Wednesday, August 5, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

৩৬ বছর পর!‌ বাঙালি ‘‌জুডোকা’‌ অস্মিতার ইতিহাস!‌

RK NEWZ দৈনিক রোজগার তিনশ টাকা। একটা মাটির ছোট্ট ঘর। সেই ঘরেরই ছোট্ট মেয়েটা ইতিহাস গড়েছে। যা গত ছত্রিশ বছরেও ভারত করে দেখাতে পারেনি। ৩১ জুলাই। মহিলাদের ৪৮ কেজি জুডো ফাইনাল। সামনে কানাডার হাইডি কোয়াক। নির্ধারিত সময় শেষ। স্কোর সমান। শুরু ‘‌গোল্ডেন স্কোর’‌। অর্থাৎ, প্রথম পয়েন্টটা পেলেই চ্যাম্পিয়ন। অস্মিতা দে ঠিক সেই পয়েন্টটাই ছিনিয়ে নিলেন। ভারত ১৯৯০ সালের অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে প্রথমবার জুডো খেলতে নেমেছিল। জিতেছিল দুটো ব্রোঞ্জ। তারপর পেরিয়ে গেল ছত্রিশটা বছর। মোট এগারোটা পদক। পাঁচটি রুপো, ছ’‌টি ব্রোঞ্জ। কিন্তু সোনা? নেই। ২০১৪ সালে গ্লাসগো শহরেই ভারতীয় জুডো খেলোয়াড়েরা সবচেয়ে ভালো খেলেছিলেন। চারটে পদক এসেছিল। তবু সোনা আসেনি। ঠিক বারো বছর পর, এই একই শহর সব হিসাব চুকিয়ে দিল। কিন্তু এটা তো কেবল একটা সুসংবাদ। আসল কাহীনি তো এখনও শুরুই হয়নি! ম্যাচ জেতার পর অস্মিতার প্রথম যে মানুষটাকে ফোন করার কথা ছিল, সেই নম্বরটা আজ চিরকালের মতো বন্ধ। তাঁর বাবা, অর্জুন কুমার দে, সাত মাস আগে পরলোকে পাড়ি দেন ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে। ডিসেম্বরের ১ তারিখ, আর সেই দিনই সব কিছু থেমে গেল। অস্মিতা বলেছিল, ‘‌বাবা যখন চলে গেলেন, আমার মনে হয়েছিল সব শেষ। তিনিই তো একমাত্র মানুষ ছিলেন, যিনি সবসময় আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।’‌ একবার একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। ত্রিপুরার দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার বিলোনিয়া বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ছোট্ট একটা শহর। আগরতলা থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরে। জনসংখ্যা বড়জোর কুড়ি হাজার। এখানেই অর্জুন কুমার দে-র একটা সাইকেল মেরামতের দোকান ছিল। সারাদিন টায়ার পাংচার, চেন ব্রেক মেরামত করতেন। দু হাতে আবৃত কালো কালি। সেই কালি হাতেই খিদে পেলে একটু কিছু মুখে পুরে দেওয়া। শুধু খিদে সংবররণ। দিনের শেষে রোজগার কেবলমাত্র তিনশো টাকা। চার সন্তান। মাটির ঘর। তাঁরই মেয়ে অস্মিতা বলত, ‘‌আমি ত্রিপুরার একটা খুব ছোট্ট গ্রাম থেকে এসেছি। সেখানকার মানুষ অত বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না। কিন্তু বাবা সবসময় আমার সাহস জুগিয়েছিলেন।’‌ দারিদ্র্য শুধু মানুষের জমানো অর্থটাই কেড়ে নেয় না, মানুষের কল্পনাশক্তির ডানাগুলোও ছেঁটে দেয়। এক উঠতি প্রতিভারও মাথার ওপর অদৃশ্য একটা ছাদ তৈরী করে —এর চেয়ে ওপরে ওঠার কথা ভুলেও ভেবো না! অর্জুন দে নিজের মেয়ের মাথার ওপর সেই ছাদটা তৈরি হতে দেননি। লড়াইয়ের শুরুটা কিন্তু জুডো দিয়ে হয়নি। অস্মিতা একসময় আটশো মিটার দৌড়াতেন। জেলা ট্রায়াল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। তারপর একদিন কোনও এক কোচ ওঁর ক্ষিপ্রতা দেখে বললেন, ‘‌ম্যাটে এসো’‌। সালটা ২০১৫। ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুল। বিলোনিয়া বিদ্যাপীঠ কোচিং সেন্টারের বীনা দেবনাথ ছিলেন প্রথম কোচ। তারপর প্রশিক্ষক মাণিক লাল দেব। এই দুজনের হাত ধরেই প্রথম কোনও কৌশল করায়ত্ত। ২০১৮ সালে ভোপালের সাই ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সেলেন্স। কোচ যশপাল সোলোংকি। আর ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশ পুলিশে চাকরি। মাঝপথে হাঁটুর সেই মারাত্মক চোটের উদয়। যা সাধারণত খেলোয়াড়দের কেরিয়ারের কবর খুঁড়ে দেয়। দৈনিক তিনশো টাকা রোজগারী বাবা মেয়েকে নিয়ে সোজা দৌড় দিলেন দিল্লিতে। অস্ত্রোপচার, দামী ওষুধ, চিকিৎসা সবই হল সফলভাবেই। ঠিক কতদিন তাঁর সাইকেল মেরামতির দোকান বন্ধ ছিল? অর্থিক অনটনের কথা মুখ ফুটে কাউকে বলতেন না, অসহায় বাবা। কালের অমোঘ নিয়ম। অমনিষার অন্ধকার নেমে এল এক ডিসেম্বরে। অস্মিতার বাবা চিরকালের মতো চলে গেলেন। সবসময় অস্মিতাকে বলতেন—‘‌তুই খেলে যা, বাকিটা আমি দেখে নেব!’‌ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার উপক্রম অস্মিতার জীবনে। ম্যাট থেকে বহু দূরে সরে গেল ভেঙে তছনছ হয়ে যাওয়া হৃদয়। অস্মিতার মনে হয়েছিল, আর বোধহয় হবে না!‌ শেষকৃত্যের মাত্র দশ দিন পর ওর মা বললেন, ‘‌আজ যদি আমি তোকে আটকে দিই, তবে তোর বাবা এটাই ভাববেন যে আমিই তোর স্বপ্নগুলো খুন করে দিলাম।’‌ মাত্র দশ দিন। একজন সদ্য স্বামীহারা ‘‌মা’‌। বাড়িতে চার চারটে ছোটো ছোটো সন্তান। অস্মিতার ‘‌মা’ নিজের মেয়ের ব্যাগ গুছিয়ে আবার ভোপালে ফিরিয়ে দিলেন! বাবার চলে যাওয়াটা অস্মিতাকে চ্যাম্পিয়ন বানায়নি। বাবার চলে যাওয়ার পরও প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে আবার ম্যাটে ফিরে যাওয়ার অদম্য জেদ তাঁকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে। এটাই হল জুডোর মূল দর্শন। একজন ‘‌জুডোকা’‌র তীব্র জেদের গল্পকথা। ‘‌জুডো’‌ একটা জাপানি শব্দ। ‘‌জু’‌ কথার অর্থ হল, কোমল বা নমনীয় হওয়া। আর ‘‌ডো’‌ কথার অর্থ পথ। জুডো কথার আক্ষরিক অর্থ — বিনয়ে নমিত হওয়ার পথ। ১৮৮২ সালে এর প্রণেতা জিগোরো কানো একটা দারুণ নীতি শিখিয়েছিলেন—‘‌জু ইয়োকু গো ও সেইসু’‌। অর্থাৎ, কোমলতাই শেষ পর্যন্ত কঠোরতাকে জয় করে নেয়। সামনের জন যদি খুব জোরে একটা ধাক্কা মারে, তবে তার সঙ্গে গায়ের জোরে লড়াই করতে যেও না। একটু ঝুকে যাও। দেখবে তার নিজের শক্তির ভারসাম্য হারিয়ে সে নিজেই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আগে একটু নুয়ে পড়া। তারপর ঠিক জয় ছিনিয়ে নেওয়া। তেইশ বছরের মেয়ে অস্মিতা শুধু ম্যাটে নয়, নিজের বাস্তব জীবনেও করে দেখিয়েছেন। গ্লাসগো যাওয়ার আগের সপ্তাহগুলো সহজ ছিল না। যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। অস্মিতা বলছিলেন, ‘‌ভারতে থাকাকালীন আমার চোখেই ঘুম আসত না। সারা রাত শুধু আগামী ম্যাচগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতাম। শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকত, অথচ ঘুম হতো না। অথচ ঠিক ভোর সাড়ে পাঁচটায় আবার ট্রেনিংয়ের জন্য উঠে পড়তে হতো!’‌ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মিশাইল ম্যান এপিজে আব্দুল কালাম তাঁর ‘Ignited Minds’ বইতে একটা দারুণ প্রশ্ন তুলেছিলেন—আমাদের দেশে তো মেধার অভাব নেই, প্রতিভার অভাব নেই, সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই, তবুও আমরা সামান্য একটু কোনোমতে ‘‌চালিয়ে নেওয়া’‌ বা গড়ের মাঠে পড়ে থাকাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যাই কেন? তিনি বারবার বলতেন, স্বপ্ন সেটা নয় যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি, স্বপ্ন সেটাই যা আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। অস্মিতা হুবহু সেটাই করে দেখিয়েছেন। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে। একটা ছোট বিষয়, যেটা আমার মনে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। বাড়ির ফ্রিজে একটা মিষ্টি রাখা ছিল—লবঙ্গ লতিকা। অস্মিতার ভীষণ পছন্দের। ওর ভাই এনে দিয়েছিল।
