RK NEWZ তোলাবাজির সহজ প্রাপ্তি ও সুখ এই রাজ্যে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সংক্রাম থেকে অনেকেই বেরতে পারেনি। নতুন সরকারের শাসনকালে তোলাবাজির লালসা আবার চাগিয়ে উঠেছে। কিন্তু তাকে আঁতুড়েই বিনাশের জন্য এই সরকারের সংকল্প, প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগ আশা, সাহস ও স্বস্তির সঞ্চার করেছে। নতুন সরকার তোলাবাজির সমস্যা কোনওভাবে লুকনোর চেষ্টা করছে না। এই স্বচ্ছতা দাবি করে অভিনন্দন এবং প্রত্যয়। রাজ্যবাসীর একান্ত প্রত্যাশা তোলাবাজদের প্রতি সরকারের এই কঠোর মনোভাব যেন সমস্ত শাসনকাল জুড়ে বজায় থাকে। যেন বিন্দুমাত্র শিথিল না হয়। নতুন সরকারের ঘোষণা, তোলা আদায়ের প্রতি দেখানো হবে ‘জিরো টলারেন্স’। ব্যবস্থা করা হবে ক্ষমাহীন অনিবার্য শাস্তির। বাংলা সংবাদপত্রের পাতায় ইদানীং যে-শব্দটির ছড়াছড়ি এবং আধিপত্য– সেই শব্দটি ‘তোলাবাজি’। একদিকে তোলাবাজির বিস্তৃত ও বিচিত্র অভিযোগ। অন্যদিকে সরকারের অঙ্গীকার এবং তর্জন তোলাবাজি বন্ধ করার। শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রাচীনে-নতুনে মেশানো। আগে যা ছিল তোলা আদায় করা, এখন তাই আরও স্মার্ট, টানটান এবং শক্তিশালী হয়ে তোলাবাজি। তবে তোলাবাজির ব্যাপকতা, স্টাইল, মাফিয়াগিরি এবং ভয়ংকরতা পালটেছে। কিন্তু আদি উৎসে এখনও তেমন রূপান্তর হয়েছে বলে মনে হয় না। নানাবিধ পরাক্রম এখনও তোলাবাজি বা ব্ল্যাকমেলের টেক-অফ রানওয়ে। যত ক্ষমতার জোর, তত তোলাবাজির হুংকার। এই ক্ষমতার পিছনে থাকে কখনও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। কখনও অসৎ অর্থের অবিশ্বাস্য প্রাচুর্য। কিন্তু আধিপত্য এবং মাফিয়া-শক্তি ছাড়া সম্ভব নয় অন্যের অর্থ, সম্পত্তি, অধিকার গ্রাস করা। ভূতপূর্ব শাসকের শাসনে আমরা ক্রমশ দেখেছি তোলাবাজি কত সর্পিল ও জটিল পথে কোন ব্যাপক প্রসার এবং কী অন্যায়বিদ্ধ লজ্জায় পৌঁছতে পারে। নতুন সরকার এসে তাই এই ঘোষণা করেছে, তোলা আদায়ের মতো নিকৃষ্ট অপরাধের প্রতি তাদের নীতি– ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ বা ‘জিরো টলারেন্স’-এর। অর্থাৎ, মুহূর্তের জন্যও সহ্য করা হবে না এই পাপ। ব্যবস্থা করা হবে ক্ষমাহীন অনিবার্য শাস্তির। ‘তোলাবাজি’-র সঙ্গে ভারতীয় জনসমাজের সংযোগের কথা বারবার আলোচিত হয়েছে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায়। পেশিশক্তি সম্বল করে কেউ বিস্তার করে প্রভুত্বের উপনিবেশ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় দুষ্ট রাজনীতিকের প্রশ্রয়, আখের গোছানোর অছিলা। কখনও বা সেই বৃত্তে আগমন ঘটে কর্পোরেট তন্ত্রের। এই ত্রিশক্তির সমাহারে ‘তোলাবাজি’-র গল্প ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তখন পরিত্রাতা রূপে জনসমাজের মধ্যে থেকেই উঠে আসে এমন কেউ, যে ‘নায়ক’। দুষ্টের বধ ও শিষ্টের পালন যার অভিপ্রায়িক লক্ষ্য। সমাজে এমন ঘটনার বীজ রয়েছে বলেই না সিনেমায় তা পল্লবিত হয়! তবে সুশাসনের জন্য প্রতিবার নায়ককল্প চরিত্রের আবির্ভাব ঘটাই কি আমাদের নিয়তি? সামাজিক স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিগত সততা কেন এত দিনেও স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হল না?
তোলাবাজির মামলায় বিধাননগরের প্রাক্তন পুর চেয়ারম্যান তথা নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়ক সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে ১,৭৩০ পাতার চার্জশিট পেশ করল বিধাননগর থানার পুলিশ। গ্রেপ্তারের ৫৭ দিনের মাথায় বুধবার বারাসত আদালতে চার্জশিট জমা পড়ে। এরপর তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে আদালত ১২ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। আগামী ১৭ আগস্ট ফের তাঁকে আদালতে তোলা হবে। একই মামলায় ধৃত বিদ্যুৎ গঙ্গোপাধ্যায় অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন। আদালত সূত্রের খবর, চার্জশিটে তোলাবাজি, অভিযোগকারীদের ভয় দেখানো, হুমকি এবং বিধাননগর পুরসভার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের এক প্রবীণের সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে ৪৮ লক্ষ টাকা আদায়ের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, টাকা সরাসরি অভিযুক্তের হাতে না নিয়ে একজন রিকশাচালক ও এক মুড়ি বিক্রেতার মাধ্যমে দু’দফায় সংগ্রহ করা হয়। মামলায় মোট ৪১ জনকে সাক্ষী দিয়েছেন। সব্যসাচী দত্তের আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জানান, তদন্ত শেষ হয়েছে। চার্জশিটও জমা পড়েছে। দীর্ঘদিন হেফাজতে রয়েছেন আমার মক্কেল। তাই উপযুক্ত শর্তে জামিনের আবেদন করেছি। এরপরই জামিনের বিরোধিতা করে বিশেষ সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় আদালতে জানান, চার্জশিট জমা পড়লেও বিচারপর্ব শুরু হয়নি। অভিযোগকারীদের একাংশ এখনও আতঙ্কে। এই অবস্থায় জামিন পেলে সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর জামিনের আবেদন খারিজ করে জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। ৮ জুন তোলাবাজির অভিযোগে সব্যসাচী দত্তকে গ্রেপ্তার করে বিধাননগর থানার পুলিশ। পরে মামলায় দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ধারা যোগ করা হয়। তদন্তে একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, লকারে তল্লাশি এবং বিপুল সোনা উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই আদালতে এই চার্জশিট পেশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সব্যাসাচী দত্তের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটও খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। রীতিমতো বিপাকে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক। এরমধ্যেই এবার তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করল পুলিশ।



