RK NEWZ ফর্ম ৬ নিয়ে বিশেষ অভিযানের নির্দেশ। দেশজুড়ে এসআইআর -এর পরে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর -এর পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক এখনও মেটেনি। লক্ষ লক্ষ আবেদন ও আপিলের নিষ্পত্তি বাকি। তার মধ্যেই বড় পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গ সহ যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন শেষ হয়ে গিয়েছে, ঠ্যালায় পড়ে এবার সেখানে ভোটার তালিকা থেকে ‘left out’ বা বাদ পড়ে যাওয়া যোগ্য ভোটারদের খুঁজে ফের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্যবিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিল নির্বাচন কমিশন। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, শুধু ভোটার নিজে আবেদন করবেন—এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, সমস্ত জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং ERO-দের সক্রিয়ভাবে খুঁজে দেখতে হবে, SIR-এর পরে কোনও যোগ্য ভোটার তালিকার বাইরে থেকে গিয়েছেন কি না। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে Form 6 পূরণ করিয়ে ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এসআইআর নিয়ে কমিশনের তিন কমিশনারের মধ্যে চরম মতপার্থক্যের কথা সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গেছে। যা নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে এখন বিরোধীরা এককাট্টা। এহেন অবস্থায় কিছুটা ঠ্যালায় পড়ে কমিশন এই অভিযানে নামতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশ?
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই নির্দেশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ SIR-এর পরে নাম বাদ যাওয়া এবং নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন নিয়ে বিপুল সংখ্যক মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের SIR সংক্রান্ত ৩৮.২০ লক্ষ আপিলের মধ্যে তখন মাত্র ১.০২ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক আবেদন তখনও ঝুলে ছিল। তারও আগে অগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় প্রায় ৩৬.৬ লক্ষ মামলা SIR প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে আটকে ছিল। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি ( ‘logical discrepancies) সংক্রান্ত আবেদনগুলি খতিয়ে দেখছিল ১৯টি ট্রাইব্যুনাল। এই প্রেক্ষাপটেই কমিশনের নতুন নির্দেশ বাংলার বাদ পড়া ভোটারদের জন্য নতুন একটি পথ খুলে দিল। পুরনো আর নতুন তালিকা মিলিয়ে দেখা হবে। কমিশনের বৈঠকে রাজ্যের CEO-দের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে বিষয়টি শুধু নতুন আবেদন গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধিকারিকদের বলা হয়েছে SIR-এর আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে SIR-এর পরের তালিকা মিলিয়ে দেখতে। কার কার নাম বাদ গিয়েছে, সেই তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য কোথাও ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন কি না, তিনি ডুপ্লিকেট ভোটার ছিলেন কি না অথবা তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না। এর কোনওটিই না হলে অথচ তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়ে থাকলে, তাঁকে ‘left out’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করে ফের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন বুথ লেভেল অফিসার তথা বিএলও-রা। প্রয়োজন হলে বিএলও বা নির্বাচনী আধিকারিকরা সংশ্লিষ্ট ভোটারের বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ৬ পূরণে সাহায্য করবেন। রাজনৈতিক দলগুলির বুথ স্তরের এজেন্টদের সাহায্যও এই কাজে নেওয়া যেতে পারে। ফর্ম ৬-ই হবে ফেরার রাস্তা। SIR-এর পরে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের ফের তালিকায় আনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে ফর্ম ৬। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রেও এই ফর্ম ব্যবহৃত হয়। তবে এখানেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এসআইআর চলাকালীন অনলাইন ফর্ম ৬-এ একটি অতিরিক্ত ঘোষণা ( declaration) বা প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল। আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না, সেই তথ্য চাওয়া হচ্ছিল। এই পরিবর্তন নিয়েই নির্বাচন কমিশনের ভিতরে আপত্তি উঠেছিল। এখন কমিশন জানিয়েছে, ওই অতিরিক্ত ডিক্লিয়েরাশেন শুধু এসআইআর লাকালীনই ব্যবহার করা হবে। এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলিতে সাধারণ statutory Form 6 দিয়েই নতুন এবং বাদ পড়ে যাওয়া যোগ্য ভোটাররা আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পরবর্তী বিশেষ অভিযানে পুরনো অতিরিক্ত প্রশ্ন ছাড়াই ফর্ম ৬ হবে নাম ফেরানোর অন্যতম পথ।