সেই মিষ্টিটা ফ্রিজেই পড়ে রইল। অস্মিতা হাসতে হাসতে বলছিল, ‘‌ফ্রিজ খুলে বারবার ওটার দিকে তাকিয়েছি। প্রায় খেয়েই ফেলছিলাম প্রায়! তারপর নিজের হাত নিজেই টেনে সরিয়ে নিয়েছি।’‌ খাওয়ার লোভ সংবরণ। নিজেকে ফইট রাখতেই হবে। কমনওয়েলথ গেমসে ৪৮ কেজির ওজন বিভাগ। এক-একটা গ্রামের ওজনও ভীষণ দামি। পদক তৈরি হয় ফ্রিজে পড়ে থাকা সেই একটা মিষ্টি দিয়ে, যা তুমি ইচ্ছে সত্ত্বেও মুখে তোলোনি! ৩১ জুলাইয়ের রাত। অস্মিতার সোনা জেতার ঠিক কিছু সময় পর, তেইশ বছরের হর্ষ সিংও ৬০ কেজি বিভাগের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার অলিম্পিয়ান জোশুয়া কাটজকে ১০-০ ব্যবধানে হারিয়ে দেশের হয়ে দ্বিতীয় সোনাটা জিতে নিলেন। একই দিন। একই খেলা। প্রথমবার দু-‌দুটো ঐতিহাসিক জয়। ভারতের প্রথম জুডো চ্যাম্পিয়ন—সে পুরুষ হোক বা নারী। তার ঠিক পরেই প্রথম পুরুষ চ্যাম্পিয়নও চলে এল। সেই রাত পর্যন্ত গ্লাসগোতে ভারতের ঝুলিতে মোট তেইশটা পদক জমা হয়েছিল। কিন্তু ম্যাটের মাঝে গায়ে তেরঙ্গা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটার মনের ভেতর তখন কোনো মেডেলের আনন্দ ছিল না। মেডেল হাতে তাঁর চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছিল… একটা ছোট্ট সাইকেল মেরামতের দোকান। আর একজন মানুষ, যিনি আজ এই সোনালী সকালটা দেখে যাওয়ার জন্য আর পৃথিবীতে নেই। কিছু মানুষ হয়তো সবটা দেখে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকেন না। তাঁরা শুধু একটা অসম্ভব সুন্দর স্বপ্নের বীজ বুনে দিতেই পৃথিবীতে জন্ম নেন। শহরের এমন কোনো বাবা-মা আছেন কি না ভাবছেন, যাঁদের সন্তান খেলাধুলায় দারুণ, অথচ টাকার অভাবে এগোতে পারছে না? অস্মিতা কোনো বিরাট কোটি টাকার প্রাইভেট অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং নেননি। তিনি হেঁটেছেন সরকারি রাস্তা দিয়ে। সেই পথ আজও খোলা।

রাজ্যের নিজস্ব স্পোর্টস স্কুল বা ‘‌সাই’‌ স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার ট্রেনিং সেন্টার। সারা দেশে এরকম প্রায় ৬৯টা সাই ট্রেনিং সেন্টার আছে, যেখানে জুডোসহ বহু খেলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কোচ, কিট, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা—সবটাই এই স্কিমের আওতায়। ন্যাশনাল স্কুল গেমস এবং ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলো ইন্ডিয়ার ট্যালেন্ট হান্ট টিম সরাসরি এখানেই আসে প্রতিভাবানদের বেছে নিতে। রিক্রুটমেন্ট এভাবেই মাঠে হয়, কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে হয় না। খেলো ইন্ডিয়া অ্যাথলিট সিলেকশন দ্বারা নির্বাচিত হলে প্রতি খেলোয়াড়কে বার্ষিক পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী আট বছরের সাপোর্ট মেলে। এই দেশে ২৬টি অনুমোদিত এবং ২৪টি চালু সেন্টার রয়েছে সাই ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সেলেন্সের। অস্মিতাও ভোপালের এই সেন্টার থেকেই আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন। খেলার সমস্ত নিয়মকানুন এবং বয়সের প্রোটোকল খেলো ইন্ডিয়ার অফিশিয়াল ড্যাশবোর্ডে পরিষ্কার দেওয়া থাকে। এই পথগুলো একটু যত্ন করে মনে রাখবেন। কোনও কচিকাঁচা যদি খেলাধুলায় সত্যি ভালো হয়, অথবা প্রতিভাবান বলে মনে হয়, তাহলে শুধু ‘‌টাকা নেই’‌ ভেবে তার পথ আটকে দেবেন না। প্রতিভাকে এগিয়ে চলার ও স্বপ্নকে স্বার্থক করার সুযোগ করে দেওয়া প্রত্যেকের দায়িত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles