RK NEWZ বহু বিতর্কিত ‘লজ্জা’-র স্রষ্টা। লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ১৯টি বছরের পার! আবার কলকাতায় পা রাখা। তসলিমার কাছে যেন ঘরে ফেরা? জিভে আড়ষ্টতা নেই। কথা শুনে ঠাহর করার উপায় নেই, পূর্ববঙ্গের কন্যা। ১৯ বছর পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে কাটিয়ে দিল্লি আপাতত আপন। নিজেকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছেন। সংসার সেখানেই। খানিকটা অন্য রকম লাগছে প্রিয় ‘প্রগতিশীল’ কলকাতাকে দেখে। তসলিমাকে ‘বাংলাদেশি লেখিকা’ বলে পরিচয় দেন অনেকে। তিনিও নিজেকে ‘বাঙালি লেখিকা’ বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যে সময়ে তাঁর জন্ম, তখন ‘বাংলাদেশ’ বলে কোনও দেশ তৈরি হয়নি, মনে করিয়ে দেন বছর ৬৩-র তসলিমা।’ ৭১-পূর্ব পূর্ববঙ্গে জন্মানো, বাবরি-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যিক-মহলে পরিচিতি অর্জন করা ‘দ্বিখণ্ডিত’-র লেখিকার কাছে কলকাতায় আসা, অনেকটা বাড়ি ফেরার মতো। নিউ ইয়র্ক শহরে বহু বাঙালির মধ্যে বসে থাকলে কিন্তু ঘর মনে হয় না তাঁর। জন্মের জায়গা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ছাড়া তেমন ঘরোয়া আরামের জায়গা ঢাকা আর কলকাতা। বাংলাদেশে পা রাখার অধিকার বহু কাল হল গিয়েছে। ৩২ বছর দেশছাড়া। ‘‘আমাকে কেউ বাংলাদেশি বলেন, পূর্ববঙ্গে আমার জন্ম বলে। কেউ কেউ বাংলাদেশি-সুইডিশ লেখিকা বলেন। আমি সুইডিশ নাগরিক বলে। সুইডিশ হলাম কী ভাবে? আমি সুইডিশ ভাষাটাই জানি না। বাংলাদেশও তো এক সময়ে ছিল না। তাই না!’’ বক্তব্য তসলিমার। নিজের কথায় তাই তিনি শুধুই বাঙালি। বাঙালিদের জায়গা পশ্চিমবঙ্গও তাঁর ‘ঘর’। পশ্চিমবঙ্গেও তিনি ঠিক বাইরের নন। আন্তর্জাতিক মিডিয়া, জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যম ‘বাংলাদেশি লেখক’ বলে তাঁর পরিচিতি লেখে ঠিকই। বাংলা সংবাদপত্র, কলকাতার টিভি চ্যানেলে তিনি শুধুই তসলিমা নাসরিন। সেই কলকাতাও ছাড়তে হয়েছিল! এতকালে আর কেউ ডেকে আনেনি। তসলিমার অভিমান হয়েছিল যখন তৎকালীন বাম সরকার তাঁকে আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। আবার দুই সরকার পেরিয়ে যখন আমন্ত্রণ পেয়েছেন ফেরার, তাতে আনন্দিতও।অভিমান যায়নি। বার বার ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অস্বস্তি-ক্লান্তি প্রকাশ করেন ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, নারীর শোষণের বিরুদ্ধে অক্লান্ত লিখে চলা তসলিমা। ‘এ বার যদি কেউ বলেন যে, আমাকে আর এখান থেকে চলে যেতে হবে না, তবেই কলকাতায় থাকতে আসতে পারি’। নির্লিপ্ত উচ্চারণের মাঝে মিশে অভিমান। এক বার যখন আসার সুযোগ হয়েছে, তখন বার বার আসার মন তৈরি করে নিয়েছেন। ফিরে এসে এখানে বসত গড়বেন কি না, সে পরের ব্যাপার। বইমেলা, অনুষ্ঠান আরও বহু কিছুতে আবার দেখা যে যাবে তাঁকে এ শহরে— সে কথা স্পষ্ট করেন। শান্ত স্বরে প্রত্যাবর্তনের তৃপ্তি দিব্যি প্রকাশ পায় প্রতিবাদী লেখিকা বলে পরিচিত তসলিমার মুখভঙ্গিমায়। আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্বিখণ্ডিত’-তে বিতর্কিত মতের প্রকাশ ঘিরে উত্তাপের জেরে ২০০৭ সালে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর থেকে মান-অভিমানের সম্পর্ক এ শহরের সঙ্গে। তসলিমার দিল্লিবাসী এক বাঙালি বন্ধুর কথায়, ‘‘বাঙালিদের শাড়ি থেকে আড্ডা— সবই তো পছন্দ তসলিমার। অনেক সময়েই কলকাতার প্রসঙ্গ তোলেন কথায় কথায়।’’ তবে ১৯ বছর পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে কাটিয়ে দিল্লি আপন হয়ে গিয়েছে। দিল্লির বাঙালিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন। প্রবাসী বাঙালিদের আড্ডা-অনুষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত। নিজেই জানান, তাঁর লেখা উপন্যাস থেকে সেখানে নাটক হলে আনন্দ হয়। তসলিমা বলেন, ‘‘দুই বাংলা আমার কাছে একই। বাংলা থেকে দূরে গেলে প্রবাসী বলে মনে হয় নিজেকে। কলকাতায় এলে এখনও সেটাই হয় ঘরে ফেরা।’’
শহরে এসেই বহু ব্যস্ততার মাঝে ঘুরে এসেছেন ৭ নম্বর রওডন স্ট্রিটে তাঁর বাসা ছিল যেখানে, সেখান থেকে। নানা অনুষ্ঠান, বন্ধু সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে কফি হাউসে কালো কফিতে চুমুক দিতে দিতে সাক্ষাৎকার, দাওয়াতের ব্যস্ততায় শহরটা হেঁটে দেখার সময় না পেলেও কয়েকটি জায়গায় অবশ্যই ঢুঁ দিতে ভোলেন না। এক সময়ে ইসলামের বিবিধ প্রসঙ্গকে প্রশ্ন করে নির্বাসিত হতে হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। তারপর সেখান থেকে সুইডেনে আশ্রয়। ইউরোপের কিছু দেশে ঘুরে ঘুরে কেটেছে বছর দশ। এত বছর ধরে ঘরহীনতার কথা বলতে বলতে যখন ২০০৪ সালে কলকাতায় বসবাস শুরুর সময়টা মনে করেন, তাতে ক্লান্তির থেকে আরামের প্রকাশ খানিক বেশি সচেতন সম্ভ্রান্ত কণ্ঠস্বরে। কলকাতায় আসা তাই তাঁর কাছে আর পাঁচটা মামুলি সফর নয়, স্পষ্ট করে দেন বহু বিতর্কিত ‘লজ্জা’-র স্রষ্টা। তসলিমার কাছে কলকাতা হল কবিতা-সাহিত্যের শহর। পুরনো কথা মনে পড়ে এসেই। ‘‘খুব লিখতাম তখন’’, কলকাতায় বসবাসের প্রথম দিকটার কথা মনে করে বলেন। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে দেখা করার ইচ্ছা। নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও কলেজ স্ট্রিট যাওয়া, নিজের প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ উপভোগ। পছন্দের সাহিত্যের শহর যে বেশ খানিকটা বদলে গিয়েছে, তা দিনকয়েকেই টের পাচ্ছেন। মুখে খুব বেশি বলছেন না। তসলিমা বলছেন, ‘‘আরও খানিকটা সময় কাটাতে হবে, সবটা বুঝতে গেলে। কিন্তু শহরটা বদলেছে তো বটেই!’’ তসলিমার জন্য আয়োজিত সভায় রাজনীতির টানাপড়েন আর কটূক্তির জেরে ‘তৃণমূল ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত এক কবিকে তসলিমার কবিতার মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য হওয়া। কারণ, সভা তখন বিজেপি ঘনিষ্ঠ বহু জনে ভরা। আয়োজকও তো তাঁরাই। তার পর সেই কবি জয় গোস্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তসলিমা। জয়ও জানিয়েছেন, তসলিমার কবিতাপাঠ শুনতে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলে তিনি আবার যাবেন। তসলিমা মনে করেন, আগে কলকাতার সাহিত্যিকেরা রাজনীতিতে এতখানি জড়িয়ে পড়তেন না। কোনও দলে যোগ দিতেন না সে ভাবে। কলকাতার সাহিত্য-মহলে এটা একটা বড় বদল। ‘‘নিজের সুবিধার জন্য রাজনীতিতে জড়ানোর বিষয়টা আগে ছিল না লেখক-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে,’’ বলেন তসলিমা। তসলিমা পশ্চিমবঙ্গের সদ্য গঠিত বিজেপি সরকারের আমন্ত্রণেই এসেছেন এ রাজ্যে। তা নিয়ে যথেষ্ট গুঞ্জন। ইসলামের মৌলবাদ নিয়ে যিনি সরব, তিনি কী করে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলে পরিচিত এক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনিও জানেন, প্রশ্ন উঠবেই। জবাব প্রস্তত ঠোঁটের ডগায়। বলে দেন, ‘‘আমি কোনও মৌলবাদের পক্ষে নই। শুধু যে মৌলবাদ বেশি দেখেছি, তার বিরুদ্ধে বেশি লিখি।’’ মান-অভিমানের সম্পর্ক এ রাজ্যের সঙ্গে। যখন এখানে আসতেন না, তখনও তেমন ছিল। এখন আবার তেমনই হবে। লেখিকা পুরনোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চান, বলেন, ‘‘আমি খুব উদার।’’ কী হয়েছিল, মনে রাখতে চান না। অন্যদের আরও বেশি মনে পড়ে ঠিক কী কী ঘটেছে ইতিহাসে। তসলিমার কলকাতায় ফেরা অন্য অনেকের ঘরে ফেরার থেকে আলাদা। তাঁর ফিরতে ইচ্ছা করে। বাংলাদেশেও যেতে ইচ্ছা করে।