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিল কমিশন? দেশজুড়ে এসআইআর -এর পরে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়েই নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মামলায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীও এসআইআর সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিশনের ভিতরে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের তদন্তে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে Form 6-এর পরিবর্তন এবং ECINet-এর কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় ছিল। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের বৈঠকে একাধিক প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘unmapped’ অথবা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে যাঁদের নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সশরীরে শুনানিতে হাজির না করিয়ে BLO-র মাধ্যমে বাড়ি থেকে নথি সংগ্রহের ব্যবস্থা করার কথাও জানানো হয়েছে।
বাংলায় এখন কী হতে পারে? নতুন নির্দেশ বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে কাজের একটি দ্বিতীয় স্তর তৈরি হতে পারে। একদিকে এসআইআর -সংক্রান্ত লক্ষ লক্ষ আপিলের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলবে। অন্যদিকে, কমিশনের আধিকারিকরা পুরনো ও নতুন ভোটার তালিকা মিলিয়ে এমন যোগ্য ভোটারদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করবেন, যাঁদের নাম এসআইআর -এর পরে তালিকার বাইরে থেকে গিয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের নাম অন্য কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়নি, যাঁরা ডুপ্লিকেট ভোটার নন এবং যাঁদের মৃত্যু হয়নি—তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই এবং Form 6-এর মাধ্যমে নাম ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ফলে বাংলার যে ভোটাররা এসআইআর -এর পরে তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য কমিশনের এই বিশেষ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফর্ম ৬ জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম উঠে যাবে—এমন নয়। আবেদন যাচাই করে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
এসআইআরের বৈধতা খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে কমিশন গড়ল আইনজীবীদের সংগঠন
আইনজীবীদের একটি সংগঠন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এর বৈধতা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। বৈধতা যাচাই এর কাজটি করবেন সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা। লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন (LAFC)) নামে ওই সংগঠন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মদন বি লোকুরের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ বৈধতা, পদ্ধতি এবং সার্বিক প্রভাব খতিয়ে দেখবে। সংগঠনের তরফে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ফলে নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে কিনা সেই বিষয়টি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের কমিশন বিশেষভাবে খতিয়ে দেখবে। উল্লেখযোগ্য হল, এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে। বস্তুত, শীর্ষ আদালতের সম্মতির ভিত্তিতেই গত বছর বিহারে প্রথম এসআইআর কার্যকর হয়। দেশজুড়ে অভিযোগ উঠেছে বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েক কোটি বৈধ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ প্রায় ১৩ কোটি ভোটার বাদ গিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের সংগঠন এসআইআরের আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা খতিয়ে দেখা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল সুপ্রিম কোর্টও। শীর্ষ আদালতে এসআইআর মামলায় বিশিষ্ট আইনজীবীরা এই প্রক্রিয়াকে সংবিধানবিরোধী বলে দাবি করেছিলেন। আইনজীবীদের তৈরি স্বাধীন কমিশনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি লোকুর ছাড়াও থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি একে পট্টনায়েক, জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বদর দুররেজ আহমেদ এবং প্রাক্তন বিচারপতি রেখা শর্মা ও অঞ্জনা প্রকাশ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিশন অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি খতিয়ে দেখবে যে, এসআইআর প্রক্রিয়া কার্যকর করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন ন্যায় বিচার করেছে কিনা। এজন্য প্রাক্তন বিচারপতিদের কমিশন দেশজুড়ে গণশুনানি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। তারা ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক, সুশীল সমাজ সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সাক্ষ্য রেকর্ড করবে। এলএএফসি বলেছে, তাদের অনুসন্ধান ও সুপারিশগুলির বিষয়ে চূড়ান্ত দায়িত্ব অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত কমিশনের। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে কপিল সিবাল, প্রশান্ত ভূষণ, চন্দর উদয় সিং, প্রশান্ত চন্দ্র সেন, রাজু রামচন্দ্রন, রেবেকা ম্যামেন জন, ওয়ারিশা ফারাসাত এবং বৃন্দা গ্রোভার সহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী কমিশনকে কৌশলগত আইনি পরামর্শ দেবেন।




