Saturday, August 1, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়’!‌ সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর :‌ শুভেন্দু

RK NEWZ প্রায় দু’দশক পর কলকাতায় ফিরেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তসলিমা বলেন, “৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি মানবিকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাক স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলেছি। বিপদ এসেছে কিন্তু আমার বিশ্বাস বদলায়নি। বাংলাদেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ভয়াবহ। রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলয় নীল-সহ অনেক মুক্তচিন্তককে মৌলবাদীরা হত্যা করেছে। তাঁদের অপরাধ ছিল, তাঁরা প্রশ্ন করেছে। ইসলামের বিধানের সমালোচনা করেছে। তাঁদের হত্যা করে সমাজকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্ন করলে মৃত্যু। নীরব থাকলে জীবন। তবে আমি এই জীবন মানি না। যে জীবন বাকস্বাধীনতার বিনিময়ে কিনতে হয় সে জীবন, জীবন নয়। প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। প্রশ্নকারীকে হত্যা করলে আরও বহু প্রশ্নকারী ফিরে আসে। যে সমাজ প্রশ্নকারীকে কারাগারে পাঠায় সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে। বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকলেও অবিশ্বাসের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। ধর্ম নিরপেক্ষতা হল, আইন থেকে ধর্মকে পৃথক রাখা। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না, রাষ্ট্রের থাকবে ন্যায়। আমি বিশ্বাস করি একদিন বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে। নারী পুরুষ সমানাধিকার পাবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করবে। নাস্তিক ও মুক্ত চিন্তকরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই রাস্তায় হাঁটবে। আশা কোনও অন্ধআশাবাদ নয়। অন্ধকারের অস্তিত্ব জেনেও আলো তৈরি করার জেদ। মনে অভিমান থাকলেও দু’হাত ভরে রয়েছে ভালোবাসা। যে শহর থেকে চলে যেতে হয়েছিল সেখানেই ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছি। ঘর কেড়ে নিয়েছে কিন্তু, ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিতে পারেনি। মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ। আমার মন থেকে দেশকে বের করতে পারেনি। কী ক্ষতি করেছি যে চলে যেতে হয়েছিল? আজ আমি প্রশ্ন করতে আসিনি। বলতে এসেছি, ফিরে এসেছি। কলকাতায়, একটা বাক্য বলতে ১৯ বছর সময় লাগল। আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।”

দু’দশকের ‘লজ্জা’ সত্যিই কেটে গেল! শনিসন্ধ্যায় কলকাতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রবীন্দ্রসদনে বিখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত জানালেন শহরবাসী। সেই মুহূর্ত আরও বিশেষ হয়ে উঠল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর স্বাগত ভাষণে। লেখিকার উদ্দেশে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মুক্ত বার্তা, ‘‘সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রী। আপনি যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা আসবেন, কথা বলবেন। শৃঙ্খলমুক্ত, বাঁধনমুক্ত পশ্চিমবঙ্গে সবার আসার, বাক স্বাধীনতার সুযোগ আছে। ধমক-চমক অতীত। আজ প্রমাণিত, নতুন সরকারের হাতে বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা সুরক্ষিত।” সেকুলার মিশনের উদ্যোগে তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ‘ফেরা’ বড় উদযাপনই বটে। শনিবার বিকেলে রবীন্দ্রসদনে সেই উদযাপনের অপেক্ষায় ছিল সাংস্কৃতিক মহল। তসলিমাকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নজরে পড়ে। সন্ধ্যা নাগাদ লেখিকা সেখানে পা রাখতেই বোঝা গেল দু’দশক ধরে কতটা তৃষ্ণা বুকের ভিতর জমিয়ে রেখেছিল এ শহর। তুঁতে বালুচরী, লাল টিপে ‘বঙ্গকন্যা’র মুখেও তখন প্রশান্তির বিচ্ছুরণ! কিছুক্ষণ পর রবীন্দ্রসদনে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঞ্চে তসলিমাকে স্বাগত জানান, দেওয়া হয় নাগরিক সংবর্ধনা। সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি ছবি তুলে দেওয়া হয় লেখিকার হাতে। এরপর ‘দ্বিখণ্ডিত’ স্রষ্টার ছবি খোদাই করা একটি রুপোর মেডেল নাগরিকদের তরফে উপহার হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘শৃঙ্খলমুক্ত, বাঁধনমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ। সবার এখানে আসার, সবার বাক স্বাধীনতার সুযোগ রয়েছে। আমাদের প্রিয়, সম্মানীয়া লেখিকা বঙ্গভূমিতে পা রেখেছেন। তাতেই প্রমাণিত, নতুন সরকারের হাতে বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা সুরক্ষিত। কোনও ধমক-চমক নয়। সেসব এখন অতীত। নতুন সরকারে শুধু মুখ বদল হয়নি। আরও অনেক বদল হয়েছে। তসলিমা নাসরিন সেসব ভালোই বুঝতে পেরেছেন আশা করি। ওঁকে বলতে চাই, আপনি যতবার খুশি, যখন খুশি আসুন। সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।” তসলিমা নাসরিনের জন্য কবিতা লিখেছেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, সেই কবিতা তিনি পড়ে শোনান।

দেখতে দেখতে কুড়ি বছর। তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরলেন শুক্রবার। দুই দশক তিনি শহরে না থাকলেও এই বাংলায় তিনি অপ্রাসঙ্গিক বা অনালোচিত ছিলেন, এমনটা তাঁর অতি বড় নিন্দুকও বলতে পারবে না। তিনি সাহসের সর্বনাম। তিনি প্রতিবাদের সুচারু কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তসলিমা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তবু অনেকের মতে, সাহিত্যিক তসলিমাকে যেন ছাপিয়ে গিয়েছে অন্য প্রেক্ষিতগুলি। প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবাদের তীব্রতা কি শৈল্পিক সৃজনশীলতাকে আড়াল করে দেয়? আসলে তসলিমার বহু রচনায় তাঁর ব্যক্তিজীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনই সমাজ থেকে ধর্ম, নারী-পুরুষের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বিষয়গুলিও রয়েছে। মিলেমিশে গিয়েছে। ফলে শিল্পের সূক্ষ্মতার বদলে ব্যক্তিগত মতামতের স্পষ্ট উচ্চারণ তাঁর সৃজনের মানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে- এমনও মত অনেকের। তবে এপ্রসঙ্গে বলতে গেলে তসলিমা নাসরিনের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন ঘটনাবহুল হলে তাঁর কলমের কালিতে মিশে যায় সেই সব বর্ণিল অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি। তসলিমার জীবন। পেশায় চিকিৎসক। