিনটি পদক পকেটে পুরে ইতিমধ্যে দেশে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার ডেপুটি শেফ দ্য মিশন অঞ্জলি ভাগবত জানান, রবিবার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ভারতের মহিলা পতাকাবাহক হিসেবে নীরুকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এই সম্মান গ্রহণ করতে শনিবার সকালেই ফের নাগোয়া উড়ে গিয়েছেন তিনি। চলতি বছরেই লোনাটোতে আয়োজিত আইএসএসএফ বিশ্বকাপেও সোনা জিতেছিলেন নীরু। নাগোয়াতে ব্যক্তিগত, দলগত এবং মিক্সড টিম—তিনটি আলাদা ফরম্যাটেই তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেশের শুটিংকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। নীরুর সাফল্য যখন দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে, তখন হকির টার্ফে ঘোর অস্বস্তি। গেমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত আম্পায়ার এবং টেকনিক্যাল আধিকারিক গুরিন্দর সিং সঙ্ঘার বিরুদ্ধে মারাত্মক যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। জানা গিয়েছে, এক মালয়েশীয় মহিলা আধিকারিক এবং হোটেলের এক কর্মীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন তিনি। এর জেরে এশিয়ান হকি ফেডারেশন (এএইচএফ) তাঁকে তড়িঘড়ি দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। হকি ইন্ডিয়ার এক আধিকারিকের বক্তব্য, ‘মালয়েশিয়ার এক আধিকারিকের অভিযোগের ভিত্তিতে গুরিন্দরকে দু’দিন আগেই দেশে পাঠানো হয়েছে। এএইচএফ-এর বিস্তারিত রিপোর্ট পেলেই কড়া পদক্ষেপ করা হবে। দোষী প্রমাণিত হলে তাঁকে রেয়াত করা হবে না।’
গুরিন্দরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে রাঁচিতে হকি ইন্ডিয়া লিগ চলার সময়ও এক মহিলা আম্পায়ার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। যদিও সে বার প্রমাণের অভাবে তিনি পার পেয়ে যান। এশিয়ান গেমসে আধিকারিক নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি এএইচএফ-এর অধীনে থাকায় ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থা বা হকি ইন্ডিয়ার সরাসরি কোনও দায় নেই। তবে মহিলাদের হেনস্থার বিষয়টি হকি ইন্ডিয়ার কাছে নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতেই জাতীয় মহিলা দলের এক সাপোর্ট স্টাফকে একই ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল ফেডারেশন। এবার আন্তর্জাতিক আসরে ফের এক আধিকারিকের কুকীর্তি দেশের ভাবমূর্তিতে বড়সড় দাগ কাটল।
একই আসরে এক নারী যখন দেশের পতাকা হাতে নেতৃত্ব দেবেন, তখন আরেক নারীর সম্মানহানির দায়ে কলঙ্কিত দেশের নাম। নাগোয়ার মাটিতে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রের এই আলো-আঁধারির চিত্র এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের জন্ম দিল।




