RK NEWZ পানমশলার আড়ালে ‘বিষ’! তামাক-সুপারির নেশায় মুখে বাসা বাঁধছে কোন মারণ রোগ? অনেকের ধারণা, সিগারেট না খেলেই মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি কম। তামাক না থাকলে সুপারি বা পানমশলা ততটা ক্ষতিকর নয়। তামাক-সুপারির নেশায় মুখে বাসা বাঁধছে কোন মারণ রোগ? একটি বিজ্ঞাপনকে ঘিরে বিতর্ক। কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় একটি স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তা। বিমল এলাচির বিজ্ঞাপন নিয়ে মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) শো-কজ নোটিস পেয়েছেন শাহরুখ খান, অজয় দেবগন ও টাইগার শ্রফ। এফডিএ-এর অভিযোগ, এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রে নিষিদ্ধ বিমল পানমশলার পরোক্ষ প্রচার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনটি নিয়ে বিতর্কের আইনি ও নিয়ন্ত্রক দিক আলাদা বিষয়। কিন্তু এই ঘটনাই ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে ভারতের একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যার কথা—তামাক ও সুপারি ব্যবহারের সঙ্গে মুখের ক্যানসারের গভীর সম্পর্ক। আইএআরসি-এর গ্লোবোকন ২০২২ তথ্য অনুযায়ী, ভারতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসার। এর পিছনে ধূমপানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ধোঁয়াবিহীন তামাকের। গুটখা, খৈনি, জর্দা বা তামাকযুক্ত পান—মুখের ভিতরে রেখে চেবোনো এই পণ্যগুলি সরাসরি মুখের টিস্যুকে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আনে।
মুখের ক্যানসারের সব কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু তামাক ও সুপারি ব্যবহারের মতো বড় ঝুঁকিগুলির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটা অনেকটাই নিজের হাতে। সিগারেট ছাড়ার পাশাপাশি গুটখা, খৈনি, জর্দা, তামাকযুক্ত পান এবং অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাক থেকেও দূরে থাকতে হবে। একই সঙ্গে সুপারিকেও তামাকের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে দেখা যাবে না। নিয়মিত দাঁত ও মুখের পরীক্ষা করানো এবং কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুখের ক্যানসার যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে, চিকিৎসার সুযোগ তত বেশি থাকে। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করা হতে পারে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে আর বিক্রি করা যাবে না পানমশলা! নীতি সংশোধন করল কেন্দ্র, ব্যবহার করতে হবে কাচ, টিন। এফএসএসএআই জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে। প্লাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল প্যাকেটে আর বিক্রি করা যাবে না পানমশলা। জানিয়ে দিল ভারতের খাদ্য সুরক্ষা ও নিয়ামক সংস্থা (ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা এফএসএসএআই)। কী দিয়ে পানমশলার প্যাকেট তৈরি করতে হবে, তা-ও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনস্থ এই সংস্থা। ২০১৮ সালের খাদ্য সুরক্ষা এবং মানক (প্যাকেজিং) নিয়ন্ত্রক নীতি সংশোধন করে তাতে পানমশলা সংক্রান্ত নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা এবং মানক (প্যাকেজিং) নিয়ন্ত্রক সংশোধনী নীতি, ২০২৬-এর মাধ্যমে নতুন নিয়মের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এফএসএসএআই। সোমবার সেই নিয়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্লাস্টিক ছাড়া অন্য কোনও জিনিসের তৈরি প্যাকেটে পানমশলা বিক্রি করতে হবে। কী দিয়ে তৈরি করতে হবে পানমশলার প্যাকেট? এফএসএসএআই জানিয়েছে, কাগজ, পেপারবোর্ড, সেলুলোজ়ের মতো জিনিস দিয়ে তৈরি করতে হবে পানমশলার প্যাকেট। কোনও মতেই প্যাকেটের উপকরণে প্লাস্টিক রাখা যাবে না। পলিথাইলিন, পলিপ্রপিলিন, পলিয়েস্টার, পলিভিনাইল ক্লোরাইডের মতো জিনিস দিয়ে পানমশলার প্যাকেট তৈরি চলবে না। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা মেটালাইজড লেয়ারের মতো কিছু দিয়েও পানমশলার প্যাকেট তৈরি করা চলবে না। তবে টিন বা কাচের তৈরি কৌটোয় পানমশলা বিক্রি করা যাবে। সংশোধিত নীতিতে জানানো হয়েছে, ২০১৬ সালের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি, ১৯৮৬ সালের পরিবেশ (রক্ষা) আইন মেনে এ বার থেকে পানমশলা প্যাকেটজাত করতে হবে। নীতি সংশোধনীর খসড়া চলতি বছর ২৮ এপ্রিল প্রকাশ করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত জানতে চেয়েছিল তারা। ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়। এফএসএসএআই জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞপ্তিতেও এ-ও জানানো হয়েছে, দেশে পানমশলা কোনও ভাবেই বন্ধ করা হচ্ছে না। বরং তা কী ভাবে প্যাকেটজাত করা হবে, এ বার সেই সংক্রান্ত নীতিও প্রণয়ন করা হচ্ছে।
চিকিৎসকদের কথায়, তামাক মুখের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। অনেকেই অল্প পরিমাণে তামাক দিয়ে শুরু করেন। ধীরে ধীরে নির্ভরতা তৈরি হয় এবং পরে তা আসক্তিতে পরিণত হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘আমি তো খুব অল্প খাই’—এই যুক্তিও নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহার মুখের কোষে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তামাকে থাকা ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক কোষের ডিএনএ ক্ষতি করে অস্বাভাবিক কোষ তৈরির পথ প্রশস্ত করতে পারে। তামাক নেই বলে সুপারি কি নিরাপদ? না। পান বা বিভিন্ন চেবোনো মিশ্রণে ব্যবহৃত সুপারিকেও হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আইএআরসি সুপারিকে গ্রুপ ১ কার্সিনোজেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অর্থাৎ, এটি মানুষের ক্যানসার ঘটাতে সক্ষম বলে প্রমাণিত। সুপারি ব্যবহারের সঙ্গে মুখের একাধিক সম্ভাব্য প্রি-ক্যানসারাস অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস। এই রোগে মুখের ভিতরের টিস্যু ধীরে ধীরে শক্ত ও সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে মুখ খুলতে অসুবিধা হতে পারে এবং স্বাভাবিক ভাবে খাওয়া-দাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই ‘তামাক নেই, শুধু সুপারি’, এই যুক্তি দিয়ে সুপারিকে নিরাপদ ভাবা ঠিক নয়। চেবোনো তামাক দীর্ঘক্ষণ মুখের ভিতরে রেখে দিলে মুখের টিস্যু সরাসরি ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে থাকে। বারবার এই সংস্পর্শের ফলে মুখের ভিতরে জ্বালা, প্রদাহ এবং টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই কোষ অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বাড়তে শুরু করলে ক্যানসারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সমস্যা হল, এই পরিবর্তন অনেক সময় চোখে পড়ার মতো বড় কোনও লক্ষণ দিয়ে শুরু হয় না। তাই নিয়মিত তামাক বা সুপারি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মুখের ছোট পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। মুখে কোনও ঘা হলেই যে ক্যানসার, তা নয়। কিন্তু কিছু লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মুখের ভিতরে দীর্ঘদিনের ঘা বা ক্ষত, সাদা বা লাল ছোপ, কোনও জায়গা অস্বাভাবিক ভাবে মোটা বা শক্ত হয়ে যাওয়া, গুটি বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, মুখে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অস্বস্তি—এসব সতর্ক হওয়ার মতো লক্ষণ। এর পাশাপাশি চিবোতে বা গিলতে সমস্যা, মুখ খুলতে অসুবিধা বা মুখের ভিতরের আবরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে কোনও মুখের ঘা দীর্ঘদিনেও না সারলে ‘সাধারণ ঘা’ ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়।