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্র্যাকটিসও করেছেন। কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। ১৯৯২ সালে পেয়ে গিয়েছেন আনন্দ পুরস্কারও। তবে ‘লজ্জা’ ঘিরে যে ঢেউ উঠল তা ছিল প্রবল। বাবরি ধ্বংস-পরবর্তী দাঙ্গার ধাক্কা বাংলাদেশেও পড়েছিল। এই প্রেক্ষাপটেই লেখা সেই উপন্যাস। যা প্রকাশের পর মৌলবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে কেবল ফতোয়া জারি করেই ক্ষান্ত হয়নি। মৃত্যুর হুমকিও দিয়েছিল। সদ্য তিরিশ পেরনো এক যুবতীকে ছাড়তে হল দেশ। আজ তিনি ষাট পেরিয়ে গিয়েছেন। প্রিয় জন্মভূমিতে আর ফেরা হবে না। কলকাতাকে ভালোবেসেছিলেন। সেই শহরও ছাড়তে হয়েছিল বছর কুড়ি আগে। তীব্র বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তসলিমাকে কলকাতায় থাকতে দেয়নি। শুক্রবার যখন ফিরলেন, তাঁর কি মনে পড়ছিল না ২০০৭ সালের সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা? একরাতের মধ্যে রাতারাতি শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। আরও একবার ঠাঁইনাড়া হওয়া। এমন এক জীবন যাঁর, তাঁর জীবনচর্চা আর পাঁচজনের মতো হবে না সেটাই স্বাভাবিক। সমসাময়িক বঙ্গীয় লেখক-কবিদের কথা ধরলে মানতেই হবে তসলিমার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তাঁদের সকলের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন মাত্রায় বয়ে চলেছে গত কয়েক দশক ধরে। সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স এবং আমেরিকা নানা দেশ ঘুরেছেন। এদেশের দিল্লিতেও থেকেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষা ও বঙ্গভাষীদের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাওয়া… হয়নি। এই নির্বাসন, এই লড়াই তসলিমার লেখক সত্তাকে প্রভাবিত করবে না, তা কি হয়? তাঁর কবিতায় পাই, ‘আমার জন্য অপেক্ষা করো মধুপুর নেত্রকোনা/ অপেক্ষা করো জয়দেবপুরের চৌরাস্তা/ আমি ফিরব। ফিরব ভিড়ে হট্টগোল, খরায় বন্যায়… শোনো শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, সীতাকুণ্ড-পাহাড়- আমি ফিরব।/ যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন।’ এই পঙক্তির মধ্যে যে আকুতি, তার সততা ও নিষ্ঠাকে গ্রহণ করলে বোঝা যায় ফিরে আসার এই প্রতিজ্ঞা স্রেফ সৃজনের অভিপ্রায়ই নয়। তা সত্যের দীপ্যমান প্রতিবিম্বও বটে।

কেবল আশ্রয় নয়, তসলিমার জীবনে পুরুষও স্থায়ী হয়নি। প্রথম জীবনে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বছর চারেকের দাম্পত্য। তারপর বিচ্ছেদ। এরপর নাইমুল ইসলাম খান, মিনার মাহমুদ। সম্পর্কের এই ভাঙনগুলিও তাঁকে উন্মনা করেছে। ‘ভালোবাসা আমি যতটা নিয়েছি লুফে/ তারো চেয়ে পারি গোগ্রাসে নিতে ভালোবাসা হীনতাও।/…অতল নিষেধে ডুবতে ডুবতে ভাসি,/ আমার কে আছে একা আমি ছাড়া আর?’ এই জীবনবীক্ষা, অনুভবই তসলিমা। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘আমি ও আমার গল্প একই।’ তসলিমা এমন উচ্চারণ কোনও লেখায় করেছেন কি না জানা নেই। তবে না বললেও আসলে বিষয়টা সেটাই। একধরনের বিপন্নতা ও বিদ্রোহ তাঁর লেখনীকে চালিত করেছে বরাবর। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ বইয়ে লিখেছিলেন, ”অল ইউ হ্যাভ টু ডু ইজ রাইট ওয়ান ট্রু সেনটেন্স। রাইট দ্য ট্রুয়েস্ট সেনটেন্স দ্যাট ইউ নো।” এই ‘সত্যি’ বাক্যই লিখতে চেয়েছেন তসলিমা। তাঁর পাঠকও সেটাই পড়তে চেয়েছে। প্রতিবাদের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ও তসলিমা সমার্থক। শৈল্পিক সৃজনশীলতা নিয়ে সংশয় থাকল কি থাকল না সেটা নিয়ে কখনও হয়তো ভাবিতও হননি তিনি। দৃঢ়তা, সাহিত্য ও প্রতিবাদের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ভীক উচ্চারণই এত বছর ধরে তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তাঁর পাঠক-পাঠিকারাও সেটা জানেন। তসলিমাকে তাঁরা ভালোবাসেন এই সত্যের দীপ্তির কারণেই। ভালোবাসবেন আগামিদিনেও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles