RK NEWZ নেপালে ভয়ংকর দুর্যোগের পরেই পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশে দিল্লির পাঠানো ১১ জনের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। ৯ জনের বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে চিন। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া হলিউডের সাইফাই ছবি ‘২০১২’-কে মনে করিয়ে দিয়েছে নেপালের প্রলয়। বুধবার সকালে হিমালয়ের হিমবাহ ভাঙার পর সুন্দরী নদীই হয়ে উঠেছিল রাক্ষুসে! জল আর কাদার স্রোতে ভেসে গিয়েছিল শহর থেকে গ্রাম। বেঘোরে মৃত্যু হয়েছে অসংখ্য মানুষের। ভয়ংকর ওই দুর্যোগে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রবিবারের খবর, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৬৮ জনের। সব মিলিয়ে নিখোঁজ ৩০৪৮। হাজারও বাঁধা ডিঙিয়ে একটানা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। নেপাল প্রশাসন জানিয়েছে, মহাপ্রলয়ের পরে সে দেশে খোঁজ মিলছে না ২৫০২ জনের। এর মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি। মৃতের সংখ্যা ৭৫২। অন্যদিকে চিনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে বহু গ্রাম-জনপদ বিধ্বস্ত হলেও সেখানকার সঠিক তথ্য প্রকাশ্যে আসছে না বলেই অভিযোগ। যেহেতু ওই অঞ্চলে বিদেশি সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয় না চিনা প্রশাসন। চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১৬। খোঁজ মিলছে না ৫৬৪ জনের। এর মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি। ভয়ংকর হড়পা বানের জেরে ত্রিশুল এলাকায় একটি সুড়ঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ১০০ জন কর্মী আটকে পড়েছেন। নেপালের মন্ত্রী সুদান গুরুং জানিয়েছেন, ভিতরে বড় পাইপ ঢুকিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে নেপালি সেনা। যদিও রাতে একটানা বৃষ্টিপাত এবং নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। উল্লেখ্য, সব মিলিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মী নিখোঁজ। নেপালে ভয়ংকর দুর্যোগের পরেই পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশে দিল্লির পাঠানো ১১ জনের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। ৯ জনের বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে চিনও। রবিবার উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার কারণ তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি নতুন সৃষ্ট হ্রদ। এর আগে আরেকটি হ্রদের জল নিষ্কাশন হলেও তার কাছেই প্রায় ২.৮ কিলোমিটার দূরে ভূমিধসে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদে বিপদ বাড়ছে। ক্রমাগত বৃষ্টিপাতে জেরে ওই হ্রদের জল বিপজ্জনক পর্যায় পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের প্রলয়ঙ্করি বানের নেপথ্যে লাংটাং লিরুং হিমবাহ ধস। ঘণ্টায় ৩০০ কিমি বেগে নেমে আসা কাদা-জলে তছনছ এলাকা, ফের নতুন ৩টি হ্রদ থেকে প্লাবনের আশঙ্কা। নেপালে এখনও বহু মানুষের কোনও খোঁজ নেই। স্বজনদের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা। চলতি সপ্তাহে ভয়াবহ হড়পা বানে ত্রিশূলী নদীর উপত্যকার একাধিক গ্রাম ভেসে যায়। নিখোঁজ শতাধিক। চারদিকে শুধুই নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষা, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। হড়পা বানের পর থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই বিপুল জলরাশির এমন ভয়াবহ গতিতে নেমে আসার কারণ কী। তাঁর মতে, প্রায় এক কিলোমিটার আয়তনের একটি হিমবাহের অংশ সম্ভবত ভেঙে পড়েছিল। ঘটনাটি প্রায় ৫ হাজার মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় ঘটতে পারে। সেখান থেকে বিশাল বরফখণ্ড ও জলরাশি দ্রুত নীচের দিকে নামতে শুরু করে। নামার পথে সেই প্রবাহ একাধিক জলাশয়ের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অত্যন্ত খাড়া ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে নামার সময় বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে এগিয়েছে সেই জলরাশি। সঞ্জিৎ সিং বালসাইদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তিব্বতের দিকের সীমান্ত পারাপারের জায়গায় পৌঁছনোর আগে ওই প্রবাহ প্রায় ৩ হাজার মিটার নীচে নেমে এসেছিল। সরু গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে নামতে নামতে পুরো শক্তি একটি নির্দিষ্ট পথে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে হিমবাহের সঙ্গে নেমে আসা জল, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের সম্মিলিত শক্তি আরও ভয়াবহ আকার নেয়।
নেপালের হিমালয় হিমবাহ ও পর্বত গবেষক ধনঞ্জয় রেগমি জানিয়েছেন, জল ও ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ছিল, যা আগের অনুমানের থেকেও বেশি। বিপর্যয়ের পর ওই এলাকায় নতুন করে তিনটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। ফলে ফের বড়সড় বন্যার আশঙ্কা এখনও কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের ভয়, নতুন করে কোনও বড় পাথর ধস নামলে তিনটি হ্রদের উপরই তার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জল নিয়ন্ত্রিতভাবে বের করে দেওয়াই একমাত্র কার্যকর উপায় হতে পারে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই ধরনের কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে তথ্য নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ ও উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া একমাত্র সম্ভাব্য ব্যবস্থা। তারপর পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার সুযোগ নেই। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এই বিপর্যয়ের পিছনে রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। ‘স্নোস্কেপস’-এর ম্যানেজিং পার্টনার আশুতোষ মিশ্র জানিয়েছেন, প্রথম দিকে সন্দেহ করা হয়েছিল সদ্য তৈরি হওয়া তিনটি হ্রদের কোনও একটির বাঁধ বা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক ভেঙে যাওয়ার ফলেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পরে পাওয়া তথ্য সেই ধারণাকে বদলে দেয়। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই তিনটি হ্রদই বিপর্যয়ের মূল কারণ নয়। বরং লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর দিকের হিমবাহের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা ধসে পড়েছে। লাংটাং লিরুং প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতার একটি শৃঙ্গ। বিপর্যস্ত এলাকার মানুষ এখন এই দুর্যোগের কারণ নিয়ে ভাবার অবস্থায় নেই। দ্বিতীয় দফায় বন্যা হবে কি না, সেই আশঙ্কাও তাঁদের কাছে এই মুহূর্তে গৌণ। স্বজনদের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো এক ব্যক্তি তাঁর ভাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের লোক সেখানে থাকুক বা না থাকুক, যারা আটকে রয়েছে, তাদের বাঁচাতে হবে। আমাদের আপনজন না থাকলেও অন্যদের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে হবে। আমাদের অন্য ছেলে, অন্য ভাইদেরও বাঁচাতে হবে। সেখানে যে-ই থাকুক, সবাইকে বাঁচাতে হবে।’ তাঁর পরিবারের আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি না বলেন। এরপর ভাইয়ের ছবি হাতে থাকা ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার একটাই ভাই। কিন্তু অন্য নেপালিরাও তো আমাদের ভাই।’




